ছায়াপথ। শব্দটি শুনলে মনে হয় অনেক দূরবর্তি এক বিশালতা যেন। কিন্তু সেই ছায়াপথে তো আমরাও আছি।
সর্বমোট ৩৭ টি সায়েন্স ফিকশন গল্প আছে এ সংকলনে। 'ছায়াপথ'এ যারা লিখেছেন তাদের প্রায় ২০ জনের লেখনির সাথে আমি আগে থেকে পরিচিত। কারো কারো প্রায় সব রচনা আমি পাঠ করেছি। তাই বৈজ্ঞানিক কল্পগল্পের সংকলনটি আমার ইচ্ছাতালিকায় ছিলো।
সায়েন্স ফিকশন বর্তমানের বর্ধিত রূপ। আমরা যেরকম ডিস্টোপিয়ান সময়ে বাস করছি 'ছায়াপথ' গ্রন্থটিতে সেই সময়ের এক্সটেন্ডেড ভার্শন ঘুরেফিরে এসেছে বেশিরভাগ গল্পে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে সতর্কবাণী, মানুষের পৃথিবীকে বসবাসের অযোগ্য বানিয়ে ফেলা, গোত্রে গোত্রে সংঘর্ষ, ভিন গ্রহের প্রাণীর ব্যাপারে সতর্কতাসহ বিভিন্ন সফট ফিলসফির দেখাও বইটিতে পাওয়া যায়।
একটি গল্পসংকলন মূল্যায়নে আমার নিজস্ব এক দর্শন আছে। যদি প্রতি চারটি গল্পে একটি ভালো লেগে যায় তাহলে উক্ত গ্রন্থ পাশ মার্ক পেয়ে যায়, আমার দৃষ্টিকোণ থেকে। আমার পছন্দের গল্পগুলি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা পরবর্তি প্যারায় শুরু হচ্ছে।
১) পেরিপ্ল্যানেটা আমিরিকানা - আহসান হাবীব
একদম ছোট্ট একটি গল্প। তবে তেলাপোকার ডিএনএ থেকে এআই এর ভিতরকার সৃষ্ট পরিবর্তনের আখ্যান বেশ ভালো লেগেছে। আহসান হাবীব গুনীজন। রম্যের বাইরে সাই-ফাইতে তাঁর হাত ভালো। হয়তো কমিক্স নিয়ে কাজ করার ফলে লেখকের এ জনরায় হাত পেকেছে।
২) অবজেক্ট - মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
সায়েন্স কম ফিকশন বেশি কায়দা আমার হার্ড সাই-ফাই থেকে বেশি পছন্দের। থ্রিলিং এক অভিযানের গল্পে শেষের দিকে খানিকটা মন খারাপ হয়ে যায়।
৩) ফেরা - শরিফুল হাসান
দারুন এক গল্প লিখেছেন শরিফুল। মেকানিস্ট জীবন থেকে বেরিয়ে আসার আকুতি কাউকে কতটুকু সেক্রিফাইস করাতে পারে এ বিষয়টি গল্পের মূল শক্তির জায়গা ছিলো।
৪) শূন্যতার এনট্রপি - নাফিস আমিন
লেখক সম্পর্কে গল্পটি পড়ার আগে কোন ধারনা ছিলো না। কিন্তু যেরকম কনসেপ্ট নিয়ে তিনি লিখেছেন তা প্রশংসা না করে পারছি না।
৫) বনস্পতি - জাহিদ হোসেন
এই লেখকের লেখনির সাথে পরিচিতরা 'জাহিদিয় ক্ষ্যাপামি' এর সাথে পরিচিত। তবে গল্পটি জাহিদ হোসেন সচরাচর যেরকম লিখেন সেই স্টাইল থেকে একটু ভিন্ন এবং মানুষ ও বৃক্ষের পারস্পরিক রহস্যময় সম্পর্কের আদি কাহিনী যেভাবে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে তিনি রচনা করেছেন তা ভালো লেগেছে।
৬) পুনরাবৃত্তি - পায়েল নূসরাত
আর্মি ট্যাকটিকসের সাথে থ্রিলিং এক বৈজ্ঞানিক কল্পগল্প যেরূপ গল্পকথনে লেখক উন্মোচিত করেছেন, এই সংকলনের আমার অন্যতম সেরা গল্পগুলির মধ্যে 'পুনরাবৃত্তি' একটি মনে হয়েছে।
৭) রৌরবকাল - কৌশিক মজুমদার
আরেকটি অন্যতম সেরা গল্প। কোন স্পয়লার দিতে চাই না। তবে লেখক এক গল্পে হরর, সাই-ফাই, টিকে থাকার আপ্রাণ সংগ্রাম সুন্দর রচনা করেছেন।
৮) একজন ডেলিভারি ম্যান - ওয়াসিফ নূর
আমার মতে এই সংকলনের সবচেয়ে সেরা গল্প এটি। সংক্ষিপ্ত এ গল্পে একজন ডেলিভারি ম্যানের একদিনের মহাবিপদে যে টুইস্ট দিয়েছেন লেখক সেটির চেয়েও গল্পের সাবটেক্সট আমার চমৎকার লেগেছে। ব্রিলিয়ান্ট একটি গল্প।
৯) আধমরা বিড়ালজোড়া - নাবিল মুহতাসিম
নাবিল মুহতাসিম বলতে গেলে কখনো হতাশ করেন না। নাবিলিয় ভঙ্গিমার স্টোরিটেলিং আসলেই গ্রিপিং। তাছাড়া গল্পের নাম দেখেই সচেতন পাঠকের বুঝে যাওয়ার কথা কোন বৈজ্ঞানিক থট এক্সপেরিমেন্টকে উপজীব্য করে লেখক গল্পটি রচনা করেছেন। বেশ উপভোগ্য ছিলো 'আধমরা বিড়ালজোড়া'। তাছাড়া গল্পের এক অংশে 'বিভং'এর প্রতি সামান্য একটু নড কি নাবিল দিয়েছেন?
কেপির স্টোরিটেলিং সম্পর্কে নতুন কী আর বলবো। এআই এর সাথে মানবমনস্তত্ত্বের অদ্ভুত মিল এবং সহ্যক্ষমতার পার্থক্য যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক, তা মনে রাখার মতো।
১১) ডেসপারেটলি সিকিং দ্য ইমপসিবল - তানজীম রহমান
তানজীম রহমান মানে নিরীক্ষাধর্মী লেখা। একটি মন্তব্যঘরের কথাবার্তার মাঝে সুন্দর গল্প ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।
১২) স্নাত - বাপ্পী খান
সায়েন্স ফিকশনে আতঙ্কমিশ্রিত অস্বস্তি সৃষ্টি করেছেন বাপ্পী খান। সম্ভবত তাঁর লেখনির শক্তির জায়গা থেকেই রিখেছেন।
১৩) উত্তম পুরুষ - আলী ওয়াহাব সৌহার্দ্য
গিফ্টেড এই লেখক অতিশুদ্ধতাবাদ কীভাবে সবকিছু বিনাশের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে তা নিয়ে সুন্দর লিখেছেন।
১৪) ভক্সওয়াগেন ১৯৬৯ - সামসুল ইসলাম রুমি, হাসান ইনাম
এই গল্পটা সায়েন্স ফিকশনের সাথে ঐতিহাসিক ইভেন্টকে যুক্ত করে যেভাবে হিউমার দিতে পেরেছে এ কারণে বহুদিন স্মরণে থাকবে।
১৫) আকাশ আমার - মুনাজিল রহমান
লেখকের প্রথম কোন রচনার সাথে পরিচিতি হলো। মুনাজিল রহমান গল্পকথনের অন্যতম থাম্বরুল "শো, ডোন্ট টেল" এর যেরূপ সার্থক প্রয়োগ করেছেন তা প্রশংসার দাবীদার।
১৬) সোফিয়া - কায়সার কবির
সায়েন্স ফিকশনে ভালো ইন্টেন্সিটি আনতে সক্ষম হয়েছেন কায়সার কবির। খুব ভালো লেগেছে গল্পটি।
সায়েন্স ফিকশন জনরা আমার অনেক সময় প্রায় ফ্যান্টাসির মত লাগে। এটা কি শুধুমাত্র আমার সাথে ঘটে কিনা জানি না।
তবে গল্প সংকলনের অপেক্ষাকৃত কম ভালো লাগা অংশগুলি নিয়ে একটু বলা দরকার। সম্পাদকের কাজ শুধুমাত্র প্রুফ রিডিং নয় এ কথা আমার অজানা নয় তবে 'ছায়াপথ'এ বেশ চোখে পড়ার মতো মুদ্রনপ্রমাদের দেখা পেয়েছি। তাছাড়া আমার মতে যারা লিখেছেন তাদের সবার সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি থাকলে আরো ভালো হতো। আশা করছি পরবর্তি সংস্করণে ( যদি সম্ভব হয় ) সিদ্দিক আহমেদ এবং সালমান হক এসব দিক একটু খতিয়ে দেখবেন।
কারণ দুজনকেই আমি গুনিজন হিসেবে জানি। তাদের কাছ থেকে তাই এক্সপেক্টেশন বেশি রাখলে দোষের কিছু হয় না, মনে হয়।
সব মিলিয়ে সমৃদ্ধ এক বৈজ্ঞানিক কল্পগল্প সংকলন হয়েছে 'ছায়াপথ'।
সায়েন্স ফিকশন যারা পছন্দ করেন তাদের এ গল্পসংকলন গ্রন্থটি ভালো লাগতে পারে।
বই রিভিউ
নাম : ছায়াপথ সম্পাদনা : সিদ্দিক আহমেদ । সালমান হক প্রথম প্রকাশ : অমর একুশে বইমেলা ২০২৪ প্রকাশক : আফসার ব্রাদার্স প্রচ্ছদ : রোমেল বড়ুয়া অক্ষরবিন্যাস : ঈশিন কম্পিউটার এন্ড গ্রাফিক্স ডিজাইন জনরা : বৈজ্ঞানিক কল্পগল্প, সফ্ট ফ্যান্টাসি। রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
সায়েন্স ফিকশন মূলতঃ অনতিদূর ভবিষ্যৎ কেমন হবে সেটা একজন লেখক তাঁর সৃষ্টিশীল কল্পনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন। প্রেক্ষাপট ভবিষ্যৎ হলেও, এ জনরার সাহিত্যের মূল ভিত্তি আসলে বর্তমান-ই। রোগ-শোক, জরা, মৃত্যু, প্রযুক্তি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আবেগ, প্রেম, রাজনীতি ইত্যাদি নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ কারণে সভ্যতার উন্নতির যেখানে অন্তরায়; সেই দেয়াল গুলোকে ভেঙে ওড়ার ব্যবস্থা করে দেয় এই সাহিত্য। কেমন হতো মানুষ যদি এসবের উর্ধ্বে যেতে পারতো? কেমন হতো জ্ঞাতিভাই কোনো বুদ্ধিমান এলিয়েনের সাথে যদি যোগাযোগ হতো? কেমন হতো যদি জানতাম, যা দেখছি সবই মেকি? কৌতুহলী প্রশ্নের উদ্রেক যেমন সায়েন্স ফিকশন করে, তেমনি উত্তরটাও কল্পনা করে নেয়। সেই কল্পণাকে আবার লাগাম টেনে রাখে ব���জ্ঞানের যুক্তি। সায়েন্স ফিকশন মূলতঃ মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ বার্তা নয়, বরঞ্চ সতর্কবার্তা, কখনোবা আশার বার্তা। কখনোবা কাল্পনিক একটা আইডিয়া সত্যি সত্যি বদলে দিতে পারে গোটা দুনিয়ার ভবিষ্যৎ।
আমি বুঝতে পারি আমরা যে সময়টায় বাস করছি, তা সায়েন্স ফিকশনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। আমরা মাত্রই একটা বিরাট মহামারি সামাল দিয়েছি। পৃথিবীর রাজনীতি টালমাটাল অবস্থায়। সবচাইতে বড় ব্যাপার বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে আসতে চলেছে অভূতপূর্ব পরিবর্তন। এআই এখন বর্তমান, মানুষ মহাকাশ ভ্রমণ করতে পারছে বিনোদনের জন্য, আমরা ব্ল্যাকহোল দেখেছি প্রথমবার, ইলন মাস্ক নামের পাগলাটে প্রযুক্তিবিদ নিওরোলিংক নামের ইলেকট্রনিক চিপ বসাচ্ছেন মস্তিষ্কে, হলোগ্রাফিক প্রযুক্তি আসলো বলে, চোখে ভিশন-প্রো পড়ে লাম্পপোস্টকে লাগছে প্রেয়সীর চাইতে সুন্দর, ইন্টারনেটে ঘটছে ভয়াবহ সব ঘটনা, সরকার ক্যামেরা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে প্রত্যেকটা নাগরিকের ঘরে। এ যেনো সত্যিকারের ব্ল্যাক মিরর সিনেমার একেকটা এপিসোডের রিয়েল স্ট্রিমিং! এমন পরিবর্তনের যুগ শতবছর পর আসে একটা সভ্যতায়। সে হিসেবে সায়েন্স ফিকশন লেখকদের জন্য এর চাইতে উত্তম সময়ে জন্ম আর কখন হতে পারে?
পরিবর্তনের এ ছোঁয়া 'ছায়াপথ'-এর লেখকদের লেখায় পাওয়া গেছে। এআই জ্বরে ভুগছে বিশ্ব, তাই এআই নিয়ে উঠে এসেছে কতগুলো গল্প। এখানে আছে সুপরিচিত লেখকদের লিখা ৩৭টি সাইফাই ছোটগল্প! এতগুলো গল্প যখন, সব গল্পে মন টানবেনা স্বাভাবিক। তবু যত্নের সাথে গল্পগুলো লেখা, সংগ্রহ ও সম্পাদনা হয়েছে বোঝা যায়। নির্দ্বিধায় বলার মতো রিচ একটি সংকলন। আরও বোঝা গিয়েছে এ ধরণের সংকলন কেন আরো প্রয়োজন।
বইটির সবচাইতে ভালো দিক হলো এখানে লেখকেরা তাদের নিজস্ব কমফোর্ট জোনে, নিজস্ব ভঙ্গিতেই গল্প লিখেছেন। যেমন মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন লিখেছেন সাইফাই থ্রিলার, জাহিদ হোসেন লিখেছেন পাগলাটে সায়েন্স ফ্যান্টাসি, আবরার আবীর লিখেছেন বৃহৎ স্কেলে ছোট একটা গল্প...এরকম।
দূর্বল দিক বললে, বেশিরভাগ গল্পেই পায়োনিয়ার লেখকদের ছাপ দেখা যায় বাক্যগঠন, সংলাপ, প্রযুক্তির ধারণা বা এক্সপোজিশনে। প্রান্ত ঘোষ দস্তিদারের লেখা- 'রুচিবদল' গল্পটা ছাড়া 'শো ডোন্ট টেল' ধরণের লেখার সাহস করতে কাওকে তেমন দেখলাম না। সাইফাই গল্পে ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং বা টাইমলাইনের বর্ণণা দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, সেটিকে বোরিং না করে গল্পের মাঝে ফুটিয়ে তোলাতেই কৃতিত্ব বলে মনে হয় আমার।
আবার গতানুগতিক ধাঁচের বাইরে নতুন আইডিয়া এক্সপ্লোর করে লেখা হয়েছে কয়েকটি গল্প। যেমন, রুশদী শামসের- উপপাদক, মাশুদুল হকের- পারফেক্ট কেক, কৌশিক মজুমদারের- রৌরবকাল, ওয়াসি আহমেদের- এখানে দুঃখ উৎপাদন করা হয়, আলী ওয়াহাব সৌহার্দের- উত্তম পুরুষ, সামসুল ইসলাম রুমি ও হাসান ইনামের- ভক্সওয়াগেন ১৯৬৯, অর্নব কবিরের- দর্পণবিভ্রম এই গল্প গুলোর প্লট চমৎকার। তানজীম রহমানের চ্যাটবক্সের আদলে স্যাটায়ারিক গল্পটার ধরণটাও মজার। তবে কৌশিক মজুমদার, নিয়াজ মেহেদি, হাসান ইনাম, কৌশিক জামান যেমন পরিচিত বা বাঙালী প্লটে গল্প লিখেছেন, অমন গল্প কমই ছিল। নিয়াজ মেহেদী বা মাশুদুল হকের গল্পদুটি আমার আগে পড়া হয়েছে।
সাইফাই কোনো সায়েন্স আর্টস কমার্সের স্পেসিফিক জনরা নয়। সকল শ্রেণীর পাঠক চাইলেই এর স্বাদ নিতে পারেন। হয়তো হার্ডকোর বা হাই সাইফাই প্রথম প্রথম কঠিন লাগবে। তবে বেশিরভাগ সাইফাই সহজ করেই পুরো ধারণা ভেঙে বুঝিয়ে লেখা হয় সবার জন্য। কারণ, বিজ্ঞান সবার। বরঞ্চ আমার মতে, যিনি একাডেমিক পড়াশোনায় বিজ্ঞান পড়েন নি, তিনি সাইফাইতে অন্যভাবে মজা পেতে পারেন, জন্ম দিতে পারেন অন্য দৃষ্টিভঙ্গির।