সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর প্রবন্ধে মনের চোখ তৈরির জন্য 'বই পড়ার' কথা বলেছিলেন। মনের চোখ কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি করে, আপন ভুবন তৈরি করে সেখানে ডুব দিতে সাহায্য করে। 'মিথলজি' জনরাটি কল্পনাশক্তি বৃদ্ধির এই কাজটি খুব সুন্দরভাবে করে থাকে। পুরাণের গল্পগুলি কল্পনার দরজা খুলে দিয়ে এক অন্য রাজ্যে পাঠককে অবলীলায় নিয়ে যেতে পারে। 'প্যাপিরাসে পুরাণ' সংকলনটির অভিনবত্ব এই যে, এখানে মোট ২৬টি মিথলজি-ফিকশন গল্প স্থান পেয়েছে। দুই বাংলার জনপ্রিয় পুরাণ লেখকদের গল্পের পাশাপাশি আছে মিথলজি প্রতিযোগিতা থেকে নির্বাচিত গল্প। প্রতিটি গল্পের বিষয়বস্তুতে রয়েছে বৈচিত্র্য, ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ। পাঠক গল্পগুলিতে একইসাথে পাবেন স্থান- কাল-পাত্রের মিশ্রণে লেখকদের চিন্তাশক্তির এক অভূতপূর্ব উপস্থাপনা। বিভিন্ন স্থানের পুরাণের সাথে জীবনের সংমিশ্রণে উঠে এসেছে সৃষ্টি-ধ্বংস, শুভ-অশুভ কিংবা জন্ম-মৃত্যু-ভালোবাসার কথা। এ কথা বলাই যায়, গল্পগুলি পাঠককে একটু হলেও ভাবাবে।
পুরাণ আর মিথোলজির সবচেয়ে বিরক্তিকর পাঠক সম্ভবত আমি। তারপরও প্রতি বছর এসব বই সংগ্রহ করা আমার লাগবেই। পড়িও বসে বসে। তয় বিদগ্ধ পাঠক, আমার করা রেটিং মোটেই গুরুত্বের সাথে নেবেন না। বইটির গল্পগুলোকে আমি শুধু গল্প হিসেবে নিয়েই রেটিং করেছি। বইটিতে মোট ২৬ টি গল্প আছে। যথা (আমার ব্যাক্তিগত রেটিং সহ) -
কি আশ্চর্য তাইনা, পুরাণ-মিথলজিকে আমরা এই ঝাঁ তকতকে বিদ্যুৎ বাতির আলোর নিচে বসে থেকেও আজো ভুলতে পারিনি। অথচ যখন এসবের জন্ম, তখন মাথার উপর শুধু বিরাট এক প্রশ্নবোধক অন্ধকার রাতের আকাশ আর সেই আকাশ জুড়ে মৃত নক্ষত্রপুঞ্জির মিটিমিটি আলো ছাড়া আর কিছুই নেই। আমরা যখন গুণতে শিখলাম, কড়ায় গন্ডায় গুণে বের করলাম আমরা বোধহয় পৃথিবীতে জীবিত আছি ২০০০০০ বছর ধরে। এই গণণা, আর্কিওলজিস্টদের ধারণা, গুহামানবদের অদ্ভুত চিত্রকর্ম...মূলকথা এই নির্ধারণের আদর্শ নিরুপণেও একরকম জড়িয়ে আছে পুরাণ। পুরাণের জন্ম দর্শনের আগে, বিজ্ঞানের আগে, ধর্মের আগে, ধারণা করা যায় ভাষারও আগে। মানুষ যখন থেকে ভাবতেও শেখেনি ঠিকমতো, তখনও পুরাণ ঘিরে রেখেছে অদৃষ্টের চাদর দিয়ে। নাহলে এত দূর্বল উদ্ভট একটা প্রাণি এতদূর এলো কি করে? এভাবে দেখতে দেখতে, বুঝতে বুঝতে হাজার হাজার মিথ কবে যে আমাদের শেয়াল, শিম্পাঞ্জিদের দল থেকে আলাদা করে বড় করে তুললো আমরা ধরতেও পারিনি। ফ্যান্টাসির সম্রাট টোলকিন বিশ্বাস করতেন, মিথের জন্ম হয় সত্য থেকে। মানুষের চেতনা যখন শিশুপর্যায়ে, তখন মাথাভর্তি অজস্র, অগণিত প্রশ্নে অস্তিত্ব ভরে উঠতো। এতসব প্রশ্ন নিয়ে মানুষ কার কাছে ছুটবে? বিজ্ঞান নেই, দর্শন নেই, ধর্ম নেই, সত্য কোথা থেকে পাবো? তখন উত্তর দেয়া শুরু করলো প্রকৃতি। এই পুরাণ হলো প্রকৃতির উত্তর! যে উত্তর আমাদের শত সভ্যতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় এখনো। কিভাবে তারা চিন্তা করতো, কিভাবে সেসব চিন্তা থেকে সবকিছু গড়ে উ্ঠেছিল, কিভাবে মাথার উপর এই বিদ্যুৎ বাতিটা এলো সেই জার্নিটা আমরা জানতে পারি এখন।
পুরাণ নিয়ে এজন্য সাহিত্যের শেষ নেই, সম্ভবতঃ কখনো শেষ হবেওনা। নানা দেশের পৌরাণিক সাহিত্যের ভান্ডারে ভাসতে ভাসতে বাঙালি এক পুরাণপাগল লেখক এস এম নিয়াজ মাওলা এবং ফেসবুক ভিত্তিক সাহিত্য গ্রুপ বইপোকাদের আড্ডাখানার মানুষেরা ভাবলো, আচ্ছা আমাদের বাংলা ভাষাভাষিদের মুখ থেকে পুরাণের গল্প শুনলে কেমন হয়? সেই থেকে জন্ম নিলো 'প্যাপিরাসে পুরাণ' নামের এই বইটি।
মোট ছাব্বিশটি গল্প। প্রথম গল্পটিই একটি ৭০ পৃষ্ঠার বড়্গল্প, নাম 'নপুংসক'। এই গল্পটা মূলতঃ গ্রিসে রোমান সাম্রাজ্যের সময়কাল নিয়ে। চমৎকার গল্প। একটা বিচার এবং ভুখন্ডের রাজনীতি নিয়ে এই গল্পটা একরকম কোর্টরুম ড্রামা আর সেই সময়কালের সভ্যতার একটা ধারণা দেয়। পুরো গল্পটা পড়তে গিয়ে মিথের ছোঁয়া দেখা যায়নি তেমন, বরং শুধু সভ্যতা নিয়েই গল্পটা এগিয়েছে বলে ধন্দ লেগে যায়। তবে শেষমেশ বিচারেও কিভাবে মিথের প্রভাব কাজে লাগতো দেখা গিয়েছিল কিছুটা। সুন্দর গল্প, কিন্তু কিছু কিন্তু কিন্তু প্রশ্ন রেখে গিয়েছে মনে।
পরের গল্পটি মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর স্যারের লেখা 'চালাক ব্যাটার বউ'। খুবই মজার একটা গল্প। আরও বেশ কিছু গল্প ভালো লেগেছে। যেমন, কৈবর্তলোক, প্যান্ডোরা, অমরা, চক্র, লিলিথের জন্য হাহাকার, আতেনের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি এবং লাউ চিংড়ি!
গ্রিক, নর্স মিথোলজির গল্পের জয়জয়কার দেখা গেছে। সবচেয়ে প্রচলিত মিথ বলেই বোধহয়। ইনকা, অ্যাজটেক, মায়ান, চীন সভ্যতার গল্পের অভাব লক্ষণীয়। বিষয়টা খারাপ বলছিনা, কারণ তাবাসসুম নাজের লেখা দেবতা হাফেস্টাসকে নিয়ে লেখা প্যান্ডোরা গল্পটার মতো চমৎকার গল্পের দেখা তো পেয়েছি। আমার খুব পছন্দের চরিত্র মেডুসা কয়েকবার এসেছে বিভিন্ন গল্পে। বিষয়টা ভালো লাগা উচিত, কেনো যেনো সেটা লেবু অধিক কচলানোর মতো লেগেছে।
লাউ চিংড়ি, কৈবর্তলোক এই গল্পগুলোর মাধ্যমে দেশীয় মিথের দেখা পাওয়া গেছে। কৈবর্তলোক গল্পটা নিয়ে আমার অভিযোগ- গল্পের লেখনী পুরোপুরি মৌলিক নয়। গল্পটা মৌলিক হতে পারে, তথ্য শুধু পরিবেশন নয় লেখা নিয়ে লেখকের আরও সাবধান হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। যাহোক, এ গল্পগুলোর মাধ্যমে বাংলার সুন্দরবনের বনবিবি, মাকাল ঠাকুর, দক্ষিণরায়-দের সাথে মানুষের পরিচয় ঘটছে এটা আনন্দের। এছাড়াও অমরা, কাক এই গল্পগুলো ভারতীয় মিথের সাথে দেখা করিয়ে দেবে। রবিন জামান খানের কাক গল্পটি থেকে কাকভূষন্ডির মতো ইন্টারেস্টিং একটা চরিত্রের খোঁজ পেয়েছি।
ফেব্রুয়ারিতে বইটি শেষকরার পর আমার বেশ কিছুদিন দোনমনা কাজ করেছে। আমি এটাকে পুরোপুরি ভালো বলতে পারছিনা বলেই হয়তো। বেশিরভাগ গল্পে অভিনবত্বের অভাব এবং বেশিরভাগ গল্প হররে রূপ নিয়েছে। সব গল্পকে থ্রিলার বা হররে রুপান্তরিত করার টেন্ডেন্সি থেকে বেড়িয়ে আসা জরুরি। অথচ কত ধরণের গল্প হতে পারতো... হতে পারতো বিভিন্ন মিথের দেবতাদের দেখা হয়ে গেল, তাদের মধ্যে আলোচনা হল। কেমন হতো যদি পুরাতন কোনো মিথলজিক্যাল সভ্যতা এখনো বাস্তবে থাকতো? কতশত মহাযুদ্ধ হয়েছিল, কেমন হত যদি সেসব যুদ্ধের ফল ভিন্ন হতো? (অল্টারনেট মিথ প্রায় একেবারেই বইতে অনুপস্থিত)। দেব-দেবীদের নিয়ে, দোষ নিয়ে পর্যালোচনা হয়নি, হতে পারতো সেরকম কোনো টপিকে গল্প। অথবা বর্তমান পৃথিবীর কোনো গল্প, যে গল্পের পরিণাম হাজার লক্ষ বছর পুরাতন সভ্যতার মিথেও ছিল একই। কিংবা ধরি একটা মিথের জন্ম কিভাবে হলো তা নিয়ে কল্পগল্প। কতশত আইডিয়া, অথচ বেশিরভাগ গল্পই সেসবের ধার ধারেনি। দুই একটা গল্প মিথের গল্পকে রিরাইট করেছে বাংলায়। মহিউদ্দিন মোহাম্মাদ যুনাইদের 'লিলিথের জন্য হাহাকার' বা ফাজানা রহমানের 'দ্যা বক্স অফ গডেস পরার্পিনার...' ছাড়া বেশিরভাগই খুব একটা জমেনি।
সম্পাদনা ভালো হয়েছে, তবে কিছু গল্পের ক্ষেত্রে প্র��ক্ষাপট বা সোর্স উল্লেখ করলেও অনেক নবিশ পাঠকদের জন্য উপভোগ আরও সহজ হত। (রবিন জামান খানের 'কাক' গল্পটি দ্রষ্টব্য) নতুবা একটা ডিসক্লাইমার পড়ে যেতেই পারে, বইটি শুধুমাত্র যারা মিথ নিয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন তারাই উপভোগ করতে পারবেন। সবশেষে, না বলে পারছিনা, কিছু গল্প কম হলে মানটা আরও বজায় থাকতো বলে আমার বিশ্বাস। একটি বইয়ের আঁটোসাটো প্রোডাকশন আমরা পাঠকরা চাই নাকি গুণমাণে ভরা কিছু গল্প পড়তে চাই সেটা প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ দিন শেষে সাড়ে আটশো টাকা খরচ করে মানুষ কন্টেন্ট সাবস্ক্রিপশন করতে, পোছপাছ দেখে আর প্রকাশনীর প্রাউড সেলার থেকে "আমাদের বই একটু দামী-ই হয়" শোনার জন্য নয়।
যাহোক লেখিকা ক্যারেন আর্মস্ট্রং এর কথাটার সাথে সহমত রেখে দীর্ঘ লেখাটি শেষ করি, "আমাদের জীবনে আবার পৌরাণিক কাহিনী আসুক যাতে আমরা পৃথিবীকে শুধু এক রিসোর্স হিসেবে ব্যবহার নয়, বরং পবিত্র স্থান হিসেবে সম্মান করতে শিখি।"
বর্তমান সময়ে এসে কেউ যদি পৃথিবীকে জানতে চায় একদম শুরু থেকে, বুঝতে চায় আজ থেকে হাজার হাজার বছর পূর্বের সভ্যতা এবং মানুষদের ধ্যান ধারণাকে, তবে তার জন্যে ভরসার জায়গাটির নাম হলো হলো মিথ তথা পুরাণ। সৃষ্টির শুরু থেকে প্রকৃতির মাধ্যমেই মানুষেরা খুঁজে নিতে শুরু করে নিজেদের জন্ম এবং জগৎ রহস্যকে। যার ফলে জন্ম হয় এই পুরাণ কথার। নৃতত্ত্ববিদ উইলিয়াম বাসকোম মিথের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, ‘মিথ বা পুরাণ হচ্ছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সেই আদিম যুগ থেকে শুরু করে দেব-দেবী, বীর মানব বা তারা ব্যতীত অন্য কারোর গল্প, যা সাধারণত সত্য এবং পবিত্র বলে বিশ্বাস করা হয়, এবং যার সাহায্যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অনেক রহস্যকে ব্যাখ্যা করা যায়, যা বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব নয়।’ অর্থাৎ মিথ এমন এক আশ্চর্য ধারণা যা বিজ্ঞাননির্ভর বর্তমান এই বিশ্বে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত নয় ঠিকই, কিন্তু হাজার বছর ধরে মানুষের হৃদয়ে এবং মস্তিষ্কে বেচেঁ রয়েছে তা। তবে, যা রটে তার কিছু তো বটে! এই প্রবাদটিকে সার্থক প্রমাণ করতেই হয়তো ফ্যান্টাসি সম্রাট টেলিকন বিশ্বাস করে এসেছেন যে এই পুরাণের জন্ম সত্য ঘটনা থেকেই হয়েছে। এরপর ডালপালা বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে।
পুরাণের এই সহজাত তবে আশ্চর্য্য জগৎটাকে নিয়ে যখন কেউ ভাবতে শুরু করে এবং নিজের ভাবনাকে বিস্তৃত করে, নিজের চিন্তাশক্তি; পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি কিংবা নিজ-কল্পনাকে ব্যবহার করে কেউ যখন নতুন চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে তাতে পুরাণের ছোঁয়া দিয়ে নতুন এক গল্পের আবিষ্কার করে তখন তৈরি হয় চমৎকার আরেকটি জগৎ। যার নাম ‘মিথলজিক্যাল ফিকশন’ কিংবা ‘পৌরাণিক কল্পকাহিনী’। এক্ষেত্রে এই নতুন জগৎ সৃষ্টিতে অবশ্য একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হয় যে, পুরাণের মূল বিষয় এবং চরিত্র গুলো যেন বিকৃত না হয়ে যায় আবার!
যাই হোক! মিথলজির এই চমৎকার শাখা মিথলজিক্যাল ফিকশন বিষয়ক মোট ছাব্বিশটি গল্প সম্বলিত একটি বই সম্প্রতি আমি পড়ে শেষ করলাম। অনলাইন জগতের বেশ সফল এবং জনপ্রিয় একটি বই বিষয়ক গ্রুপ এবং বাংলার মিথলজি কিং খ্যাত লেখক, গবেষক এস এম নিয়াজ মাওলার নেতৃত্বেই মূলত বইটির কাজ শুরু হয়। লেখকেরা শোনাতে শুরু করে পুরাণ বিষয়ক তাদের তৈরি বেশ কিছু গল্পকে। এরপর এই উদ্যোগের ফলেই পাঠকদের হাতে পৌঁছে যায় “প্যাপিরাসে পুরাণ” নামক এই গল্প সংকলন। এই বইয়ের আরেকটি চমৎকার বিষয় হলো, দুই বাংলার লেখকদের এক মলাটে আনা হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পাশাপাশি সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে নতুনদেরও। যাদের অধিকাংশই বোধ হয় এই প্রথম নিজের তৈরি গল্প ছাপার অক্ষরে এবং নিজ পরিচয় লেখক হিসেবে একটি বইয়ে পেলো। এই বৈশিষ্ট্য গুলোর কারণেই “প্যাপিরাসে পুরাণ” প্রায় সকল পাঠকদের কাছে হয়ে উঠেছে সংগ্রহে রাখবার মতন লোভনীয় একটি বই।
এবার বইয়ের মূল কনটেন্ট অর্থাৎ গল্পগুলো নিয়ে বলা যাক। প্রথমেই বলেছি বইটিতে মোট ছাব্বিশটি গল্প রয়েছে। এবং অবশ্যই প্রতিটি গল্পই আলাদা লেখকের। গল্পগ্রন্থ নিয়ে কিছু লেখার বিষয়টি বরাবর আমার কাছে ঝামেলা মনে হলেও এবারে যেহেতু একটি ব্যতিক্রম প্রজেক্টের ফসল এই “প্যাপিরাসে পুরাণ” তাই তার সম্পর্কে বলাটা একপ্রকার ফরজ কাজ বলা যায়। সবগুলো গল্প নিয়ে আলোচনা সম্ভব না হলেও হাইলাইট করবার মতন গল্পগুলো নিয়ে ছোটো আলোচনা করবার এবং একটি ওভারঅল রিভিউ দেয়ার চেষ্টা করছি।
বইয়ের শুরুটা হয় ৭২ পেজের বেশ বড়ো একটি গল্প দিয়ে। নাম নপুংসক। লেখক, শুদ্ধস্বত্ব সহজিয়া ঘোষ। খুব সুন্দর একটি রাজনীতি এবং কোর্টরুম ড্রামা বিষয়ক গল্প। তবে, মিথের সাথে গল্পটা ঠিক কোথায় কানেক্টেড তা বুঝতে বেগ পেতে হয়েছে বৈকি! মূলত রোমান সাম্রাজ্যের সভ্যতা নিয়েই গল্পটা এগিয়েছে বলা যায়।
দ্বিতীয় গল্পটির নাম চালাক ব্যাটার বউ। লেখক মুহম্মদ আলমগীর তৈমুর। নামের মধ্যেই যেমন একটি চার্মিং একটা বিষয় রয়েছে গল্পটিও তেমনই চমৎকার। পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিলো, আমি আসলে নিজে পড়ছি না বরং কেউ পাশে বসে মজার ছলে এক নাগাড়ে শুনিয়ে যাচ্ছে গল্পটা। ঠিক রূপকথার মতন। এমনই সাবলীল লেখনী। তবে, এই গল্পের সাথেও মিথের কানেকশনটা আমি ঠিক বুঝিনি। প্রথম গল্পের সাথে শেষমেশ কানেকশন তৈরি করতে পারলেও এই গল্পের বিষয়ে তা একদমই ধরতে পারিনি।
এরপরের চারটি গল্প পরপর আমার বেশ ভালো লেগেছে। ওগুলো হলো মানতু, লাউ চিংড়ি, কৈবর্তলোক এবং প্যান্ডোরা। মানতু গল্পটি বৌদ্ধ ধর্মকে কেন্দ্র করে একটি রিভেঞ্জমূলক গল্প। লাউ চিংড়ি এবং কৈবর্তলোক বঙ্গদেশীয় লোককথাকে খুব সুন্দরভাবে প্রেজেন্ট করেছে। বনবিবি, দক্ষিণ রায়, মাকাল ঠাকুর, নর্ঘের মতন চরিত্রদের সাথে পরিচয় ঘটেছে গল্প দুটোর মাধ্যমে। আর গ্রীক মিথলজি নিয়ে যাদের কিঞ্চিৎ ধারণা রয়েছে তারা তো প্যান্ডোরাকে জানবেনই। পৃথিবীর প্রথম রমনী সে। তারই সৃষ্টিকথাকে কেন্দ্র করে দারুন একটি গল্প প্যান্ডোরা। এই বইটিতে আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প গুলোর তালিকা করতে হলে প্যান্ডোরার অবস্থান হবে দ্বিতীয়তে। প্রথমটা লাউ চিংড়ি। আরো কিছু গল্প ভালো লেগেছে। যেমন, দ্যা বক্স অফ গডেস প্রসার্পিনার, কাক, অস্তিত্বের টানে এবং সূর্যদেবের অন্তর্ধান।
এবার বলবো চমৎকার দুটো গল্পকে নিয়ে। যার কন্টেন্ট আমার বেশ মনে ধরেছে। তবে গল্প দুটোকে আরো বিস্তৃত করলে একটা ভালো আউটপুট আসতো বলে আমি মনে করি। গল্পদুটোর একটির নাম স্বয়ম্ভু এবং অপরটি সাইলেন্স অব দ্যা স্নেইকস। লেখক যথাক্রমে, শুভঙ্কর শুভ এবং ফারহান তানভীর স্বপ্নীল। টাইম ট্রাভেল এবং মিথকে একত্রিত করে চমৎকার কন্সেপ্ট এবং পাঠককে আকৃষ্ট করার মতন লেখার ধাঁচ। এই দুটি বিষয়ের কারণে গল্প দুটোকে ভালো লেগেছে আমার। তবে, স্বয়ম্ভুর ক্ষেত্রে মোটামুটি একটা সন্তুষ্ট হবার মতোন ব্যাখ্যা পেলেও এবং ভালো জায়গাতে এসে শেষ করলেও সাইলেন্স অব দ্যা স্নেইকস গল্পটি এক্ষেত্রে হতাশ করেছে। সুন্দর একটি কন্সেপ্ট তৈরি করার মাধ্যমে যেখান থেকে মূল গল্পের শুরু হওয়ার কথা সেখানে এসেই থেমে গিয়েছে। এবং ব্যাখ্যাটাও সন্তুষ্ট করতে পারলো না! আশা করি এই ধাঁচেই তাদের বিস্তৃত লেখা সামনে পাবো আমরা পাঠকেরা।
বইয়ের সম্পাদনা বেশ ভালো ছিলো। তবে একটি গল্পের ক্ষেত্রে গুরুচন্ডালি দোষটা কিছু কিছু জায়গায় এসে পড়ার ক্ষেত্রে বিরক্ত করেছে খানিক। পুরো বইটিতে গ্রীক মিথেরই অধিক আধিপত্য রয়েছে। হয়তোবা বেশী প্রচলিত তাই! তবে, আমি আশা করেছিলাম আরো ইন্টারেস্টিং মিথ গুলোকে সামনে আনা হবে। গ্রীক মিথের চরিত্র মেডুসাকে নিয়ে চার পাঁচটার মতন গল্প রয়েছে। এই ব্যাপারটা চোখে লাগলো বেশ! যেহেতু বইটি একটি গল্প সংকলন ছিলো তাই একই বিষয়কে কেন্দ্র করে একাধিক গল্পের আধিপত্যটা না থাকলেও চলতো। মূল বিষয় এবং পরিণতি আলাদা হলেও ব্যাপারটা মানানসই হতো। তবে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেই একই রিভেঞ্জমূলক বিষয়টিই উঠে এসেছে বলেই দৃষ্টিকটু লাগলো। তাছাড়া বইয়ের অধিকাংশ গল্পই এমন রিভেঞ্জ কিংবা রহস্যের বিষয়তেই এগিয়েছে। দু তিনটে গল্প এমন মনে হলো মিথের মূল গল্পকেই বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে শুধু! আমি আরো ইউনিক কনটেন্ট আশা করেছিলাম বিধায়ই হয়তো কিছু ক্ষেত্রে এসে একদম একঘেয়ে হয়ে আসছিলো রিডিং জার্নিটা। দুটো আলাদা মিথিলজিক্যাল জগতের ক্রস কানেকশন কিংবা অলটারনেটিভ জগৎ তৈরি করা ইত্যাদি বিষয় গুলোর উপস্থিতি পেলে আরো দারুণ হতে পারতো সংকলনটা।
বইয়ের একটা ব্যাপার যা না বললেই নয়; অনেক গুলো গল্পই নতুন পাঠকদের বুঝতে বেগ পেতে হবে। আমার মতে গল্প গুলোতে সোর্স উল্লেখ করলে ভালো হতো। গল্পগুলো উপভোগ করতে আরো সহজ হত তবে। যেমন, মানতু, লাউ চিংড়ি, কাক, অস্তিত্বের টানে, সূর্যদেবতার অন্তর্ধান গল্পগুলোতে মোটামুটি ভাবে ধারণা দেওয়া ছিলো। কাক এবং সূর্যদেবতার অন্তর্ধান গল্পদুটির ক্ষেত্রে অবশ্য গল্পের শেষে সরাসরি সোর্স উল্লেখ করা ছিলো।
সবশেষে, প্যাপিরাসে পুরাণের সাথে আমার জার্নিটা বেশ ভালো গিয়েছে বলবো না। আবার খুব খারাপ গিয়েছে এমনটাও না। ওভারঅল জার্নিটা ভালোই ছিলো। তবে, গল্প গুলোর পরিণতি ঘুরে ফিরে একই রকম এবং একই বিষয় ফুটে উঠেছে বলেই মূলত খুব দারুন কিছু একটা হতে গিয়েও হলো না।
☞ মোট ২৬ টি গল্প। প্রতিটা গল্পের আলাদা রিভিউ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বিশাল বড় হয়ে যাবে পোস্ট। তাই ভেঙ্গে কয়েক ভাগ করে পুরো বইয়ের রিভিউ দিবো ভাবছি। তবে প্রতিটা ভাগের রিভিউ শেষে, গল্পগুলো একত্র করে ততোটুকু পর্যন্ত বইটা কেমন লেগেছে তার ব্যাখ্যা সংক্ষেপে দিবো। নিম্নে বইয়ের ১ম গল্প 'নপুংসক'টি বাদ আছে।
(গল্পের নাম - লেখকের নাম) • চালাক ব্যাটার বউ - মুহাম্মদ আলমগীর তৈমূর
শুরুতে আসা দুইটা ধাঁধার প্রথমটা বুঝতে পারিনি। কিন্তু এমন ভাবে উত্তর ভাসমান ছিলো তাতে বুঝে গিয়েছিলাম দ্বিতীয়টা খুব একটা কঠিন হবে না। হলোও তাই, বুঝে গিয়েছিলাম। শেষের ধাঁধাগুলোও বইয়ের মতো হুবহু বুঝে ফেলতে না পারলেও, সারাংশটা যেনো আমার আর লেখক ভাবনা একই ছিলো। শেষের অংশে শিক্ষণীয় কিছু ব্যাপার আছে। কিছু ব্যক্তি আছে নিজের কর্মে বা কথায় দোষ থাকলেও অপরজনকে প্রয়োজনে গলায় পারা দিয়ে স্বীকার করাবে তিনিই সঠিক। এমন ধাঁচের লোকদের মুখোমুখি না হতে পারলে, নিজের ব্যক্তিত্বের কাছে শুরুতেই হেরে যাওয়া। তবে কিছু ক্ষেত্রে যতোই বুঝ দেওয়া হোক, মানবে না, হিতে বিপরীত হবে, সেক্ষেত্রে বরং চুপ থাকাই ভালো।
• মানতু - মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ
গল্পে বর্তমান যুগের মিডিয়া যুক্ত কোনো এপ কিংবা যাবতীয় অন্যান্য কথা থাকলে সে বইটা রেখে দেই। কোনো কালে ছুঁয়েও দেখা হবে কিনা সন্দেহ। উক্ত লেখকের অনুবাদ করা 'দি আউটসাইডার' ও 'মরণ-খেলা' দুইটা বই পড়েছিলাম, অনুবাদ যেনো একদম গুগল ট্রান্সলেশন। ভিষণ আক্ষেপ আছে আমার। তবে অনুবাদে তিনি এমন কিছু শব্দগুচ্ছ এবং শৈলী ব্যাপার ব্যবহার করতেন যেটা সামান্য হলেও আমাকে আকর্ষণ করেছিলো অবশ্য। সে আকর্ষণ থেকে 'মানতু' গল্পে মিডিয়া যুক্ত একটা এপ এর নাম থাকলেও পড়তে শুরু করি কেমন লিখেছে। যে জন্য বই রেখে দিতাম সে সমস্যা পাইনি, গুছিয়ে লিখেছে বেশ। গল্পে বৌদ্ধ ধর্মের কিছু হরর ও অতিপ্রাকৃতিক ব্যাখ্যা আছে, জানি না এগুলো বাস্তবেও অবদান রাখে কিনা। তবে এই ব্যাখ্যার মাঝে লেখক নিজের অন্য বইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন। গল্পে লেখক ইসলামের কিছু বিষয় টেনেছে, সে সঙ্গে বাচ্চাদের কপালে কালো তিল দেওয়াকেও এনেছে। যেটা একে-অপরের সঙ্গে যায় না। কারণ ইসলামে বাচ্চাদের কপালে যে উদ্দেশ্যে তিল দেওয়া হয় সেটা নিষিদ্ধ। লেখক যেহেতু টেনেছেন, হয়তো একদম ইসলামিক ভাবেই টানতো, কিংবা বিপক্ষেই টানতো। গোজামেলটা আমার পছন্দ হয় নি।
• লাউ চিংড়ি - শরিফুল হাসান
রূপকথার গল্প আকারে লিখেছেন। ভাইবটা হচ্ছে আমাদের নানা-নানি কিংবা দাদা-দাদি কালে অলৌকিক ও হরর মিশ্রিত যেসব রূপকথার গল্প শোনাতো, হুবুহু সেরকম অনুভূতি।
• কৈবর্তলোক - তৌফিক হাসান উর রাকিব
লাউ চিংড়ি গল্পের সামান্য ছিটেফোঁটা মিল আছে এই গল্পের মধ্যে। তবে গুরত্ব প্রভাব ফেলে না। শক্ত ধাঁচের লেখা আছে, এবং সামান্য বাক্যেই গভীর মনোভাব তৈরি করার মতো প্রতিভাও আছে লেখকের শৈলীতে। পড়ে মনে হচ্ছিলো ভারতীয় লেখক বুঝি, কিন্তু বাংলাদেশের কুমিল্লাতেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা লেখকের। এই গল্পেও বর্তমান যুগের মিডিয়া যুক্ত এপের নাম উল্লেখ আছে। কিন্তু ছাইও সমস্যা হয় নি যে কারণে আমি এসব বই রেখে দিতাম। এতোক্ষণে বলা সকল গল্প গুলোর মাঝে সবচেয়ে দারুণ লেগেছে উক্ত কৈবর্তলোক গল্পটি। তবে শেষটা যেরকম আশা করেছিলাম, বলতে গেলে যেরকম ক্ষুদা পেয়েছিলো সেরকম নিবারণ যোগ্য হয় নি, আমার ব্যক্তিগত মতামত। কিন্তু ফিকশনের পাশাপাশি সামান্য নন-ফিকশন ব্যাপার আছে বলেও মনে হয়েছিলো, পুরোপুরি নিশ্চিত না। কোনো কিছু নিয়ে ঘাটাঘাটির মেজাজ নেই বর্তমানে, তাই বই শুধু পড়েই যাচ্ছি আর নিজস্ব মতামত দিচ্ছি।
◑ গল্পগুলো পড়ে মনে হলো পঞ্চম-ষষ্ঠম শ্রেণিতে থাকলে পুরোপুরি মজা পেতাম। তবে কৈবর্তলোক গল্পটা একটু ভিন্ন। কিন্তু সবগুলো গল্প একবার পড়ে যাওয়ার মতো প্রভাব খাটাতে পারে। আর বইটা পড়তে গিয়ে সুজন দেবনাথ এর লিখা 'হেমলকের নিমন্ত্রণ' বইয়ের দুইটা লাইন ভিষণ মনে পরছিলো, "সুখের মতো বদমাশ। দুঃখের মতো বেহায়া"। আরো মনে পরছিলো আমার লেখা, "তার পায়ে থাকা জুতোর দাম আমার সাধ্যে মাথার মুকুটের চেয়েও দামি।"
1 star for the cover and the tagged bookmark, another star for those 3-4 stories which actually had an out and out mythological backdrop. Most of the stories felt like science fictions with forceful infiltration of mythological characters. Decreasing the number of the stories might have made the book more 'qualitative'! Kudos for the unique approach but did really expect much more!!!