মরক্কো-ভিত্তিক এ ভ্রমণবৃত্তান্তের প্রেক্ষাপট জুড়ে আছে চমকপ্রদ ঘটনা ও বিচিত্র চরিত্রে ভরপুর মারাকেশ নগরী। অস্ট্রেলিয়া, তিউনিশিয়া, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে আসা পর্যটকদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে কাসাব্লাঙ্কা ও রাবাতের দৃশ্যপট। জাবলে-আটলাসের ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ধরে যাওয়ার পথে আমিঝমিঝের বাজারে যাত্রাবিরতি ও জলপ্রপাতের পাড়ে তাঁবুতে রাত কাটানোও পাঠকের আগ্রহের অগ্নিতে ইন্ধন জোগাবে।
মঈনুস সুলতানের জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেসের। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ‘জিম্বাবুয়ে : বোবা পাথর সালানিনি’ গ্রন্থটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৪ সালে ভ্রমণসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে মঈনুস সুলতানের।
মঈনুস সুলতানের ভ্রমণগদ্যের তারিফ নতুন করে আর কী করব! বরাবরের মতোই সেটি উমদা। তবে ছোটখাটো বিস্তর ভুল দেখে মনে হচ্ছিল বইটির কাজের সময় প্রুফরিডার ছুটিতে ছিলেন হয়তো! অন্য কোনো প্রকাশনী হলে কেবল বিরক্ত হতাম, বাতিঘর বলে যুগপৎ অবাক ও হতাশ হলাম।
সমসাময়িক ভ্রমন সাহিত্যে সবচেয়ে মননশীল লেখা সম্ভবত মঈনুস সুলতানই লেখেন। জিম্বাবুয়ে, সিয়েরা লিওন, ইথিওপিয়া, দক্ষিন আফ্রিকা, লাওস, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, মরক্কো, মেসিডোনিয়া, সোয়াজিল্যান্ড সহ আরো অনেক দেশের বিভিন্ন দুর্গম স্থানে উনি ভ্রমন করেছেন, কখনো কাজের সূত্রে আবার কখনো নিতান্তই শখ বা এডভেঞ্চারের তাড়নায়। মঈনুস সুলতানের ভ্রমণ কাহিনী নির্দিষ্ট কোন প্লটে ভর করে আগায় না, বিশেষ কোন গল্পও থাকে না। মরক্কোর গল্প বলতে গিয়ে সুলতান কখনো স্মৃতি হাতড়ে চলে যান থাইল্যান্ডে কিংবা দক্ষিন আফ্রিকায়, আবার দক্ষিন আফ্রিকায় বসে চলে যান কান্দাহার বা কিরঘিস্তানের কোন প্রত্যন্ত গ্রামে। সুলতানের ভ্রমনে আমরা পাই মানুষের গল্প, মানুষের আচরণ, চলন-বলন, পোশাক আশাকের এমন নিখুঁত বর্ণনা আর কোন ভ্রমণ সাহিত্যে আমি পাই না। পথ চলতে চলতে সুলতান সেই সব দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, শিক্ষা, ক্যুইজিন, আদিবাসী মানুষ আর ইতিহাসকে এত চমৎকারভাবে তুলে আনেন যে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না! সুলতানের লেখার গুনেই কি না জানি না, যখনই তার কোন লেখা পড়ি প্রেমে পড়ে যাই সেইসব মানুষ ও শহরের, কল্পনায় চলে যাই মালির টিম্বাকটু, থাইল্যান্ডের চিয়াংমাই, আফগানিস্তানের কান্দাহার, যুক্তরাষ্ট্রের সান্তা ফে, মরক্কোর মারাকেশ বা জোহানসবার্গে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের বিপন্নপ্রায় জাতিগোষ্ঠীর জীবনচিত্রও অত্যন্ত মায়া নিয়ে চিত্রায়ণ করেছেন তিনি তার নানা বইয়ে। সবচেয়ে বেশী ভালোলাগে সুলতানের লেখার স্টাইল! বাক্যের মাঝে মাঝে আরবি, ফারসি, উর্দু ও আঞ্চলিক ভাষার এমন যথোপযুক্ত ও পরিমিত ব্যবহার একটি সাধারণ বাক্যকেও এত মাধুর্য্যমন্ডিত করে তুলতে পারে! যাযাবর হিসেবে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলোর জীবনেরও যে গল্প থাকে, লুকনো কোন গভীর বিষাদ থাকে, সুলতান সেই গল্প চমৎকার নৈপুণ্য তুলে নিয়ে আসেন, ফাঁকে গলে তার নিজের ব্যক্তিগত জীবনের গল্পও চলে আসে কালে ভদ্রে-তার ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন, আর্থিক সংকট, কাজ না পেয়ে বেকার হালতে দিন গুজরানের চিন্তা-নানা কিছু! ব্যক্তিগত জীবনের এই হালকা টাচ থাকে বলেই সুলতান বা তার গল্পের মানুষদের খুব কাছের বলে মনে হয়! মঈনুস সুলতান নানা ধরনের Antic and Vintage জিনিস সংগ্রহ করতে পছন্দ করেন, রক হান্টিং ও ট্রেকিং তার নেশা, ভালোবাসেন গান ও চিত্রকর্ম, কবিতাও লিখেন মাঝে মাঝে -তাই অবধারিতভাবে তার লেখায় ঘুরেফিরে আসে বিখ্যাত সব মিউজিশিয়ান ও কবির গান ও কবিতার কথা, চীনের উইঘুর সম্প্রদায়ের কোন কবি বা ইথিওপিয়া বা তাঞ্জানিয়ার লোকজ কোন কবির কবিতার এক দু লাইনও উঠে আসে তার লেখায়, নানা সময়ে তিনি অনুবাদ করেছেন এইসব কবিদের কবিতা। লেখায় প্রাসঙ্গিকভাবে আসে বিখ্যাত সব চিত্রকরদের চিত্রকর্ম ও সংশ্লিষ্ট আন্দোলনের কথা। সুলতানের লেখা ভ্রমণকাহিনী তাই শুধু ভ্রমনের গল্পই নয় পাঠকদের জন্যও সত্যিকারের এক ভ্রমণ। 'মরক্কোর মারাকেশে ও জাবালে আটলাসে' মরক্কোর নানা ইতিহাসের সাথে সাথে তাঁর ভ্রমনসঙ্গী ও পথচেনা মানুষের নানা গল্প মুগ্ধ করেছে প্রতিবারের মত!