পদার্থবিজ্ঞানের ভাষ্য, গরুটির শরীর মূলত কিছু কণার সমষ্টি। এ কণাগুলো নির্দিষ্ট ডিজাইনে গরুর আকার ধারণ করে জমাট বেঁধে আছে। গরুটির চামড়া, মাংস, লোম, গোবর, মূত্র, হাড়, লালা, রুমেন, চর্বি, এনজাইম, এসিড, নিউরন, রক্ত, পানি, এগুলো ভাঙলে আমরা পাবো বিভিন্ন মৌলের অণু ও পরমাণু। পরমাণুকে ভাঙলে পাবো ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, এরকম, কোটি কোটি কণা। ইলেকট্রনকে আর ভাঙা যায় না, তবে প্রোটিন ও নিউট্রনকে ভাঙা যায়। স্ট্যান্ডার্ড মডেলের দাবি, প্রোটন ও নিউট্রনকে ভাঙলে পাওয়া যাবে আরও তিনটি করে কণা। এ কণাগুলোর নাম কোয়ার্ক। কোয়ার্ক ৬ ধরণের ( এ ধরণগুলোকে বলা হয় 'ফ্লেভার' ) । ফ্লেভারগুলো হলো: আপ, ডাউন, চার্ম, স্ট্রেইঞ্জ, টপ ও বটম। প্রোটনে থাকে দুটি 'আপ কোয়ার্ক' ও একটি 'ডাউন কোয়ার্ক', এবং নিউট্রনে থাকে দুটি 'ডাউন কোয়ার্ক', ও একটি 'আপ কোয়ার্ক'। কোয়ার্ককে আর ভাঙা যায় না।
সত্যের কোনো সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নেই - এই সরল সত্যটিই নানাভাবে বোঝাতে চেয়েছেন মহিউদ্দিন মোহাম্মদ। বইটি দুইটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগ বাংলায় এবং দ্বিতীয় অংশ ইংরেজিতে লিখেছেন। বাংলা অংশটুকু বুঝতে পেরেছি ; ইংরেজি ততখানি বোধগম্য হয়নি।
'গরু রচনাসমগ্র'-এর মহিউদ্দিন মোহাম্মদ এখানে অনুপস্থিত। তার সহজাত রসবোধ ও আক্রমণের ধার লেখাগুলোতে নেই।
লেখকের পহেলা বইটা পড়লেই চলবে। এটা পড়ার সুপারিশ করব না।
এই বইয়ের নাম চোখে পড়লে অনেকের মাঝে হাস্যরসের উদ্রেক হতে পারে। তবে দর্শনের প্রাথমিক পাঠ যাদের আছে তাঁরা হয়তো জনপ্রিয় লেখক মহিউদ্দিন মোহাম্মদ রচিত 'দার্শনিক রচনাবলী - ১ : গরুটি আছে কি না?' গ্রন্থটির প্রতি আগ্রহী হবেন।
আমি অবশ্য লেখকের 'মূর্তিভাঙা প্রকল্প'এর 'দর্শন কী?' অধ্যায় আরেকবার পড়েছি প্রথম প্যারায় উল্লিখিত গ্রন্থের মাঝখান দিয়ে যাওয়ার জার্নির পর পর-ই।
স্বল্প পরিসরের এ গ্রন্থ যেভাবে প্রাঞ্জল, সুপাঠ্য এবং পারস্যুয়েসিভ লেখনিতে ফুটে উঠেছে তাতে দর্শনশাস্ত্রের উপর তেমন একটা দখল নেই এরূপ পাঠকের জন্যেও লেখকের দার্শনিক রচনাবলী এর প্রথম পাঠ কঠিন কিছু হওয়ার কথা নয়।
দর্শনের কাজ হচ্ছে মোটাদাগে কৌতুহল, নিষ্ঠা এবং সংগ্রামের সাথে কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সমাধানে নেমে পড়া এবং ক্রমাগত উত্তরের অনুসন্ধানে লেগে থাকা। মহিউদ্দিন মোহাম্মদের লেখালেখির মধ্য দিয়ে যাওয়ার পথে মনে পড়ে গেল কয়েকদিন আগে পড়া আলবেয়ার ক্যামুর 'দ্য মিথ অফ সিসিফাস'এর একটি চৌম্বক অংশের কথা।
আলবেয়ার ক্যামুর মতে নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারা জিনিয়াসের লক্ষণ। মানুষ প্রাণী হিসেবে মাত্র তিন মাত্রায় আবদ্ধ। শারীরিক ও মানসিক নানামুখি সীমাবদ্ধতার মাঝে বেশিরভাগ মানুষের মাঝে এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে তাঁর জানাটাই প্রকৃত।
লেখকের অল্প কলেবরের বইটি সায়েন্টিফিক ডগমা এবং ধর্মতন্ত্রের উর্ধ্বে গিয়ে এমন দর্শনের আলাপ তুলেছে যা যেকোন পাঠককে মানুষ হিসেবে তাঁর জগতকে দেখার লিমিটেশনকে বারবার মনে করিয়ে দিবে।
দার্শনিক রচনাবলীতে জগৎ ও জীবনকে বুঝার জন্য শুধুমাত্র মানুষ নয়, অন্যান্য প্রাণীদের কথা এ বইয়ে এসেছে। তবে ঐসব প্রাণীর বিকল্প অবস্থা মানুষের অবস্থানে নিয়ে ভাবা হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক অনুসিদ্ধান্তসমূহ রচিত হয়েছে যথাসাধ্য সহজ ভাষায়। বইয়ের ইংরেজিতে লিখা অংশ সহজবোধ্য লেগেছে। সেট থিওরি এবং প্রতীকী ব্যঞ্জনার প্রাথমিক ধারণা থাকলেই যেকোন পাঠক ইংরেজি অংশটি আত্মস্থ করতে পারবেন।
লেখকের কাছ থেকে আশা সব সময়ই একটু বেশি থাকে। যেহেতু এটি দার্শনিক রচনাবলীর প্রথম অংশ, তাই আশা করছি দর্শনের বিভিন্ন নানা রঙের শাখা-প্রশাখায় পাঠকের ভবিষ্যতে বিচরণ ঘটবে।
নবীন পাঠকদের অনেকের জন্য হয়তো এ বই আই ওপেনার হিসেবে কাজ করতে পারে।
লেখকের প্রতি শুভকামনা রইলো।
বই রিভিউ
নাম : দার্শনিক রচনাবলী - ১ গরুটি আছে কি না? লেখক : মহিউদ্দিন মোহাম্মদ প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৪ প্রকাশক : জ্ঞানকোষ প্রকাশনী প্রচ্ছদ : সব্যসাচী মিস্ত্রী রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
সত্য যে স্থায়ী কিছু নয় বরং এটি আপেক্ষিক, নির্ভর করে প্রসঙ্গ কাঠামোর উপরে; মহিউদ্দিন মোহাম্মদ এটাই বোঝাতে চেয়েছেন দর্শন, জীববিজ্ঞান আর গণিত দিয়ে। আগের বইগুলো পড়ার পর লেখকের যে চিত্র গঠিত হয়েছিল মস্তিষ্কে, এই বইয়ে সেই লেখককে পাওয়া যায় না।
ফালতু লেগেছে, লেখকের অন্যান্য বই পড়ে যেমন ভালো লেগেছে, এই বইটা পড়ে ঠিক তার উলটো প্রতিক্রিয়া হয়েছে। মাধ্যমিক এর বিজ্ঞান বই এর সিউডো-জ্ঞ্যান পাতি নিয়েই এই বই। নামের সাথে মিল নেই, দর্শনের ছিটেফোঁটাও নেই। সামান্য পার্সপেক্টিভ নিয়ে এই ক্ষুদ্র আলোচনা আর যাই হউক, দর্শন হতে পারেনা।
সাহিত্য কী ধরনের ভূমিকা পালন করে? এ নিয়ে অনেকের প্রশ্ন থাকে।প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যের ভূমিকা নিয়ে বলেন, ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য লোককে শিক্ষা দেয়া নয়। শিক্ষক ও কবির কাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিক্ষক ছাত্রকে নির্দিষ্ট সিলেবাস অনুসারে পরীক্ষার বৈতরণী পাড় হওয়ার জন্যে জ্ঞান দান করেন। এটা তার চাকরি। অন্যদিকে সাহিত্যিক বা কবির উদ্দেশ্য তার বিপরীত। ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষের মনকে বিশ্বের খবর জানানো, সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনকে জাগানো।’ আমার মনে হয় , মহিউদ্দিন মোহাম্মদের তুখর চিন্তাভাবনা মানুষের মনকে জাগানোর দায়িত্বটা নিয়েছে বর্তমান বাংলাদেশের সাহিত্যের অন্ধকার যুগে। ‘আমরা কে? আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কী? মরাল কী? সঠিক ও ভুলের মাপকাঠিন্য কী? জ্ঞান কী? সুখ ও দুঃখের উৎস কী? আমরা কিভাবে সঠিকভাবে সুখী হতে পারি?’ জন্ম থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিটি মানুষকে উপরের প্রশ্নগুলো অসংখ্যবার শুনতে হয়। বয়সের সাথে সাথে, পরিবেশ পরিস্থিতি যত পরিবর্তন হয়, ততই যেন এই কথাগুলো আরো শক্ত হয়ে জেঁকে বসে মাথার ভেতর। মহিউদ্দিন মোহাম্মদের ‘দার্শনিক রচনাবলি-১ ,গরুটি আছে কি না?’ বইটিতে কঠিন কিংবা জটিল যা-ই বলা হোক না কেন এই বইয়ে যেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে সবই দর্শনকেন্দ্রিক। মহিউদ্দিন মোহাম্মদ অত্যন্ত সহজ- সরল ও সাবলীল ভঙ্গিতে এইসব কঠিন আর জটিল প্রশ্ন তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে। পাঠক তা পাঠে যেমন তৃপ্ত হবেন, তেমনি আগ্রহী ও উৎসাহী হয়ে উঠবেন দর্শনের গভীরতা সন্ধানে।
খুব সময় নিয়ে কয়েকবার পড়ে বইটা বুঝলাম। অনেক বড় একটা ধাক্কা খেলাম। চারদিকে যা দেখতেছি তাই কীরকম যেন ঠেকতেছে। মনে হইতেছে কোনোকিছুরই অস্তিত্ব নাই। সবই মস্তিষ্কের খেলা। বইটা সবাই পড়ে বুঝবে বলে মনে হইল না। সেকেন্ড পার্ট ইংরেজি অংশটা অনেক দুর্বোধ্য। তবে বাংলা অংশটা মানে ফার্স্ট পার্টটা লেখকের সাবলীল আর খুব বিস্তারিত ভেঙে লেখার কারণে বুঝছি। অনেকের কাছে প্রথম দেখায় সাধারণ বিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনা মনে হবে, কিন্তু গভীরে ঢুকলে বুঝা যায় বঅইটা দর্শনের খুব উন্নত স্তরের বই। হ্যাটস অফ লেখক।
অফিস ফাঁকি দিয়ে বই টা পড়লাম। খুব চেষ্টা করলাম কোনো খুঁত বের করতে পারি কিনা।। সেটা নিয়ে সমালোচনা করার জন্যে। কিন্তু আমি ব্যার্থ।। অনেক অনেক ভালোবাসা লেখকের জন্যে