গত কয়েকদিন ধরে “সাক্ষী ছিলো শিরস্ত্রাণ” বইটা পড়ছি অনেকটা সময় নিয়ে, এবং থেমে থেমে। যতটুকু পারা যায় বইয়ের সাথে সাথে নেটেও ঘাটাঘাটি করছি। বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অস্থিরতা অনুভব হচ্ছে। আমার চারপাশের সবকিছু অসম্ভব রকমের নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে, কেমন যেন একটা থমথমে পরিবেশ। প্রচন্ড উৎকণ্ঠায় দম বন্ধ হয়ে আসছে। যেন ভুলে গিয়েছি আমি বর্তমানের একজন, চুয়াল্লিশ বছর আগের একটা সালের প্রতিটা দিন আমার কাছে সত্য হয়ে উঠছে। প্রচন্ড টেনশনে সময় পার করছি এরকম সময়ে হাতে আসল প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের একাত্তরের স্মৃতিবিজরিত এই বইটি, যে বইটি পালে নতুন হাওয়া লাগিয়ে দিল।
গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করছি অনেক, কিন্তু বারবার সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আশা করি সবাই ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। এই বইটা হাতে নিয়ে উলটে পালটে দেখছিলাম, প্রায় আমারই বয়সী যুবকটা তখনও হুমায়ূন আহমেদ হয়ে ওঠেনি। নিতান্তই বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এক ছাত্রের ডায়েরী বলা যেতে পারে একে। হুমায়ূন আহমেদ পরবর্তীতে একাত্তর নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক লেখা লিখলেও তা ছিল একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের লেখা, যে লেখা হয়তো প্রকাশের আগে বারবার মোডিফাই করা হয়েছে তাঁর মাধ্যমেই। কিন্তু এই লেখাটা মোটেও মোডিফায়েড না, তাই এখানে একাত্তরের যুবক প্রকৃত হুমায়ূনকেই পাওয়া যাবে, বোঝা যাবে সে কি ভাবত। কেননা, এই বইয়ে যুক্ত করা হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের নিজ হাতে লেখা পান্ডুলিপিটাই, যেটা পড়লে চোখে পড়বে কিছু অসংলগ্ন বাক্য, ভুল শব্দ এবং প্রাচীন বানানরীতি। এই হস্তলিপি হয়তো সাক্ষ্য দেবে তেইশ বছরের যুবকটির পরবর্তীতে কথাসাহিত্যের অমর কিংবদন্তীতে পরিণত হওয়াকে।
বইটা হাতে নিয়ে দেখছিলাম, কখন ডুবে গিয়েছি নিজেও জানি না।
বইটার ভূমিকা লিখেছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল, সেখানেই জানা যাবে হুমায়ূন আহমেদের এই শেষ বইটায় কিভাবে পুরো পরিবার যুক্ত হয়ে গিয়েছে, কিভাবেই বা এই তাঁর এই লেখাটা উদ্ধার হল। মুহম্মদ জাফর ইকবাল এই লেখায় হুমায়ূন আহমেদের কিছুটা সমালোচনাও করেছেন বটে, বলেছেন তিনি অসাধারণ কথাশিল্পী হলেও দুর্বল ইতিহাসবিদ। নানা বইয়ে নানা স্মৃতিচারণে তথ্য দেওয়ার সময় তিনি একটু কষ্ট করে নির্ভুল সঠিক তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেননি! তবে শেষে তাঁর পক্ষে যে যুক্তিটি দিয়েছেন সেটি বেশ পছন্দ হয়েছে আমার, পাঠকের কৌতুহল বাড়িয়ে দিতে তা আর উল্লেখ করলাম না। লেখাটিতে হুমায়ূন আহমেদ তার ভার্সিটির দিনগুলো থেকে শুরু করে একাত্তরে তাদের পারিবারিক অবস্থান বর্ণনা করেছেন। সেই সাথে তার প্রথম উপন্যাস লেখার ঘটনাও উঠে এসেছে, যা তিনি লিখতেন এবং পড়ে শোনাতেন সবাইকে। এই উপন্যাসের নাম তিনি দিয়েছিলেন “নন্দিত লোকে”। পরবর্তীতে যা “শঙ্খনীল কারাগার” নামে প্রকাশিত হয়। তাঁর এবং জাফর ইকবাল স্যারের বিভিন্ন লেখায় সেসময়ে তাদের পরিবারের ঘটনাগুলো জানতে পারলেও তাদের পিতা শহীদ ফয়জুর রহমানের মৃত্যুর পূর্বে একাত্তরে ভূমিকা এখানেই বিস্তারিত ভাবে জানলাম। তবে এটি শুধু যে হুমায়ূন আহমেদের লেখা তা কিন্তু নয়, যেখানে হুমায়ূন আহমেদ শেষ করেছেন সেটি থেকেই শুরু করেছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল; তাদের পিতার শহীদ হওয়ার কাহিনী। এই বইটির মাধ্যমেই এই প্রথম তারা দুজন একই সাথে একজায়গায় লিখে যুক্ত হলেন। সত্যি বলতে যুক্ত হলেন তারা তিনজন ভাইই, যেহেতু প্রচ্ছদটি তাদের অনুজ আহসান হাবীবের করা।
এখানে যেমন পাওয়া যাবে হুমায়ূন আহমেদের হস্তলিপি, তেমনি পাওয়া যাবে মুহম্মদ জাফর ইকবালেরও। দুজনের পান্ডুলিপির কিছুটা তুলনাও করা যেতে পারে। আমি নিজে হুমায়ূন আহমেদের হস্তলিপিটা থেকেই পড়েছি, যেখানে যেন আরো বেশি গভীরে যাওয়া যায়।
ছোটবেলায় যখন প্রথমবারের মত জানলাম হুমায়ূন আহমেদ আর মুহম্মদ জাফর ইকবাল নিজের ভাই, প্রচন্ড বিস্মিত হয়েছিলাম, যে বিস্ময় এখনও কাটেনি।
(রিভিউটা লিখেছিলাম ফেসবুকের বইপড়ুয়া গ্রুপে, ভাবলাম এখানেও দিয়ে রাখি)