পরিবর্তনই সংসারের নিয়ম। জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতে পরিবর্তনকে আমরা মেনে নিতে বাধ্য। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা উন্নত হয়েছি প্রযুক্তিতে। মানবসভ্যতা অগ্রসর হয়ে পেরিয়ে এসেছে অনেক যুগ। কিন্তু তার সাথে লোপ পেয়েছে আমাদের বাস্তব বোধ। সবুজের পর সবুজ ধ্বংস করে আমরা উন্মাদের মতো নির্মাণ করে যাচ্ছি কংক্রিটের জঙ্গল। কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে আবর্জনা ছড়িয়ে দূষিত করছি আমাদের চারপাশের পরিবেশকে। এইভাবেই চলতে থাকলে সেদিন বেশি দূরে নেই যখন আমাদের পরের প্রজন্ম উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে একটা কংক্রিটের জঙ্গল আর দূষিত মৃত নদীতে ঘেরা একটা মরুময় পৃথিবী যেখানে এই সবুজে ঘেরা প্রকৃতির অস্তিত্ব ইতিহাস বা কল্পকাহিনি ছাড়া আর কোথাও থাকবে না। গাছের কথা উল্লেখ করা থাকবে বইয়ের পাতায়, মিউজিয়ামে প্রাচীন দুস্প্রাপ্য কোনও বস্তুর মতো সাজানো থাকবে গাছের লাশ। যেখানে একটা নবজাতককে জন্ম নেওয়ার পর বুকভরা বাতাসের বিনিময়ে ভুগতে হবে তীব্র শ্বাসকষ্টে। যেখানে মানুষের আয় হবে সীমিত। এক ফোঁটা পানীয় জলের জন্য বন্য জন্তুর মতো সংঘর্ষ করবে তারা। প্রচণ্ড মরুপ্রদেশের মতো তাপপ্রবাহে দগ্ধ হয়ে যাওয়া প্রকৃতিতে সামান্য ছায়ার জন্য ভিক্ষুকের মতো হন্যে হয়ে ঘুরবে তারা। আর ওদের এই সর্বনাশের জন্য হয়তো দায়ী থাকব আমরাই। এরকমই সময়োপযোগী বিষয় নিয়ে লেখা একটি ভৌতিক উপন্যাস হল "হুইল চেয়ার"।
"হুইল চেয়ার" ... সত্যি বলতে শুধুমাত্র কভার টা দেখে বইটা কিনেছিলাম । নিজেদের বাড়ি , নেমপ্লেট থাকবে এই আশায় নতুন বাড়ি কিনেছিল উদ্দীপ্ত | নির্দিষ্ট দিনে গৃহ প্রবেশের মাধ্যম স্ত্রী বর্ণালী , কন্যা ইলোরা ( গিনি ) পুত্র রনির সাথে নতুন বাড়িতে থাকতে শুরু করে | কিন্তু সেই বাড়িতে আসার পর থেকেই বাড়ির সদস্যদের শরীরের অবনতি ঘটতে থাকে দিন দিন | এর মধ্যেই ইলোরার জীবনে বিভিন্ন ঘটনা ঘটতে থাকে , সে বাড়ির মধ্যে কয়েক জনের উপস্থিতি অনুভব করতে পারে যা সে ছাড়া বাড়ির আর কেউ বুঝতে পারে না । হঠাৎ একদিন রনির অসুস্থতার জন্য যখন সবাই হাসপাতালে ছিল ঠিক সেইদিন রাত্রেই গিনি বাড়ির মধ্যে অন্যান্য ব্যক্তির উপস্থিতি খুব ভালো ভাবে বুঝতে পারে I সেই পরিস্থিতিতে তার সবার প্রথম মনে পড়ে প্রতিবেশী বুবাই এর কথা , আর তাকে ফোন করেই অজ্ঞান হয়ে যায় গিনি | তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় । সেই মুহুর্তে বুবাইদের বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন বুবাই এর দাদু দিব্যাংশু বাবু , একজন প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর I তার কথামতোই কাজ করে কিভাবে গিনি সুস্থ হয়ে ওঠে ......... দিন দিন টাকার লোভে কিভাবে জঙ্গল কেটে প্রোমোটররা বাড়ি বানিয়ে চলেছে | প্রকৃতিপ্রেমী কমলকান্তী বাবু তার গাছপালায় ঘেরা বাড়ি প্রোমোটারকে বিক্রি করতে না চাইলে তাকে আর তার পুরো পরিবারকে মেরে ফেলে। গিনির জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার থেকে এই ঘটনা গুলো সামনে আসে |
"হুইল চেয়ার " উপন্যাস এর মধ্যে দিয়ে আমাদের জীবনে গাছের কতটা প্রয়োজন, গাছের প্রতি প্রেম অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়ে খুব সুন্দর ভাবে বোঝানো রয়েছে I
লেখিকা যেরকম ধাঁচের লেখা আমাদের উপহার দিয়েছেন সেই হিসেবে এই গল্পটা অনেকটাই ছোট ও অন্য স্বাদের। গল্পটা প্রেম, ভয়, অতিপ্রাকৃতিক এবং সর্বোপরি প্রকৃতি প্রেমের একটি মিশ্রণ। আজকের দিনে দাড়িয়ে গল্পের বিষয়টি যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক।
👻মাঝে বেশ কিছুদিন মনটা ভূত ভূত করছিলো, যদিও ভূতের গপ্পের পোকা আমি তেমন নই, তবে অলৌকিক আবহে কোনও গল্প বা উপন্যাস পড়তে বেশ লাগছিল । তাই সাথী দাসের লেখা হুতোমগড়ের হাতছানি পড়ার পর ওনার এই অলৌকিক আবহে লেখা হুইল চেয়ার বইটি হাতে তুলে নিলাম।
🏠উদ্দীপ্ত তার বন্ধুর পরামর্শে নতুন ফ্ল্যাট কেনে, তার স্ত্রী বর্ণালী ও দুই ছেলে-মেয়ে কে নিয়ে নতুন ফ্ল্যাট এ আসে। তবে নতুন ফ্ল্যাট এ আসার পর থেকেই নানা রকম দুর্যোগ ঘনিয়ে আসে ওদের পরিবারে। ওদের মেয়ে ইলোরা নানা রকম অস্বাভাবিক ঘটনার সম্মুখীন হয়, কিন্তু কেউ ওর কোনও কথা বিশ্বাস করে না। এদিকে ওর ভাই রিন্টু নতুন ফ্ল্যাট এ আসার পর থেকেই শরীর খারাপ এ ভুগছে। তাই ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় নিজের মেয়েকে ভুল বোঝে উদ্দীপ্ত ও বর্ণালী।
✨এরমধ্যে আবাসনের আভরণ নামের একটি ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব আর ধীরে ধীরে প্রথম প্রেমে জড়িয়ে পড়ে ইলোরা। একদিন ওরা দু’জনে ঘুরতে গিয়ে পাশের জঙ্গলে এক পরিত্যক্ত বাড়ি দেখতে পায়—আর সেই বাড়ির ভাঙা জানালা দিয়ে চোখে পড়ে এক হুইল চেয়ার। এই বাড়িটির রহস্য কি? বা ওদের ফ্ল্যাট এর সাথে এই বাড়ির কিসের সংযোগ? আরও অনেক ঘটনা ঘটে এর পড়ে, গল্পে আসে আরও এক প্রধান চরিত্র আভরণ এর দাদু। এসব জানতে হলে বইটা পড়তে হবে।
✍️লেখিকা এই উপন্যাসে শুধু অলৌকিক আবহ তৈরি করেননি, পাশাপাশি খুব সুন্দরভাবে ছুঁয়ে গেছেন এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তাকেও । এই দুইয়ের মিশ্রণে পড়তে বেশ লাগলো। 📖গল্পটি বেশ ছোট, মোটে ১২০ পাতার। ওয়ান সিটিং এ পড়ে নেওয়াই যায়।
🍃সবশেষে একটা কথাই বলব—প্রকৃতি আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, আমরা নয়। তাকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। নাহলে একদিন সত্যিই কংক্রিটের জঙ্গলে মুক্ত বাতাস আর এক ফোঁটা জলের জন্য যুদ্ধ করতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।