বই রিভিউঃ মানিকদার সঙ্গে
লেখক ঃ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
আচ্ছা, একটা বইয়ের প্রথম ত্রিশপাতা পড়েই কেন ১০-২০ স্টার দেয়া যায় না! আফসোস, বড্ড আফসোস!
আহা কি বই!, কি সৌমিত্রের লেখনী! ১১৬ পাতার বইটা বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল!!
মহৎ দেখে যে মুগ্ধ হতে পারে, সেই নাকি গুণী শিল্পী হয়। এই যে মুগ্ধতা, এটা কিন্তু অভিনেতা ও পরিচালকের বিরাট চাহিদা।
সৌমিত্রের লেখা আমি আগে পড়িনি। তিনি বিরটমাপের অভিনেতা,তুখোড় আবৃত্তি করেন, এসবের বাইরেও যে তার এত সুন্দর একটা লেখক সত্তা আছে, সে খবর পাইনি আগে।
লেখক স্মৃতিচারণ করেছেন তার মানিকদার, সত্যজিৎ রায়ের। সত্যজিৎ রায় ঠিক কত বড় পরিচালক ছিলেন, সেটার পাশাপাশি তিনি যে কত চমৎকার একজন মানুষ ছিলেন, জেনে মুগ্ধ হতে হয়। বইটিতে কিছু দুর্লভ ছবিরও সংযোজন করা হয়েছে, বিভিন্ন সেটে, ছবি তৈরীর বিভিন্ন অজানা ইতিহাস।
আজকেও যে হীরক রাজার দেশে সিনেমাটি পুরোনো হয়নি, ফেলু মিত্তিরের ছবি হলে আমরা হামলে পড়ি, তার পেছনে একজন সত্যজিৎ রায়ের কত শ্রম, কত নিষ্ঠা, কতটা দূরদর্শিতা ছিল!
সৌমিত্রের সাথে সত্যজিৎ এর জানাশোনা ৩৫ বছর। স্মৃতিচারণ করার জন্য সময়টা খুব অল্প নয়। এই বইয়ে পরিচালক সত্যজিৎ এর কথাই বেশী উঠে এসেছে। ছোট ছোট দৃশ্য, বর্ণনায় মানিকদার সাথে ফুটে উঠেছে নবীন অভিনেতাদের জন্য একজন গুণী অভিনেতার সাথে একজন বিশ্বখ্যাত পরিচালক এর টিপস ও।থিয়েটার বা ছবি তৈরীর কত খুটিঁনাটি বিষয়ই না থাকে!
সর্বোপরিভাবে সত্যজিৎ আছেন বইটির পাতায় পাতায়।তার বিরাট সত্তা নিয়ে। আর সৌমিত্রের আটপৌরে স্বাভাবিক আত্মকথন এ আছে তার মানিকদার প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা,ভালবাসা।
গুণীজন বলেন, মহৎ মানুষই অপরের মহত্ত্ব দেখতে পারে। তার বাংলা সিনেমার প্রবাদপ্রতিম দুজন মানুষের একজন যখন আরেকজনকে নিয়ে লেখেন, পাঠকের জন্য মুগ্ধতা ছাড়া কিছুই থাকে না।
সৌমিত্রের কথাতেই মানিকদার চলে যাওয়ায় তার শূন্যতা বোঝা যায়, মানিকদার মৃত্যুর পরে শোকসন্তপ্ত সৌমিত্রকে এক বিদেশিনী বলছেন, Dont cry Soumitra, Manikda has given you a heritage.
মানুষ চলে যায়। কিন্তু ওইকথা শোনার পর সৌমিত্র ভাবলেন,তার মানিকদার কাছে তিনি চৌত্রিশ বছর যা পেয়েছেন,তার জন্যেই আরো একটা জীবন বাচাঁ যায়।মৃত্যুতে মানিকদার শেষ হয়নি।
অন্যের কথা জানি না,আমি ব্যাক্তিগত ভাবে সৌমিত্রকে বাংলা ধ্রুপদী সিনেমার অভিভাবক মনে করি। আর আমি জানি, এরপর যতবার আমি ওঁনাকে দেখব, তার আড়ালে আরেকজন বিরাট পুরুষের ছায়া দেখব, যিনি বাংলা লাইট ক্যামেরা,একশনের জগতই নয়, শংকু, ফেলু আর গল্প ১০১ দিয়ে রাঙিয়ে দিয়েছেন আমাদের ছোটবেলাটিও, সেই ছ'ফুট লম্বা মানুষটি, যিনি বলেছেন,সিনেমা না করতে পারলে,বেঁচে থেকে আর লাভ কি!
বইটির সাজেশনের জন্য ছোট্ট বন্ধু রাইসাকে অসংখ্য এবং অসংখ্য ধন্যবাদ। তার বিনা অনুমতিতেই তার গুডরিডস রিভিউয়ের কিছু কথা এখানে ব্যাবহার করেছি। কি লিখব ভেবে পাচ্ছিলাম না। ঘোরে আছি, বড্ড ঘোরে আছি!