ছোট ছোট আটটা গল্পে এক '৭১ এর পৌরাণিক সময়কে লেখক তুলে ধরেছেন কাছাকাছি বয়সী নানান বালক-বালিকার দৃষ্টিকোণ থেকে। এই বয়সের চরিত্রগুলোর সাথে আমি পরিচিত। যুদ্ধের ঐ সময়টাতে আমার বাবার বয়স গল্পের এসব চরিত্রের কারও কারও বয়সের সমানই ছিল। যুদ্ধের সবচেয়ে জান্তব যে দৃশ্য আমার কাছে স্পষ্ট সেটা হচ্ছে আমাদের বাজারে হঠাৎ শোরগোল উঠেছে মিলিটারি এসেছে, আমার ৮-৯ বছরের বাবা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে দৌড়াতে কিছুতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। হাজার হাজার হাটুরেরা বাবার ডানহাতের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে, আমার অসহায় ছোট্ট বাবা নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে তীব্র ব্যথায় কিংবা আসন্ন বিপদের কল্পনায়। না, আমাদের গ্রামে মিলিটারিরা ঢুকে নি। কিছু মুক্তিযোদ্ধা শুনেছি আমাদের প্রাইমারি স্কুলে অবস্থান করেছিলেন কিছুদিনের জন্য। বাবাসহ তার বয়সী অন্য বাচ্চারা মুক্তিদের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার তুলতো (এইখানে এই গল্প শুনে ছোট্ট বয়সে আমারও তীব্র গর্ব হয়েছিল!)।
ইমতিয়ার শামীমের লেখার মুগ্ধ পাঠক আমি। তার শব্দশৈলী কিংবা গল্প, দুইয়েই আমি বিমোহিত হই। তার মতো গল্প যেমন সমসাময়িক কোনো লেখক বলে না, তার মতো শব্দের মালা গাঁথতেও পটুত্ব দেখতে পাই নি অন��য লেখকদের মধ্যে। তাই তো প্রত্যাশার পারদ চড়েছিল বেশ অনেকটা উঁচুতে। প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে বৈ কি! লেখকই তার টাইমলাইনে এই বইয়ের ছবিতে জ্য�� জেনেটের একটা লাইন উদ্ধৃত করেছিলেন, "যারা প্রতারিত হন, লেখনী তাদের চূড়ান্ত আশ্রয়।" আমরা সকলেই প্রতারিত হয়েছি, জীবনের কাছে, সময়ের কাছে, স্বাধীনতা নামের মরীচিকার কাছে। তাই লেখকের বালক বয়সের প্রত্যক্ষ এক সময়ের বেদনা আমাদের বুকে না বাজলেও আমরাও বুঝতে শিখি কিংবা উপলব্ধি করতে শিখে গিয়েছি "মানুষের প্রাণ তা হলে বিরাট এক বনজঙ্গল- কত সত্য সেখানে নিশ্চিন্তে লুকিয়ে থাকে আরও কত মানুষকে নিরাপদে রাখতে হবে বলে। মিথ্যা সদর্পে হাঁটতে থাকে মুক্ত, খোলা আকাশের তীব্র বাতাসের সঙ্গী হয়ে; অথচ সত্য লুকিয়ে থাকে জীবনের কত রাস্তা, কত আলপথ, কত হালট আর নদী,বিল, ডোবাতে! আচ্ছা, মানুষের জীবনের বড় বড় সত্যগুলো কি এভাবেই লুকিয়ে থাকে? অপেক্ষা করে নিশ্চিন্তে বেরুনোর দিনটির জন্য?" কী জানি! আমাদের সত্য কি? নিশ্চিন্ত দিনটি কি ভাবে? ছোটবেলায় মা বলতেন পরে কিছু বললে সহ্য করা যায়, ঘরের মানুষের অ-কথা কি সহ্য করা যায়? বিদেশিরা বাংলাদেশ ছেড়েছে, আমিও আবেগমথিত কণ্ঠে কতবার আওড়েছি,
"বিষণ্ণ আলোয় এই বাংলাদেশ
নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ
প্রান্তরে দিগন্ত নির্নিমেষ
এ আমারই সাড়ে তিন হাত জমি।"
তবুও এখনও যুদ্ধকালীন সময়ের মতো হু হু করে বাড়ছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম, আমরা কেবল সত্য লুকিয়ে কাছের মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে চুপ থাকি। এখনও মানুষ পু*ড়ে ম*রছে, মানুষকে কু*পিয়ে হ*ত্যা করছে, ধর্ষিতার আহাজারিতে সমাজ ধর্ষকের গলায় বিজয়মাল্য তুলে দিচ্ছে। মিথ্যারা বেড়ে উঠছে, চাটুকারেরা সাফল্যের সিঁড়ি না বরং এলিভেটরে চেপে তরতর করে উপরে উঠছে। এসব আক্ষেপ নিয়ে যে লেখনীকে আশ্রয় করব, সে সাহসও নেই। আমার চিরাচরিত প্রশ্ন, "আমরা কি স্বাধীন?" লেখক এই প্রশ্নকেই বারবার এনেছেন। একাত্তরের শীতের শুরুতে যে স্বাধীনতার কথা লেখা হয়েছিল, সেখানে কি যুদ্ধ থেমে গিয়েছিল? যায় নি। এখনও কত শিশুই উত্তর পায় না, তাদের অবোধ্য প্রশ্নের। এই বইয়েরই এক বাচ্চা মেয়ের প্রশ্ন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে রাত থেকে, "আমি বুঝি না, চোখ যার জলে ভরে উঠতে পারে, লোকে কেন তাকে বে*শ্যা বলে?"
রক্তারক্তি থেমে যায় নি, কষ্ট কিছু লাঘব হয় নি। শুধু রূপ বদলেছে। যারা হারিয়ে গিয়েছে, যাদের হারিয়ে ফেলছি, যাদের হারিয়ে ফেলব কিংবা আমরা যারা হারিয়ে যাব তাদের অনুপস্থিতি কতটা প্রকট হবে?
"মানুষ কখনও কখনও অনুপস্থিত থাকলে বরং তার উপস্থিতি আরও বেশি করে বাজে।" কতজন নিজের মধ্যে জপবে স্বাধীনতার নামে প্রতারিত সময়ের গল্প? আমরাই বা কতটুকু জিজ্ঞাসু চোখে দেখছি আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া অন্যায়গুলোকে? স্বাধীনতা তো কোনো বদান্যতার মালা ছিল না! জীবনের থেকে বড় ধর্মকে মানুষ খুইয়েছে, প্রিয়জনদের হারিয়েছে। তবুও আজও আমরা শুনতে পাই কড়িপাতার ঝুনঝুন আর মৃত্যুর মধ্যে ডুবতে ডুবতে আমাদের কানে বাজে শৈশবের সেই বিস্ময়কর সময়টা যখন প্রথম পরিচিত হয়েছিলাম 'একাত্তর' শব্দটার সাথে।
বিঃদ্রঃ এটা বইয়ের পাঠপ্রতিক্রিয়া না, কেবল আমার অনুভূতির সারাংশ।