Jump to ratings and reviews
Rate this book

সোনালু সোনালু যত স্বপ্নদাহ

Rate this book
১৯৭১। আমাদের সবচেয়ে আবেগময় ও অশ্রুদগ্ধ এবং গৌরবোজ্জ্বল সময়। এদেশের মানুষের ত্যাগ আর রক্তে লেখা হয়েছে সেই ইতিহাস। তবে তা কেবল ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই আটকে থাকেনি। বাংলা ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য নতুন একটি অধ্যায় সূচনা করেছে। যেমন ভাষা আন্দোলনের সাহিত্য। তথাপি, ওই বিষাদময় বেদনাবিদ্ধ ও বিপন্নতার সব চিত্র কি উঠে এসেছে আমাদের সাহিত্যে? সব কিছুই কি আমাদের রুপালি কলমে রূপায়িত হতে পেরেছে? ফলে অসামান্য ভার নিয়ে, অশেষ অপ্রাপ্তি নিয়ে আমাদের সাহিত্যস্রষ্টারা লিখে চলেছেন সেই সব আত্মঅভিজ্ঞতা। কারো সেসব প্রত্যক্ষ ও উজ্জ্বল স্মৃতি, আবার কারো রচনায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বিবিধ ইতিহাস ও শ্রুতিকথার স্মারক হয়ে রূপান্বিত হয়ে চলেছে জাতির ওই গৌরবদীপ্ত কথকতা। ইমতিয়ার শামীম মুক্তিযুদ্ধের ওই প্রজন্ম, যিনি বালকের ভয়ার্ত-বিস্ময়মাখা চোখে প্রত্যক্ষ করেছিলেন রক্তপাতময় দিনগুলো। সেসব স্মৃতি-বিস্মৃতিময় বিষাদবিদ্ধ সময়ের গল্প স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও তাঁর মগজে অদৃশ্য এক ঘুণপোকার মতো কাটাকুটি করে চলেছে নিরন্তর। তবে গল্প তো কেবল বাস্তবের অনুপুঙ্খ উদ্বোধন নয়, তাতে মেশে শিল্পের নানান কারিকুরি। ইমতিয়ার শামীম সেই শিল্পনিরীক্ষায় পূর্বাপর মনোযোগী। মানব মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সমাজ-রাষ্ট্রের নানান অসহনীয় চলচ্ছবি তিনি মিশিয়ে দেন গল্পের নৈর্ব্যক্তিক শরীরে। ফলে সেগুলো হয়ে ওঠে শিল্পের নির্দিষ্ট একটি তলের সঙ্গে অসহিষ্ণু বাস্তবের স্তরবহুলতার সংবেদ। সোনালু সোনালু যত স্বপ্নদাহ সংকলনের গল্পেও লেখকের চেতনাপ্রবাহে জেগে থাকে আশ্চর্য ও অনির্বাপিত এক চোখ।

136 pages, Hardcover

First published February 19, 2024

Loading...
Loading...

About the author

Imtiar Shamim

56 books119 followers
ইমতিয়ার শামীমের জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সালে, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। আজকের কাগজে সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরু নব্বই দশকের গোড়াতে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ডানাকাটা হিমের ভেতর’ (১৯৯৬)-এর পান্ডুলিপি পড়ে আহমদ ছফা দৈনিক বাংলাবাজারে তাঁর নিয়মিত কলামে লিখেছিলেন, ‘একদম আলাদা, নতুন। আমাদের মতো বুড়োহাবড়া লেখকদের মধ্যে যা কস্মিনকালেও ছিল না।’

ইমতিয়ার শামীম ‘শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে’ গল্পগ্রন্থের জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার (২০১৪), সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ২০২০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সকল প্রধান সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
5 (26%)
4 stars
12 (63%)
3 stars
2 (10%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 10 of 10 reviews
Profile Image for Harun Ahmed.
1,751 reviews509 followers
December 20, 2024
২০২৪ এ আমার পড়া সবচেয়ে প্রিয় গল্পগ্রন্থ "সোনালু সোনালু যত স্বপ্নদাহ।"  মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইটিতে গল্প আছে ৮টি। প্রতিটি গল্পই লেখা হয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু/ কিশোর /কিশোরীর দৃষ্টিকোণ থেকে। যুদ্ধের সময়টাকে তারা যেভাবে দেখছে, বড়দের জগতের নিষ্ঠুরতা, যুদ্ধের বিভীষিকা তাদের ওপর যে সরাসরি ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলছে তা নিয়েই মূলত আখ্যানভাগ গড়ে উঠেছে।মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব বা মূলধারার কোনো ইতিহাসকে কেন্দ্র না করে ইমতিয়ার শামীম প্রান্তিক মানুষ, তাদের জীবনযাপন, পলায়ন, সমঝোতা, অসহায়ত্ব, সংখ্যালঘু নির্যাতন,হতবিহবলকর বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাদের টিকে থাকার প্রাণান্ত চেষ্টাকে উপজীব্য করেছেন।সরল ভঙ্গিতে কাহিনি এগিয়ে নিতে নিতে লেখক আলগোছে এমনভাবে সমাপ্তি টানেন যা গল্প সম্বন্ধে আমাদের পুরো মনোভাবই বদলে দেয়। অথচ এই সমাপ্তিকথন কোনোভাবেই "টুইস্ট " বা মোচড় নয়, পাঠককে বিভ্রান্ত করার কোনো উদ্দেশ্যই লেখকের নেই। এই কথন ব্যবহৃত হয়েছে পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে তীব্র অভিঘাত সৃষ্টির জন্য। সবচেয়ে বেশি অভিঘাত সৃষ্টি করা গল্প, আমার মতে - নীলকণ্ঠী সকাল, অগ্নিগিরির অশ্রুমতি, মর্মলোকের হত্যাকাণ্ড আর প্রত্যাবর্তনের খুঁটিনাটি। 


"ফর্মের জন্য সাহিত্য না সাহিত্যের জন্য ফর্ম" বহুল আলোচিত ও পুরনো একটি প্রশ্ন। হাসান আজিজুল হক অনেক আগে এ বিষয়টা নিয়ে লিখেছেন। তাঁর মতে, বিষয়বস্তুক সর্বোত্তমভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য যা ভালো মনে হয় লেখক তা-ই করেন।অর্থাৎ বিষয়বস্তু অনুযায়ী ফর্ম বাছাই করেন; আগে ফর্ম বাছাই করে বিষয় নির্বাচন করেন না। এ বইয়ের কাহিনি ছোটদের চোখ দিয়ে দেখা হয়েছে, তাদের মতো ভাষা ব্যবহার করে লেখা হয়েছে -গল্পের জন্য ঠিক এই ফর্মটাই দরকার ছিলো। ছোটরা ভান ধরতে জানে না, সত্য লুকিয়ে রাখতে শেখেনি, তাদের বয়ানে নির্বিকারভাবে বলে যাওয়া গল্প তাই ভয়ংকরভাবে ধাক্কা দেয় আমাদের। অন্য কোনোভাবে লিখলে গল্পগুলো আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠতো না। সৎ সাহিত্য দেশকালের সীমা ছাড়িয়ে যায়, যেমন এ বইয়ের গল্পগুলো হতে পারে যুদ্ধকালীন বা যুদ্ধবিধ্বস্ত অন্য কোনো দেশেরও। সবাইকে অনুরোধ করবো বইটি পড়ে দেখার জন্য।
Profile Image for শাহ্‌ পরাণ.
264 reviews83 followers
March 22, 2025
সোনালু সোনালু যত স্বপ্নদাহ: ৪.৪৪/৫

১. নীলকণ্ঠী সকাল: ৫/৫
গল্প শেষ করার পর ফ্যানের দিকে মনে হয় ২০/৩০ মিনিট স্থির চোখে তাকিয়ে ছিলাম। এতোটা কষ্ট দিয়ে, এতোটা বেদনা দিয়েও গল্প হয়! এরকম লক্ষ লক্ষ পরিবারের লক্ষ লক্ষ যন্ত্রণা নিয়ে এই দেশের জন্ম হয়েছে এই অনুভূতিটা যদি দেশের সবাইকে জানানো যেতো তাহলে হয়তো দেশটা আরেকটু সুন্দর হতো।

২. অগ্নিগিরির অশ্রুমতি: ৪.৫/৫

৩. দুর্বোধ্য বুকের ঘ্রাণ: ৪/৫

৪. মর্মলোকের হত্যাকাণ্ড: ৫/৫
পৃথিবীতে সুখের ভাষা, কষ্টের ভাষা, কান্নার ভাষা, অর্থের ভাষা, ক্ষুদার ভাষা আর যৌনতার ভাষা সব মানুষের জন্য একই।
গল্পের হৃদয় নিংড়ানো শেষ দুই লাইন মর্মের খুব গভীরে যেনো আঘাত করলো।

আমি কান পেতে থাকি, ভালো করে বোঝার চেষ্টা করি, মা কী বলছে, কী করছে; আমাকেও তো এসবই করতে হবে।
মাঝখানে থেকে খালি খালি এতো দৌড়াদৌড়ি! কোন মানে হয়!


৫. ফেরা না ফেরার সন্ধ্যা: ৩.৫/৫
কিছু পাপের শাস্তি আল্লাহ পৃথিবীতেই দিয়ে দেয়। এবং খুব বেশি দেরি করেন না তিনি। এই গল্পে যেমন দেখানো হলো আমার নিজের ছোট জীবনেও দেখেছি।

৬. প্রত্যাবর্তনের খুঁটিনাটি: ৪/৫
একাত্তরে এই দেশ সবার জন্য স্বাধীন হয় নাই। করো করো জন্য বিশেষ করে অনেক হিন্দু পরিবারের জন্য পুরো দেশটাই হারিয়ে গিয়েছিল জীবন থেকে।

৭. হারিয়ে যাওয়ার আগে: ৪.৫/৫

৮. কড়িশিমের ঝুনঝুনি: ৫/৫
আহা! এতো কষ্ট এতো কষ্ট! এতোটা কষ্ট না দিলেও তো পারতেন লেখক।
Profile Image for Yeasin Reza.
531 reviews94 followers
September 5, 2024
যুদ্ধের ভয়াবহতা আর দুর্বিষহতা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আঘাত করে শিশুদের। তাদের নিজস্ব ছোট্ট জগৎ মুহুর্তে ভেঙে পড়ে। 'বড়'দের অনেক কিছুই তাদের বোঝে আসেনা। ইমতিয়ার শামীমের উক্ত গল্পগ্রন্থে শিশু-কিশোরদের চোখে মুক্তিযুদ্ধ উঠে এসেছে অভিনব রীতিতে। বরাবরই আমি ইমতিয়ারের গদ্যের গুণমুগ্ধ ভক্ত। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভালো লেখা থেকে আজেবাজে লেখার পরিমাণটা ই বেশি। শিশু-কিশোরদের পয়েন্ট অফ ভিউতে মুক্তিযুদ্ধ কেমন ছিলো সেটা অনুধাবন করার জন্য উক্ত গল্পগ্রন্থের কাছে আমাদের ফিরতে হবে।
Profile Image for Rifat.
505 reviews337 followers
December 31, 2024
রিসার্স মেথোডলজি ক্লাসে স্যার একদিন হুট করে রিসার্চারের নৈতিকতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বললেন কেউ একজন মুক্তিযোদ্ধা হলে সে যে সবদিক থেকেই নৈতিকতার চর্চা করবে ব্যাপারটা এমন না। আমরা ভাবি কেউ একজন যুদ্ধ করে দেশকে বাঁচিয়েছে বলে সে হয়তো ভালো মানুষ কিন্তু দেশপ্রেম থাকলেই যে চরিত্র ভালো হবে এমন নয় । মর্মলোকের হত্যাকাণ্ড গল্পটি আমাকে স্যারের কথা মনে করে দিয়েছে দ্বিতীয়বার।



২০২৪ এ পড়া সর্বশেষ বই। ইমতিয়ার শামীমের লেখা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পগ্রন্থ, গল্পের সংখ্যা ৮টি। গল্পগুলির গল্প শোনায় কিছু উঠতি বয়সী শিশু-কিশোর। তাই দৃশ্যপটও ভণিতাবিহীন, সরল। বইটা আর চারটা শিশুকিশোরদের জন্য রচিত এই জনরার গল্পগ্রন্থের মতো নয়, ঠিক যে কারণে ইমতিয়ার শামীম একজন ইমতিয়ার শামীম! গল্পের সমাপ্তি সুরশলাকায় টোকা লাগার মতো, বেশ কিছু সময় ধরে মনে বাজতে থাকে মৃদু লয়ে আর পাঠক নিশ্চয়ই ভাবতে থাকে..

৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪
2 reviews
March 2, 2024
ছোট ছোট আটটা গল্পে এক '৭১ এর পৌরাণিক সময়কে লেখক তুলে ধরেছেন কাছাকাছি বয়সী নানান বালক-বালিকার দৃষ্টিকোণ থেকে। এই বয়সের চরিত্রগুলোর সাথে আমি পরিচিত। যুদ্ধের ঐ সময়টাতে আমার বাবার বয়স গল্পের এসব চরিত্রের কারও কারও বয়সের সমানই ছিল। যুদ্ধের সবচেয়ে জান্তব যে দৃশ্য আমার কাছে স্পষ্ট সেটা হচ্ছে আমাদের বাজারে হঠাৎ শোরগোল উঠেছে মিলিটারি এসেছে, আমার ৮-৯ বছরের বাবা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে দৌড়াতে কিছুতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। হাজার হাজার হাটুরেরা বাবার ডানহাতের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে, আমার অসহায় ছোট্ট বাবা নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে তীব্র ব্যথায় কিংবা আসন্ন বিপদের কল্পনায়। না, আমাদের গ্রামে মিলিটারিরা ঢুকে নি। কিছু মুক্তিযোদ্ধা শুনেছি আমাদের প্রাইমারি স্কুলে অবস্থান করেছিলেন কিছুদিনের জন্য। বাবাসহ তার বয়সী অন্য বাচ্চারা মুক্তিদের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার তুলতো (এইখানে এই গল্প শুনে ছোট্ট বয়সে আমারও তীব্র গর্ব হয়েছিল!)।

ইমতিয়ার শামীমের লেখার মুগ্ধ পাঠক আমি। তার শব্দশৈলী কিংবা গল্প, দুইয়েই আমি বিমোহিত হই। তার মতো গল্প যেমন সমসাময়িক কোনো লেখক বলে না, তার মতো শব্দের মালা গাঁথতেও পটুত্ব দেখতে পাই নি অন্য লেখকদের মধ্যে। তাই তো প্রত্যাশার পারদ চড়েছিল বেশ অনেকটা উঁচুতে। প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে বৈ কি! লেখকই তার টাইমলাইনে এই বইয়ের ছবিতে জ্যঁ জেনেটের একটা লাইন উদ্ধৃত করেছিলেন, "যারা প্রতারিত হন, লেখনী তাদের চূড়ান্ত আশ্রয়।" আমরা সকলেই প্রতারিত হয়েছি, জীবনের কাছে, সময়ের কাছে, স্বাধীনতা নামের মরীচিকার কাছে। তাই লেখকের বালক বয়সের প্রত্যক্ষ এক সময়ের বেদনা আমাদের বুকে না বাজলেও আমরাও বুঝতে শিখি কিংবা উপলব্ধি করতে শিখে গিয়েছি "মানুষের প্রাণ তা হলে বিরাট এক বনজঙ্গল- কত সত্য সেখানে নিশ্চিন্তে লুকিয়ে থাকে আরও কত মানুষকে নিরাপদে রাখতে হবে বলে। মিথ্যা সদর্পে হাঁটতে থাকে মুক্ত, খোলা আকাশের তীব্র বাতাসের সঙ্গী হয়ে; অথচ সত্য লুকিয়ে থাকে জীবনের কত রাস্তা, কত আলপথ, কত হালট আর নদী,বিল, ডোবাতে! আচ্ছা, মানুষের জীবনের বড় বড় সত্যগুলো কি এভাবেই লুকিয়ে থাকে? অপেক্ষা করে নিশ্চিন্তে বেরুনোর দিনটির জন্য?" কী জানি! আমাদের সত্য কি? নিশ্চিন্ত দিনটি কি ভাবে? ছোটবেলায় মা বলতেন পরে কিছু বললে সহ্য করা যায়, ঘরের মানুষের অ-কথা কি সহ্য করা যায়? বিদেশিরা বাংলাদেশ ছেড়েছে, আমিও আবেগমথিত কণ্ঠে কতবার আওড়েছি,
"বিষণ্ণ আলোয় এই বাংলাদেশ
নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ
প্রান্তরে দিগন্ত নির্নিমেষ
এ আমারই সাড়ে তিন হাত জমি।"
তবুও এখনও যুদ্ধকালীন সময়ের মতো হু হু করে বাড়ছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম, আমরা কেবল সত্য লুকিয়ে কাছের মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে চুপ থাকি। এখনও মানুষ পু*ড়ে ম*রছে, মানুষকে কু*পিয়ে হ*ত্যা করছে, ধর্ষিতার আহাজারিতে সমাজ ধর্ষকের গলায় বিজয়মাল্য তুলে দিচ্ছে। মিথ্যারা বেড়ে উঠছে, চাটুকারেরা সাফল্যের সিঁড়ি না বরং এলিভেটরে চেপে তরতর করে উপরে উঠছে। এসব আক্ষেপ নিয়ে যে লেখনীকে আশ্রয় করব, সে সাহসও নেই। আমার চিরাচরিত প্রশ্ন, "আমরা কি স্বাধীন?" লেখক এই প্রশ্নকেই বারবার এনেছেন। একাত্তরের শীতের শুরুতে যে স্বাধীনতার কথা লেখা হয়েছিল, সেখানে কি যুদ্ধ থেমে গিয়েছিল? যায় নি। এখনও কত শিশুই উত্তর পায় না, তাদের অবোধ্য প্রশ্নের। এই বইয়েরই এক বাচ্চা মেয়ের প্রশ্ন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে রাত থেকে, "আমি বুঝি না, চোখ যার জলে ভরে উঠতে পারে, লোকে কেন তাকে বে*শ্যা বলে?"
রক্তারক্তি থেমে যায় নি, কষ্ট কিছু লাঘব হয় নি। শুধু রূপ বদলেছে। যারা হারিয়ে গিয়েছে, যাদের হারিয়ে ফেলছি, যাদের হারিয়ে ফেলব কিংবা আমরা যারা হারিয়ে যাব তাদের অনুপস্থিতি কতটা প্রকট হবে?
"মানুষ কখনও কখনও অনুপস্থিত থাকলে বরং তার উপস্থিতি আরও বেশি করে বাজে।" কতজন নিজের মধ্যে জপবে স্বাধীনতার নামে প্রতারিত সময়ের গল্প? আমরাই বা কতটুকু জিজ্ঞাসু চোখে দেখছি আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া অন্যায়গুলোকে? স্বাধীনতা তো কোনো বদান্যতার মালা ছিল না! জীবনের থেকে বড় ধর্মকে মানুষ খুইয়েছে, প্রিয়জনদের হারিয়েছে। তবুও আজও আমরা শুনতে পাই কড়িপাতার ঝুনঝুন আর মৃত্যুর মধ্যে ডুবতে ডুবতে আমাদের কানে বাজে শৈশবের সেই বিস্ময়কর সময়টা যখন প্রথম পরিচিত হয়েছিলাম 'একাত্তর' শব্দটার সাথে।
বিঃদ্রঃ এটা বইয়ের পাঠপ্রতিক্রিয়া না, কেবল আমার অনুভূতির সারাংশ।
Profile Image for Arifur Rahman Nayeem.
214 reviews114 followers
March 12, 2024
গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলো মুক্তিযুদ্ধকে ছোটদের চোখ দিয়ে দেখার প্রয়াস। প্রতিটি গল্পের প্রধান চরিত্র কোনো বালক অথবা বালিকা। গল্পের কথকও তারা। তবে ছোটদের নিয়ে লেখা হলেও গল্পগুলো আসলে ছোটদের জন্য নয়। ছোটরা অনেক কিছু দেখে ঠিকই, কিন্তু তাদের কলুষমুক্ত মন দেখার অন্তরালেও যে থাকতে পারে দেখার মতো আরও কিছু, তা ঠিকঠাক অনুধাবন করতে পারে না। উদাহরণ দেওয়া যায় ‘নীলকণ্ঠী সকাল’ গল্প থেকে। গল্প কথকের বাবা যুদ্ধে যায়। মা ও বোন নিয়ে তার অভুক্ত অবস্থায় কাটে দিনের পর দিন। এক সময় তার মায়ের কাছে আসে ক্যাম্পে খানসেনাদের কাজ করে দেওয়ার আদেশ। কাজ নেওয়ার কিছুদিন পর থেকে বালক কথকের মায়ের পেট স্ফীত হতে থাকে। আর সে ভাবে, ইদানিং বোন এবং ওর যেমন নিয়মিত খাবার জোটায় শরীর-স্বাস্থ্য ভালো হচ্ছে, একই কারণে ভুঁড়ি বাড়ছে তাদের মায়েরও। আবার দেখা যায়, সময় ও পরিস্থিতি ছোটদের বুঝতে শেখায় বড়দের মতো করে। অভাবিতপূর্ব সব ঘটনা মনের দিক থেকে রাতারাতি ওদের বড় করে তোলে। বড়রা ওদেরকে কিছু না বললেও যুদ্ধদিনের ব্যাপার-স্যাপার ওরা সব বুঝে নিতে শিখে যায়। হাসিখুশি খেলতে থাকা ওরা যেন অকস্মাৎ মুখোমুখি হয়ে পড়ে ভয়ঙ্কর কোনো দানবের। ফলত মুহূর্তেই মিসমার হয়ে যায় সব। আর এমন করে যুদ্ধকাল বড় নির্দয়ভাবে কেড়ে নেয় ওদের স্বাভাবিক বালকবেলা। বইটা পড়তে পড়তে বুকে হাহাকার জাগে। অজান্তেই বেরিয়ে আসে একের পর এক দীর্ঘশ্বাস। সবমিলিয়ে ‘সোনালু সোনালু যত স্বপ্নদাহ’কে আমার মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক এক অনন্য গল্প সংকলন বলে মনে হলো।
Profile Image for Kripasindhu  Joy.
611 reviews2 followers
October 31, 2025
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যা কথাসাহিত্য হয় তার বেশিরভাগই বড়দের দৃষ্টিকোণ থেকে। ছোটদের দৃষ্টি থেকে লেখাগুলো বেশিরভাগই মূলত কিশোরসাহিত্য শ্রেণিতে ফেলার মতো।
এই বইয়ের গল্পগুলো সেখানে আলাদা। উপরের দুইটা শর্তের উভয়েরই বিপরীতে গল্পগুলোর অবস্থান।

ইমতিয়ার শামীমের উপন্যাস আগে পড়লেও এই প্রথম গল্প পড়লাম এবং বলতে বাধ্য হবো যে অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ইতিবাচক।
Profile Image for Edward Rony.
97 reviews9 followers
May 7, 2026
'সোনালু সোনালু যত স্বপ্নদাহ' গল্পগ্রন্থের প্রতিটি গল্পের প্রেক্ষাপটই মুক্তিযুদ্ধ। এছাড়া প্রতিটি গল্পই রচিত হয়েছে ’৭১-এর কিশোরের দৃষ্টিকোণ থেকে। ফলে যুদ্ধের ভয়াবহতা কিশোর মনে কী ধরনের দাগ ফেলেছিল, তার আভাস পাওয়া যায় প্রতিটি গল্পে।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ফিকশন সাহিত্য আমার পছন্দ। আর সরাসরি সম্মুখযুদ্ধের বাইরে সাধারণ মানুষের জীবনে এর কী প্রভাব ছিল, নারীদের ওপর করা অত্যাচার, রাজাকার-আলবদর, শরণার্থী ক্যাম্প, গণহত্যা— এসব বিষয়েই আমার আগ্রহ বেশি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে 'সোনালু সোনালু যত স্বপ্নদাহ' এগিয়ে আছে। কারণ প্রতিটি গল্পের প্রেক্ষাপটই এমন।

এই গল্পগ্রন্থ নিয়ে অনেকের ব্যাপক আগ্রহ দেখলাম, অনেকের খুবই প্রিয় বই। তবে সত্যি বলতে, আমার ততটা ভালো লাগেনি। মানে, ইমতিয়ার শামীমের লেখা হিসেবে যতটা ভালো আশা করেছিলাম, ততটা ভালো লাগেনি আরকি।

ইমতিয়ার শামীমের প্রথম দিকের বেশ কিছু বই পড়েছি। যে নিজস্ব গদ্যরীতিতে তিনি লেখেন, সেই গদ্যে এই গল্পগ্রন্থ লেখা হয়নি। তাঁর লেখায় এমন কিছু বিষয় থাকে, যেখানে পাঠক ভ্রু কুঁচকে উঠবে, আবার সেই লাইনটা পড়বে। কিছু লাইন পড়ে গায়ে কাঁটা দেবে। এই বিষয়গুলো এখানে প্রায় অনুপস্থিত লেগেছে আমার।

এরচেয়ে ভালো গল্প ইমতিয়ার শামীম লিখেছেন।
Profile Image for Md Abdul Kayem.
201 reviews3 followers
March 28, 2026
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেকোনো লেখা আমাকে প্রচন্ডরকম টানে। ইমতিয়ার শামীমের 'সোন��লু সোনালু যত স্বপ্নদাহ' বইটা যখন হাতে নিয়েছিলাম তখন জানতামও না বইটা কেমন হতে যাচ্ছে। কিন্তু শেষ করার পর মনে হলো এই বছরের সবচেয়ে ভালো বইগুলোর একটা পড়া হলো আমার, বইটিতে মোট ৮টা গল্প আছে। প্রতিটি গল্পই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে।

যুদ্ধ শেষ হলে অনেকেই বাড়ি ফিরে স্বস্তিতে, কেউ কেউ অপেক্ষায় থাকে হারানো মানুষের আর কারো কারো জীবনে আরো একটা মহাযুদ্ধ শুরু হয়। যে যুদ্ধের সবচেয়ে বড়ো লড়াই হয়ে উঠে ঠিকে থাকার। সকল লাঞ্ছনা, উপেক্ষা সহ্য করে। অথচ যে লাঞ্ছনায় ভুক্তভুগীর কোনো হাত নেই তা সবাই জানে। তবুও অপেক্ষায় থাকে 'নীলকন্ঠী সকাল' এর। নীলকণ্ঠী সকালের গল্পটা সেই সময়েই যে সময়ে একটা দেশ জন্মেছিলো, এক গ্রামীণ কিশোরের চোখে গল্পের পাতায় ঠাঁই হয়েছে সেইদিনগুলোর মাঠেঘাটে প্রাণ নিয়ে দৌঁড়ানোর গল্পগুলো। যে গল্পে একটা পরিবারের আর্তনাদের গল্প উঠে এসেছে, এসেছে এক যুদ্ধ শেষে আরেক যুদ্ধে মুখোমুখি হওয়া এক অসহায় মায়ের আর্তনাদে ভরা চিৎকার। কিশোরটি তার বাবা-মা আর বোনকে দিয়ে ছুটে বেড়ায় মাঠেঘাটে পুরোনো আত্মীয়ের দাওয়ায়। শেষমেশ হয়তো থিতু হয় কিন্তু তার মূল্য চুকাতে হয় চরম ভাবে সেই কিশোরের মাকে। এক যুদ্ধের পর সমাজের সভ্য মুখোশধারীদের সাথে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ।

'অগ্নিগিরির অশ্রুমতি' গল্পটাও সেই সময়ের, শহরের এক হিন্দু পরিবারের উপর হওয়া যুদ্ধের সময়কার নানান অত্যাচারের গল্প। ১২ কী ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর চোখে সেই সময়কে দেখবেন পাঠক এই গল্পে। স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করতে গিয়ে তাদের যে বিসর্জনগুলো দিতে হয়েছে সেটাই কাহিনির পাতায় পাতায় উঠে এসেছে। আর আছে এক দীর্ঘযাত্রার সময় শেষে বিষন্ন আবার উল্লাসে আঁকা অর্জিত স্বাধীনতাটুকু।

ক্লাস সিক্সে পড়া এক কিশোর মফস্বল শহরে ছোটো বড়ো ভাইবোনদের সাথে মেতে উঠে দূরন্তপনায়। শিঙারা, আইসক্রিম, ললিপপ কিংবা দুপুর বিকেলে মোড়ের মিস্ত্রি কাকার ট্রানজিস্টর মেরামতের দোকানে বেজে ওঠা সিনেমার গানের মতো প্রানবন্ত জীবন একদিন পাকিস্তানীদের কড়ালগ্রাস নেমে আসে। কিশোরের চোখে সেই জীবনের গল্প শুনতে শুনতে নষ্টালজিকে ভুগবেন, আবার বাবার কিংবা ভাইয়ের বুকের 'দুর্বোধ্য বুকের ঘ্রাণ' এর লোভও হবে। এই গল্পটা পূর্বের দুই গল্পের চেয়েও চমৎকার। যে গল্পে যুদ্ধের সময়ের এক কিশোরের স্বাধীনতা নিয়ে চিন্তাধারা, দুরন্তপনার দারুণ এক দৃশ্য উঠে এসেছে। পড়তে পড়তে মনে হয় চোখের সামনেই যেন প্রতিটি মূহুর্ত ঘটে চলেছে।

'মর্মলোকের হত্যাকন্ডা' গল্পটা এক বেশ্যার। অবশ্য এই বেশ্যা মানে কী জানে না সদ্য ফ্রক-প্যান্ট পড়তে শেখা মেয়েটি। কেবল দুই চোখে দেখে তার মায়ের বেঁচে থাকার লড়াই। কখনো পেটের জন্য, কখনো বিহারীদের হাত থেকে জীবনের জন্য আর কখনো বা একদিন স্বাধীনভাবে সবছেড়ে বাঁচতে পারবে সেই আশায়। তবুও তার নিজেকে টেঁকি মনে হয়, যার কাজই ধানভাঙা। কিশোরী সেই ধানভাঙা দেখে মনোযোগ দিয়ে, কে জানে একদিন না তাঁকেও ধান ভাঙতে হয়!

'ফেরা না ফেরার সন্ধ্যা' এক যুদ্ধের সময়ের সন্ধ্যার গল্প, যে সন্ধ্যায় দুই কিশোরী আগুন খুঁজতে গিয়ে গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া আগুন দেখেছিলো। যে সন্ধ্যায় গর্ভবতী মাকে নিয়ে দৌড়াতে হয়েছিলো পাকআর্মিদের ভয়ে, অথচ অধিক মুনাফাখোর বাবাটা যদি দাদার কথাটা মেনে নিত ভরসন্ধ্যায় দৌড়াতে হতো না। গল্পটা ছোটো কিন্তু যুদ্ধের সময়ের অনেকগুলো বিষয়ের মাঝে এমন এক বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে যে বিষয় কখনো পুরোনো হয়নি। নানান বিপদে পায়দা লুটা সেই মানুষগুলো এখনো আছে। তবুও কিশোরীর চোখে সে গল্প এক অন্যরূপে ধরা দিয়েছিলো।

'প্রত্যাবর্তনের খুঁটিনাটি' গল্পের নিখিল বাবা-মায়েদের যৌথ পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে মানা ক্যাম্পে। যুদ্ধটা শুরু হয়েই গেলো। তাই তো খানের ব্যাটা খান জব্বার খানের কাছে সব ভিটেমাটি বন্ধক রেখে এসেছে এ পাড়ে। ছোট্টো নিখিল ভাবে যুদ্ধ মানে কোনো দিন হুট করে ফের বাড়ির দিকে রওনা হওয়ার জন্যে ধাওয়া খেতে খেতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়া আর স্বাধীনতা মানে এই-গাভর্তি চুলকানি-পাঁচড়া, মাথাভর্তি খুশকি আর পেটভরা ক্ষুধা নিয়ে উদাম আকাশের নিচে নির্ঘুম রাত কাটাতে কাটাতে একদিন আবারও ফের বাড়ির দিকে রওনা হওয়া।

'হারিয়ে যাওার আগে' গল্পটা বেশ ভালো রকমের বড়ো। কারফিউ উঠে যাওয়া এক দুপুরে মফস্বল শহর ছেড়ে আসা এক কিশোর তার বাবা-মায়ের সাথে চাচা-চাচীদের কাছে গ্রামে সময় কাটানোর গল্প। যে গল্পে এক কিশোরের বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো যেমন আছে, আছে কিশোর মনের যুদ্ধের মানসিক প্রভাব, বড়োদের কান্ড দেখে নিজের মনোজগতের পরিবর্তনের গল্প।

'কড়িশিমের ঝুনঝুনি' নামে শেষ গল্পটাও এক গ্রাম্য কিশোরের, যে অবাক চোখে শহর ফেরত মানুষ দেখে। ষ্টেশনে ঠাঁই নেওয়া পাকবাহিনীদের নির্যাতনের গল্প শোনে বড়োদের কাছে আর ছুটে বেড়ায় বন্ধুদের সাথে মেতে উঠে দূরন্তপনায়। অবশ্য যুদ্ধ যেমন বড়োদেরও বদলে দেয়, বদলে দেয় ছোটোদেরও। এই গল্পের বর্ণনাটা আমার কাছে ঠিক আগের মতো মনে হয়নি। এক কিশোর যেন তার দেখা সময়গুলো ডায়রিতে বন্ধি করেছে।

বইটির এই আটটির প্রতিটি গল্পই ছোটগল্প হলেও এক একটা গল্পকে আমাকে উপন্যাসের স্বাদ দিয়েছে। তাছাড়া এই গল্পগুলোর আরো একটা বিশেষত্ব আছে, প্রতিটি গল্পই উঠে এসেছে কিশোর কিংবা কিশোরী বা শিশুদের বর্ণনায়। কিশোর মনে যুদ্ধের প্রভাবের গল্প এর আগে আমার পড়া হয়নি।

গল্পগুলো যুদ্ধের সময়ের হলেও আমার বেশ ভালো লেগেছে লেখক এখানে যুদ্ধকেই বর্ণনায় প্রাধান্য দেয়নি, বরং সেই সময়ের নানানশ্রেণির মানুষগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছে। সেখানে যেমন আছে শহুরে চাকরিজীবী, আছে বস্তিবাসী, গ্রাম্য খেটে খাওয়া মানুষের গল্প। আর প্রতিটি গল্প প্রথমপুরুষে কিশোর-কিশোরীদের চোখে দেখেছে। তাই বর্ণনায় সেই যুদ্ধে কিশোরদের সারল্য যেমন উঠে এসেছে, উঠে এসেছে শৈশবের দূরন্তপনা, কিশোরদের মনে যুদ্ধ নিয়ে নানান সব চিন্তা ভাবনা।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই আস্ত গল্পগ্রন্থটাকে আমি এই বছরের পড়া সবচেয়ে ভালো বইগুলোর কাতারে রাখবো। হাইলি রিকমেন্ড করি বইটা সবাইকে। আটটা গল্প পড়ে মনে হবে ছোটগল্প নয়, ৮টা উপন্যাস পড়া হলো। সেই উপন্যাসের কোনো কোনো গল্পের শেষটা বিমর্ষ করবে কোনটা শৈশবের স্মৃতিকে নাড়িয়ে দিবে আর কিশোর মনের যুদ্ধ নিয়ে নানান ভাবনা মুগ্ধ করবে। মনে হবে আসলেই তো, এভাবেই তো ভাবে তারা। আর শেষ করার পর মনে হবে বছরের সবচেয়ে ভালো বইটা পড়া হয়েছে যেখানে লেখক সময়ের গল্প বলেছেন যে গল্প পিছনে ফেলে আসলেও রয়ে গেছে আমাদের হৃদয়ে, দৈনন্দিন কাজে। যে গল্পকে নিয়েই আমাদের যেতে হবে বহুদূর।

বই: সোনালু সোনালু যত স্বপ্নদাহ
লেখক: ইমতিয়ার শামীম
প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর
প্রকাশক: কথাপ্রকাশ
মূল্য: ৩৫০৳
পৃষ্ঠা: ১৩৬৳
Profile Image for Anik Chowdhury.
190 reviews45 followers
August 9, 2024
'সোনালু সোনালু যত স্বপ্নদহ' গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো মূলত মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কিশোরদের চোখে দেখা যুদ্ধ এবং তৎকালীন সমাজকে ব্যাখ্যা করে। এই গল্পগ্রন্থের প্রতিটি গল্প নানান কিশোর-কিশোরীর চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে। তবে সেসব গল্পগুলো বলতে গিয়ে তারা আর কিশোর নেই, হয়ে উঠেছে বাগ্মী। সময় মানুষকে বদলে দেয় আরো বেশি বদলে দেয় শিশু কিশোরদের মনকে। কারণ তাদের নরম সেই মনের উপর নিড়ানি দেওয়া সহজ এবং সেই মনে নিড়ানির ফলে সৃষ্ট হওয়া প্রতিটি দাগ স্পষ্ট করে ভেসে থাকে। ���কজন কিশোরকে আমরা যতই অবুঝ ভাবিনা কেন, আদপে তার মনের ওপর আন্দোলিত হওয়া প্রতিটি কম্পনকে সে মনের গভীরে ভাঁজ করে রাখে সহজে। শিশু কিংবা কিশোরদের নিয়ে লেখা এবং যেখানে তাদের মনের গভীরতার ছাপ দেখা যায় সেইরকম দুইটি সৃষ্টি হলো মাহমুদুল হকের উপন্যাস 'কালো বরফ' এবং 'অনুর পাঠশালার'।
যুদ্ধের সময়ে এসব কিশোর-কিশোরীদের বয়স নয় বছর থেকে চৌদ্দ বছরের মধ্যে। তারা তাদের পরিবারের কথা বলে, একজন নারীর কথা বলে যিনি পুঁজি করেন নিজের দেহকে, পালানোর কথা বলে, ধর্মান্তরিত হওয়ার কথা বলে, সংখ্যালঘু হিসাবে বিতাড়িত হওয়ার কথা বলে। 'অগ্নিগিরির অশ্রুমতি' গল্পের কিছু লাইনের কথা না বললেই নয়,
"স্বাভাবিক হোক বা না হোক, স্বাভাবিকের মতো বানানো হতে লাগল। কিন্তু আমাদের হিন্দুদের স্বাভাবিকই কী আর অস্বাভাবিকই কী—প্রথম থেকেই একেবারে গনগনে আগুনের মধ্যে আছি আমরা।"
১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটে বলা হলেও যেকোনো চতুর মানুষ বুঝতে পারবেন এই ২০২৪ সালে এসেও এই লাইনগুলোর ভয়ানক বাস্তবতা। মনের মধ্যে সহজাত ভাবে প্রশ্ন তুলে দিয়ে যায়, পরিস্থিতি কী আদৌ পাল্টেছে?
স্বপ্নালু চোখে যাদের স্বপ্ন দেখার কথা ছিলো সেই কিশোররা তাদের স্বপ্নকে দাহ করে দিয়ে এক ভয়ংকর বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠতে থাকে। যুদ্ধ তো মানুষকে পাল্টে দেয় কিন্তু পাল্টে দেওয়া সেই ক্ষতের ঝড় এসে কিশোর মনকেও বিদ্ধ করতে থাকে নিরলস। সেই সাথে সহজে মেলাতে পারি সেইসব দিনগুলো নিয়ে শোনা এক ঠাকুমার মুখের গল্পগুলো, যেগুলো আর স্পষ্ট মনে নাই। তবে তার জবানবন্দিতে বলা যুদ্ধের সময়ের ব্যাখ্যা ছিলো খানিকটা এইরকম "আমরা বাড়িঘর ফেলে এক কাপড়ে বের হয়ে গিয়েছি। জমির আলপথ ধরে চলতাম। কেউ আসলে লুকিয়ে পরতাম ধানিজমির ভিতরে ধানের মধ্যে। দিনের বেলা ধানের ভিতরে লুকিয়ে থাকতাম আর রাতের বেলা পথ চলতাম। তোর বাবা ছিলো তোর ঠাকুমার কোলে। রঞ্জিত আর তোর বাবা ছয়মাসের বড় ছোট। তাদের সেইসময় বয়স তিন চার বছর… বাড়িঘর ফেলে ধানিজমি মাড়িয়ে আরো কষ্ট করে পৌঁছালাম ঐ পাড়ের শরনার্থীদের শিবিরে। কত বেলা জাউ ভাত খেয়ে কাটিয়েছি এবং আরো কতবেলা অনাহারে কাটিয়েছি হিসাব নাই… যুদ্ধ শেষে বাড়ি এসে দেখি পুকুরে মাছ নাই, গোয়ালে গরু নাই, ধান ভর্তি গোলা ছিলো এসে দেখি গোলায় ধান নাই, সব লুঠ হয়ে গিয়েছে। বাড়ির জিনিসপাতিও সব নিয়ে গিয়েছে। শুধু দাঁড়িয়ে আছে এমাথা থেকে ওমাথা লম্বা একান্নবর্তী পরিবারের লণ্ডভণ্ড বাড়িটা।" যুদ্ধ নিয়ে তার এই স্মৃতি ছোটবেলায় আমার মধ্যে গল্প বলার ছলে বপন করে দিয়েছিলেন সেই ঠাকুমা। যে গল্পগুলো শুনে ঘুমাতাম তার মধ্যে যুদ্ধের এই গল্পও ছিলো।

সচরাচর একটা গল্পগ্রন্থের সব গল্প ভালো হয় না। তবে এই গল্পগ্রন্থের সবগুলো গল্প ভালো লেগেছে। তবে প্রেক্ষাপট একটা হলেও ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে গল্পগুলোকে পরিবেশন করা হয়েছে। বিভিন্ন পরিবারের কিশোরের চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধ। তবে এই বই শুরু করার পর কেন যেন একটা অলিক ভাবনা ছিলো আমার। তা হলো হয়তো কোন রাজাকার পরিবারের ছেলের দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধটাকে দেখবো। কিন্তু এমন কোন গল্প নাই। তাই বলে হতাশ হইনি, কারণ রয়েসয়ে পড়লে গল্পগুলোর রূঢ় বাস্তবতা ধাক্কা মারে। তাই 'কড়িশিমের ঝুনঝুনি', 'নীলকণ্ঠী আকাশ', 'অগ্নিগিরির অশ্রুমতি', 'দুর্বোধ্য বুকের ঘ্রাণ' গল্পগুলো আমার বেশ ভালো লাগে।
Displaying 1 - 10 of 10 reviews