এই বাসাটা রিচি ঠিক যেভাবে ফেলে গিয়েছিল, সেভাবেই রেখে দিয়েছে ফরহাদ। একটি আসবাবও এই ক’বছরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরায়নি, প্রতিটি জিনিস রিচি যেখানে যেমন ছিল, সেখানেই আছে। চিরুনি ডেস্কের যে জায়গায় থাকত, সেখানেই রাখা হয় এখনো, রিচির শাড়িগুলো আলমারির যে তাকে থাকত সেখানেই আছে, সুদৃশ্য শোপিসগুলো যেখানে যেখানে সাজানোছিল, সেখান থেকেই নন্দন ছড়িয়ে যাচ্ছে এখনো। ফরহাদ কেবল গেরস্থালি সাফ-সুতরো করে রাখে, আর কোনো কিছুই সে এদিক-সেদিককরেনি। ব্যাপারটা এমন যে সবকিছু ঠিকঠাক সাক্ষ্য দিচ্ছে একটি পরিপাটি সংসারের ব্যাপারে, কেবল যে দুটো মানুষ সংসারটা করছিল, তাদের মধ্যে একজন নেই হয়ে গেছে! এই ঘরের প্রতিটি কোণায়রিচির সাথে তার সাংসারিক স্মৃতি, সেসব স্মৃতি রোমন্থন করে অনেকটা সময় কাটিয়ে দিতে পারে ফরহাদ,শুরুতে অবশ্য বড্ড পোড়াতো এসব, এখন কেমন রয়েসয়ে গেছে। যেন এইসব স্মৃতি নিয়ে একা বেঁচে থাকাটাই অতি স্বাভাবিক ব্যাপার, এমন একটা অনুভব নিয়ে ফরহাদের দিন কেটে যাচ্ছে। কিন্তু খেয়া! জীবনের এই হেমন্তকালে আসন্ন শীতের অপেক্ষায় যখন প্রহর গুনছেফরহাদ, তখন কোথা থেকে সাত নম্বর সংকেত পড়া ঝড়ের মতো এই মেয়েটা জীবনটা ওলট-পালট করতে চলে এসেছে! একে এভাবে আসতে দেওয়া কি ঠিক হবে?
একজন নারী আর একজন পুরুষের মধ্যকার যে ভালোবাসা, তা কি কেবলই এই ভালোবাসা নাকি অন্যকিছু? নাকি এটা কোনো এক আদিমতা! যাই বলি না কেনো সেই ভালোবাসা ছাড়া কি কোনো সম্পর্ক তৈরী হয় নাকি হওয়া সম্ভব?
ফরহাদ, যে কিনা রিচিকে এখনো ভালোবাসে। তার রেখে যাওয়া সংসারটি এখনো ঠিকই আগের মতই আছে। বলা ভালো ফরহাদ রেখে দিয়েছে সেই ভাবেই। তাদের শোবার ঘরের দেয়ালে রিচির লাগানো এখনো সেই পেইন্টিংটি শোভা পাচ্ছে যা কিনা দু'জন নর-নারীর আদিমতা প্রকাশ করে। রিচির এই আদিম রূপ ফরহাদের অজানা ছিলো বিয়ের আগে। তাদের প্রেমের বিয়ে ছিলো। তবুও যেনো বিয়ের পর রিচিকে ফরহাদ নতুন করে আবিষ্কার করে। পার্ফেক্ট জুটি ছিলো তারা। তারপরও ফরহাদ আজ একা। ফরহাদ যেনো হেরে যাওয়া কোনো মানুষ। কিন্তু কেনো সে হেরে গেলো সুন্দর এই জীবন যাত্রায়!
ফরহাদের এই নিঃসঙ্গ জীবনে ধুমকেতুর মতন দেখায় দিয়ে যায় খেয়া। যার কাছে পুরুষ মানুষ একজন নারী ভোগী ছাড়া কিছু না। সে মনে করে পুরুষ মানুষের কাছে নারীর শরীরটাই একমাত্র ভালোবাসার বস্তু। তারা সত্যিকার ভালোবাসা কি জানে না। এসব শুনে ফরহাদ হতবাক হয়ে মনেমনে হাসে। আর তাকে বলে, ‘খেয়া আপনি এখনো পরিণত হননি তাই জানেন না ভালোবাসা কাকে বলে।’।
ফরহাদের জীবনে অন্য এক মোড় এনে দেয় খেয়া। কিন্তু সেই একই সাথে কি খেয়ার জীবনে নতুন কোনো মোড় আসে না! হ্যা আসে, আসতে বাধ্য! *** ‘জান্নাতুন নুর দিশা’র এবারের বইমেলায় প্রকাশিত বই ‘পুরুষ সাবিত্রী’ পড়ে আমি অন্যরকম অনুভূতি পেয়েছি। অন্যরকম ঠিকনা, বলা ভালো ভিন্ন মাত্রার অনুভূতি।
দু'জন মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের ভিত সম্পর্কে লেখিকা সুন্দর ভাবে গল্পের ছলে বলে গেলেন। গল্পের বিষয়বস্তু সম্পর্কে মোটামুটি সব পাঠকের কম বেশি জানা থাকলেও, সেই সব জানারও থাকে সীমাবদ্ধতা। প্রতিটা মানুষের থাকে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি, দৃষ্টিকোণ। তাই কারো কাছে সেই সব সম্পর্ক হয় অসম্ভব সুন্দর অথবা অসম্ভব কদর্য। আমার কাছে কেমন লেগেছে সেটা বিষয় না, কারণ আমি যে দৃষ্টিকোণ থেকে বইটি পড়েছি আপনি হয়তো তার একদম উল্টো দিক থেকে দেখবেন। শুধু এতটুকু বলতে পারি, ‘পুরুষ সাবিত্রী’ নামকরণটি যথাযথ হয়েছে। লেখিকা ফরহাদ, রিচি, খেয়া ছাড়াও আরো কিছু সম্পর্কের গল্প বলেছেন এই বইতে। তাদের গল্প গুলোও আপনাকে একটি সংসারের অন্য দিক সম্পর্কে জানাবে। সেই সাথে চট্টগ্রাম অঞ্চলের নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনাও উপভোগ্য ছিলো।