একজন প্রফেসর তার পেশাগত জীবন শেষ করে নিভৃত গ্রামে যাপন করছেন নিরবিচ্ছিন্ন জীবন। একদিন শীতের সকালে হঠাৎ দেশের প্রভাবশালী এক জাতীয় দৈনিক পত্রিকা মারফর জানতে পারলেন, তার বাবা ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি। শুধু কী তাই? তিনি ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান রাজনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক। তার এক ইশারায় পালটে যেত গদিতে বসা সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিটিও। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ক্ষমতায় নিয়ে আসতে তার ছিল যথেষ্ট ভূমিকা। এছাড়াও ইন্দিরা গান্ধীকে বিভিন্ন সময় তিনি আততায়ীর হাত থেকে রক্ষা করে হয়েছিলেন ইন্দিরার চরম আস্থাভাজন ব্যক্তি। ফলে ভারতের বড় বড় ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে। এর থেকে বাদ পড়েনি টাটা, বিড়লা, আম্বানির মতো ব্যবসায়ীরাও। আবার এই লোকই শুধুমাত্র একটা মেয়েকে নিজের করে পেতে বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ। ভূ-স্বর্গ কাশ্মীর ভারতের অধীনে চলে যাওয়াতেও মূল অনুঘটক হিসেবে ছিলেন রহস্যময় লোকটি। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রবল ক্ষমতাধর ব্যক্তিটি একদিন হঠাৎ চলে যান লোকচক্ষুর আড়ালে। কেউ খুঁজে পায় না তাকে। কোথায় যান তিনি? কেনই বা যান? আসলেই কি তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিলেন?
খুব একটা টানলো না। আলী মুত্তাকিনকে যতোটা ক্ষমতাশালী ও দেশপ্রেমী হিসেবে দেখানো হয়েছে তার সাথে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার অসহায়ত্ব ও ভূমিকা মেলে না। বর্তমান ঘটনাপ্রবাহের শুরুটা জমজমাট হলেও লেখক কাহিনির পরবর্তী অংশ খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করেছেন। ইন্দিরা গান্ধীর সাথে মুত্তাকিনের সম্পর্কের ভিত্তিও স্পষ্ট নয়। পুরো গল্পেই অনেক "যদি" ও "কিন্তু" আছে।এসব "যদি" বা "কিন্তু" অগ্রাহ্য করলে বইটা অনেকের কাছেই বেশ ভালো লাগবে। লেখকের গদ্যশৈলী আকর্ষণীয়। তার লেখা "আফ্রিকার খঞ্জর" পড়ার ইচ্ছা রইলো।
ক্ষমতা! এই একটা শব্দ সর্বস্তরের মানুষের কাছে পরিচিত। কেউ ক্ষেতের ধান কাটার মানুষের উপর ক্ষমতার লাঙল চালাতে চায়, কেউ স্কুলে তার ক্ষমতার দাপট দেখাতে চায়, কেউ আবার খেলার মাঠে শুধু নিজের ব্যাট আছে বলে প্রথমে ব্যাটিং করার ক্ষমতা দেখায়। আর রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার জন্যই দেশ নিয়ন্ত্রণ করে বিজয়ী দল। এক কথায় যার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি সেই আসল রাজা। অন্যরা সব প্রজার মতো মাথা নুইয়ে থাকবে। নিজের অধিকার আদায় করতে গেলেই তাকে ক্ষমতার কালো থাবা খুবলে নিবে।
'ইন্ধিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল' বইটাও তেমনি এক ক্ষমতার লড়াই। নিজেকে শীর্ষে নেওয়ার জন্য কত নিচু হয় একটা মানুষ তারই আখ্যান গাওয়া হয়েছে এই বইয়ে। আলী মুত্তাকিন, একজন সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে কিভাবে নিজের ক্ষুরধার বুদ্ধির চালে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশেরই প্রচন্ড ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হয় তা এই বই জুড়ে আছে। যাকে ইন্ধিরা গান্ধী ভাই মানে, অন্যদিকে ইস্কান্দার মির্জা, ইয়াহিয়া খান আইয়ুব খান সহ সবাই সমীহ করে চলে।
গল্পটা প্রথমেই একটা চমক দিয়ে হুকড করে ফেলে। মাহবুব সালেহীন একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক যাকে রাজাকার বলে একটা খবর বের হয় পত্রিকায়। সেখান থেকে শুরু করে আস্তে আস্তে গল্পের গতি বাড়ে।
৪৭ এর ভাগ, কাশ্মীর দখল করার জন্য ইন্ডিয়া পাকিস্তানের যু*দ্ধ, ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ২৫শে মার্চের গণহ*ত্যা সহ অনেক কিছু উঠে এসেছে বইটায়।
বইটা দুইটা টাইমলাইনে এগিয়েছে। প্রথমটা কাশ্মীরের রাজা হরি সিং এর সময়ের অন্যটা বর্তমান সময়। আলী মুত্তাকিন যখন ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে যাচ্ছেন অতীতে তেমনি সমান তালে উনার নাতী মুশফিক সালেহীনও তার ক্ষমতা ব্যবহার করে বর্তমানে একেকজনের কাছ থেকে তার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাসিল করছে।
বইয়ে দারুণ ভাবে রাজনীতির মারপ্যাচ, ক্রো*ধ, জেদ, ভালোবাসা, মিথ্যাচার ফুটে উঠেছে। তাছাড়া মুজাফফত পীরীর মায়ের দেশের প্রতি এক অদ্ভুত মায়া, ক্ষমতাধর স্বামী বা তীব্র ঘৃণিত মানুষকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া মেহের এর ভালোবাসা আপনাকে পুলকিত হবেন।
আমাদের চেনাজানা থ্রিলারের বাইরে পলিটিকাল থ্রিলার খুব কম লেখা হয়। এতে নেই একটু পর পর সিরিয়াল কিলারের খু*নখারাবি, নেই গায়েব হওয়া ব্যক্তি। এখানে আছে গল্পের ভিতর ঢুকে প্রতিটা চরিত্রের স্বার্থ দেখার বিষয়, আছে চিন্তা ধরিয়ে দেওয়ার অনেক জায়গা। বিগ্রেডিয়ার খসরুর মতো উন্মাদ লোক যে ক্ষমতার জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত।
সবমিলিয়ে 'ইন্ধিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল ' পলিটিকাল থ্রিলার হিসেবে উপভোগ্য বই। একটা ব্যাপার আমাকে একটু পীড়া দিয়েছে। গল্পের টাইমলাইন জাম্পটা যদি উল্লেখ করা থাকতো তাহলে আরো ভালো হতো। অন্যদের এটা কোনো সমস্যা নাও লাগতে পারে।
আল আমিন সরলের বই এই প্রথম পড়া হয়েছে। সুন্দর লেখনশৈলীতে ফুটে উঠেছে প্রতিটা সিকোয়েন্স। সাথে কিছু রূপক লেখাও দারুণ লেগেছে। কিছু কিছু শ্রুতিকটু শব্দকেও সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন উনি। সামনে আরো দারুণ সব বই আসবে আশা করি উনার হাত ধরে।
প্রডাকশন ও সম্পাদনা : গুটি এম্বোজড ডাস্ট জ্যাকেট, ক্রিম কালারের পেজ সাথে পেজ সেটাপ বইটাকে দারুণ করে তুলেছে। অনেক বইয়ে গল্পের অধ্যায় দুই তিন লাইন দিয়ে শেষ করে পুরো পাতা খালি রাখা হয় কিন্তু এদিক দিয়ে একেবারে ভিন্ন ছিলো এই বইটা। কোনোধরণের খালি পাতা না রেখে এক অধ্যায় থেকে অন্য অধ্যায় একই পেজে শুরু করা হয়েছে। এতে যেমন বইটার পাতা কমে এসছে সাথে দামটাও আয়ত্তে এসেছে।
বইয়ে কিছু বানান ভুল ও টাইপিং মিস্টেক আছে যেগুলো আশা করি পরে ঠিক করা হবে।
সর্বশেষে বলব ক্ষমতার জন্য মানুষ কতদূর যেতে পারে তা অবলোকন করতে চাইলে হাতে তুলে নিতে পারেন বইটি।
বই :- ইন্ধিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল লেখক:- আল আমিন সরল জনরা :- পলিটিকাল থ্রিলার প্রকাশনী :- নয়া উদ্যোগ পৃষ্টা সংখ্য :- ১৮৪
বইটা পড়া শুরু করবার পর থেকে যত সামনে এগিয়েছি ততই বারবার নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম আমি আসলেই আফ্রিকার খঞ্জরের লেখকের বই পড়ছি তো! না মানে একই লেখক কিভাবে এমন আকাশ পাতাল ব্যবধানে লিখতে পারেন? গল্প এলোমেলো হতে পারে কিন্তু অন্তত লিখনশৈলী তো ঠিক থাকবে। দুঃখের বিষয় যে এটাই যে এই পুরো বইতে খুব অল্প কিছু জায়গায় আমি আফ্রিকার খঞ্জরের আল আমিন সরল কে খুঁজে পেয়েছি। বাকী বইটা মনে হচ্ছে টিএনএজ কেউ লেখক হবার শখে লিখে যাচ্ছে। গল্পের প্লট হতে শুরু করে, কাহিনী বিন্যাস, সংলাপ সবকিছুতেই ইম্যাচিউরিটি লক্ষ্যনীয় পর্যায়ে। সবচেয়ে বড় কথা পুরো গল্পটার কোন আগামাথাই নেই বলা যায়।
যা চাই তাই করতে পারি টাইপ একটা কারেক্টার আছে গল্পে। যে বাংলাদেশের এক গ্রাম থেকে ভাগ্যান্বেষনে বের হয়ে বিরাট ব্যবসায়ী হয়ে গিয়েছে। হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে সে এতোটাই ক্ষমতাশালী যে আম্বানি, টাটা, বিরলা সবাই তার পকেটে থাকবে!? সে এক মেয়েকে ভালোবাসে আর তাকে পাওয়ার জন্যই কাশ্মিরে প্রথম ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ সংগঠিত হয়! উপমহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সব চরিত্ররা সবাই মূলত তার হাতের পুতুল!! পাকিস্তানের আর্মিতে রদবদল হয় তার ইশারায়। যে লোক ইচ্ছা হলেই দুটো প্রবল পরাক্রমশালী দেশের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে পারে আবার পারে নিজের ইচ্ছেমতো তা থামাতেও, সেই লোক কিন্তু একাত্তরের যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকাতে পারে নাই। এমনকি ২৫শে মার্চের হামলা নিয়ে তার ভিতরে বেশ নির্লিপ্ততাও দেখা যায়। তবে দুই যুগের বেশী সময় ধরে স্ত্রী সন্তান নিয়ে লাহোরে থিতু হবার পরেও, যুদ্ধ শুরু হলে সে মাতৃভূমির টানে যুদ্ধের মাঝেই নিজ দেশে ফিরে আসতে চায়!! কি অদ্ভুত স্বদেশপ্রেম! বেশ কয়েকবার ইন্দিরা গান্ধীর জীবন বাঁচানোর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ, ইন্দিরা গান্ধী এই লোকের অনুরোধেই মুক্তিযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে দেশকে স্বাধীন হতে সহায়তা করে। তা না হলে কিন্তু ভারত কখনোই দুই পাকিস্তানের মাঝে আসতো না!!
ও আচ্ছা যে লোকের এত ক্ষমতা তার নাম তো বলা হলো না, আলী মুত্তাকীন। নাম তো সুনা হোগা! কি শুনেন নাই?? আপনাদের ব্যর্থতা এটা! কাশ্মির, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের রূপরেখা বদলে দিয়েছে আড়ালে থাকা এই মহাপুরুষ (!)।
লেখক অনেক কিছুই তুলে আনতে চেয়েছেন গল্পে। কিন্তু সবই এসেছে খাপছাড়া ভাবে। চরিত্রদের চিন্তাভাবনা এবং তাদের কাজকর্মের মাঝে কোন মিল নেই। সবচেয়ে বিরক্ত লেগেছে প্রতিটা নারী চরিত্রকে নগ্নভাবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টাটা। একমাত্র মেহের চরিত্রটাই কিছুটা মনে দাগ কাটবার মতো। এ ধরণের পলিটিক্যাল কন্সপিরেসি থ্রিলারের ক্ষেত্রে প্রপার প্ল্যানিং, এরপর এক্সিকিউশান দেখানো জরুরী। অথচ এই বইটায় যে যখন যেভাবে যা চাচ্ছে তাইই করতে পারছে!! যদি, কিন্তুর অভাব নাই গোটা বই জুড়ে। সেগুলা নিয়ে লিখতে গেলে এই রিভিউর সাইজ গিয়ে দাঁড়াবে একটা বইয়ের সমান!
ফিকশনে যেকোনো কিছুই হতে পারে। সকল বইতে আমি যুক্তি খুঁজতে যাই না। কিন্তু তাই বলে গাঁজাখুরি ব্যাপার স্যাপার মানতেও আমার ঢের আপত্তি আছে। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সব চরিত্রদেরকে টেনে এনে সবাইকে একজনের হাতের পুতুল বানাই দিবেন, তাও আবার তার এই অসীম ক্ষমতার সঠিক কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই; একজন পাঠক হিসেবে এটা মেনে নেয়া বেশ কষ্টকর। এই রকম একটা বই এর আগে পড়ছিলাম আমিনুল ইসলামের গডফাদার নামে। আমার পড়া সবচেয়ে বাজে বইগুলোর মাঝে এই দুইটা অন্যতম। কোনটা বেশী খারাপ সে ব্যাপারে একটা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়ে যেতে পারে।
লেখক এর আগেও ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে লিখেছেন। তারিক বিন জিয়াদকে যেভাবে উনি কাগজের পাতায় তুলে এনেছিলেন সেটার কোন তুলনা হয় না। শক্তিশালী সেই লিখনশৈলী কোথায় হারালো সেটা নিয়ে বরং একটা তদন্ত করা যেতে পারে! লেখকের প্রথম বই পড়ে যে মুগ্ধতা জন্মেছিল, তা পুরোপুরি উপ্রে ফেলেছে এই বইটা। একই লেখকের দুই বইয়ের গদ্যশৈলীর মাঝে এমন আকাশ পাতাল তফাৎ হবার একটাই মানে হতে পারে আর তা হলো, আফ্রিকার খঞ্জর তিনি লিখেছিলেন প্যাশন থেকে। আর এটা লিখেছেন লেখক হবার তাগিদ থেকে।
প্রথম বইটার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলাম। সেটার ফল হিসেবে যদি এমন বই বের হয়। তাহলে আশা করি এই সমালোচনার ফল হিসেবে ভালো কিছুই আসবে। সত্যি বলতে এই বইটা অর্ধেক পড়ার পর আর পড়ার ইচ্ছে হচ্ছিল না। শুধুমাত্র লেখক যে তার নিজের পথ থেকে অনেক অনেক দূরে সড়ে গিয়েছেন তা বুঝাবার জন্য সময় নষ্ট করে পুরো বইটা পড়া।
লেখকের জন্য শুভকামনা।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০২/১০ ( এরচেয়ে বেশী দিতে পারলাম না )
‘পূর্ব পাকিস্তান নয় রে শু*য়ো*রের বাচ্চা, বাংলাদেশ।’
প্রথমেই বলে নেই, বইয়ের রিভিউ লেখতে আমি পারিনা। কতজন কত সুন্দর করে যে রিভিউ করে, পড়তে গিয়ে মনে হয়, রিভিউটাই আলাদা একটা গল্প। এই যেমন সেদিন ‘জলমিছরি’ উপন্যাস নিয়ে ফারজানা রহমান নামের এক আপু, এতো দারুণ এক রিভিউ লিখলেন, পড়ে তব্দা খেয়ে গেছি। এতো সুন্দর করেও রিভিউ লেখা যায়! আমি মূলত কোন বই পড়ার পড় বইয়ের ভাল লাগা মন্দ লাগা লেখতে পারি। তবে তাও খুব একটা গোছানো হয়না। গুছিয়ে লেখার গুণ আমার নেই। ইন্দিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল নিয়ে আমার জার্নির গল্পটাও এভাবেই লেখবো। একটু অগোছালো, একটু সাধারণ রিভিউ লেখার নিয়মের বাইরে গিয়ে।
কমলা রঙের আপেল আমি দেখিনি। তবে কাশ্মীর দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমি যখন প্রথমবার কাশ্মীরের বুকে পা রাখি, দুচোখ মেলে তাকাই কাশ্মীরের দিকে তখন কাশ্মীরকে আমার পছন্দের ফল কমলার মতোই মনে হয়েছিলো। কেন মনে হয়েছিলো জানিনা। তবে মনে হয়েছিলো। কমলার কোয়ার মতো সুশৃঙ্খল আর সৌন্দর্যে কমলা রঙের মতোই মনোহর।
পৃথিবীর সমস্ত বড় বড় সমস্যার সাথে কোন না কোন ভাবে আপেল ব্যাপারটা জড়িত। সিনেমাতেও তাই দেখেছি। ভয়ানক কোন সময় দেখাতে, টাইম ট্রাভেল দেখাতে কিংবা সংঘাতের ব্যাপার দেখাতেও সিম্বল হিসেবে আপেল দেখানো হয়৷ কখনো লালচে আপেল, কখনো সবুজ আপেল। ইন্দিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেলে, লেখক কাশ্মীরকে দেখিয়েছেন কমলা রঙের আপেল হিসেবে। বিবাদের বিষয়, তাও আবার রূপ রঙ সহকারে!
কাশ্মীর নিয়ে কে না জানে? কিন্তু কাশ্মীর ভাগের ইতিহাস কি জানে? জানে কী এর পেছনের রাজনীতি। জানে অনেকেই। আমিও জানি। কিন্তু লেখক এখানে সেই গল্প বলতে গিয়েই বেশ রূপকতার আশ্রয় নিয়েছেন। সোজা চিন্তায় ধরা মুশকিল। কিন্তু চিন্তা ভাবনাকে একটু এলোমেলো করে দিলেই, সহজ হয়ে যায়। আমার ক্ষেত্রে হয়েছে।
প্রেম আমার কাছে কী? জোছনা রাতে পুকুরের জলে চাঁদের রোশনাই। প্রেমে বিজয়ী হওয়ার মতো সুখকর কাজ আর নেই। হোক সে নর-নারীর নারীর প্রেম, প্রকৃতি প্রেম কিংবা দেশপ্রেম। আচ্ছা, শুধুমাত্র ভালোবাসার মানুষকে পাওয়ার জন্য কতটুকু যাওয়া যায়? বাঁধিয়ে দেওয়া যায় দু'টি দেশের যুদ্ধ, স্নান করে উঠা যায় রক্ত গঙ্গায়? কিংবা ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের ভালোবাসা কেমন থাকে? মৃত্যুমুখে পতিত বাবার শেষ কথাগুলো কী এতোই গুরুত্বপূর্ণ, যে যার জন্য তছনছ করে দেওয়া যায় দুনিয়া? চরম নির্মমতায় চেপে বসা যায় পৃথিবীর পবিত্র বুকে? যায় বোধ হয়!
থ্রিলার উপন্যাস আমি অনেক পড়েছি। ঐ একই খুন খারাবি, রক্তারক্তি। শহরে একের পর এক খুন হচ্ছে কেউ, কারণ কেউ জানেনা। অজানা কারণ উদ্ধারে নেমে পড়ে একজন। সমস্ত ভয় ভীতি, বাঁধা উপেক্ষা করে উদ্ধার করে খুনের রহস্য। কখনো খুনি ধরা পড়ে, কখনো থেকে যায় অধরাই। চেনা ফরম্যাট। এর বাইরে যায় না, আমাদের বেশীর ভাগ থ্রিলার লেখা এমন। এখানে খুন, রহস্য, রক্তা রক্তি এতো প্রাধন্য পায়, যে এতে গল্প থাকেনা, থাকলেও গল্পের ভেতরে ঢোকার আগেই আবার সামনে চলে আসে রক্ত৷ গা গুলিয়ে উঠে। ইন্দিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল পুরোপুরি একটা গল্প। চিন্তায় আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো গল্প।
ইন্দিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল কি শুধুই থ্রিলার? না। একে পুরোপুরি রোমান্টিক গল্প বললেও ভুল হয় না। এই রোমান্টিক গল্পের দুর্বলতা একটাই, এখানে লুতুপুতু ডায়লগ নেই, নেই পুতুপুতু প্রেম।
পলিটিক্যাল ন্যারেটিভ? আমি পলিটিক্স ভাল বুঝিনা৷ জীবন চলার জন্য যতটুকু পলিটিক্যাল হওয়া দরকার, আমি ততটুকুই। তাই ইন্দিরা গান্ধীর পলিটিক্স আমার জীবনের সাথে মিলিয়ে নিতে কষ্ট হয়নি। কষ্ট হয়নি ভারত পাকিস্তানের দ্বৈরথ নিয়ে পলিটিক্স বুঝতেও। তাই তো আমিই যে আলী মুত্তাকিন, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না৷ অসুবিধা হয়না, আলী মুত্তাকিনকে পাশে বাড়ির শান্ত স্নিগ্ধ বুদ্ধিমান ছেলেটি ভাবতেও।
অনেক হাবিজাবি লিখলাম। কী লিখলাম জানিনা। আগেই বলেছি, লিখতেই গেলেই আমি এলোমেলো হয়ে যাই। গুছিয়ে লিখতে পারিনা কিছুই। যা ভেবে লেখা শুরু করেছিলাম, তার কিছুই লিখতে পারিনি।
ইন্দিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেলের সাথে দুর্দান্ত এক জার্নি শেষ হলো। জার্নির ক্লান্তি ভর করেছে মন মগজে৷ আপাতত বেশ কয়েকদিন আর কিছু মাথায় ঢুকবে না বলেই মনে হচ্ছে। আলী মুত্তাকিন এসে ভীড় জমাবে মস্তিষ্কের নিউরনের প্রতিটি সেলে। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাবো মুজাফফর পীরীর আদ্র চোখ, মৌলভী আব্দুল ওহাবের মৃতপ্রায় শ্বেত শুভ্র মুখমণ্ডল। শুনতে পাবো, পুরো উপন্যাসের ভিত্তি সেই হৃদয় ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা কথা। দেখতে পাবো ক্ষমতার লোভে উন্মাদ শুকুরের মতো ঘোঁতঘোঁত করতে থাকা বিগ্রেডিয়ার শেহজাদ খশরু। কাশ্মীর রাজা হরি সিংয়ের অসহায়ত্বও দেখতে পাব কি?
সব মিলিয়ে ইন্দিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল একটি টোটাল প্যাকেজ। আপনি হাসবেন, আপনি কাঁদবেন, আপনি মাড়িয়ে যাবেন পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য প্রচন্ড এক জিঘাংসায়।
গুছিয়ে রিভিউ লেখার ইচ্ছা আছে। এটা শুধুই পাঠ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া।
বই: ইন্দির�� গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল ঔপন্যাসিক: আল আমিন সরল প্রকাশনী: নয়া উদ্যোগ
বই: ইন্দিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল লেখা: আল আমিন সরল প্রকাশনী: নয়া উদ্যোগ মুদ্রিত মুল্য: ৪০০ টাকা
[** স্পয়লার অ্যালার্ট **]
বিষয়টা হলো কী পলিটিক্যাল থ্রিলার আমার তেমন পড়া হয় নাই। কারন আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ। জটিল বিষয় মাথায় ঢুকবে না বলেই বিশ্বাস। কিন্তু এই পলিটিকাল থ্রিলার পড়ে আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হলো যে আমি আসলে মুখ্যু। নাহলে রিভিউ না দেখে এই বই কেউ টাকা দিয়ে কিনবে না। তারচেয়ে বড় কথা সময় নষ্ট করে পড়বে না
গল্পের শুরু মাহবুব সালেহীন নামের এক ভদ্রলোককে দিয়ে। ভদ্রলোকের অভ্যাস মারহাবা। সকালে ধোঁয়া ওঠা চায়ের সাথে পত্রিকা পড়া। আহা! কিন্তু একদিন এই পত্রিকার হেডলাইন তার নিস্তরঙ্গ জীবন নাড়িয়ে দিলো। এরপর আসলো কাশ্মীরের রাজা হরি সিংয়ের দরবারের জৌলুস এবং নতর্কীদের রূপের বিবরণ। পুরো বইয়ের মধ্যে এই একটা অংশই সবচেয়ে উপভোগ্য লেগেছে আমার। এরপর থেকে একেবারেই খাপছাড়া এবং চাইল্ডিশ বাক্যের ছড়াছড়ি। উদাহরণ - " 'হুম, আজ তোকে মেরেই ফেলবো।' বলে লাফিয়ে পেছনে গিয়ে তৌহিদের হাত মুচড়ে ধরলো একই বিভাগের একই বর্ষের ছাত্র জাকির। -দোস্ত ছাড় ছাড় খুব ব্যাথা পাচ্ছি৷ মাইরি বলছি আর বলবো না। -হারামজা*দা, এখন সব ফুস? আজকে তোর হাত ভেঙেই ফেলবো। -দোস্ত এবারের মতো ছাড়। বিপ্লব আমার চুলো যাক। খুব লাগছে রে। "
এই সংলাপগুলো এক পলিটিক্যাল থ্রিলারের! এরপর আসে আলী মুত্তাকীন। তিনি হলেন প্রথমেই উল্লেখিত মাহবুব সালেহীনের বাবা। তার অনেক ক্ষমতা। তার জন্যই কাশ্মীর নিয়ে প্রথম ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ হয়। তার অনুরোধেই ইন্দিরা গান্ধী মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সহায়তা করে কারন সে কয়েকবার ইন্দিরা গান্ধীর জীবন বাঁচিয়েছে! এই ভদ্রলোক আবার সস্ত্রীক লাহোরে থাকেন। কিন্তু ৭১ এ যুদ্ধ শুরু হলে মাতৃভূমির টানে দেশে ফিরতে চান! প্রেমিকার জন্য দু দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়া শুনতে খুব রোমান্টিক লাগলেও বাস্তবিক দৃষ্টিতে খুব একটা সুবিধার নয়। পলিটিক্যাল থ্রিলারের জন্য তো না-ই। তারপর ইন্দিরা গান্ধী একজনের অনুরোধে যুদ্ধের মতো আন্তর্জাতিক এবং স্পর্শকাতর ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করলেন। মানে একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এমন সিদ্ধান্ত হঠকারিতার পরিচায়ক নয় কী? একজন প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় ব্যক্তিগত কারনে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না? মানে গল্পের গরু গাছে ওঠে বলেই তাকে গাছে ওঠাতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই? তবে ভালো দিক কী একেবারেই নেই? আছে। যে শিশুসুলভ বর্ণনাশৈলীর কথা বললাম শেষ দিকে লেখক অনেকটাই গুছিয়ে এনেছেন৷ এন্ডিং ও মন্দ নয়। ভালোই লেগেছে৷ তবে সবমিলিয়ে আমি হতাশ!
গল্পের পেছনে যেমন গল্প থাকে। তেমনি থাকে ক্ষমতার পেছনে ক্ষমতা। জীবনকে যদি কন্সপাইরেসি থিউরির মধ্যে ফেলে দেই, তাহলে দেখবো প্রত্যেক ঘটনার পেছনেই আছে অন্যকোন ঘটনা। প্রত্যেক ভয়াবহ ঘটনার পেছনে আছে আরও ভয়াবহ ঘটনা। এইসব ঘটনা মুখে নেওয়া যায় না, কারও সাথে শেয়ার করা যায় না, দেখেও থাকতে হয় চোখ বন্ধ করে। শুধু অনুভব করা যায়। অনুভব করতে গিয়ে বেড়ে যায় হৃদপিণ্ডের গতি। রক্ত চলাচল করতে থাকে ঝড়ের গতিতে। শ্বাস প্রশ্বাস কখনো ভারী হয়ে আসে, আবার কখনও বা মনে হয়, থাক আর দরকার নেই। অনেক হয়েছে। অনেক বেঁচেছি।
বহুদিন পর থ্রিলার উপন্যাস পড়তে গিয়ে সত্যিকারের থ্রিলড হয়েছি। দারুণ এক উত্তেজনাকর মুহুর্ত নিয়ে শেষ করেছি ইন্দিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল।
এক কথায় অসাধারণ, অনন্য। আমি অভিভূত। বাজারে চলতি রক্তারক্তি আর খুনের থ্রিলার পড়তে পড়তে যখন ক্লান্ত তখন গল্প নির্ভর ইন্দিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল আমাকে দিয়েছে বৈকালিক মৃদুমন্দ শীতল বাতাসের পরশ।
এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হচ্ছে, এর গল্প। মেদহীন গল্প। অযাচিত চরিত্রহীন গল্প। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটা চরিত্রও নেই। বরং চরিত্র হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী, রাজা হরি সিং, মোজাফফর পীরী, শেহনাজ মেহের ও আলী মুত্তাকিন এমন এমন পরিস্থিতিতে উপন্যাসের পাতায় পাতায় দাপিয়ে বেড়িয়ে, যে মনে হয়েছে কোন একটা চরিত্র বাদ দিলে গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যেত। তবে উপন্যাসে মাহবুব সালেহীন নামের চরিত্র গল্পের মোড় ঘোরাতে যে পরিমাণ ভূমিকা রেখেছে, তাতে তাকেই আমার উপন্যাসের নায়ক মনে হয়। মনে হয়, সে না থাকলে উপন্যাস উপন্যাসই হয়ে উঠতো না। ইন্দিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেলের গল্পটা এমন, যে এটাকে থ্রিলার বানাতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় খুনের দরকার হয়নি। শহরে একটার পর একটা খুন হতে হয়নি। গল্পের প্রয়োজনেই গল্প থ্রিলার হয়ে উঠেছে। সাথে যোগ হয়েছে নগ্ন নোংরা কায়াহীন পলিটিক্স। পলিটিক্যাল ঘেরাটোপে বন্দী গল্প নিয়েই রচিত হয়েছে ইন্দিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল।
আমি প্রতিটা বই পড়ি, নতুন কিছু জানতে, এই যেমন, এই বই থেকেই জানলাম, পৃথিবীর প্রাচীণতম নেশা হলো কাঁচা সুপারির থকথকে অংশ।
ইন্দিরা ও কমলা রঙের আপেল যেখানে শেষ হয়েছে, তাতে অনায়াসেই দ্বিতীয় পার্ট লেখা সম্ভব। জানিনা, লেখক কী করবেন। তবে আমি পাঠক হিসেবে অবশ্যই সেকেন্ড পার্টের দাবি করবো।
বাংলাদেশে অজনপ্রিয় হলেও পলিটিক্যাল ক্রাইম থ্রিলার আমার ভীষণ পছন্দ। তাই যখনই বইটা সম্পর্কে জানলাম, পড়ে ফেললাম। একদম পয়সা উসুল উপন্যাস। পড়া শেষ করার পড়েও বহুক্ষণ মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে এর চরিত্রগুলো। বিশেষ করে, আলী মুত্তাকিন! ❤️ এই উপন্যাস নিয়ে সিনেমা কিংবা সিরিজ বানালে আলী মুত্তাকিন চরিত্রে অভিনয় করবে কে, ভাবতে গিয়ে দেখি, এমন চরিত্র পোট্রের্ট করা অভিনেতার বড্ড অভাব আমাদের দেশে