বিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলামের অসামান্য এক সৃষ্টি। কেউ যদি এই কবিতায় উল্লিখিত মিথিক্যাল চরিত্রগুলোকে জুড়ে জুড়ে পড়তে থাকেন, তাহলে দেখতে পাবেন এই মিথিক্যাল চরিত্রগুলোও আবার নিজেদের সাথে একটা স্তরে যুক্ত। সেই কানেকশনগুলোকে এক জায়গায় টানলে একটা আলাদা নতুন অর্থের জন্ম হয়, মনে হয় যেন কবিতার আড়ালে নজরুল বুঝি কিছু একটা বলতে চাইছেন!
আমার রূপকল্প হচ্ছে নজরুল বিদ্রোহীতে একটা মিথের নকশী কাঁথা তৈরি করেছেন। দূর থেকে সেই কাঁথার দিকে তাকালে নানারকম কালারফুল ক্যারেক্টার দেখতে পাওয়া যায়।
কিন্তু এই বইতে আমি কাঁথাটা সামনে থেকে না দেখে পেছন থেকে দেখার চেষ্টা করেছি।
আমি বলতে চেয়েছি ভৃগু, পরশুরাম, বিশ্বামিত্র, দুর্বাসা কিংবা পৃথ্বীরাজের বীরত্বের গল্পের ভেতরেই বিদ্রোহীর আবেদন শেষ হয়ে যায় না, বরং বিদ্রোহীতে নজরুল যেই স্টোরিগুলোকে নির্বাচন করেছে তারা অত্যন্ত সচেতনভাবে নির্বাচিত এবং এই সবগুলো গল্প মিলিয়ে একটা অবিচ্ছিন্ন থিসিস হাজির করেছেন নজরুল।
এবারে আমার দাবি কতটা ঠিক আর কতটা ভুল সেটার বিচার আপনারা করবেন।
কিন্তু দুর্দান্ত চিন্তা-বীজ ধারণ করা বই'ও কেমন হতাশ করতে পারে স্রেফ সু-সম্পাদনার অভাবে, এই বইটা সেই বিচারে একটা মানদণ্ড হয়ে থাকলো।
আরিফ রহমান অনলাইনে দারুণ সক্রিয়। সেখানে অবিরাম বিতর্ক করেন তিনি, বিতর্ক উস্কেও দেন। অনলাইন মাধ্যমের সাথে সাহিত্যের একটা পার্থক্য থাকে সম্ভবত তাৎক্ষণিকতায়। অর্থাৎ অনলাইনে কিছু পড়লে (আর দ্বিমত বা যোগ করার কিছু থাকলে) মানুষের মাঝে জবাব দেওয়ার একটা প্রবৃত্তি কাজ করে। সাহিত্য-- এমনকি প্রবন্ধ সাহিত্যও-- সেদিক দিয়ে শান্ত, স্থির ভাবে সে পাঠকের কাছে চিঠি লেখে। দ্বিমত যা থাকে, পাঠক নিজের মনে সেটার সাথে একটা বোঝাপড়ায় আসে। অনলাইনের তুখোড় লেখক আরিফ-- মনে হলো না-- কাগুজে বইয়ের পাঠকের মনে সেই স্থৈর্য সঞ্চার করতে পেরেছেন।
নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতা প্রসঙ্গে দারুণ কিছু প্রকল্পিত অনুমান নিয়ে আরিফ লিখতে বসেছিলেন উদ্দিষ্ট বইটি। লেখকের সব অনুমানের সাথে পাঠক একমত হয় না, হবার দরকারও নেই। আলোচ্য কবিতায় ব্যবহৃত পুরাণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখক শ্রমও বিনিয়োগ করেছেন, তাও বোঝা যায়। কিন্তু টি-টোয়েন্টির এই জমানায় কী এক অদৃশ্য আস্কিং রেটের সাথে লড়তে নেমে তিনি যেন নিজের প্রকল্পের সমর্থনে কেবল তথ্য দিয়ে গেলেন আমাদের, গবেষকের প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারলেন না।
আমি আশা করবো, কখনো সুযোগ পেলে আরিফ এই বইটা আগাগোড়া পুনর্লিখন করবেন।
ছোটবেলায় সহশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে কাজী নজরুলের "বিদ্রোহী" কবিতা পড়ার সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য দুই ই হয়েছিল। দুর্ভাগ্যের কারণ শুরুর দিকের অনেকখানি মুখস্থ করা। অল্প বয়সে বিদ্রোহী কবিতা বোধগম্য না হওয়াই স্বাভাবিক। অপরিপক্ব মস্তিষ্কে "বিদ্রোহী" এক ছটাক শক্তিশালী শব্দচয়নে কবিতার পদ্য বিনা কিছুই না। এত কঠিন কঠিন শব্দ মুখস্থ করা লাগলে নিজেকে দুর্ভাগা ভাবাই স্বাভাবিক।
নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা লেখার প্রেক্ষাপট জনাব আশীফ এন্তাজ রবির লেখা নজরুলের জীবনীমূলক উপন্যাস "আমারে দেন না ভুলিতে" বইটির মারফতেই জানার সুযোগ হয়। হঠাৎ এক মধ্যরাতে ওহী নাজিল হওয়ার মতন নজরুলের মাথায় বিদ্রোহী কবিতা সওয়ার করে। ভোরের দিকে নজরুলের তৎকালীন বন্ধু ও রুমমেট মুজাফফর আহমেদ ঘুম থেকে উঠে দেখেন নজরুলের উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে এদিক ওদিক দুলুনি দিচ্ছেন এবং খাতাভর্তি বিদ্রোহী কবিতা। কিন্তু, বিদ্রোহী কবিতার কাহিনী যতটা না সাদামাটা, বিদ্রোহী কবিতা লেখার পেছনে নজরুলের মনস্তাত্ত্বিক ও মেধার যে প্রজ্জ্বলন আমরা দেখতে পাই তা মোটেও সাদামাটা নয়৷
বিদ্রোহী কবিতা শুধু নজরুলের বিদ্রোহী হয়ে উঠার কিসসা নয়, বরঞ্চ, নানাবিদ বিষয় এখানে স্থান পেয়েছে। পুরাণের একগাদা দেবতা, অসুর, বিষ্ণুর দশ অবতার, নবী রাসূল- কে জায়গা পান নি! সবাইকে হাজির করেছেন কবি। নজরুলের পুরাণ জ্ঞান কতটা শক্ত ছিল তা হয়ত বইটা না পড়লে বুঝতাম না। মধ্যেরাতে একটা মানুষের মাথায় এত শত আইডিয়ার মিথস্ক্রিয়ায় কিভাবে এত অসাধারণ কবিতা আসতে পারে, তা ভেবে আমি শিহরিত, আশ্চর্য প্রতিভাবান নজরুল, পিকস ডিজিজ না হলে বাংলা সাহিত্য হয়ত আরোও একটু কম বঞ্চিত হতো।
আরিফ রহমান সাহেব বিদ্রোহী কবিতাকে সাতটি ভাবে বিভক্ত করে তাকে খন্ডন করেছেন। প্রতিটা ভাবের পেছনের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এবং প্রচুর রেফারেন্স, গল্প-কাহিনী উনার খন্ডনের যুক্তি হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। লেখক নাকি দুইবার পান্ডুলিপি পুনর্লিখন করেছেন। অনেক পরিশ্রমী উদ্যোগ।
আখ্যান বা পুরাণ বরাবরই শুনতে আকর্ষণীয়, তাই মন্ত্রমুগ্ধের মতন পড়ে গিয়েছি। "এটা আমার দর্শনের নোটখাতা নয়" বইটি পড়েও অনেক ভাল লেগেছিল।নন ফিকশন মানেই এক প্রস্থ রাশভারী কথাবার্তা, এ ধারায় তিনি যে নতুন সংযোজন করেছেন তা প্রশংসার দাবিদার।
নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি করার শেখার সময় বলা হয়ে থাকে এই কবিতার ভাবরস হলো 'বীর রস'। দয়া, দান, ধর্ম, দেশভক্তি, উৎসাহ এই বীর রসের উপাদানসমূহ। বিদ্রোহী কবিতায় খালি চোখে এই রসের অনেকগুলো উপাদান দেখতে পাওয়া যায়। যাই হোক ভাবরসের দিক থেকে বের হয়ে যদি পুরো কবিতায় চোখ রাখতে যাই তবে চোখের সামনে উঠে আসে হিন্দু ধর্মের অসংখ্য চরিত্র, গ্রীক মিথের অর্ফিয়াস আর ইসলাম ধর্মের তেজী বোরবাক্। বিদ্রোহী কবিতা মূলত কী? অসংখ্য পৌরাণিক চরিত্রের ছড়াছড়ি আর একজনের নিজেকে চেনার উপাখ্যান? লেখক আরিফ রহমান এই পৌরাণিক চরিত্রের পিছনের গল্পগুলোকে সুতোয় বাঁধতে চেয়েছেন, বলতে চেয়েছেন নজরুলের এই মহা-প্রলয়ের নটরাজ, সাইক্লোন, ধ্বংস, অভিশাপ পৃথ্বীর হয়ে ওঠার পেছনে কোন খন্ডে খন্ডে বিভক্ত গল্প নয় বরং একটি গল্পই উঠে এসেছে। যেমন ধরা যাক ক্ষ্যাপা দূর্বাসা, ঋষি বিশ্বামিত্র, ঋষি ভৃগু, পরশুরাম, ঋষি জমদগ্নি এনাদের কথা। এনারা সকলেই ঋষি সেটা সকলেই জানি কিন্তু আরেকটু গভীরভাবে দেখলে দেখবেন এনারা সকলেই ব্রাহ্মণ হলেও তাদের সকলের ছিলো অস্ত্র বিদ্যায় দক্ষতা। এনারা সকলেই একেকজন ছিলেন কঠোর যোদ্ধা। স্বয়ং পরশুরাম একুশবার পৃথিবীকে করেছেন নিঃক্ষত্রিয়। ২২ বছর বয়সের শেষ রাতে এক যুবক যেই দ্রোহের কথা বলে গিয়েছেন এবং অস্ত্র হিসাবে কবিতাকে ব্যবহার করেছেন তাকে নতমস্তকে প্রণাম করতে হয়। এই কবিতার ভিন্ন ভিন্ন লাইন ভিন্ন ভিন্ন গল্পকে উপস্থাপন করছে। সেই পেছনের গল্পগুলোকে আমাদের চোখের সামনে খুলে দিয়েছে "বিদ্রোহী পুরাণ"। "মম এক হাতে-বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তুর্য্য।" এই লাইনে আমরা দেখি শ্রীকৃষ্ণকে যদি বাঁশি হাতে আমাদের কাছে যেমন পরিচিত ঠিক তেমন ভাবে রণক্ষেত্রে তিনিই হয়ে ওঠেন অন্যায়ের সংহারক। আবার ঠিক পরের দুইটি লাইন হলো "আমি কৃষ্ণ-কণ্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা বারিধির। আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।" দেবাদিদেব মহাদেব যখন সমুদ্র মন্থনে বাসুকিনাগের গলা থেকে নিঃসৃত হলাহল পান করেন তখন তার কণ্ঠ হয়ে ওঠে নীল। যার কারণে তাকে নীলকন্ঠ বলেও ডাকা হয়। সেই মহাদেব আবার গঙ্গাকে নিজের জটায় আবদ্ধ করে তার গতি রোধ করছেন জগতের কল্যানে। "বিদ্রোহী পুরাণ" বইয়ে লেখক "বিদ্রোহী" কবিতার পোস্টমর্টেম করতে চেয়েছেন। বহুলাংশে সেটা সম্ভব করে দেখিয়েছেন। বিদ্রোহী কবিতার পিছনে নজরুল বিষ্ণুর দশাবতারকে লুকিয়ে রেখেছেন। সেই দশাবতারের সুলুক সন্ধান করেছেন সফলতার সাথে। এরপর নবী মোহাম্মদকেও এনেছেন। এনেছেন মেরাজের রাতে নবীর স্বর্গারোহণের বাহক অদ্ভুত মানুষের মত মুখ আর খচ্চরের মত শরীরের বোরাক বাহনকে। তার কথা তুলে ধরেছেন। এসেছে দেবরাজ ইন্দ্রের বাহন উচ্চৈস্রবার কথা। মোটামুটি বিদ্রোহী কবিতার একটা গঠনমূলক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। তবে শেষের দিকে তারাহুরো না করলেই ভালো হতো। এইখানে যতস্থানে শিবের উপখ্যান রয়েছে সেগুলোর ব্যাখ্যা দিতে পারতেন বলে মনে হয়েছে। দেবী ছিন্নমস্তা এবং দেবী চন্ডীর কথাগুলোকে ব্যাখা করা যেতো।
এবার আসুন সম্পাদনার দিকে নজর দিই। একটি বই পড়তে গিয়ে সম্পাদনার অভাবে যে তাল ছিঁড়ে যায় তার কথা না বললেই নয়। এত তাড়াহুড়ো কিসের ছিলো জানি না। যার কারণে অনেক বিশেষ বিশেষ স্থানে তথ্যের অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। যেমন এক স্থানে বলা হচ্ছে পরশুরাম ২১ বার পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয় করেছেন(সঠিক তথ্য)। কিন্তু অন্য স্থানে বলছেন সংখ্যাটা বিশবার। অন্যদিকে নজরুল বিদ্রোহী কবিতায় "আমি" শব্দটার ব্যবহার করেছে ১৪৭ বার। কিন্তু একস্থানে দেওয়া আছে ১৫৪ বার। এই যে সম্পাদনার কারণে বইটার গতি ছুটে যাচ্ছে সেটা বিরক্তিকর।
যখন বই পড়া শুরু করলাম আনুমানিক ক্লাস নাইনের দিকে, তখন একটা ব্যাপার মাথায় আসলো, বাংলা বই পড়তে গেলে যদি পুরাণ সম্পর্কে আইডিয়া না থাকে, তাহলে এই সাহিত্য মাথায় ঢুকলেও পুরোটা বুঝা যাবে না, লেখক কি চিন্তা করে লিখছেন। ক্লাস টেনে কোন এক সন্ধ্যায় তাই বন্ধু তূর্য আর অভিষেক এর কাছে ক্লাস করা শুরু করলাম, মোটামুটি একটা আইডিয়া হল ভারতীয় পুরাণ নিয়ে। এরপর যখন হাতে মহাভারত আসে, পাশাপাশি গ্রীক, রোমান, নর্স আর আরব্য রজনীর গল্প গুলো পড়া হয়, তখন মোটামুটি বই পড়ার মজাটা ভালভাবে টের পাই। শুরু হয় বইয়ের নেশা। একটা ব্যাপার মোটাদাগে বলা যায় যে, যতোই কবিতা-গল্প-উপন্যাস লেখা হয়, সেসবের বেশিরভাগই "তুলনা"র মাধ্যমে প্রকাশিত হয় লেখকের মনের ভাব। (Metaphor, Simile, Personification ইত্যাদি) আর এই ব্যাপারে আমরা সব সময় ফিরে যাই কল্পকাহিনী - আখ্যান কিংবা রূপকথার গল্পে, কিংবদন্তি তে। মুখস্থ করার দরকার নাই, তবুও বিভিন্ন mythologyর কিচ্ছা-কাহিনী জানা থাকলে আপনার বুঝতে সুবিধা হবে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাইশ বছর বয়সে বিদ্রোহী কবিতা লিখছেন। এটায় উনি এই পুরাণের নায়কদের সাথে তুলনা করাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ঢুকাইছেন। এক ধর্মের একটা কনসেপ্ট এর সাথে আরেক ধর্মের কাছাকাছি কাহিনীর বা character দের এক সুতোয় গাঁথছেন নকশী কাঁথার বুননের মতো। এইটা নিয়ে বিস্তৃত একটা স্টাডি করে এই বইটা লেখা হইছে। মহাভারত বা রামায়ণের প্রধান কুশীলব দের মোটামুটি বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত (কিন্তু ইমপ্যাক্টফুল এবং বলিষ্ঠ) ক্যারেকটার দের নিয়ে আসছেন নজরুল বিদ্রোহী কবিতায়। আপনার যদি indian mythology নিয়ে ধারণা থাকে, এটা গোগ্রাসে গিলতে পারবেন, আর না থাকলেও দোষ নাই, অনেক মজার কাহিনী জানতে পারবেন। এখানে সবকিছুই বিশ্বাস করার জন্যে আপনি বাধ্য না (আমিও বিশ্বাস করি নাই, এবং অনেক গ্রে এরিয়া আছে যেগুলো সযত্নে বাদ দিতে পারেন আপনে), কিন্তু চিন্তার খোরাক হিসেবে বইটা সেরা। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব জিনিসটা নিয়ে আমার আইডিয়া নাই এতোটা, কিন্তু এই বই পইড়া অনেক মজা পাইলাম।
লেখকের রিসার্চ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ফেসবুকে এই বিষয়ে লেখকের লেখা সিরিজ নিয়মিত পড়তাম। বই হিসেবে আসবে শুনে অনেক প্রত্যাশা ছিল। মহাভারত, রামায়ন এবং সেমিটিক ধর্মের অনেকগুলো মিথের কাহিনী সে আসলেই একই উৎস থেকে আসছে, এই বিষয়ে ভালোমত রিসার্চ দেখানো হয়েছে। মহাভারত পড়া না থাকলেও বিভিন্ন বই,সিনেমা, সিরিজ এর জন্য অনেক ক্যারেক্টারই পরিচিত। এই বইয়ে ক্যারেক্টারদের বিস্তারিত গল্পগুলো জেনে ভালো লেগেছে।
সমস্যা হল, বইয়ে একই তথ্যর অনেক পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। একটা সময় পর এইটা বিরক্তিকর ছিল। কিছু জায়গায় প্রয়োজনেই, একই ক্যারেক্টারটা ঘুরে ফিরে আসছে বুঝতে পারছি, সেইটা শুধু মেনশন করে দিলেই হত, বইয়ে আগে একবার তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বার বার তাকে নিয়ে একই তথ্যর বর্ণনা ভালো লাগে নাই।
দ্বিতীয়ত, অনেক লেখায় ফেসবুক স্ট্যাটাসের লেখাটাই তুলে দেয়া হয়েছে। ফেসবুকে সেইগুলো পড়তে ভালো লাগে। কিন্তু বইয়ে পড়তে গিয়ে অনেক শব্দই বেমানান লেগেছে। ইংরেজি কিছু শব্দ এড়ানো যেত।
আমার নন-ফিকশন পড়ার অভ্যাস খুবই কম। লেখকের এর আগের বই দর্শনের নোটখাতা পড়ে ভালো লেগেছিল। নন ফিকশন হলেও তার লেখার ধরনের জন্য পড়তে ভালো লাগে। নজরুল এবং ইসলাম নিয়ে লেখক কথা দিয়েছেন, আরো লেখালেখি করবেন। সেই লেখাগুলোর জন্য অবশ্যই অপেক্ষা করবো।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী” কবিতায় উল্লিখিত পৌরাণিক উপাদানগুলোর ব্যাখ্যার সমন্বয়ে লেখা বইটি একটি রোলারকোস্টারের মতন ভারতীয়, পারসি, গ্রিক এবং ইসলামি পুরাণে বিচরণ করে কবিতায় কবির মনোভাব সাধারণ মানুষের বোধগম্য করেছে।
বিদ্রোহী কবিতার পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিশ্লেষণ! যারা পৌরাণিক গল্প কিংবা দশাবতার নিয়ে ধারণা রাখেন না, তাদের জন্য অনেক নতুন কিছু জানার আছে বইটিতে। সুখ পাঠ্য এবং চমৎকার বিশ্লেষণের লেখককে ধন্যবাদ।
“গাহি সাম্যের গান- মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান! নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি, সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি। - কাজী নজরুল ইসলাম”
পৃথিবীর সৃষ্টি কবে, কোথায় এবং কখন। প্রশ্নও তো অনেক করা হয়, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সংজ্ঞা একরকম আবার ধর্মের ক্ষেত্রে সংজ্ঞা একরকম। কেউ বার ধর্ম দিয়ে বিজ্ঞানকে বুঝতে চায়, কেউ বার বিজ্ঞানের মাঝেই ধর্মকে খুজে পায়। তবুও পৃথিবীর ঘুর্ণন বা এই পৃথিবীর শুরুর কথা আসলেই একটি রহস্য। এখন পর্যন্ত মিথ, ধর্ম, বিজ্ঞান সব কিছুতেই পৃথিবীর ব্যাখ্যা এসেছে। সবাই তার নিজস্ব ধারায় ব্যাখ্যা করেছে এই পৃথিবীকে। এখান উল্লেখ করার বিষয় হচ্ছে, সবাই এই পৃথিবীকেই ব্যাখ্যা করেছে, কেউ অন্য কোন গ্রহ উপগ্রহকে ব্যাখ্যা করেনি।
সূর্য কে কেন্দ্র করেই পৃথিবীর ঘূর্ণন সম্পন্ন হয়ে থাকে। আমরা যদি একটু পেছন ফিরে দেখি তবে সেই সময়ে বিজ্ঞান এত বেশি অগ্রসর নাহলেও বিজ্ঞান, ধর্ম ও মিথের একটা যোগসাজশ দেখতে পাই। কোন এক জায়গাতে বলা হয়েছে পৃথিবী থালার মত, যা চারটা হাতি পিঠে করে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর হাতি গুলো দাঁড়িয়ে আছে বড় কচ্ছপের পিঠে, কিন্তু কেউ এই প্রশ্ন করেনি কচ্ছপ কোথায় আছে।
ধর্ম, বিজ্ঞান, মিথ যাইহোক না কেন সব কিছুর আবর্তন হয়েছে এই পৃথিবীকে ঘিরে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার বিজ্ঞান, ধর্ম এবং মিথ এই তিন একে অন্যের পরিপূরক হয়েছে। সব কিছুকে একটা সুতোতে গেথে নিয়েছে। তবে কিনা এই জায়গাতেও আজও মিথ নিজেকে সমুজ্জল করে রেখেছে। যার ব্যাখ্যা হয়ত অদূর ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে।
একটু প��রসঙ্গ থেকে সরে যাই, কবির শক্তি কোথায় কেউ যদি প্রশ্ন করে তবে আমার মনে হয় কবির শক্তি ছন্দ বা কাব্য রচনায় নয়। কবির শক্তি হচ্ছে তিনি লেখনীর কতটা গভীরে যেতে পেরেছেন। নিজেকে কতটা ভাবে উজাড় করে লিখেছেন। আর যখন লিখেছেন তিনি সেই লেখার গভীরে নিজেকে কতটা স্থাপন করেছেন।
শুধু ছন্দ, পদ্য আর কাব্য কবিতা রচনা নয়, পাঠকের চিন্তার মধ্যে কবিতাকে নিয়ে যাওয়াও কবির কাজ। পাঠকের চিন্তাকে ত্বরান্বিত করতে পারলেই কবির সার্থকতা। আর পাঠক যদি কবিতার গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয় তবে কবিতার সার্থকতা। এখানে কবি ও কবিতা দুজনেই সার্থক।
এবার আসি ��ৃথিবীর শুরু এবং আজ পর্যন্ত ধর্ম, বিজ্ঞান, মিথ ছাড়াও কবিতা ছিল। যা মানুষের ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। মানুষের চিন্তাকে ত্বরান্বিত করে ভাবতে বাধ্য করেছে। আর সেকারণে যুগে যুগে শ্লোক, কবিতার মাধ্যমে পৃথিবীর ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। আমরাও ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছি।
“বিদ্রোহী” এই কবিতার সাথে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে যার নাম তিনি আর কেউ নন “কাজী নজরুল ইসলাম” । কবি যখন এই কবিতা লিখেছেন পেছন ফিরে দেখলে এই কবিতার বয়স ১০২ বছরের উপরে হয়েছে। আমরা দেখতে পাই এই কবিতাটি লেখা হয়ে ১৯২১ সালের ডিসেম্বেরে। তো এই বিদ্রোহী লেখার পেছনের গল্পটি কি। অথবা তিনি যখন এই কবিতা লিখেছেন তখন কি তিনি জানতেন ১০২ বছর পরেও এই কবিতা মানুষকে উজ্জিবীত করে তুলবে।
এই বিদ্রোহী কবিতাটিকে কবি আসলে নিজেকেই নিজে তুলে ধরেছেন। তিনি নিজেকে দেখতে চেয়েছেন এই কবিতার মাধ্যমে। অথচ তখন কবির বয়স মাত্র ২২ বছর। কবিতাটি তিনি এক রাতে লিখে শেষ করেছিলেন। হ্যা, এক রাতে এক বসায় পেন্সিল দিয়ে লিখেছিলেন “বিদ্রোহী”। লাইনের কথা বলতেই হয় ১৫০ লাইন। ভাবতেও অবাক লাগে যে এত দারূণ লেখনীর সংযোগ কবি কিভাবে ঘটিয়েছেন। এরচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে কবি এত বেশি পরিমানে শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু “বিদ্রোহী” কবিতার গভীরতা কিন্তু সুবিশাল।
“ইকরা” ও “কুন”
আরবিতে “ইকরা” মানে হচ্ছে পড়ো। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) যখন নবুয়াত প্রাপ্ত হলেন, তখন তাকে প্রথমেই বলা হয়েছি। “ইকরা” মানে পড়ুন বা পড়ো। তার মানে আমরা বুঝতে পারি ইসলামে পড়ার ব্যাপারে কতটা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আবার “কুন” মানে হচ্ছে “হওয়া” । কোন কিছুর এক আদেশে হওয়া ব্যাপারটাকে আমরা “কুন” বলতে পারি। সেক্ষেত্রে দেখা যায়, ইসলাম ধর্মের যেই পথ রয়েছে তাতে পড়া এবং হওয়া দুটো ব্যাপারই জড়িত।
“সিদরাতুল মুনতাহা”
মহানবী যখন মেরাজে গিয়েছিলেন তখন তিনি বস্তু আর চেতনার সীমানায় একটি বড় বিস্তৃত ও রহস্যময় গাছ দেখতে পেয়েছিলেন। এই গাছটি তাকে দেখিয়েছিলেন ফেরেশতা জিব্রাইল (আঃ) । এই গাছটির নাম হচ্ছে “সিদর” যার অর্থ “বড়ই গাছ” । এই গাছটি একদম সপ্তম আসমান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যার অর্থ করলে দাঁড়ায় গাছটি প্রথম থেকে একদম সপ্তম আসমান পর্যন্ত ছড়িয়েছিল। আর এই গাছটির পরে কোন মানুষ বা ফেরেশতা অতিক্রম করতে পারবে না। তাদের সেই ক্ষমতা নেই।
তবে মহানবী এই গাছের পর অতিক্রম করার অনুমতি পান। তিনি একমাত্র এই গাছ কে অতিক্রম করে তার পরে কি আছে দেখতে পান। এই গাছটির পরে রয়েছে অবিনশ্বর জগৎ। সিদরাতুল মুনতাহা এর গোড়ার অংশ থেকে চারটি নদীর ধারা প্রবাহিত হয়েছে। যাদের মধ্যে দুটি পৃথিবীতে বাকি দুটি সেই অবিনশ্বর জগতে। পৃথিবীতে প্রবাহিত হওয়া দুটি নদী হচ্ছে ফোরাত এবং নীলনদ। আর অবিনশ্বর জগতে নদী দুটি হচ্ছে “হাউজে কাউসার” যা হাশরের মাঠের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে এবং “সালসাবিল” যা জান্নাতুল মাওয়ার দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
“চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি’ ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া, খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!”
এই যে নবীর আরশে উঠে যাওয়া বা খোদার কাছে চলে যাওয়া এটাকে কবি তার কবিতায় তুলে এনেছেন। আবার সেই সাথে এটাও বর্ণনা করেছেন যে একই সাথে পুরানের মতে এই লাইনের অর্থ করলে অন্য কিছু দাঁড়াবে।
এখানে হিন্দুদের দেবতা বিষ্ণু বামন অবতারের কথা বলা হয়েছে। ঘটনা সংক্ষেপে বললে, এক রাজা ক্ষমতা লাভের আশায় যোজ্ঞ শুরু করলে বিষ্ণু তার সামনে আসেন। তিনি অসীম ক্ষমতা চাইলে তার বিপরীতে বিষ্ণু যা চান তাই দেয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। বিষ্ণু ভগবানও তাকে ক্ষমতা দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তবে তার বদলে বিষ্ণু তিন পা রাখার জায়গা চান।
রাজা ভাবেন এই আর এমন কি। কিন্তু এর শেষটা ভয়াবহ, বিষ্ণুর তৃতীয় পা রাখতে গিয়ে তিনি এত বড় হয়ে যান যে তা পা রাখার জায়গা হচ্ছিল না। তিনি বড় হতে হতে একদম পুরো পৃথিবী ছেড়ে উপরে দিকে উঠে গিয়েছিলেন।
"আমি ব্যোমকেশ,ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।"
এই ব্যোমকেশ কোন গোয়েন্দা না। হিন্দুদের দেবতা শিবের আরএক নাম হচ্ছে ব্যোমকেশ। আর গঙ্গা হচ্ছে হিন্দুদের পবিত্র নদী। গঙ্গা সব পাপ ধুয়ে দেয় এমনটাই বিশ্বাস হচ্ছে হিন্দু ধর্মে। যখন পৃথিবীতে গঙ্গার ধারাকে বজায় রাখতে শিব তার চুলের মাধ্যমে গঙ্গাকে আটকে দেন। মিথোলজিক্যাল ভাবে বলা যায় যে শিব দেবতাদের ভেতর অন্যতম যিনি শক্তির দিক থেকে সবার উপরের দিকে রয়েছেন।
"আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি।"
পুরো বিদ্রোহী কবিতা জুড়ে আপনি অনেক লাইন পাবেন তবে এই লাইনের ব্যাখ্যার কথা যদি ধরতে হয় তবে দেখতে পাবেন। এখানে দুটি ঘটনা এক সাথে সমান্তরাল ভাবে দেখানো হয়েছে। মুসলিমদের জন্য যেটা জাহান্নাম সেখানে আগুন আছে আবার হিন্দু ধর্মের নরকে আগুন। আগুন কিন্তু ধ্রুব রয়েছে। সেটা পরিবর্তি হয়নি।
আমরা এখানে দুটি ঘটনার দেখতে পাই যা হচ্ছে মুসলিমদের জন্য, যখন ইব্রাহিম (আ) কে আগুনে নিক্ষেপ করা হল তখন তিনি আল্লাহ কাছে নিজে সম্পর্ন করলেন। তিনি জানতেন যে একমাত্র আল্লাহ যিনি সর্বশক্তিমান তিনি তাকে রক্ষা করবেন। আবার আমরা হিন্দুদের পুরাণে লক্ষ্য করলে দেখি যে, বিষ্ণু ভক্ত প্রহ্লাদও আগুনে অক্ষত ছিলেন। তাকে আগুন স্পর্শ করতে পারেনি। দেখুন দুটি ঘটনার ভেতর কিন্তু বেশ সুন্দর ভাবে একটা সংযোগ দেখানো হয়েছে।
গ্রীক দেবতা হচ্ছেন আর্ফিয়াস। তিনি সুন্দর ভাবে বাশি বাজাতে পারতেন। সেই বাশির সুর সবাইকে মুগ্ধ করত। তিনি ভালবাসতেইন ইরিডিয়াস কে, যার জন্য তিনি পাতাল নগর পর্যন্ত ঘুরে এসেছেন।
আবার দেবতা কৃষ্ণর ছিল বাশির শক্তি। দেবতা কৃষ্ণ কিন্তু আবার বিষ্ণুর অবতার। কৃষ্ণও খুব সুন্দর বাশি বাজাতে পারতেন। সেই বাশির সুর আকাশ বাতাস প্রকৃতি মানুষ সবাইকে মুগ্ধ করেছে। তিনিও ভালবাসতেন রাধাকে।
এই যে এখানেই কিন্তু একটি সুন্দর ছোট সংযোগ আমরা দেখতে পাই মুসলমানদের ইস্রফিলের শিঙ্গার সাথে। এখানেও বাশির একটা উদাহরণ রয়েছে। তবে সেটাকে আমরা শেষ দিনে বা পৃথিবীর শেষ দিনের জন্য সেই দিনের অপেক্ষায় রয়েছেন ইস্রাফিল (আ)।
“আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান-বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন”
এই একটা লাইনের কারণে নজরুলকে অনেক রোষানলে পরতে হয়েছিল। ভগবানের বুকে পদ চিহ্ন একে দেবার সাহস এক তুচ্ছ কবির। এটা তো মেনে নেয়া যায় না। অথচ জ্ঞানের ভান্ডারে যদি নজরুলের গভীরতা থাকত তবে না সে দেখতে পেত এর মানে।
সাধারণ অর্থে এই লাইনটি যে কাউকে কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত করতে পারে। তবে এই লাইনটি গভীরতা অনেক বেশি। বিদ্রোহীর ঠিক শেষ দিকের লাইন এটি। এখানে সাধু ভৃগুর কথা বলা হয়েছে, যিনি ক্রোধের বশবর্তি হয়ে ভগবানের বুকেই লাথি মেরে ছিলেন।
“বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত”
নজরুল যেই বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন, সেটাকে তিনি নিজেই শেষ করেছেন। তিনি শান্ত হতে চেয়েছেন। হয়ত এর মাধ্যমে তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে নিজের সাথে বিদ্রোহে তিনি অনেক বেশি ক্লান্ত। কারণ তিনি নিজেই ছিলেন এক সময় সৈনিক। তাই তিনি শান্ত হয়ে যেতে চেয়েছেন। “আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন আমি চির-বিদ্রোহী বীর-- বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!”
সকল কিছুর শেষ হয়, সব কিছু নতুন ভাবে শুরু হয় আবার সেখান থেকেই। মাথা উচ��য়ে চলার জন্য অনেক সময় আমাদের ভিন্ন পথে হাটতে হয়। তবুও বিদ্রোহী রণে ভঙ্গে দেয় না। তারা বিপ্লবী, তারা জয়ী যারা এই চির বিদ্রোহ ধরে রাখে।
আরিফ রহমানের লেখা “বিদ্রোহী পুরাণ” নিয়ে লিখতে গেলে আরও লেখা আসবে। আসবে কাজী নজরুল ইসলাম। পুরাণের সাথে লেখা বিদ্রোহীর যে সম্পর্ক দেখিয়েছেন তাতে খুব কম মানুষ এই কবিতা নিয়ে ভেবেছিলেন। অথচ এই কবিতার পর নজরুল কে রোষানলে পরতে হয়েছিল। তিনি চির উন্নত শির এর মত মাথা নোয়াননি।
কবিতাটি নিষিদ্ধ করার মত অবস্থা হলেও নিষিদ্ধ করা হয়নি। তবে যারা এই কবিতা ছাপাতে চেয়েছিল তাদের পত্রিকা জব্দ করা হতো। এমন কি ওনার ভাব ও ছন্দ চুরির অভিযোগ উঠেছিল। তবে নজরুল তো নজরুল। তার লেখা বোঝা অনেক কঠিন।
বইটির শুরু দিকে কিছু গম্ভীর ভাবে শুরু হলেও ধীরে ধীরে প্রতিটি লাইন, ও শব্দের ব্যাখ্যা যেভাবে পুরাণ, ও ধর্মের সংযোগ উঠে এসেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না যে লেখা বেশ গবেষণা করেছেন।
নজরুলের দর্শন বোঝা অনেক কঠিন একটি কাজ। তিনি শিক্ষিতদের তালিকায় সেভাবে পরেন না। অথচ তার লেখার গভীরতা ও তার লেখা দর্শন অনেক বড় বড় লেখার চেয়েও গভীর। তিনি যেন নিজেকেই তুলে ধরেছেন। নিজেকেই ভেঙেছেন আবার নিজেকেই গড়েছেন। তিনি সব সময় সমুজ্জল তার লেখায়।
বিদ্রোহী কবিতায় তিনি নিজেকে দেখেছেন। নিজেকেই ভেঙ্গেছেন আবার তিনি নিজেকেই বলেছেন। এ যেন নিজের সাথে নিজের বিদ্রোহের কথা। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।
তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে সব সময়।
“আমি উত্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন আমি বিশ্বতোরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন!”
বইঃ বিদ্রোহী পুরাণ লেখকঃ আরিফ রহমান প্রকাশনঃ পেন্ডুলাম
মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন হতে ধর্ম মানুষের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। শুরুতে ধর্ম নিয়ে এখনকার মতো এতটা আলোচনা-সমালোচনা না হলেও, জগতে ধর্ম তথা ধর্মবিশ্বাসের অস্তিত্ব ঠিকই ছিল। কালের পরিক্রমায় ধর্মবিশ্বাস ও পুরাণ একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন লেখকের লেখনীতে আমরা পুরাণের সরব উপস্থিতি দেখতে পাই। একইভাবে, ‘প্রেম ও দ্রোহের কবি’ খ্যাত কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতেও আমরা পুরাণের অনুষঙ্গ দেখতে পাই।
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় পৌরাণিক অনুষঙ্গ তথা পৌরাণিক চরিত্র ও ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবহার নিয়ে সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত প্রবন্ধকার আরিফ রহমান পাঠক সমাজে হাজির হয়েছেন। তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী পুরাণ’ শীর্ষক বিশ্লেষণাত্মক আলোচনাধর্মী বইটি ইতোমধ্যে পাঠক সমাজে হইচই ফেলে দিয়েছে। পুরাণের আঙ্গিকে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার চুলচেরা বিশ্লেষণ এ বইটির মূল আলোচ্য বিষয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, প্রবন্ধকার এক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট পুরাণ কাহিনীর আশ্রয় গ্রহণের পরিবর্তে বিভিন্ন পুরাণ কাহিনীর তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এগিয়ে গিয়েছেন। এদিকটা বিবেচনায় নিলে বইটিকে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের বই বলাটাও বোধ করি কোনো ভুল হবে না।
পুরো বইটি প্রবন্ধকার মোট সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত করেছেন। একেকটি অধ্যায়কে তিনি একেকটি ‘ভাব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ১৪৯ লাইনের বিদ্রোহী কবিতাকে সাতটি ভাগে ভাগ করে তিনি এই আলোচনা সাজিয়েছেন। আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ‘বিদ্রোহী’ কবিতা হলেও, বিভিন্ন জায়গায় প্রসঙ্গক্রমে অন্যান্য বইয়ের তথ্য, কবিতার লাইন ও গানের কথা উঠে এসেছে, যা তাঁর আলোচনাকে আরো প্রাণবন্ত ও ঋদ্ধ করে তুলেছে। আলোচ্য কবিতাটিকে লাইন ধরে ধরে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রবন্ধকার গল্পের ঢঙে একের পর এক জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা করে গিয়েছেন। এদিক থেকে তাঁকে ‘গল্পকথক’ বলাটা মনে হয় বাড়াবাড়ি হবে না। এর পাশাপাশি বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্র ও অনুষঙ্গের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে হিন্দু পুরাণের অনুষঙ্গ যেমন ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, গ্রিক, জরথ্রুস্টবাদ প্রভৃতি পুরাণের অনুষঙ্গও বাদ দেওয়া হয়নি। এজন্য যে প্রবন্ধকারকে প্রচুর খাটতে ও সময় দিতে হয়েছে, সে কথা আলাদা করে বলা বাহুল্য। এদিক থেকে এটাকে রীতিমত একটা ‘গবেষণাপত্র’ বলা হলেও, তাতে বিন্দুমাত্র অতিরঞ্জন হবে না বলে আমার বিশ্বাস।
পাঠ পর্যালোচনার এই অংশে এবারে বইটির ভাষারীতি ও চরিত্র নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। শুরুতেই বলি এর ভাষারীতি নিয়ে। চলিত ভাষারীতিতে রচিত এই বইটি যথেষ্ট প্রাঞ্জল লেগেছে। নন-ফিকশন বই সবসময়ই ফিকশন বইয়ের তুলনায় একটু কাঠখোট্টা ধরনের হয়ে থাকে। শব্দচয়নে প্রবন্ধকার আরিফ রহমান যথেষ্ট পাণ্ডিত্যের পরিচয় রেখেছেন। বাংলা ভাষার পাশাপাশি কোথাও কোথাও বর্তমান সময়ে প্রচলিত (বিশেষত কথ্যরীতিতে) ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা বর্তমান তরুণ প্রজন্মের পাঠক-পাঠিকার কাছে তেমন একটা খারাপ লাগবে না। এবারে আলোচনার এই অংশের দ্বিতীয় কিস্তি নিয়ে আলাপ শুরু করা যাক। সত্যি বলতে, এই বইয়ের চরিত্র নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার নেই। পুরো বইটিতে কেবল ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকেই আমার কাছে মুখ্য চরিত্র তথা মুখ্য বিষয় বলে মনে হয়েছে। এছাড়া অনেক প্রাসঙ্গিক তথ্য এতে তুলে ধরা হয়েছে, যা কিনা কেবল একজন সত্যিকারের পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান গবেষকের পক্ষেই সম্ভব! প্রসঙ্গত, বিভিন্ন পুরাণ কাহিনী সম্পর্কে পাঠকের ন্যুনতম মৌলিক জ্ঞান থাকলে এই বইটি তার কাছে অধিকতর উপভোগ্য হবে বলে আমার মনে হয়েছে।
এবার কথা বলব একজন পাঠক হিসেবে যেসব বিষয় আমার ভালো লেগেছে, সেসব নিয়ে। সত্যি বলতে, ভালো লাগা দিক নিয়ে আলাদা করে বলবার মতো তেমন কিছু নেই। এক্ষেত্রে মূল বিষয়গুলো ইতোপূর্বে উপর্যুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে বলা হয়ে গিয়েছে। তবুও বলছি, এই বইটির আলোচনার ঢঙ, বিষয়বস্তু ও ভাষারীতি আমার কাছে বেশি ভালো লেগেছে। নন-ফিকশনের মতো কাঠখোট্টা বিষয়কে পাঠকের কাছে অধিকতর বোধগম্য ও উপভোগ্য করে তুলতে প্রবন্ধকার যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন। এই বইটি পাঠকের হাতে তুলে দেবার আগে তিনি এর পেছনে কতটা কষ্ট করেছেন, তার একটা ফিরিস্তি বইটির একটা অংশে উঠে এসেছে। এজন্য আমি একজন পাঠক হিসেবে প্রবন্ধকারের পাশাপাশি প্রকাশক থেকে শুরু করে এর সম্পাদনা কর্মের সাথে যুক্ত প্রত্যেককেই আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই।
অন্ধকার বিহীন আলোকসজ্জা যেমন ম্লান হয়ে যায়, তেমনি একটি পর্যালোচনাতে কেবল ভালো লাগার দিক তুলে ধরা হলে, সেটা আর পর্যালোচনা থাকে না; স্তুতি হয়ে যায়। এই বইটির বিভিন্ন দিক যেমন আমাকে মোহিত করেছে, তেমনি কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় আমাকে সমানতালে হতাশ করেছে। কোথাও কোথাও শব্দের বানান ভুল চোখে পড়েছে। আবার কোথাও কোথাও সর্বনামের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ক্রিয়াপদের ব্যবহারে অসঙ্গতি দেখতে পেয়েছি; দুয়েক জায়গায় তথ্যের অসঙ্গতিও দৃষ্টি এড়ায়নি। এছাড়া এ ব্যাপারে আগ্রহী পাঠক-পাঠিকার সুবিধার্থে প্রাসঙ্গিক গ্রন্থপঞ্জির অনুপস্থিতি অনেক বেশি অনুভব করেছি। বইটি প্রকাশনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে এ ব্যাপারে কাজ করবেন বলে আশা রাখি।
দেখতে দেখতে আলোচনার অন্তিম পর্যায়ে চলে এসেছি। ধর্মগ্রন্থ ব্যতীত কোনো গ্রন্থ যেমন সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়, তেমনি এই বইটি নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে। এ বইটি যে প্রত���যেক সচেতন পাঠকের জন্য নতুন ভাবনার খোরাক জোগাবে, তা বলা বাহুল্য। সবশেষে একটা কথা বলতে চাই, বইটির কলেবর অনুযায়ী দাম অনেকের কাছে বেশি মনে হতে পারে। বইটি পড়ার আগে আমার কাছেও মনে হয়েছে। কিন্তু বইটি পড়ার পর তার বিপরীত মনে হয়েছে। বইটি পড়ার পর এ ব্যাপারে প্রত্যেক পাঠক-পাঠিকা আমার সাথে একমত হবেন বলে আমার বিশ্বাস।
“রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত-যৌবনা-যদি তেমন বই হয়। তাই বোধ করি খৈয়াম তাঁর বেহেশতের সরঞ্জামের ফিরিস্তি বানাতে গিয়ে কেতাবের কথা ভোলেন নি।”
— ‘বই কেনা’ (সৈয়দ মুজতবা আলী)
বইয়ের নাম: বিদ্রোহী পুরাণ লেখক: আরিফ রহমান বইয়ের ধরণ: বিশ্লেষণ ও গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশনা: পেন্ডুলাম প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৬০ আইএসবিএন নম্বর: ৯৭৮-৯৮৪-৯৭৫৭২-৩-৮ মুদ্রিত মূল্য: ৩৯০ টাকা
নজরুলের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া বিদ্রোহী কবিতাকে লেখক ভেঙেছেন এবং গড়েছেন পৌরাণিক কাহিনীর আলোকে। এ কাজ করতে তিনি চষে বেড়িয়েছেন হিন্দু পুরাণ ও সেমেটিক পুরাণ, তুলে এনেছেন প্যারালেল এক গল্পের সাথে আরেক। অত্যন্ত চিন্তা উদ্রেককারী বিশ্লেষণ, সন্দেহ নেই। সমস্যা হচ্ছে লেখক একাধিকবার আবেগে গা ভাসিয়ে দিয়েছেন, প্রসঙ্গচ্যুতি হয়েছে অনেক। এছাড়া অনেক বাক্যের রিপিটিশন বিরক্তিকর লেগেছে। লেখনী ধরনে আরেকটু সংযত হলে লেখার ভাববোধটা আরেকটু ঘন (concentrated) হত বলে আমার বিশ্বাস।
The writer tried too hard to explain everything, thus it became a literal word-by-word explanation of the poem rather than a philosophical understanding. I really like Arif and his writing on Facebook, this book proves that Facebook and literature has way too much difference in standard. Disappointed. However I wish him all the very best. I agree with Suhan Rizwan and hope one day Arif will rewrite the entire book.
ব্যাখ্যার সব ক্ষেত্রে সহমত পোষণ করতে না পারলেও লেখককে সাধুবাদ জানাই এমন দৃষ্টিকোণ থেকে লাইন বাই লাইন ব্যাখ্যা করার চেষ্টার কারণে। এই বই পড়ার কারণে আসল লাভ যেটা হয়েছে "বিদ্রোহী" কবিতা টা ভালো করে ঠান্ডা মাথায় বার বার পড়া হয়েছে। সত্যি বলতে প্রথম যখন পড়েছিলাম তখন অনেক কিছুই বুঝিনি এবং পুরোটা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পড়িও নি। এবার পড়া হলো।