নামে মনসুর হাল্লাজ থাকলেও বইটা কিন্তু কেবল হাল্লাজকে নিয়ে নয়। বরং 'এটা আমার দর্শনের নোটখাতা নয়' বইয়ের দ্বিতীয় পর্ব বলতে পারি আমরা এই বইটাকে । দর্শনের নোটখাতায় আমরা যেই বিষয়কে ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছি, এই বইতে সেই ছুঁয়ে যাওয়া টপিকগুলোলে নিয়ে আমরা আরেকটু বিস্তারিত আলাপ করবো। এবারের আলাপে ইগো, স্বত্বা, প্রেম, বিচ্ছেদ, অহংকার আর সত্যের মতো বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
'এটি আমার দর্শনের নোটখাতা নয়' যেখানে শেষ হয়, এই বইটির শুরু হয় সেখান থেকেই। লেখক আরিফ রহমান এর এম্পেথি সিরিজের নতুন বই 'মনসুর হাল্লাজের সত্য বলার শখ'।
রিভিউটা শুরু করি 'থিসিয়াসের নৌকা' আন্যালজি দিয়েই। লিজেন্ড অনুসারে, থিসিয়াসের বীরদের বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ রাজা নির্দেশ দেন তাদের নৌকাটি ঘাটে নোঙর করা থাকবে, চিরকাল।
এদিকে যেহেতু কোন কিছুই চিরস্থায়ী নয়, দিনকে দিন নৌকার বিভিন্ন অংশের কাঠগুলো ভেঙ্গে যেতে থাকে, এবং একটা একটা কাঠ ধীরে ধীরে 'রিপ্লেস' করে সেখানে নতুন কাঠ বসানো হতে থাকে।
এভাবে চলতে চলতে একটা সময়ে দেখা যায়, থিসিয়াসের নৌকাটি পুরোপুরি নতুন কাঠ দিয়ে রিপ্লেস হয়ে গেছে, এবং আরেকজন মানুষ যে আলগা হয়ে যাওয়া একটা একটা কাঠ সংরক্ষণ করেছে, সে তার বাড়ির উঠোনে নতুন একটা নৌকা বানিয়েছে যা দেখতে অবিকল থিসিয়াসের নৌকার মতন।
এখন প্রশ্নটি দাঁড়ায়, তাহলে, 'আসল' থিসিয়াসের নৌকা আপনি কোনটিকে বলবেন - নদীতে ভাসতে থাকা নতুন কাঠের নৌকাকে যাতে আদর্শ ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই, নাকি সেই লোকের উঠোনে থাকা নৌকাকে যাতে আদর্শ নেই কিন্ত আদর্শ ব্যতিত বাহ্যিক যাবতীয় নৌকার অংশগুলোই রয়েছে? বহুশতাব্দী পর্যন্ত এ সমস্যাটির সমাধান কেউ বের করতে পারে নি।
বস্তত, আমার শরীর, চিন্তা ভাবনা,আইডিওলজি, শিক্ষা - সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী ও রূপান্তর হয়।প্রতিনিয়ত আপনার শরীরের পুরোনো লক্ষ লক্ষ কোষ ক্ষয়ে যায়, আপনার আদর্শ ও শিক্ষা পরিবর্তন হয় - তৈরী হয় নতুন কোষ, নতুন শরীর ও নতুন আদর্শ।আমরা যা-ই শিখি না কেন, কেউ না কেউ তা বলে গেছেন,যার ক্রেডিবিলিটি হয়ত কয়েক শতাব্দী থাকবে, কিন্ত তারপরে তা আর থাকে না। এমনকি আপনি নিজেও চিরস্থায়ী না, পরিবর্তন সতত হয় আপনার মধ্যে - দশ বছর বয়সী আপনি ও বর্তমান আপনির দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন, শারীরিক-মানসিক-চিন্তাগত-আদর্শগত কত পার্থক্য আপনার মধ্যে বিরাজমান।
লেখকের কথা থেকেই কোট করে বিষয়টা বলি,
"..... তাহলে বিষয়টা কী দাঁড়াচ্ছে?
আপনার ফিজিক্যাল বডি, আপনার মেমোরি, সবাই আসলে এক জীবনে অনেকবার পরিবর্তিত হয়। শরীরের কোষ ঝরে পড়ে, নতুন কোষদের জায়গা করে দিতে, পুরাতন বিচার-বিশ্লেষণ ঝেড়ে ফেলে নতুন বিচার-বুঝকে জায়গা করে দেয় মস্তিষ্ক।……" (পৃষ্ঠা ১৯)
বস্তত, জীবনটাই পরিবর্তনশীল, ধাবমান ও গতিশীল, যেখানে একসময় আপনি ছিলেন না, তারপর আপনি এলেন, এবং একসময় আপনি আবারো প্রকৃতিতে মিশে যাবেন, যা শুরু হবে মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে।এক্ষেত্রে লেখক মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবেই নিতে দেখিয়েছেন, যে প্রতিদিনই আপনার মৃত্যু হয়, মৃত্যু মূলত একটা ট্রানজিশন, গাছ-পাখি-প্রাণী কোন না কোন রূপে আপনি প্রকৃতি্তে থেকে যাবেন।
বইটি বেশ কিছু অধ্যায়ে বিভক্ত, সমাজে নারী-পুরুষ বৈষম্যের ঐতিহাসিক কারণ পরবর্তী অধ্যায়ে তিনি আলোচনা করেন। অতীতে মানুষ যখন শিকারি ও যাযাবর জীবনযাপন করতো, নারী পুরুষের মধ্যেকার ব্যবধান খুব বেশি ছিল না। বরং অনেকক্ষেত্রেই সমাজ নারী দ্বারাই পরিচালিত হতো কারণ নারীই তার মেটিং পার্টনার চুজ করতো। কিন্ত কৃষিবিপ্লবের পরে যখন শিকারী যাযাবর জীবন মানুষ পরিবর্তন করে, এবং এক স্থানে থিতু হয়, তখন প্রজননের হার বেড়ে যায়, এবং নারী যেহেতু গর্ভকালীন কাজ করতে পারে না, কৃষি ও কৃষিজাত বস্তর তৈরী, লেনদেন, মজুত শুরু হয় পুরুষের দ্বারা, পাশাপাশি কৃষিকাজে শারীরিক শক্তির প্রয়োজন - এবং এভাবেই ক্ষমতা চলে আসে পুরুষের হাতে।
আসলে এভাবে বিষয়বস্তু নিয়ে আলাপ চালাতে থাকলে এটা আর বই রিভিউ থাকবে না, একটা বিশাল বড় প্রবন্ধ হয়ে যাবে, যা আমি চাচ্ছি না। বইটিকে আমি বই না বলে লেখকের চিন্তার ডায়েরি বলতে চাই।
বইটিতে ভালোবাসা, প্রেম, অহংকার, দু:খ, ইগো নিয়ে যেমন আলোচনা করা হয়েছে; তেমনিভাবে সাংখ্য দর্শনে নারী পুরুষের ব্যাখা, কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের সুফি ভাবাদর্শের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মানুষের জীবনে নবী আদম, মুসা ও নুহের প্রভাবও তুলে এনেছেন। বিবর্তন নিয়ে রুমি, আল জাহিজ ও ইবনে খালদুনের ব্যাখা - কিংবা লাওৎস, মহাবীর, মহাভারত এবং বুদ্ধের দর্শনও আলোচনা করেছেন। কিনৎসুগী নিয়ে আলোচনা করেছেন, মানুষের অসম্পূর্ণতার স্বরূপ বিশ্লেষন করেছেন।
এছাড়াও বইটিতে রুমী, কাহলিল জিবরান, লাওৎস ও ওশোর কিছু রচনার সহজবোধ্য অনুবাদ সংযোজন করা হয়েছে। বইটির শেষভাগে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যেকার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সম্পর্ক নিয়ে কথা বলা হয়েছে। জোরাথ্রুস্ট ধর্মের সাথে সনাতন ও ইসলামের মিল, কুরআনে সংষ্কৃত শব্দের পর্যালোচনা ও অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন বেদাত নিয়েও কথা বলা হয়েছে। বইটি শেষ হয় একজন মনসুর হাল্লাজ ও তার নির্মম মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
মানুষ ধর্মের জন্য, নাকি ধর্ম মানুষের জন্য - এই প্রশ্নটি নিয়ে আমি বহুদিন ভেবেছি, এবং ভেবে আমি সিদ্বান্তেই পৌছাই যে শেষোক্ত কথাটিই সঠিক। মানুষ না থাকলে ধর্ম থাকবে না, কিন্ত ধর্মহীন হয়েও মানুষ থাকতে পারে, সুতরাং 'মানুষ ধর্মের জন্য' কথাটির সাথে আমি একমত নই।
প্রতিটি ধর্মেরই একটি 'শুভ উদ্দেশ্য' রয়েছে, ধর্ম মানুষকে একজন বেটার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। প্রতিটি ধর্মই ভাল, প্রতিটি ধর্মই সুন্দর, প্রতিটা ধর্মই চেয়েছে শান্তি - যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা ধর্মকে নিজের আইডেন্টিটির শিকড়ে গেঁথে ফেলি। আরিফ রহমানের এম্পেথি সিরিজ সব ধর্মের গুডউইল নিয়েই শিক্ষা দেয়, আমাদের চিন্তা ভাবনাকে প্রসারিত করে এবং এই এম্পেথি সিরিজটি জীবন নিয়ে ভাবতে ইচ্ছুক যেকারো জন্য অবশ্যপাঠ্য। আমি রিভিউটি শেষ করছি আরিফ রহমানের ভাবার্থ অনুবাদ করা কবিতাটি দিয়ে -
অতিথিশালা / মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি
মানবজনমকে একটা অতিথিশালার সাথে তুলনা করা যায়। প্রতি সকালেই এখানে কোনো না কোনো নতুন অতিথি চলে আসে। কখনো আনন্দ আসে, কখনো হতাশা আসে। কখনো হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে 'বোধ' এসে দরজায় কড়া নাড়তে থাকে।
যারাই আসুক তাদের শুভেচ্ছা জানাও। দেখভাল করো তাদের। এমনকি যদি কখনো একরাশ দুঃখও আসে, তুমি ভয় পেয়ো না। তুমি খুব ভালো করে জানো, এই দুঃখ তোমার সুন্দর ঘরটির সমস্ত আসবাব ভেঙে চুরমার করে ফেলবে, তবুও সেই দুঃখকে তুমি হাসিমুখে স্বাগত জানাও। হয়তো তুমি জানোও না এই দুঃখ তোমার ঘরটাকে পরিষ্কার করতে এসেছে ভবিষ্যতের কোনো নতুন আনন্দকে জায়গা করে দেওয়ার জন্য।
সমস্ত কুৎসিত আর বাজে চিন্তারাও তোমার ঘরে বেড়াতে আসবে। তাদেরও হাসিমুখে আপন করে নিতে দ্বিধা করো না। যেই আসুক তার প্রতি কৃতজ্ঞ থেকো। কারণ যারাই তোমার ঘরে আসছে, জেনে রেখো, তাদের সবাইকে পাঠানো হচ্ছে কোনো একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে।
কমার্স কলেজে বাংলা পড়াতেন আজম স্যার। সময়টা তখন ২০০৪। আজম স্যার যে তরিকায় লেকচার দিতেন তা তখনকার জমানার জন্য ছিল বেশ অভিনব। কারণ ওভাবে তখন কোন স্যার লেকচার দিতো বলে আমার জানা ছিল না। আলাপ, বয়ান, বোঝাপড়া, বাহাস, জরুরত, রেটোরিক – এ ধরণের টার্মসের সাথে বাংলার বৃহত্তর ফেসবুক সমাজ/সোশ্যাল মিডিয়া সমাজ ভালোই পরিচিত। এগুলো বাংলার আপামর ইন্টেলেকচুয়াল, পাতি ইন্টেলেকচুয়াল ও ওয়ানাবি ইন্টেলেকচুয়ালদের পছন্দের টার্মস। আজম স্যারের কল্যাণে ��া আমরা ২০০৪ থেকে শুনে আসছি। আরিফ রহমানের বইয়ের ভাষারীতিও অনেকটাই এইরকম।
ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে, খানিকটা কথ্য, খানিকটা প্রমিত বাংলায় আরিফ রহমানের বইটা রচিত। এক সময় দারুণ আমোদ পেতাম এ ধরণের ভাষারীতি দেখে। তারপর এত জল গড়িয়েছে পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় যে এখন আর অত আমোদিত হই না। বরং ভ্রু একটু কুঁচকেই যায়। আবার কোন ওয়ানাবি ইন্টেলেকচুয়ালের পাল্লায় পড়লাম কিনা ভেবে!
বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে খুব কৌতূহল হচ্ছিল। সাথে নামটাও ছিল আগ্রহজাগানিয়া। মনসুর হাল্লাজের সত্য বলার শখ।
মনসুর হাল্লাজকে চিনতাম না। পরে হঠাৎ করে একদিন জানতে পারি। সুফি কবি হাল্লাজ ও তার অন্তিম পরিণতির কথা পড়ি। হাল্লাজ কিন্তু এ বইয়ের প্রধান চরিত্র নন। এ বই মূলত বিভিন্ন দার্শনিক চিন্তাচেতনার এক জগাখিচুড়ি। এক অদ্ভুত সুন্দর সম্মিলন। এখানে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আছেন, গৌতম বুদ্ধ আছেন, কৃষ্ণ আছেন, জরাথুষ্ট্র আছেন। আছেন নুহ (আঃ), ইবরাহিম (আঃ), গুরুনানক সহ আরো অনেকে। বারবার রুমি এসেছেন এখানে, কাহলিল জিবরান এসেছেন। এসেছে হরেক রকমের থিওরি। যে রকম আত্নবিশ্বাসের সাথে আরিফ রহমান বিভিন্ন থিওরির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, যুক্তি-পাল্টা যুক্তি পেশ করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
ভাষারীতি নিয়ে কথা বলেছিলাম। একটা জিনিস বলতে ভুলে গেছি। আর তা হলো লেখকের সাবলীলতা। তার অকপটতা, তার অকৃত্রিমতা। পুরো বই জুড়ে যথেষ্ট গুরুগম্ভীর আলোচনা চালিয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু একটিবারের জন্যেও তাকে কৃত্রিম মনে হয়নি, মনে হয়নি দুর্বোধ্য। ভাষায় এ ধরণের সাবলীলতা আনতে হলে যথেষ্ট এলেম থাকা লাগে।
একটা আপত্তি আছে যদিও। আর তা হলো লেখক আরিফ রহমান প্রায়ই মোটিভেশনাল স্পিকারের মত বয়ান দিয়ে গেছেন। বিশেষ করে ‘সম্পর্কের সিঁড়িতত্ত্ব’ চ্যাপ্টারটি রীতিমত যন্ত্রণাদায়ক লাগছিল। দাঁতে দাঁত চেপে অধ্যায়টা শেষ করতে হয়েছে।
তবে সবমিলিয়ে বইটা উপভোগ্য। চিন্তার খোরাক জোগায়। এ ধরণের বই খুব বেশি পড়িনি। আশা করি ভবিষ্যতে আরিফ রহমানের আরো বই পড়া হবে।
এই বইটা লেখকের এই সিরিজের আগের বই 'এটা আমার দর্শনের নোটখাতা নয়' এর বর্ধিত পাঠ বা এক্সটেনশন বলা যায়। কিন্তু বইটা ভালো হলেও খারাপ লাগল এই জন্যে যে এটা আগের বইটার বর্ধিতাংশই হয়ে রইল। আগেরটাকে ছাপিয়ে উঠতে পারল না। যেসব আনকোরা পাঠক লেখকের আগের বইটার মাধ্যমে এই আধ্যাত্মবাদ আর সহমর্মিতার যাত্রা শুরু করেছেন তাদের যাত্রায় আরো কিছু নতুন দরজা খুলে দেবার সুযোগ এই বইয়ের ছিল। কিন্তু লেখক শুধু পুরানো যাত্রাপথটাকেই আরেকটু সামনে টেনে নিয়ে গেছেন। তবে হ্যাঁ, আগের বইটার মত এই বইটাও তথ্যবহুল এবং প্রশ্ন জাগানিয়া। সেদিক থেকে লেখকের ক্রেডিট ষোলআনা।
বইয়ের জনরা এইটা একটা ফিলোসোফিক্যাল বই।কোনো বইয়ের একেকটা লাইন পড়ে নিজস্ব গন্ডির ভেতর ফিলোসোফিক্যাল টার্ম ব্যবহার করার চেষ্টা করে নিজের পান্ডিত্য জাহির করি নিজের কাছেই,আরে এ তো অমুকের এই থিউরি,এইটা তো অমুক ফিলোসোফার এর কথা!
এই বইটা আমি শেষ করেছি নিয়মিত শাটলে বসে,সর্বোচ্চ সময় ধরে পড়েছি চৌধুরিহাট স্টেশনে,এটা কোনো স্টেশন নয়।মূলত শাটলের জন্য দাঁড়িয়ে থাকাই উদ্দেশ্য,পাশে মসজিদ,রেললাইনের সামনে একটা পুকুর,পাশে ময়লার স্তুপ আর অসংখ্য কালো ধূসর রঙের কাক।দু একটা উপর দিয়ে উড়ে,আমি এ বইয়ের পৃষ্ঠা স্ক্রল করি।এমন পরিবেশে এই বই অদ্ভুত একটা নৌকায় করে আমারে নিয়ে যায় ফিলোসোফির জগতে,প্রথম গল্পটাও ঠিক এই ধাচেরই।একজন সাধু জীবনের অর্থ খোঁজার উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়ান দেশ কি বিদেশে।একদিন নৌকায় করে নদী পার হবার সময় দেখলেন এক মৃতদেহ,নৌক্কার সাথে ধাক্কা লেগে চলে গেল ঢেউয়ের সাথে।সাধু তাকিয়ে রইলেন,তিনি নৌকা ঘুরালেন নিজ শহরের উদ্দেশ্যে,তিনি জীবনের অর্থ খোঁজে পেয়েছেন। এই নৌকার ‘ৌ’ ধরে লেখক আমাদের নিয়ে যান থিসিয়াসের নৌকার কাছে,পাঁচদশক যাবত যে নৌকা নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান।রাজা বলেছিলেন নৌকা চিরকাল এথেনার ঘাটে বাধা থাকবে কিন্তু দিনকে দিন কাঠ খুলে পড়তে থাকে,রাজা বললেন রিপ্লেস করানো হবে,নতুন কাঠ দিয়ে রিপ্লেস করা হয়।এদিকে এক ব্যক্তি এসে পুরোনো কাঠ নিয়ে নিজের উঠানে নৌকা বানিয়ে দাবি করলেন থিসিয়াসের নৌকা মূলত আমার উঠানে।এখন বলেন কাকে বিশ্বাস করবেন? আমাদের জীবনও এমন প্রবহমান প্রসেস।আপনি অসংখ্যবার পরিবর্তিত হচ্ছেন।এমন ছোট্ট একটা গল্প দিয়ে লেখক স্মরণ করান ইয়েস্তেন গার্ডার রে,যার বইয়ের মাধ্যমে প্রথম ফিলোসোফির জগতে ডুকেছিলাম।নিজেকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ‘'আমি কে-Who am i ?’’ আসলেই তো,যা কিছু আছে তা কেবল আমার হাত পা মাথা ইত্যাদি অর্গ্যান,এখানের আমি কোনটা?আমাদের অসংখ্য পরিবর্তন পথ নেয় আমাদের আয়ুরেখা ধরে,মৃত্যুই চরম সত্য।এই মৃত্যু প্রসঙ্গে মাওলানা রুমি কি ভাবতেন তা নিয়ে রুমির কবিতার অনুবাদ করলেন লেখক,’কেন তোমার কাছে মনে হইলো কবরটাই সবকিছুর শেষে?যখন দিনের শেষে সূর্য অস্ত যায় কিংবা রাতের শেষে চাঁদ নাইমা যায় তখন কি তারা শেষ হইয়া যায়?’' রুমির এমন কবিতা নিয়ে আল্লামা ইকবালের মতো দার্শনিকেরা বলেছেন বিবর্তন তত্ত্ব কে রুমি বলতে চেয়েছেন প্রত্যাবর্তন।এসব কবিতার অনুবাদে লেখক সুফিজমের ভেতর পাকড়াও করেন আমাদের মস্তিষ্ক, বলেন sufi Whirling’’ নিয়ে।কেন সুফিরা ঘুরে ঘুরে নাচেন?পৃষ্ঠা উল্টানোর সাহস করি আমি,আমার আগ্রহ বেড়ে যায়,লেখক প্রবেশ করেন কম্পেরেটিভ রিলিজিয়ন এ,Buddism থেকে Islam, ঈশ্বর কিভাবে ‘'খালেক’ থেকে ‘'মালিক’ হয়ে উঠলেন!এমন সব নিবন্ধ বা প্রবন্ধে আটকে থাকে অনুসন্ধানী চোখ।কাহলিল জিবরানের বন্ধুত্ববিষয়ক কবিতার অনুবাদ পড়ি।পড়ি কোরআন এর কথা,মহাভারতের কথা,ধর্মে যে ভাষা ব্যবহার করি সেসব ভাষার উৎপত্তিস্থল,আস্তিক শব্দের ব্যাখ্যা ইত্যাদি ইত্যাদি।মনু থেকে নূহ কিংবা প্রাচীনতম জরাথুষ্ট্র,বুদ্ধ এবং মহানবী (সা.)।সংস্কৃত কিংবা আবেস্তার মিল অমিল সেসব বিষয়ক আলোচনার ভীড়ে খুজঁতে থাকি মনসুর হাল্লাজ কোথায়! বইটির নাম দখল করে আছেন যে ব্যক্তি সে বইয়ে আছেন অতি স্বল্প পরিসরে।যে পরিধিতে লেখক মনসুর হাল্লাজ সম্পর্কে লিখলেন তার দ্বিগুণ পরিধি জুড়ে ভেতরে রয়ে গেলে একটা কথা'ই মনসুর হাল্লাজ সম্পর্কে জানবো,মনসুর হাল্লাজ সম্পর্কে জানবো।মনসুর হাল্লাজের বিখ্যাত কথা দেকার্তের ‘Cogito,Ergu Sum” এর মতোনই।ইয়েস্তেন গার্ডার মনে করালেন Who am i? এসবের উত্তর মনসুর হাল্লাজ বলে গিয়েছেন - ‘আনাল হক’(আমিই সত্য)।হাল্লাজ ছিলেন সুফি,প্রশ্ন হলো আল্লাহর ৯৯ টি নামের মধ্যে ‘'হক’ নামটাও যেহেতু আছে সেহেতু নিজেকে সত্য দাবি করা মনসুর হাল্লাজের কথাটির মাধ্যমে খোদার সাথে শিরক করা।এইটুকু এনালজির কারণেই মনসুর হাল্লাজের মৃত্যু ঘটে।এই ঐতিহাসিক মৃত্যু থেকে লেখক কিছু অ্যানালাইসিস করলেন,মেশালেন কান্ট এবং নিটৎসের সাথে।প্রথমে তাঁকে পাথর মারা হয়,সবাই যখন পাথর মারতে থাকেন,তাঁর ওস্তাদ তাকে ফুল নিক্ষেপ করে বোঝালেন-’আমি তোমাকে ভালোবাসি’।আর এরপর কাটা হয় একেকটি অর্গ্যান।এমন সময়ও তিনি বলতে থাকেন- আনাল হক,আনাল হক….আমিই সত্য,আমিই সত্য। এমন অত্যাশ্চর্য বিষয় অতিক্রম করে লেখক অনুবাদ করলেন রুমির একটি কবিতা।��েষ লাইনটি এরকম- ‘কিন্তু প্রতিদিন সূর্যও তো ওঠে জ্বলন্ত নীরবতায়,তাকে তো সবাইকে জানান দিয়ে চলতে হয় না।’
কিছু কিছু বই ইচ্ছে করে সারাজীবন ধরে পড়ি। এসব বইয়ের সন্ধান দেয়া লোকজনকে শ্রদ্ধা🌷
প্রাণীগণ প্রত্যহ যমালয়ে যাচ্ছে, তথাপি অবশিষ্ট সকলে চিরজীবী হতে চায়, এর চেয়ে আশ্চর্য কী আছে?"
যক্ষ-যুধিষ্টিরের প্রশ্নোত্তর -বনপর্ব, মহাভারত
আমরা প্রতিদিন মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছি অথচ তাও বেঁচে থাকার কী এক আশ্চর্য প্রত্যয় নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠি। আরিফ রহমানের লেখা পড়তে গেলে আমি যে জিনিসটা অনুভব করি তা হলো আমার নিকটের কেউ যেন আমার সাথে কথা বলছে। এই কথা বলাটা আত্মিক। চিন্তা এবং চেতনা জগতে যে মনোভাব সুপ্ত অবস্থায় থাকে সেটাকে জাগ্রত করে দেন লেখক। এম্পেথির কথা বলতে গিয়ে প্রতিটা ধর্মের মধ্যে যে সৌন্দর্য এবং সৌহার্দপূর্ণ অনেক মিল আছে তা পাঠকের সামনে উন্মুক্ত করে দেন। যেমন মহাপ্লাবনের কথা যদি বলি তাহলে বিষয়টা বুঝতে আরো সহজ হয়। পৃথিবীতে বর্তমানে যে প্রধান ধর্মগুলো রয়েছে তাদের মধ্যে ইসলাম এবং হিন্দুধর্ম উল্লেখযোগ্য। হিন্দুধর্ম মতে ভগবান বিষ্ণু একবার রাজা মনুকে এক মহাপ্লাবন সম্পর্কে সতর্ক করে দেন। সেই প্লাবন থেকে বাঁচার জন্য মনু বিশাল নৌকা তৈরি করে তাতে নিজের পরিবার, নিজে এবং অপরাপর প্রাণীকূল নিয়ে নৌকা ভাসান। আর সেই নৌকাকে রক্ষা করেন ভগবান বিষ্ণুর মৎস অবতার। ঠিক কাছাকাছি ঘটনা ইসলাম ধর্মেও দেখা যায়। যেখানে নুহ নবী ঈশ্বরের নির্দেশ অনুসারে একটি বিরাট জাহজ নির্মাণ করেন এবং বিশ্বাসী ও পশুপাখিদের রক্ষা করেন। ঠিক একই গল্প পাওয়া যায় যেসব ধর্ম পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গিয়েছে তাদের গল্পেও। গ্রীক পুরাণে, নর্স পুরাণে, ব্যাবিলনীয় পৌরাণিক কাহিনি ছাড়াও আরো অনেক পুরাণে। এই যে কাছাকাছি অনেক গল্প একসাথে চলে আসছে সবগুলো গল্পকে একই রেখায় নিয়ে এসে লেখক বোঝার চেষ্টা করলেন তখন সত্যি হয়তো একটি মহাপ্লাবন সংঘটিত হয়েছিলো এবং তা থেকে নিশ্চয় কেউ উদ্ধার করেছিলেন।
এই যে লেখক বারবার প্রেমের কথা বলছেন, সহমর্মিতার কথা বলছেন, দুঃখ এবং ভগবান বুদ্ধের কথা বলছেন এতে আসলে হচ্ছেটা কী? এই প্রশ্নবাণে নিজেকে জর্জরিত করেছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে লেখকের এম্পেথি সিরিজের লেখাগুলো কী আসলেই ব্যক্তি মনে প্রভাব বিস্তার করবে? এক ধর্মের মানুষরা অন্য ধর্মের প্রতি যে বিদ্বেষ পুষে রাখি তার কতটাই বা কমছে? হয়তো অনেকের মনেই প্রভাব রাখে, আর এই বর্তমান অবস্থায় যদি একজন মানুষও সম্প্রতি, সহমর্মিতা এবং অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোন নিয়ে আশেপাশের পরিবেশকে দেখতে শুরু করে তাতেই অনেককিছু পরিবর্তন হবে আশা করা যায়। যদিও লেখক বলছেন এই লেখাগুলো আসলে নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়া কিন্তু সেটা ততক্ষণই যতক্ষণ তিনি নিজের কাছে গচ্ছিত রাখছেন। যখন নিজের বোঝাপড়াকে সবার সামনে নিয়ে আসছেন তখন সেই বোঝাপড়াতে যোগ দিচ্ছি আমরা পাঠকরাও। অনেকক্ষেত্রে তার বোঝাপড়ার সাথে নিজের চিন্তাভাবনা যোগ করে তাল মেলাচ্ছি আবার কিছু জায়গায় অমিলও থেকে যাচ্ছে। বইটার নামটা খুব মজাদার। "মনসুর হাল্লাজের সত্য বলার শখ"। তো মনসুর হাল্লাজ আমার অপরিচিত ছিলেন। তিনি জনপ্রিয় তার বিখ্যাত মতবাদ কিংবা দাবী " আনাল হক" এর জন্য। যার অর্থ, "আমিই পরম সত্য"। আরো ভেঙে বললে আমি পরম সত্য কিংবা স্রষ্টার সাথে মিলিত হয়ে গিয়েছি। বিখ্যাত সুফী সাধককে তার এই বাণীর জন্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়েছিলো। মনসুর হাল্লাজের এই বাণী তৎকালীন সময়ে ভুলভাবে আলোচিত হওয়ার কারণে তার পরিণতিও করুণ হয়।
When I read this book I thought that I would write a good review about this book and I should though because I loved it so much the whole time I read it. But I don’t know when I finished it I didn’t dare to write anything because it is kinda the end of the year and I feel like I should read more instead of writing a review, though it’s not working. Haha! This book is kind of a sequel of this writer another book called ‘ এটা আমার দর্শনের নোটখাতা নয়’, so things are kinda detail here and lots of new things comes. I love the way writer shows up the different perspectives. I marked lots of quotes from this book because I find those so truthful and great. I think it’s kind of a fun reading book like worth it. If you just have a cup of tea and think you need something interesting and at the same time knowledgeable then of course this book is for you. Happy reading . I’m sure this book will help to think with different perspectives the same thing !