লোকগল্পের সারল্য আর আধুনিক গল্পের নিরীক্ষা মিলিয়ে শাহাদুজ্জামান নির্মাণ করেছেন তার নিজস্ব ধারার গল্পসাহিত্য। তার আপাত নিরীহ গল্পের শরীরে চোরাস্রোতের মত বহমান থাকে জীবনের দুর্জ্ঞেয় উৎকণ্ঠা। তার গল্পের দেয়াল ভেঙ্গে কখনো ঢুকে পড়ে কবিতা বা প্রবন্ধের বাসিন্দারা। স্বকীয় গদ্যশৈলীতে লেখা শাহাদুজ্জামানের গল্প পাঠ তাই এক স্বতন্ত্র সাহিত্য-অভিজ্ঞতা।
এই বইতে লেখকের দশটি গল্প সংকলিত হয়েছে।
গল্পের তালিকা: • অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প • ৩০৬ নম্বর বাস • মান্না দে • মুরাকামির বিড়াল • গোয়েন্দা ঘরানার গল্প • পৃথক পৃথিবী • সাইপ্রাস • অপুষ্পক • রফিকের নোট বই • সাড়ে সাতাশ
Shahaduz Zaman (Bangla: শাহাদুজ্জামান) is a Medical Anthropologist, currently working with Newcastle University, UK. He writes short stories, novels, and non-fiction. He has published 25 books, and his debut collection ‘Koyekti Bihbol Galpa’ won the Mowla Brothers Literary Award in 1996. He also won Bangla Academy Literary Award in 2016.
এ সময়ের গল্পকারদের মধ্যে শাহাদুজ্জামানের প্রতি আমার পক্ষপাত আছে। তার ‘কয়েকটি বিহবল গল্প’ বা ‘পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। প্রায় প্রতিটা গল্পেই শাহাদুজ্জামান সেখানে চেষ্টা করেছিলেন গল্প বলার প্রচলিত ছকগুলো লোগেসেটের মতো খুলে নিজের মতো করে জোড়া লাগাতে। সেই সাথে জীবনানন্দের সাথে ভীষণ ভাবে সমাপতিত তার ভাষারীতিও দাগ কেটেছিলো মনে। মাওলা থেকে প্রকাশিত ‘অন্য এক গল্পকারের নিয়ে গল্প’ বইটি তাই কিনেছিলাম আগ্রহ নিয়েই।
জীবনানন্দের কথা বলছিলাম। কাকতাল হতে পারে, তবে দেখা গেলো বইয়ের দশটি ছোটগল্পের মাঝে প্রথমটিই জীবনানন্দের একটি অপ্রকাশিত গল্প নিয়ে। সংকলনের নামগল্পও এই প্রথম গল্পটি। এভাবে অন্য এক গল্পকারের আলোচনা দিয়ে শুরু হওয়া বইটির প্রায় প্রতিটি গল্পেই গল্পকার চেষ্টা করেছেন নিজ সাক্ষর রাখতে। আমার ভুলও হতে পারে, তবে মনে হয়েছে সাক্ষর করতে গিয়ে লেখক যেন একটু বেশিই সচেতন ছিলেন এই বেলা- যে কারণে নতুন কোনো ভাবে আলোড়িত হতে পারেনি গল্পগুলো পড়ে। অর্থাৎ গল্পগুলো চমৎকার, কিন্তু ওরা জ্বলে ওঠে না নিজের আলোয়- বরং মনে হয় পুরোনো কোনো গল্পই যেন পড়ছি শাহাদুজ্জামানের।
এই আক্ষেপটুকু বাদ দিলে বইটা বেশ ভালো লেগেছে। ‘গোয়েন্দা ঘরানার গল্প’, ‘পৃথক পৃথিবী’, ‘অপুষ্পক’- এই গল্পত্রয়কে বিশেষ উল্লেখ্য মনে হয়েছে আমার। আর অতি অবশ্যই, বলতেই হয় রমণীয় সব নামকরণে গল্পকারের পারঙ্গমতার কথা। সব কিছু ছাপিয়ে সংকলনটি থেকে এই দুর্দান্ত নামকরণগুলোই মনে পড়ে যায়। পাঠকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ‘মান্না দে’ বা ‘সাইপ্রাস’ গল্পগুলো সাক্ষী দিয়ে যাবে এই প্রতিপাদ্যটির।
সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে শাহাদুজ্জামান আমার প্রিয় একজন লেখক। তাঁর লেখাগুলো ভিন্ন ধাঁচের। বিশেষ করে শব্দচয়ন এবং বাক্য গঠনে তিনি অন্য এক মাত্রা যোগ করেছেন। ইঙ্গিতপূর্ণ বা প্রবন্ধ ধরনের গল্পগুলো পাঠককে চিন্তার খোরাক জোগায়। 'অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প' বইটির নাম শুনে পাঠক মনে করতে পারেন বিভিন্ন লেখকের গল্প নিয়ে লেখাগুলো। মূলত অন্যান্য লেখকদের উপস্থিতি থাকলেও শাহাদুজ্জামান তাঁর নিজের গল্পগুলোই উপস্থাপন করেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। বইটিতে মোট ১০ টি ভিন্নমাত্রার গল্প রয়েছে।
অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প
ঈদ সংখ্যার জন্য একটি নতুন গল্প লিখে লেখক তাঁর বন্ধু মিলনকে জানান। কিন্তু মিলন বলে, এই যে সবসময় নতুন লেখা প্রকাশ করা এতে একটা অহংবোধ আছে। এর চাইতে বিভিন্ন লেখকের লেখা পড়ে আত্মস্থ করাতেই বেশি লাভ। তাই লেখক আর তর্কে না গিয়ে মিলনের পড়ালেখা নিয়ে জিজ্ঞাসা করে। মিলন ও লেখক জীবনানন্দ দাশের একটি ছোট গল্প নিয়ে আলোচনা শুরু করে। আশি বছর আগের একটি গল্প নিয়ে সংলাপের মাধ্যমে আলোচনা আগায়। গল্পটির কোনো নাম নেই। কারণ জীবনানন্দের অধিকাংশ গল্পের নাম মৃত্যুর পর সম্পাদকেরা দিয়েছিলেন। গল্পটির দুইটি চরিত্র; সুহৃৎ ও আভা। সম্পর্কে তারা ভাইবোন। সুহৃৎ লন্ডনে আইসিএস পড়তে গেলেও ক্রমাগত ফেইল করতে করতে কোনোরকমে একটি ডিপ্লোমা নিয়ে কলকাতায় ফেরত এসেছে। অন্যদিকে আভা বিএ পাস করে বিটি করছে। দুই ভাইবোনের আলাপচারিতায় তাদের মনোভাব, চিন্তাভাবনা, জীবনদর্শন উঠে আসে। আর এদিকে নিজের গল্প বাদ দিয়ে অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প ফেঁদেছেন শাহাদুজ্জামান।
মুরাকামির বিড়াল
জাপানিজ সাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন! মুরাকামির সাথে প্রায়ই একটি বিড়ালের দেখা হতো। সেই বিড়াল মাঝেমধ্যে মুরাকামিকে গল্প বলে দিত। তো যাই হোক গভীর রাতে বন্ধু ফারুকের স্ত্রী যখন জানায়, ফারুক তখনো বাসায় ফিরেনি তখন লেখক চিন্তিত হয়ে যান। খোঁজ নিয়ে জানাবেন সেই আশ্বাস দিয়ে তিনি ফোন রেখে দেন। কিন্তু বন্ধুকে খুঁজে পান না। তখন লেখকের মনে হয় দুই সপ্তাহ আগে ফারুক অদ্ভুত এক ইমেইল করেছিল তাঁকে। তিনি সেটা বের করে পড়তে শুরু করেন। এবং জানতে পারেন মুরাকামির সেই বিড়ালের কথা। কিন্তু জাপানের বিড়াল মহাখালী কীভাবে আসলো?
গোয়েন্দা ঘরানার গল্প
রহস্য রাণী আগাথা ক্রিস্ট্রির 'মার্ডার ইন দি ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস' পড়েছেন? সেখানে যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় তার সন্দেহভাজন তালিকায় ছিলেন অনেকেই। তেমনই একটি গল্প শুনিয়েছেন লেখক। গল্পের পটভূমি বাংলাদেশের একটি গ্রাম গাডুইডাঙ্গায়। দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করা বজলু-হেলেনা দম্পতির পরিবারে শুধু বৃদ্ধ শ্বশুর হবিবর মিয়া আছেন। হেলেনা নর্মাল প্রাইমারি স্কুলে পড়লেও বজলু অশিক্ষিত। হেলেনা যখন গর্ভবতী হয় তখন সে টিটেনাসের টিকা নিতে চায়। অথচ অশিক্ষিত স্বামী ও শ্বশুর নিতে দেয় না। যা পরবর্তীতে কাল হয়ে দাঁড়ায়। আপাতদৃষ্টিতে গোয়েন্দা ঘরানার কিছু না থাকলেও সমাপ্তিতে লেখক যে মুন্সিয়ানার প্রমাণ দিয়েছেন তা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য।
অপুষ্পক
সন্তান জন্ম দিতে না পারায় রাজার প্রথম ছয় রানির বনবাসের গল্প সবারই জানা। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের কী হয় সেই প্রশ্ন থেকেই গবেষণায় নামে মাহজাবীন। গ্রামের সন্তানহীন মহিলাদের জীবনের গল্পগুলো সংগ্রহ করতে শুরু করে। কান্দিরপাড় গ্রামের রিজিয়া বেগমের বিয়ে হয়েছে চার বছর। কিন্তু কোনো সন্তান না হওয়ায় সবাই তাকে 'বাঞ্জা' বলে। স্বামী সামসু তাকে কিছু না বললেও শ্বাশুড়ি উঠতে বসতে কথা শোনায়। সন্তানহীন একজন নারী ফলহীন গাছের মতো সকলের কাছে। ফলহীন গাছকে যেভাবে উপড়ে ফেলে মানুষ, তেমনিভাবে সন্তানহীন নারী থেকে নিস্তার পেতে চায় সবাই।
সাড়ে সাতাশ
লেখকের রাইটার্স ব্লক হয়েছে। কিছুতেই গল্প লিখতে পারছেন না। এই গল্পটি লেখার আগে সাতাশটি গল্প লিখেছেন। এই গল্পে তিনি তার পূর্ববর্তী গল্পগুলোর বিভিন্ন চরিত্রগুলোকে সামনাসামনি বসিয়ে কথা বলেছেন। সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই গল্পটির নাম দিয়েছেন 'সাড়ে সাতাশ'।
শাহাদুজ্জামানের লেখা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। একেকটি গল্প একেক রকমের। ভিন্ন ভিন্ন ঘরানার হওয়াতে একই বইতে বৈচিত্র্যময় চিন্তা করতে পাঠককে বাধ্য করেন তিনি। সুন্দর বইটির স্বাদ নিতে আগ্রহী পাঠক পড়তে পারেন। হ্যাপি রিডিং।
শাহাদুজ্জামান সাহেবের সাথে আমার পরিচয় "মামলার সাক্ষী ময়না পাখি" বইটার মাধ্যমে। আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম বইটা পড়ে। শাহাদুজ্জামান সাহেবের লেখা এমন যে, পড়তে বসলে আর ছাড়তে ইচ্ছে করে না। একজন লেখকের চিন্তা যে কতোটা গভীর হতে পারে সেটার প্রমাণ সেখানেই পেয়েছিলাম। বইটা পড়েই আমি তার ফ্যান হয়ে গেছিলাম। এখনো সেই বইটা আমার সুখস্মৃতি হয়ে আছে। যাইহোক, ওদিকে আর না যায়। এই বইয়ের ব্যাপারে অর্থাৎ যেটার রিভিউ লিখছি সেই বইয়ে ফিরে আসি এবার।
আজকে শেষ করলাম "অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প" বইটা। বইটার টাইটেলটাই অদ্ভুত না? অন্য একজন গল্পকারের গল্পকে কেন্দ্র করে আবার গল্প। হাহা! আসলেও কিন্তু তাই।
এই বইটার প্রথম গল্প লিখা হয়েছে মূলত জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে। আমি গল্পটা পড়ে তাব্দা খেয��ে বসেছিলাম। এতো সুন্দর প্রেজেন্টেশন হয়তো শাহাদুজ্জামান দ্বারাই সম্ভব। শুধু এই গল্পটাই না প্রত্যেকটা গল্পের প্রেজেন্টেশন ছিলো নজরকাড়া। দশটা গল্প নিয়ে সাজানো এই বই। দশটা গল্পই ছিলো ভিন্ন ভিন্ন৷ হ্যাঁ, প্রত্যেকটা গল্পই যে একদম টপ নচ তা বললে ভুল বলা হবে। ভালো গল্প আর এভারেজ গল্প নিয়েই বইটা। তবে ধরে রেখেছিলো, শাহাদুজ্জামান সাহেবের প্রেজেন্টেশন। আহা! লেখা পড়েই যেনো মুগ্ধ হতে হয়।
সবমিলিয়ে, বেশ ভালো সময় কাটলো বইটার সাথে। ভালো লেগেছে।
‘কয়েকটি বিহ্বল গল্প’ আর ‘পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ’ এর তুলনায় যথেষ্ট লঘু মানের গল্পগ্রন্থ। আসলে শাহাদুজ্জামান আগের গল্পগ্রন্থগুলো দিয়ে বার এত উপরে সেট করে দিয়েছেন যে নিজেই সেই সেই উচ্চতায় যেতে পারছেন না। তবুও এই বইয়ের ‘৩০৬ নং বাস’ গল্পটা আমার অলটাইম ফেভারিট গল্পের তালিকায় যুক্ত হয়ে গেল। কিন্তু ওভারঅল স্লাইটলি ডিসাপয়েন্টিং। গুডরিডসের রেটিং করার এই এক জ্বালা৷ ৪ তারা দিতে ইচ্ছা করছে না, আবার ৩ তারা দেওয়ার মতো বইও না। ৩.৫ স্টারই উপযুক্ত এই বইয়ের জন্য।
"অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প" নামটা দারুন না? একটা কথা প্রচলিত আছে, আগে দর্শনদারি তারপর গুনবিচারি। অর্থাৎ প্রথমে একটা মানুষের চেহারা দেখে জাজ করা হয়, পরে তারসাথে মেলামেশা করতে করতে তাকে চেনা যায়। তেমনি একটা বই এর ক্ষেত্রে প্রথমেই বইয়ের নাম ও প্রচ্ছদ চোখে পরে, পড়ার পরে না বিচার করা যায় বইটা কেমন। বইয়ের নাম যদি চোখ না টেনে ধরে তাহলে হয়তো বইটা পড়াই হয় না। যদিও বলে চেনা বামুনের পৈতা লাগে না তেমনি শাহাদুজ্জামান আমার প্রিয় লেখক তাই উনি যদি "কুদ্দুস মর্জিনার প্রেমকাহিনী" নামে বই লেখে সেটাও আমি পড়বো, তবুও বলবো এই বইটার নাম আমাকে দারুন ভাবে আকর্ষণ করেছে।
"অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প" এ প্রজন্মের ধারালো কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের ছোট গল্প সঙ্কলন। ১০ টি গল্প স্থান পেয়েছে এই সঙ্কলনে। নাম গল্পটি জীবনানন্দ দাসের একটি অপ্রকাশিত ছোট গল্প নিয়ে লেখক ও তার বন্ধুর আলোচনা। এই আলোচনা কে লেখক গল্পের ছলে তুলে ধরেছেন। লেখকের জীবনানন্দ প্রীতি সম্পর্কে যারা তার লেখা পড়েছেন তাদের ধারনা আছে।
সঙ্কলনের সেরা গল্প আমার মতে "গোয়েন্দা ঘরানার গল্প"। গল্পে লেখক একটি বাচ্চার খুনের বেদনাতুর ঘটনা তুলে ধরে গোয়েন্দা হওয়ার ভার পাঠকের উপরে ছেরে দিয়েছেন। খুনি কে বা কারা পাঠককে বের করে নিতে হবে। কাকে খুনি বলবো আমি? বাচ্চার বাবা? নাকি দাদা? নাকি মা? নাকি সমাজ ব্যবস্থা? নাকি রাষ্ট্র? আমি ও কি কিছুটা দায়ী হই না এই সমাজের এই রাষ্ট্রের অংশ হয়ে?
"মান্না দে" শীর্ষক গল্পে লেখক সামাজের এক ভন্ড রুপের মুখোশ ধরে হ্যাচকা টান মেরেছেন। গল্পের শেষে মান্না দের চিরায়ত গানের কয়েক কলি বুকে কাঁপন ধরায়।
"কত দূরে আর নিয়ে যাবে বলো কোথায় পথের প্রান্ত ঠিকানা হারানো চরণের গতি হয় নি কি তবু ক্লান্ত? পিছনের পথে উঠেছে ধূলির ঝড় সমুখে অন্ধকার"
"পৃথক পৃথিবী" শীর্ষক গল্পে আমি বার বার ভিমড়ি খেয়েছি, ভেবেছি কোথায় যাচ্ছেন লেখক? ভাবতে পারিনি এভাবে শেষ করবেন। "অপুস্পক" শীর্ষক গল্পে উঠে এসেছে আমাদের চিরায়ত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থা, উঠে এসেছে সন্তানহীনা নারীর প্রতি সমাজের, পরিবারের করা নির্মম অত্যাচারের চিত্র। একটা গল্প আমার কাছে একটু দুর্বল লেগেছে, "মুরাকামির বেড়াল" আসলে আমি বুঝিনি, লেখক ঠিক কি বোঝাতে চেয়েছেন আমি বুঝতে পারিনি।
সব মিলিয়ে একটা সফল ছোট গল্প সঙ্কলন বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত আগের ধারণাটাই ঠিক হল। বইটা সম্পর্কে একমাত্র ভালো লাগলো তার নামটা। বাকিটা তেমন কিছু না। বোধহয় ভুল বই দিয়ে শাহাদুজ্জামানের লেখা পড়া শুরু করলাম। আর বই এর শেষ গল্প পড়তে গিয়ে তো মাথায় হাত। উনার aগের গল্পগুলোর চরিত্রর একটা সারমর্ম যেন। এখন আগের গল্প গুলো পড়তে গেলে তো মনে হবে যে - এটা তো জানি। খুব খারাপ লেগেছে একথা বলব না। কিন্তু কোন গল্পই মনে দাগ কাটতে পারেনি। গোয়েন্দা ঘরানার গল্প আর রফিকের নোট বই ভালো লেগেছে। কিন্তু সেরকম কোন এফেক্ট ফেলতে পারে নাই। হ্যা , কিছু কিছু লাইন ভাবতে বাধ্য করেছে। কিন্তু তা হাতে গোণা। দু -একটা গল্প পরে রিতিমত বিরক্ত লেগেছে। নাহ, আসলেই 'কয়েকটি বিহ্বল গল্প' দিয়ে শুরু করা উচিত ছিল। পরিশেষে অভিব্যাক্তি -হতাশ। সামনে ক্রাচের কর্ণেল পড়ব। আশা করি ধারণা পাল্টাবে।
শাহাদুজ্জামানের লেখা এমন যে,পড়তে বসলে খালি হাতে ফেরার উপায় নেই। কিছু না কিছু বিশেষ থাকবেই,যা ভরিয়ে তুলবে মনের কুঠুরি । তবে কথাটা পরিমাণ নিয়ে,কখনো কম কখনো বেশি।
"অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প" বইয়ে প্রথম গল্পটা ছাড়া আর অন্য গল্পগুলো কম ভালো লেগেছে। তবে কোন গল্পই খারাপ লাগেনি। প্রত্যকটা লেখা খুব উৎসাহ নিয়েই পড়েছি। ভালোই।
পাঠক শুধু "রিডার্স ব্লক" এ থাকেন না মাঝে মাঝে লেখক থাকেন "রাইটার্স ব্লক" এ। "কয়েকটি বিহ্বলতার গল্প" ও "পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ" গল্পগ্রন্থ দুটি লেখার পরে তেমনই এক পর্যায়ে ছিলেন লেখক শাহাদুজ্জামান। আধখানা এক গল্প লিখে আবার শুরু করেন লেখালেখি টা তবে সে অনুপ্রেরণা ছিলো তেমনই আধখানা এক সিনেমা।
অন্য লেখকের কোন গল্প নিয়ে আলোচনা হতে পারে কিন্তু সেই গল্পের আলোচনা নিয়ে নতুন কোন গল্প হতে পারে এটা অবশ্যই ব্যতিক্রম একটা প্রেক্ষাপট, গল্পের প্রেক্ষাপট অন্য একজন লেখকদের লেখা গল্প এবং সেই গল্পের চরিত্র। লেখক শাহাদুজ্জামান এর লেখা মানে আলাদা রকম কিছু, তা এই গল্পগ্রন্থেও বিদ্যমান। বিচিত্র কিছু বিষয়ের উপরে গল্প গুলো লেখা। অন্য লেখকের গল্প, সামাজিক সমস্যা, মনস্তাত্ত্বিক বিষয়, কিছু চরিত্রের সাথে লেখক নিজেও সমান ভাবে উপস্থিত গল্পের মাঝে, তাছার নিজেরই জীবনের কোন এক ক্ষুদ্র খন্ড মুহূর্তও গল্পের বিষয়বস্তু।
"অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প" বরাবরের মতই লেখকের অন্য সব লেখার মতই প্রবল ভালোলাগায় পূর্ণ।
কয়দিন যাবৎ পড়ায় মন নেই। অফিসের সব কাজ করোনা কেন্দ্রিক। সামাজিক ও প্রচার মাধ্যম করোনা কেন্দ্রিক। মেয়ে মন ভালো রাখার জন্য বই পড়তে বলে। পড়লাম একটা বই। আবার বইয়ের লেখককে ইমেইলও করলাম! কেমন করলাম? আমার ইমেইলটি পড়ে দেখুন। উত্তর পাইনি এখনো। কেন লেখককে ইমেইল করলাম? আসলে যা মন চাইলো তাই করলাম।
কথাশিল্পী শাহাদুজ্জামান,
আমি করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কোন বই পড়ব নিয়ে ভাবতে ভাবতে ড্রয়িং রুমে ছেলেমেয়ে ও পুত্রবধূর টেবিলে রাখা অনেকগুলো বই থেকে "অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প" বইটি তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করি।
আপনার এ বই পড়লে ছোটগল্পের আঙ্গিক নিয়ে তত্ত্ব পড়ার প্রয়োজন নেই। একেকটা গল্প ভিন্ন রকমের আঙ্গিকের উদাহরণ।
"অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প” টি পড়ে জীবনানন্দ নিয়ে আপনার "একজন কমলালেবু"র কথা মনে পড়লো। গল্পের কৌশলটিতে ভাই বোনের কথোপকথনে আভার বিভিন্ন চাকরি ও স্থান নিয়ে তার বিশ্লেষণ এবং জেন্ডার বিষয়টি চমৎকার ফুটে উঠেছে।
তবে এখানে বোন আভার মাধোমে আপনি গতানুগতিক নারী জীবনের চূড়ান্ত আকাংঙ্ক্ষার প্রতিফলন করতে গিয়ে একটু যেন আগের আভাকে মেরে ফেলেছেন। “৩০৬ নম্বর বাস ” পড়ার সময় যেন লংবেটন স্ট্রিট বাসস্টপে আমিই দাঁড়িয়েছিলাম। নিউক্যাসল এয়ারপোর্ট আর গোবিন্দগঞ্জের জীবন যে একসূত্রেই গাঁথা। আমি বিমোহিত। “মান্না দে” গল্প পড়ে করোনার মধ্যে ভারতেশ্বরী হোমসের মেয়েটি তথা এ মেয়েগুষ্ঠির জন্য অন্তর্জ্বালায় জ্বলছি।
“মুরাকামির বিড়াল” এর পিছু পিছু আমিও ছুটেছি, আমরাও ছুটি। তবে সবাই ছুটলে মন্দ হতো না! ”গোয়েন্দা ঘরনার গল্প” আমাকে পোড়াচ্ছে। ইদানিং করোনার প্রাদুর্ভাবের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত এলাকায় (লামা,বাঘাইছড়ি, দীঘিনালা) হামে বেশ কয়েকজন শিশু মারা গেছে। চাকরিসূত্রে নিজেকে খুনী মনে হচ্ছে। “পৃথক পৃথিবী” বাবা ও মেয়ের শারীরিক পার্থক্যটি অভিনব উপায়ে উপস্থাপন করেছেন। আপনি যে একজন সুদক্ষ জেন্ডার বিশেষজ্ঞ এর প্রমাণ রাখলেন। “সাইপ্রাস” গল্প হলো সমসাময়িক বাংলাদেশের চিত্র। “অপুষ্পক “ এর বিষয় বৈচিত্র্য ও ঘটনার নাটকীয়তার সাথে মাহজাবীনের সন্তান নিয়ে নিজের জীবন পরিকল্পনা নারীবাদকে বুঝাতে সহায়ক।
“সাড়ে সাতাশ” আপানার অন্য কোন আত্মজৈবনিক বইয়ে দিলেই ভালো হতো । আমাদের ড্রয়িং রুমে টেবিলে আপনার আরেকটি বই “আমার দীপেশ আবিষ্কার” বইটি একটু উল্টেপাল্টে দেখেছি। এখনো পড়া হয়নি। ঐ বইয়ে দিলেও পারতেন।
আপনার আরও অনেক বই পড়েছি। আমার এক সহকর্মী আপনার অত্যন্ত ভক্ত । আমি পড়তাম । কিন্তু প্রিয় ছিলেন না। এই "অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প” পড়ার পর আপনাকে প্রিয় কথা সাহিত্যিকরের মধ্যে নিলাম প্রিয় কথাশিল্পী শাহাদুজ্জামান।
বিঃদ্রঃঃবইয়ের ফ্লেপে আপনার ইমেইল ঠিকানা পেয়ে আপনাকে লেখার লোভ নিয়ন্ত্রণ করলাম না। কারণ এ মুহূর্তে আমার পাঠ প্রতিক্রিয়া কোথাও না কোথাও প্রকাশ করতে চাই। কিন্তু করোনার জন্য অন্য কোথাও দিতে মন সায় দিচ্ছে না।
প্রথমেই যেই জিনিসটার কথা মনে হলো, তাহলো বানান-প্রমাদ, ব্যাপারটাকে স্রেফ মুদ্রণ দোষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে ইচ্ছা করছে না, লেখক নতুনধারার কোন বানানরীতি অনুসরণ করতে চান কিনা জানি না, তবে লেখক না হলে প্রকাশক যে কোন একজনকে অন্তত একই বানানই নানানরীতিতে লেখার দায়টা কিছুটা হলেও দিতে হয়!
গল্পগুলো নিয়ে মিশ্র অনুভূতি হয়েছে। ভালো লাগেনি এমন না, '৩০৬ নম্বর বাস' আর 'গোয়েন্দা ঘরানার গল্প'বেশ ভালো লেগেছে। 'অপুষ্পক' পড়ে বেশ বিরক্ত লেগেছে, 'গবেষকের' মেমো বদলে 'ডায়েরি' হয়তো মানাতো, বর্ণনা লাফ দিয়ে প্রথম পুরুষ থেকে তৃতীয়তে চলে গেছে ঐ 'মেমো'র শেষের দিকে, আর থিমটা পুরাতন। 'সাড়ে সাতাশ'কে এই বইতে রাখা ঠিক হয়নি মনে হয়েছে, লেখাটা 'চিন্তাভাবনা'র কাতারে ফেলা যায়, লেখকের আত্মচিন্তার কোন বই হলে তাতে সংকলিত হলে বেশি ভালো হতো।
শাহাদুজ্জামানের গল্প আগে পড়িনি, অনেকটা এ কারণেই 'সাড়ে সাতাশ' গল্পটা (?) শেষ করিনি, তাহলে আর আগের গল্পগুলো পড়ার মনে হয় মানে হতো না, এমনিতেই অর্ধেক পড়ে অর্ধেক গল্পের বিষয়বস্তু বা চরিত্রদেরকে জানা হয়ে গেল মনে হয়েছে। ইংরেজি শব্দের বাহুল্য কিছুটা বিরক্তি এনেছে, যদিও কথোপকথন বা এমন শব্দ আসতে পারে, তবে ব্যাপারটা কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে, যেন চরিত্ররা জোর করে শব্দগুলোকে কথার মাঝে ঢোকাচ্ছে। হয়তো সকলের কাছ থেকে প্রশংসা শুনে পড়তে শুরু করাতেই সামান্য আশাভঙ্গ হয়েছে। যাই হোক, আরও পড়বার পরে হয়তো পাঠক হিসেবে কিছু একটা ধারণা নেয়া যাবে। 'কয়েকটি বিহ্বল গল্প' শুরু করেছি পড়তে, দেখা যাক, প্রথমদিকের লেখা কেমন লাগে।
বর্তমান সময়ের নন্দিত লেখক শাহাদুজ্জামানের "কয়েকটি বিহব্বল গল্প" দিয়ে আমার তার লেখার সাথে পরিচয় ঘটে। কোন একটা কারণে ঐ বইটা এখনো পড়ে শেষ করতে পারিনি। এর মাঝেই, এই "অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প" বইটা উপহার পাই। পড়তে শুরু করি এবগ্ন সত্যি বেশ কিছু ক্ষেত্রে মুগ্ধ হয়েছি।
বইটা মুলত লেখকের ১০টি ছোট গল্পের সঙ্কলন। এইগল্পগুলোতে অন্য লেখকদের কথা রয়েছে, রয়েছে অন্য লেখকদের ছায়াও। ১০টি গল্পের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হল "অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প"। এই ছোট গল্পটি মূলত জীবনান্দ দাশের একটা ছোটগল্পের এনালাইসিস যেটা কিনা শাহাদুজ্জামান তার মুন্সিয়ানায় একটা ভিন্নরুপে পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছেন। গল্পটা পড়ে আমার নিজেরও জীবনান্দকে আরো জানার ইচ্ছা জেগেছে। আরেকটা সুন্দর গল্প "পৃথক পৃথিবী", যা মূলতঃ আমাদের বর্তমান সময়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী-পুরুষের পৃথক জগতকে তুলে ধরেছে। "গোয়েন্দা ঘরানার গল্প" নামক গল্পটই সমাজবিজ্ঞান ও পাবলিক হেলথের শিক্ষার্থীদের খুবই ভালো লাগবে। "মান্না দে" নামক গল্পটি আমাদের সমাজে প্রচলিত মিথগুলোর আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রভাবকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
দোকানে বইয়ের খাঁজে খাঁজে জীবনানন্দের উপন্যাস খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ শাহাদুজ্জামানের এই বইয়ের সাথে সাক্ষাৎ, টু-রিড লিস্টে যা অনেকদিন যাবৎ ছিল। কাকতালীয়ভাবে, বইটি খোলা মাত্র প্রথম গল্পেই জীবনানন্দকে পেয়ে যাই। শাহাদুজ্জামানের প্রতিটা বইয়ের নাম অদ্ভুতভাবে তাঁর স্বকীয়তা প্রকাশ করে, বই খোলামাত্র তাতে বুঁদ হয়ে যেতে বরাবরের মতন কোন সময় লাগে না৷ [জীবনানন্দকে নিয়ে কাকতালীয় বেশ কিছু জিনিস ঘটেছে এখন অব্দি৷ ব্যাপারটা নিজের কাছে যেমন মিস্টিফাইয়িং লাগে, তেমনি একটু গা ছমছমে একটা ব্যাপারও আছে।]
ইউসিএলের খেলা দেখতে দেখতে পড়া শুরু করলাম। যখন শেষ করলাম, দেখি প্রায় ভোর হয়ে গিয়েছে। পড়তে খারাপ লাগে নি। অদ্ভুত ভাল-মন্দ মিশিয়ে রাখা গল্পগুলো। যে গল্পের নামে বইয়ের নাম সেটা পড়ে কিছুই বুঝি নি, সম্ভবত খেলা দেখার কারণে। আবার পড়তে হবে।
গত দুই বছরে নতুন যে কয়জন লেখকের বই পড়েছি তার মধ্যে শাহাদুজ্জামান পছন্দের তালিকায় উপরের দিকে থাকবে। কারণ হিসেবে তার লেখার ধরণ তো অবশ্যই আছে, কিন্তু ভালো লেগেছে যে বিষয়টা তা হচ্ছে তার প্রত্যেকটা লেখাই অনেক রিসার্চ করে লেখা। উনার বই পড়লেই বুঝা যায় লেখার আগে প্রচুর সময় নিয়ে পড়াশুনা করেছেন বিষয়টা নিয়ে। যেমনঃ "একজন কমলালেবু''। ঠিক কবিতা প্রেমিক বলতে যা বুঝায় আমিতো তা না, আমার পাঠক জীবনে একজনই কবি। জীবনানন্দ দাশ। একজন কমলালেবু উনার ব্যক্তিগত জীবন এবং সাহিত্য কে সমন্বয় করে লেখা। কবির ব্যক্তিগত জীবন এবং লেখার সময়ের ব্যাখ্যা, পারিপার্শ্বিকতা এত গভীরভাবে গবেষণা করে লেখা যা পড়ে তার কবিতা গুলো আবার পড়লে যে নতুন ভাবে অনুভব করবে সবাই সেটা নিশ্চিত।বইটা পড়ার পরে মনে হয়েছে উনার জীবন সম্পর্কে না জানলে উনার লেখার অর্থ হয়ত আধাআধি বুঝা যায়।
*অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প* বইটি ১০ টা ছোট গল্পের সংকলন। ভিন্ন ভিন্ন theme এর জন্য প্রত্যেকটা গল্পই ভালো লেগেছে। এর মধ্যে কয়েকটা গল্প আলাদা ভাবে বলতে চাই, লেখক শুধু গল্প উপস্থাপনের ধরণ দিয়ে সাধারণ গল্প কে আলাদা করে ফেলেছেন যেটা খুবই প্রশংসনীয়। 👌
১. অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প
এখানে অন্য গল্পকার হচ্ছেন জীবনানন্দ দাশ। কবিতার পাশে তিনি অল্প কিছু উপন্যাস লিখেছিলেন যা বেশিরভাগই সামনে এসেছে কবি মারা যাওয়ার পরে। সেরকমই একটা উপন্যাসের দুইটি চরিত্র এবং তাদের কথোপকথন নিয়ে লেখক শাহাদুজ্জামান এবং তার বন্ধু মিলনের আলোচনা নিয়েই এই গল্প। গল্প, চরিত্র নিয়ে আলোচনা আমার প্রিয় কাজ গুলোর মধ্যে একটা। তাই স্বাভাবিক ভাবেই এই গল্প লেখার ধাঁচ আমার ভালো লেগেছে অনেক। মজার বিষয় হচ্ছে মনে হচ্ছিলো জীবনানন্দ দাশ সাহিত্য, তৎকালীন সমাজ নিয়ে ক্ষোভ, তখনকার লেখকদের বা সাহিত্যের ট্রেন্ড এই ব্যাপারগুলো নিয়ে তার নিজের আরগুমেন্টকে সামনে এনেছেন ভাই-বোন সুহৃৎ এবং আভার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে। সুযোগ পেলে এই বইটা পড়ার ইচ্ছা আছে।
২. গোয়েন্দা ঘরানার গল্প
গোয়েন্দা ঘরানার বা রহস্য উন্মোচনের কোন গল্প এটা না। বরং আমাদের সমাজ ব্যবস্থার নানান অসংগতির কারনে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করা এক দম্পতির বাচ্চার মৃত্যুর মন খারাপ করানো এক গল্প।গল্পের শুরু একটি গ্রামে। বাচ্চার মৃত্যুকে আসলে দুভার্গ্য বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। ভালো লেগেছে গল্পের শেষে পাঠকের কাছে করা লেখকের প্রশ্ন। খুনী আসলে কে সেটা পাঠক বলে দিক। অশিক্ষিত পরিবার, সমাজের কুসংস্কার, সমাজকর্মীদের দায়িত্বের প্রতি অবহেলা নাকি দেশ নিজেই কারণ সচেতনতা তৈরি করতে পারেনি এর জনগনের মাঝে বা সাধারণ সেবা নিশ্চিত করতে পারেনি সাধারণ মানুষের জন্য। কোন একজন দায়ী নাকি সবাই মিলে হত্যা?
লেখা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। এই দুটো গল্প ছাড়াও ভালো লেগেছে মুরাকামির বিড়াল, অপুষ্পক এবং ৩০৬ নম্বর বাস। মুরাকামির বিড়াল লেখা হয়েছে মুরাকামির মতো কল্পনার জগৎ তৈরি করে৷ ৩০৬ নম্বর বাস নস্টালজিয়া theme এ লেখা, এবং অপুষ্পক লেখা হয়েছে সমাজের একটা ইস্যুকে টার্গেট করে একটু চাপা হিউমার ব্যবহার করে।
রিডার্স ব্লক কাটানোর জন্য খুব ভালো একটা বই। Highly recommended.
বইমেলায় গিয়ে মাওলা ব্রাদার্সকে খুঁজে বাইর করলাম। কারণ অতি অবশ্যই লেখক শাহাদুজ্জামান। আজকাল উপন্যাসের থেকে ছোটগল্প কেনো জানি ভালো লাগে। ছোটগল্পের একধরনের মাধুর্য আছে । বৃষ্টির পর যেমন প্রকৃতির মধ্যে একটা নতুনত্বের উদ্যম চলে আসে। তেমনি দর্শন, ফিজিক্স পড়ার মধ্য ছোটগল্প আমাকে কেমন যেন পুনরুজ্জীবিত করে। সমসাময়িকদের মধ্যে ছোটগল্প লেখার হাত শাহাদুজ্জামানের প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নেই। দৈর্ঘ্যে,প্রস্থে ,উচ্চতায় এক্কেবারে খাপেখাপ লেখা। স্পষ্ট বক্তব্য ,সতেজ তার দৃষ্টিভঙ্গি একইসাথে গল্পের থিমগুলো থটফুল।
মাওলা ব্রাদার্সে শাহাদুজ্জামানের বইগুলো ঘাটতে ঘাটতে চোখে পড়ে, ‘ অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প ‘ বই। পাতা উল্টাতেই সূচিপত্রে দেখে নিলাম , গল্পের নামগুলো একটু বেশিই লোভনীয়।যেমন- ‘ অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প’, ‘৩০৬ নম্বর বাস’, ‘মান্না দে’ , ‘মুরাকামির বিড়াল’,,,,,, আত্মার জ্বিবটা গল্পগুলো পড়ার লোভে ভিজে উঠল। নিয়ে নিলুম বইটি।
দশটি ছোটগল্প নিয়ে ‘ অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প’ বইটি।শাহাদুজ্জামান পাঠক মনকে কখনো নিরাশ করে না। গল্পগুলো পড়ার মনে হয়েছে আরেকটু লিখল না কেনো।ছোটগল্পের বইয়ের বৈশিষ্ট্যেই হলো , বৈচিত্র্য। আর ভিন্নতা মানে চিন্তা আর ভাবনা সুদূরপ্রসারতা। কথা দিচ্ছি, প্রত্যেকটি গল্প আপনার ভালো লাগবে।
শাহাদুজ্জামান আমার বেশ পছন্দের লেখক। বিশেষত, ‘একটি হাসপাতাল একজন...’ বইটি অত্যন্ত পছন্দের। গল্প আগে যা পড়েছি তার অনেকগুলোই আচড় কেটেছে।
তবে, এই বই পড়তে গিয়ে ও পড়া শেষ করে খুব যে আনন্দের অনুভূতি হলো তা বলা যাবে না। লেখকের গল্প আগে পড়া থাকলে নতুনত্বের অভাব মনে হয়, যদিও খুব প্রকট নয়৷
শাহাদুজ্জামান নিরীক্ষাধর্মী লেখা লিখতে পছন্দ করেন। এই বইটাও তার সেই সিগনেচার স্টাইলে লেখা। লেখকের একজন মুগ্ধ ভক্ত হিসেবে বইটা আমি গোগ্রাসে গিলেছি। কিন্তু আমার যেটা মনে হয়েছে - এই বইটাতে সেই স্বপ্নীল, ঘোর লাগা, অবচেতনেই কলজে কাঁপিয়ে দেয়া শাহাদুজ্জামানের উঁচু স্বরটা একটু যেন ম্রিয়মাণ! প্রথম গল্পটা অসাধারণ, মনে দাগ কাটার মত। কিন্তু পরের গল্পগুলোয় লেখকের সেই জাদুর কাঠি অনেকটাই যেন ঘুমিয়ে ছিল।
আমরা শাহদুজ্জামানের কাছ থেকে আরো অনেক ঘোরলাগা দুপুর -সন্ধ্যা-রাত চাই। চাই মেঘের ভেলায় সোনালী সিংহ দেখতে। ইলিয়াস-জহির-ছফা-শওকত আলী চলে যাওয়ার পর আমরা যারা এক বুক হাহাকার আর ভালোবাসা নিয়ে নতুন কাউকে খুঁজে ফিরছি তাদের অন্যতম ভরসার জায়গা শাহাদুজ্জামান।
ভালো থাকুন প্রিয় লেখক...আমাদের জন্য সৃষ্টি করুন নতুন নতুন সব ঘোর লাগা মূহুর্ত।