২০০৯ সাল। রোমাঞ্চকর একটি চলচ্চিত্রের সূচনা যেনো! ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে বিধ্বস্ত উপকূলের জীবন ও প্রকৃতি নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে একজন সাংবাদিক জেলেদের মুখে জানতে পারেন, সুন্দরবনের নৃশংস ও বেপরোয়া অপরাধীরা কীভাবে পুরো সুন্দরবনের জনজীবনকে জিম্মি করে রেখেছে। দস্যুদলকে থামাবার স্বপ্ন দেখতে থাকেন তিনি। পথ খুঁজতে গিয়ে ডাকাতদেরই ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে চলে আসেন। দুঃসাহসী সেই কাজে ঝুঁকি ছিলো অজস্র। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সাথে দস্যুদলের তুমুল গোলাগুলির মাঝে শ্বাসমূলের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত পায়ে দৌড়াতে হয়েছে জলকাদায় মাখামাখি সেই রহস্যময় বনের ভেতর দিয়ে। নজরদারি এড়িয়ে দস্যুদের গোপন ডেরায় পৌঁছুতে পাড়ি দিতে হয়েছে দিকচিহ্নহীন রাতের সমুদ্র। চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র, গোপন হত্যা, গডফাদারদের উস্কানিতে ডাকাতদলের বিদ্রোহী সদস্যদের হুমকি, বিপদের শেষ নেই! ডাকাতদের সাথে মাখামাখির বদনামও কুড়িয়েছেন, দমে যাননি।
বই: সুন্দরবনের দুর্ধর্ষ দস্যুদের রুপান্তরের গল্প লেখক: মোহসীন উল হাকিম প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৪ প্রকাশনা: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (The University Press Limited) প্রচ্ছদ: অদিতি বাংলা দাম: ৫৯২/- পৃষ্ঠা: ৩৯৮ ধরন: অভিযান/সত্য ঘটনা/অপরাধ
সুন্দরবন সম্পর্কে আমরা কম বেশি কিছুটা জানি। এমনকি সুন্দরবন যাওয়ার সৌভাগ্যও হয়েছে। কিন্তু সুন্দরবন যে এত বিশাল এবং সুন্দরবনকে ঘিরে এত ঘটনা রয়েছে এই বইটি না পড়লে হয়তো আমি কখনো জানতে পারতাম না। বইয়ের লেখক একজন সাংবাদিক এবং বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে উনার জীবনের একটি বড়/মূল্যবান অংশ সুন্দরবনের সাথে কাটিয়েছেন। বইটি বিষয়বস্তু মূলত সুন্দরবনের জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের সফল প্রচেষ্টা এবং প্রচেষ্টাটি শুরু হয়েছিল এই সাংবাদিক লেখকের হাত ধরে।
২০০৯ সালে সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের প্রতিবেদন করতে গিয়ে লেখকের প্রথম ধারণা হয় সুন্দরবনের জলদস্যু নিয়ে। সুন্দরবনের এই জলদস্যুরা সুন্দরবনের এবং উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ জনগণের জীবনকে জিম্মি করে রেখেছে। লেখক মনোযোগ দিলেন কিভাবে দস্যুদের সাথে মেশা যায় এবং তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানা যায়। এই যাত্রাপথে উনি জানতে পারলেন সুন্দরবনের দস্যুরা আসলে কেউ সুখী নয়; তারা হয়তো নিয়মিত জেলেদের কাছ থেকে প্রচুর টাকা ডাকাতি করছে কিন্তু তাদের ভাগ্যের চাকার পরিবর্তন করতে পারেননি। তারা হত দরিদ্র ছিল এবং সে হতদরিদ্র অবস্থায় রয়ে গেছে। পরিবর্তন হয়েছে সমাজের ভদ্রবেশি গডফাদারদের জীবন।
তারপর শুরু হল লেখক এর যাত্রা কিভাবে সুন্দরবনের দস্যুদের কে বুঝিয়ে শুনিয়ে আত্মসমর্পণ করানো যায়। একটি কথাতে হয়তো লেখক এর পরিশ্রমকে সম্পন্ন বোঝা সম্ভব না যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি বইটি পড়বেন। বইয়ের প্রতিটি অংশে লেখক খুব ভালোভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন এই আত্মসমর্পণের জন্য বোঝাতে গিয়ে তাকে কত রাত কতদিন দস্যুদের সাথে ট্রলারে ট্রলারে থাকতে হয়েছে এবং প্রকৃতির সাথে লড়াইয়ের জীবনে অভ্যস্ত হতে হয়েছে। সুন্দরবনের বিখ্যাত মাস্টার জলদস্যুর যার আত্মসমর্পণ দিয়ে লেখকের এই অভিযানের সফল যাত্রা শুরু তার সম্পূর্ণ কাহিনী খুব সুন্দর ভাবে বলেন বর্ণিত হয়েছে। এরপর একে একে কে বিভিন্ন জলদস্যুর আত্মসমর্পণের উদ্দেশ্য এবং এর পিছনের কাহিনী খুব সুন্দর ভাবে এই বইয়ে বর্ণনা করা আছে। এই সাংবাদিক লেখকের সাথে RAB এর সহযোগিতার কথাও বিভিন্ন জায়গায় উঠে এসেছে বিশেষত আদনান সাহেবের কথা। তবে লেখক বিভিন্ন জায়গায় কিছু কথা বারবার পুনরাবৃত্তি করেছে যা অনেক সময় পাঠকদের বিরক্ত করবে। লেখক অনেক জায়গায় নিজের সততার বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন আমার মনে হয় এত জায়গায় উনি বর্ণনা না করলে চলতো। বইটির বিভিন্ন ঘটনা বলে দেয় লেখক তার কাজে ১০০% সৎ ছিলেন। আমার মনে হয়েছে লেখক জলদস্যুদের আত্মসমর্পণে উনার ত্যাগ স্বীকারের সঠিক স্বীকৃতি পান নাই। আমরা আবার এই বইয়ে এমনও ইঙ্গিত পায় যে অনেক ভদ্রবেশী মানুষ আবার এই আত্মসমর্পণের বিপক্ষে ছিল এমনকি লেখকের নামে মিথ্যা প্রচারণাও ছিল। হয়তো নিরাপত্তা খাতিরে অনেক কিছুই উনি লেখাতে প্রকাশ করেন নাই।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে সম্প্রতি কক্সবাজার উপকূলের কিছু জলদস্য যার মধ্যে একজন মহিলাও রয়েছে আত্মসমর্পণ করেছে এবং এতেও হয়তো লেখকের উপস্থিতি ছিল। কারণ বইয়ের একটা অংশে উনি কক্সবাজার উপকূলের জলদস্যু নিয়েও লিখেছেন। #ধূসরকল্পনা
বইটা পড়ার সময় সবসময়ই মনে হচ্ছিল আমি সুন্দরবনের প্রতিটি খালে খালে ঘুরছি, দস্যুদের সঙ্গে গল্প করছি,কখনো ছোট ডিঙি কখনো ট্রলারে ঘুরছি, জেলেদের গল্প শুনছি। সুন্দরবনের বনদস্যুদের গল্প, তাদের বনদস্যু হ'য়ে উঠার গল্প কিভাবে একজন সাধারণ মানুষ দুর্ধর্ষ বনদস্যুতে রুপান্তর হয়।
আবার চোখের সামনে বনদস্যু রুপান্তরিত হচ্ছে সাধারণ মানুষে। মাষ্টার বাহিনী, মজনু বাহিনী, ইলিয়াস বাহিনী, শান্ত বাহিনী, আলম বাহিনী, আলিফ বাহিনী, জোনাব বাহিনী, বড়ো সুমন বাহিনী, খোকা বাবু বাহিনী
এসব জলদস্যুদের অজানা সব গল্প জেনেছি। সুন্দরবনের অন্তরালে সেই সব হোতাদের কথা, ডাকাতির অস্ত্র থেকে শুরু করে নদী ও খাল উজাড় করা বিষের সরবরাহ করে যারা শ্বাসমূলীয় এই অরণ্যকে তিলে তিলে হত্যা করছে তাদের গল্প জেনেছি।
একসময়ে দুর্ধর্ষ দস্যুরা রুপান্তরিত হয়,ফিরে আসে স্বাভাবিক জীবনে। সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয়। সেই সাথে শুরু হয় বনজীবী মানুষদের জীবন মানের পরিবর্তন আর এই রুপান্তরের নেপথ্যে মোহসীন উল হাকিম।