হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। ছিলেন অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও। তিনি বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র; বাংলায় মুসলমানের রাষ্ট্রসাধনারও প্রধান এক নেতা। অথচ বাংলাভাষীদের একাডেমিক জগতে তিনি প্রায় উপেক্ষিত। বাংলায় মুসলমানের রাষ্ট্রসাধনার প্রশ্নও এখানে প্রায় উদাসীনতার শিকার। আলতাফ পারভেজ সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করেছেন। এই বই একদিকে সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক জীবনী, অন্যদিকে বাংলায় মুসলমানদের রাজনৈতিক গঠন ও পুনর্গঠনেরও ইতিহাসও।
আলতাফ পারভেজের জন্ম ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬। দর্শনশাস্ত্রে প্রথম স্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন শেষ করেন। ছাত্রত্ব ও ছাত্র রাজনীতির পর সাংবাদিকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু। পরে গবেষণা ও শিক্ষকতায় সংশ্লিষ্টতা। প্রকাশিত গ্রন্থ ছয়টি। যার মধ্যে আছে—‘কারাজীবন, কারাব্যবস্থা, কারা বিদ্রোহ : অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা’, ‘অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, কর্নের তাহের ও জাসদ রাজনীতি’, ‘বাংলাদেশের নারীর ভূ-সম্পদের লড়াই’, 'মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী ইতিহাসের পুনর্পাঠ'।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নামমাত্র 'গণতন্ত্রের মানসপুত্র' ছিলেন না ; তিনি তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে অনেকবার হোঁচট খেয়েছেন। কিন্তু কখনোই গণতন্ত্রের সিধা রাস্তা ছাড়েননি। আশপাশে ষড়যন্ত্রের আভাস তিনি পেয়েছেন। অথচ গদিতে বসার জন্য ষড়যন্ত্রের রাজনীতির পথ মাড়াননি। রাজনীতিবিদ ফেরেশতা হয় না। আবার, ইবলিশের পক্ষে দীর্ঘদিন রাজনীতির বন্ধুর রাস্তায় টিকে থাকা অসম্ভব। সোহরাওয়ার্দী মানুষ ছিলেন। তাঁর নানা ভুল-ভ্রান্তি ছিল। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন উপমহাদেশের মহত্তম রাজনীতিবিদদের একজন।
'৪৬ সালের কুখ্যাত কলকাতা দাঙ্গার জন্য সোহরাওয়ার্দীকে এখনো গালি শুনতে হয়। তাঁর মতো আপাদমস্তক মানুষকে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেওয়া হয়। আলতাফ পারভেজ দেখিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কার্যকর ক্ষমতার সামান্যই সোহরাওয়ার্দীর হাতে ছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর ও আমলাতন্ত্রকে বিবেচনায় না রেখে একতরফা কামান দাগা হয় সোহরাওয়ার্দীকে। যা এক ধরনের সাম্প্রদায়িকতা বটে।
সোহরাওয়ার্দীকে বহুমাত্রিক রূপে দেখেছেন আলতাফ পারভেজ। জুলফিকার আলী ভুট্টোকে আতশ কাঁচের নিচে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন আলতাফ পারভেজ। প্রতিতুলনায় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রতি এক ধরনের মমতা আলতাফ পারভেজের লেখায় আবিষ্কার করেছি। যেমন: প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, পূর্ব বাংলাকে শতকরা ৯৮ ভাগ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে। এমন উক্তির ব্যবচ্ছেদে সোহরাওয়ার্দীকে 'দায়মুক্তি' দেওয়ার চেষ্টা চোখ এড়ায়নি। লাহোর প্রস্তাবে স্টেটসের বদলে 'স্টেট' হবে, এই প্রস্তাবের উত্থাপনকারী ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিজে। এই প্রস্তাবের সুদূরপ্রসারী ফলাফল নিয়ে আলোচনা হতে পারত। সোহরাওয়ার্দী দলের ভেতর নিজের একান্ত অনুগত কর্মীদল রাখতে পছন্দ করতেন। সেই কর্মীদের সেরা কর্মী ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই দুই মহান নেতার সম্পর্ক নিয়ে আলাপ দেখলাম না! যা রীতিমতো বিস্ময়কর।
মোহাম্মদ আলি বগুড়ার মন্ত্রিসভায় সোহরাওয়ার্দী আইনমন্ত্রী হলেন। অথচ দেশভাগের সময় মোহাম্মদ আলি তার মন্ত্রিসভার সদস্য ছিল। তিনি গণতন্ত্রের স্বার্থে কতটুকু আর কতখানি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে অস্থির হয়ে গিয়ে, এই মন্ত্রিসভায় যোগ দেন তা নিয়ে আরও স্বচ্ছ আলাপ থাকতে পারত। জীবনীকার হিসেবে আলতাফ পারভেজ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলোকে মনস্তাত্ত্বিক জায়গা থেকে বুঝতে চাইতে পারতেন। তাতে হয়তো আরও ভিন্নভাবে বুঝতে পারতাম শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে।
আইয়ুব খানের আমলে সোহরাওয়ার্দীকে কারাবন্দি করা হয়। এ সময়ে তাকে সাময়িক বাহিনীর অধীনে আদালতের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে তিনি অবিভক্ত পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বলেছিলেন,
' যে দেশে একজন লে. কর্নেল প্রধানমন্ত্রীর বিচার করতে বসে, সে দেশ টিকে থাকতে পারবে না। '
কী অমোঘ সত্য!
শহীদ সোহরাওয়ার্দী আমৃত্যু নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করেছেন। সহিংসতার রাজনীতির পক্ষে তিনি কখনোই ছিলেন না ; এমনকি ছাত্রদের প্রধান দায়িত্ব তিনি রাজনীতি নয়, বরং পড়াশোনা করাকেই বুঝতেন। সহিংসতার রাজনীতি নিয়ে তিনি তার অন্যতম প্রিয়ভাজন ইত্তেফাকের মানিক মিয়াকে চিঠিতে লিখেছিলেন,
'...দেখো, আমরা যাঁরা আগের জমানার নেতা তাঁরা কেবল নিয়মতান্ত্রিক পথে চলতে জানি। কিন্তু আমরা তাতে ব্যর্থ হয়েছি। বিপদ হলো, এমন অনিয়মতান্ত্রিক নেতৃত্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, যা হয়তো দেশকেই ধ্বংস করে বসবে আর সেই সাথে আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। '
দেশভাগের পর ভারত সরকার শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ওপর ৬৪ লাখ টাকা করারোপ করে! সেই দেনার দায়ে তার সবকিছুই চলে যায়। ভারত তাঁর মতো নেতাকে সইতে পারছিল না। লিয়াকত আলি খাঁ পাকিস্তানে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিল। তিনি হয়ে পড়েছিলেন সত্যিকারের উদ্বাস্তু। ভারত ও পাকিস্তানের কোথাও তাঁর এক ছটাক জমিও ছিল না। তিনি মারা গেছেন নিঃসঙ্গ হয়ে। তিনি মারা গেছেন মনোবেদনায়। মৃত্যুর মাত্র ছয়দিন আগে চিঠিতে বলেন,
‘একান্তভাবে কেবল তোমাকেই জানাই, মরলেই আমি সুখী হব। বাঁচার আর কোনো অর্থ হয় না। কারও কাজে যখন আসব না, যদি কেবল নিজের জন্যই বাঁচতে হয়, সে বাঁচার সার্থকতা কী? '
শহীদ সোহরাওয়ার্দীর লেবাননের বৈরুতে মারা গেলেন ১৯৬৩ সালে। তাঁর মৃত্যু নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন ছিল। কিন্তু আইয়ুব ও ভুট্টোর একমাত্র 'বড়ো' দুশমন সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুতে তারা স্বস্তিবোধ করেছিল এবং নিশ্চিত করেছিল যেন কোনো তদন্ত না হয়।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের শিষ্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের লিডার শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাষ্ট্রসাধনায় বাঙালি মুসলমানের পাশাপাশি বাঙালি হিন্দু ছিল। তিনি একান্তভাবে চেয়েছেন বাংলাভাগকে রুখতে। কিন্তু পরাজিত হয়েছেন রাজনীতির পাঁকচক্রে। আলতাফ পারভেজ শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাষ্ট্রসাধনাকে বুঝতে চেয়েছেন ; বোঝাতে চেয়েছেন পাঠককে। জীবনীকার হিসেবে তিনি নিরপেক্ষ নন। বরং দরদ দিয়েই লিখেছেন আমৃত্যু গণতন্ত্রের পক্ষের যোদ্ধা শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে।
বাংলায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা খুব কম। বইপত্র আরও কম। সেখানে আলতাফ পারভেজের 'সোহরাওয়ার্দী ও বাংলায় মুসলমানের রাষ্ট্রসাধনা' নিঃসন্দেহে চমৎকার সংযোজন।
সাড়ে চার শ পাতার বইটির প্রকাশক 'বাতিঘর'। কিছু বানান ভুল ও সাল এলোমেলো হয়ে যাওয়া চোখে পড়ল। এগুলো আশা করি, পরের সংস্করণে সংশোধন করা হবে।
আলতাফ পারভেজের লেখায় যে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা থাকে, এ বইতে তা কিছুটা হলেও অনুপস্থিত। তথ্য উপাত্ত যথেষ্ট আছে, কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর প্রতি লেখকের পক্ষপাতিত্ব দৃষ্টি এড়ায় না।সোহরাওয়ার্দীর সময়ের জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেলো। ইতিহাসের ধারাবাহিক বর্ণনার পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দীর সাথে মওলানা ভাসানী,শেরে বাংলা, শেখ মুজিব প্রমুখের সম্পর্ক ও তুলনা; এঁদের মতাদর্শের পার্থক্য কীভাবে জাতির ভাগ্য বদলে দিয়েছে তা-ও বিশদভাবে আসতে পারতো। বইয়ের নামের পরের অংশ অর্থাৎ "বাংলায় মুসলমানের রাষ্ট্রসাধনা" নিয়ে আমার আগ্রহ ছিলো বেশি। শেষদিকে কৌতূহলোদ্দীপক আলোচনা থাকলেও তা অসম্পূর্ণ। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করলে বাংলাদেশের মানুষ তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় এবং নিজেদের জাতীয় সংগীত হিসেবে "আমার সোনার বাংলা"কে গ্রহণ করা ছিলো শাসকদের বিরুদ্ধে একধরনের দ্রোহ। বর্তমান বাংলাদেশে, একবিংশ শতাব্দীতে, ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে প্রতিনিয়ত ব্যবহার করা হচ্ছে, প্রচুর মানুষ ধর্মপ্রাণ না হয়ে ধর্মান্ধ হচ্ছে, এর পেছনের মনস্তত্ত্ব কী, প্রগতির উল্টোপথে কেন এই যাত্রা, তা লেখকের আলোচনায় স্থান পেতে পারতো।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে পড়ার আগ্রহ ছিল অনেকদিন। এই বইটা অনেকখানি তৃষ্ণা মেটালেও ব্যক্তি সোহরাওয়ার্দীর চেয়ে রাজন��তিবিদ সোহরাওয়ার্দীর বর্ণনাই বেশী। কারণ বইয়ের নামের অর্ধেকটা বাংলায় মুসলমানদের রাষ্ট্রসাধনা। কিন্তু এই নামই আবার অনেকগুলো প্রশ্ন নিয়ে আসে মাথায়। যেগুলোর উত্তর খুঁজে পেতে আরো কিছু বই পড়তে হবে।
এই বইয়ে তিনি জেনে-বুঝে অসততার আশ্রয় নিয়েছেন। প্রভূ ভারতের মনোরঞ্জনে বিফল এক চেষ্টা তার মধ্যে লক্ষণীয়।
বাংলাভাগের জন্য কেবল কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা দায়ী নন, মুসলিম লীগের অনেকেই দায়ী, এই তথ্য তিনি দিয়েছেন।
জিন্নাহ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রীন সিগন্যাল দেয় এই ব্যাপারে, জিন্নাহ ওই সময় সর্বেসর্বা আর নাজিমুদ্দিন বা অন্য যারা ছিলো তাদের মতামত ছিলো গান্ধীর মতো, কংগ্রেসের মতামত নেয়ার জন্য শরৎ বসু গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করতে চান, গান্ধী বসুরে পাঠান নেহেরু আর প্যাটেলের কাছে তখন প্যাটেল আর নেহরুই সব কংগ্রেসে, প্যাটেল রীতিমতো বসু সাহেবরে অপদস্ত করেন এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য।
আর হিন্দুত্ববাদী শ্যামা মুখার্জিদের ভারত ভাগ মেনে নেয়ার একটাই শর্ত ছিলো - বাংলা আর পাঞ্জাবকে ভাগ করতে হবে। এই অবস্থায় বাংলা ভাগ ঠেকানো মুসলিম লীগ বা সোহরাওয়ার্দী আর আবুল হাশিমের পক্ষে অসম্ভব ছিলো।
এর বাইরে নেহরু আরেক কালপ্রিট, কেবিনেট মেশিন ফেডারেল রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে ধারণা দেন নেহরু ১০ ই জুলাই নিজেদের গোপন অভিসন্ধি প্রকাশ করে দিয়ে সব ভণ্ডুল করে দেন। ফলেই তৈরি হয় ডাইরেক্ট একশান ডে - কর্মসূচির মতো অবস্থা।
এর বাইরে আলতাফ রবী ঠাকুরের আমার সোনারে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিশেবে গ্রহণ করাকে একটা বিপ্লবী বড়ো ধরনের কাজ হিশেবে দেখাতে চান, এ ব্যাপারটা পিওর গোলামীর নিদর্শন, রবী বাবুরা যদি সফল হতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ঠেকাতে, তাহলে আলতাফ কিন্তু আজ এই বইটই লিখতে পারতো না।
রবী ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য আমার সোনার বাংলা লিখে, এই আমার সোনার বাংলা দুই বাংলারে এক করে রাখার এক আকুতি। তখন হিন্দুরা যুক্ত বাংলা চাইতো - কারণ মুসলমানরা ছিলো গোলাম, গোলামরা ছুটে গেলে কোলকাতায় বসে কবিতা লেখা আর আকাশ দেখা রবী বাবুদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না।
৪৭ সালে রবী বাবুর প্রেতাত্মারা কিন্তু যুক্তবাংলা আর চায় নাই, তখন দেখলো মুসলমান গোলামরা সংখ্যায় বেশি, গোলামরা রাজাউজির হয়ে মহান হিন্দুদের শাসন করবে, এসব মানা ভারি অন্যায়।
আলতাফদের মনে যে অবিভক্ত ভারতের জন্য ঠান্ডা আকুতি, তা দেখলে বমি আসে।