ঢাকার অলি-গলিতে আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে সেই রহস্যমানব জহির। এবার জহিরের জালে আটকে গেছে হাসান জামিল। ঘসেটি বেগমের রেখে যাওয়া গুপ্তধন এখন কোথায়? পলাশীর প্রান্তর হয়ে আমাদের যেতে হবে আরো পেছনে। সুবাদার ইসলাম খাঁ তখন ভাওয়ালে গিয়েছেন শিকারে। হাসান মাহফুজের লেখা দুটো গল্পের ভেতর লুকিয়ে আছে প্রাচীন সেই গুপ্তধনের নকশা। জামিল কি পারবে সেই নকশা বের করে আনতে। ঢাকার উন্নয়নের নামে তৈরি হওয়া ‘গ্লোরি অফ ঢাকা’ নামের সংগঠনটার আসল কাজ কী? কে আছে এদের পেছনে? প্রিয় পাঠক, এটা কোনো নতুন গল্প নয়। এটা আপনার পরিচিত একটি গল্পের ভিন্ন রূপ। চলুন, চেনা চরিত্রগুলোর হাত ধরেই এবার ঢাকায় ফাগুন সিরিজের দ্বিতীয় বই থেকে ঘুরে আসি।
Hasan Enam, a university student, first started writing in a magazine. But gradually his writing changed and he turned his attention to publishing his own books. 'Dhakay Fagun', a dense fiction about the history of Dhaka, makes Hasan Enam a new acquaintance among the readers. However, he came out of these people the next year and wrote the novel 'Jaltaranga'.
The tendency to introspect is evident in his writings. Hasan Enam will throw himself into more debauchery in upcoming projects.
"আমি কাঁটাতারেই সুখী এই কুয়াশাতে উঁকি দিয়ে রাজি মিথ্যে নিতে আসলে সত্যি বলে, সত্যি কিছু নেই"
সত্যের বাইরেও অনেক সময় কিছু সত্য চাপা পড়ে যায়। জানা যায় না ভেতরের নিগুঢ় কথাগুলো। আপাতদৃষ্টিতে যেটা সত্যি আসলে সেটাই মিথ্যে ধোঁকা, আবার যেটা মিথ্যে ধোঁকা আসলেই সেটাই সত্যি। কোনো ঘটনা ঘটলে আমাদের আসলে দুই পক্ষের কথাই শোনা উচিত। কারণ সবাই নিজ নিজ আত্মপক্ষ সমর্থন করবে এটাই স্বাভাবিক। তাই আসল সত্যিটা তখনই জানা যাবে যখন দুই পক্ষকে সমান সুযোগ দেয়া হবে কথা বলার।
আচ্ছা "ঢাকায় ফাগুন" বইটির কথা মনে পড়ে? যেখানে লেখক হাসান মাহফুজ লিখেছেন নিজের বয়ানে এমন আশ্চর্য চমকপ্রদ কাহিনী যা আমাদের আসলেই অবাক করে দেবে। কেউ হয়তো মনে করবে করোনাকালীন লকডাউনে থেকে থেকে মাহফুজের মাথাটাই খারাপ হয়ে গেছে। তাই এমন আজগুবি গল্প ফেঁদে বসেছে।
সেই যে মাহফুজ লিখেছিল জহিরের কথা। সে ১৯৪২ সাল থেকে এসেছে। ৭৮ বছর আগের জহির চলে এসেছে ২০২০ এ লেখক হাসান মাহফুজের বাড়িতে। এবং তাঁকে শুনিয়েছিল টাইম ট্রাভেল বা সময় পরিভ্রমণের আশ্চর্য সব ঘটনা! যেটা হাসান মাহফুজকে বারবার বিভ্রান্ত করেছে। কিন্তু তাঁর সাথে যা যা ঘটে গেছে মাহফুজ সেই ঘটনাকেও কীভাবে অস্বীকার করে! এসব কী আসলেই স্বপ্ন?
এখানে কিন্তু আরেকটা চরিত্র ছিলো তরুণ লেখক হাসান জামিল। যার একটা লেখা ছাপা হয়েছে ঠিক টাইম ট্রাভেল প্লট ভিত্তি করে। এবং মাহফুজের গল্পে জড়িয়ে যায় হাসান জামিল। রহস্য ক্রমশ ঘনিভূত হয়েছিল প্রথম বইয়ে। সব রহস্যের সমাধান দরকার, জানা দরকার সবগুলো চরিত্রের ভূমিকা।
~ ঢাকায় যেভাবে ফাগুন এলো ~ --------------------------------------------------
ঢাকায় ফাগুন কীভাবে এলো, এর সাথে জড়িয়ে থাকা হাজারটা প্রশ্নের উত্তর এবার জামিল দেবে। কোন জামিল? ওই যে সেই তরুণ লেখক হাসান জামিল। সে হাসান মাহফুজের গল্পের গুরুত্বপূর্ণ আরেক চরিত্র। যেহেতু জহির তাঁকেও নাকি নিয়ন্ত্রন করছে, জামিলেরও তো কিছু কথা থেকে যায় আসলে। গল্প এখনো অনেক বাকি আছে। জানতে হবে অজানা অনেক ঘটনা।
এবার সেই ঘটনা বলবে হাসান জামিল। ঢাকায় ফাগুন বইয়ে শুনেছি হাসান মাহফুজের কথা। এবার শুনবো হাসান জামিলের কথা। ওই যে শুরুতে বললাম না কোনো ঘটনার সত্যতা জানতে কখনো এক পক্ষের বক্তব্য শুনতে নেই। শুনতে হবে দুই পক্ষের বক্তব্য। নাহলে রহস্য উন্মোচন করা যায় না। জহির নামের লোকটার ভূমিকা জানতে হবে। আসলে সে কে? কী চায় তাঁদের দুজনের কাছে? কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষ ভাবে এক হয় আরেক। হয়তো সেটা সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিংবা সবখানেই।
এই শহর, যাদুর শহর, প্রানের শহর ঢাকারে... এই শহর, যাদুর শহর, প্রানের শহর আহারে...
এই শহরের আরেকটা পরিচয় দেই, এই শহর ইতিহাসের শহর। ঢাকার অলিতে গলিতে যেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কতশত ইতিহাস। কে জানতো এই ঢাকার সাথে জড়িয়ে আছে সিরাজউদ্দৌলা, জড়িয়ে আছেন ঘষেটি বেগম। আছে আরেক গল্প "কদমে রাসূল" শুনেছেন এই গল্পটা? ঢাকার বুকে এমনি ইতিহাস লুকিয়ে আছে। যার সাথে হয়তো জড়িয়ে গেছে কিছু চরিত্র।
"গ্লোরি অফ ঢাকা" কাজ করে ঢাকার ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে। কিন্তু শুধুই কী তাই? এর আড়ালে লুকিয়ে আছে কী কোনো অন্য প্রসঙ্গ? "ঢাকায় ফাগুন যেভাবে এলো" এবার চলুন মুখোমুখি হওয়া যাক নিগুঢ় সব সত্যের।
দারুন সাবলীল ভাবে উপস্থাপন করে এত কম কথায় কীভাবে সত্যগুলোকে বলা যায় আসলেই এই বইটা না পড়লে আপনি বুঝতে পারবেন না। বলা চলে রীতিমতো গোগ্ৰাসে একটানা আমি পুরোপুরি ঘোরের মধ্যে পড়ে গেছি। কারণ আমার মধ্যে তীব্র একটা কৌতুহল কাজ করছিল।
এই বইটা পড়ার আগে "ঢাকায় ফাগুন" পড়েছি এবং বিলিভ মি আমি এই সেকেন্ড বইটাকে এগিয়ে রাখবো। লেখকের গল্প বলার স্টাইল চমৎকার। অনায়াসে আপনি একটানা পড়ে যেতে পারবেন একটুও বিরক্তি আসবে না। এবং থ্রিলারের এই বইটি ছোট ছোট এত টুইস্ট রেখেছে যে সত্যি ভালো লেগেছে। লেখক ইতিহাসকে দারুনভাবে ব্যবহার করেছেন নিজের গল্পে।
আমি আমার হাসবেন্ডকে বারবার বলছিলাম থার্ড বই কবে আসবে! লেখককে বলো তাড়াতাড়ি লিখতে। শুনে সে মিটিমিটি হাসছে বলে সবুরে মেওয়া ফলে। অপেক্ষা করতেই হবে।
অনেকগুলো প্রশ্ন জমে ছিলো মনে এবং এই বইয়ের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে গেল সবকিছু। এবার অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি তৃতীয় বইয়ের। আমার থ্রিলার পাগল হাসবেন্ড আসলেই দারুন একটা বইয়ের সাজেশন দিয়েছে মানতেই হবে। রহস্য, রোমাঞ্চকর। সবমিলে দারুন সময় কেটেছে বইয়ের সাথে।
'ঢাকায় ফাগুন' বইয়ের থেকে সিক্যুয়েল আরো ভালো হয়েছে বলে আমার মনে হলো। জহির আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে ঢাকার রাস্তায় এবার তার উদ্দেশ্য কী?তার উত্তরই রয়েছে বইটিতে। হাসান ইনাম সময় এবং ঢাকার ইতিহাস নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন বলে আমার মনে হলো।অনেক সাবলীলভাবে তিনি আমাদের ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয় পাঠ করান।এই বইটিতে খুব সাবলীলভাবে গল্প এগিয়েছে,এবং গল্পের টুইস্টগুলো বেশ চমকপ্রদ ছিলো বলা যায়। গল্প এগিয়েছে মহা মূল্যবান একটি পাথরকে কেন্দ্র করে। এই পাথরের সাথে কীভাবে হাসান জামিল জড়িয়ে গেলো?শেষ পর্যন্ত পাথর উদ্ধার হয়েছিলো কি?হাসান জামিলের ভাগ্যে কি ঘটেছিলো শেষ পর্যন্ত? জানতে হলে বইটি পড়ে দেখতে হবে।
ঢাকায় ফাগুনের সিকুয়াল হিসেবে লেখক খুবি ভালো একটা ডেলিভারি দিয়েছেন বলাই যায়। ছোট্ট কলেবরের হলেও বইয়ের ৪৭ পৃষ্ঠা থেকে শেষ অবধি খুব ভালো মতো আটকে রাখতে পেরেছেন গল্পের সাথে। সত্যি বলতে শুরুর দিকে একটু বিরক্ত লাগছিলো, হয়তো প্রথম পার্টের কাহিনিগুলোকে ঘুরিয়ে বলা হচ্ছিলো দেখে। হাসান ইনাম গল্পে গল্পে ইতিহাস সত্যিকার অর্থেই খুব ভালো বলতে পারেন, তার পাশাপাশি উনার ব্যক্তিগত কিছু জীবনদর্শনও লেখায় ফুটিয়ে তোলেন।যারা উপন্যাস লেখে তাদের এই বিষয়টা আমার কাছে খুব ভালো লাগে।ঢাকডোল পিটিয়ে না বলে সোজাসাপটা গল্পের ফ্লো তে বলে ফেলেন যেটা সাব কনছাস মাইন্ডে থেকে যায়। লেখক এরকম করে লিখতে পারলে অনেক দূর যেতে পারবেন বলে আশা রাখি।
ঢাকায় ফাগুনের সিকুয়ালে লেখক মেরাজ,বোরাক, ইসলাম খাঁ, এক চিমটি পরাবাস্তব এসবকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন। পাথর হাতে পেয়ে জামিলের দ্রুতগতির বান্দা বনে যাওয়াটা তাই ভালো লেগেছে পারসোনালি তার সাথে পাথরটা কিসের সাথে জড়িত সেটাও আন্দাজ করা গিয়েছে। ঢাকার ইতিহাস এই উপন্যাসিকাতেও তিনি একদম দু-হাত ভরে যতটুকু পেরেছেন ঢেলে দিয়েছেন।এরকম লেখা পড়লে সত্যিই ঢাকা নিয়ে লেখা নন-ফিকশনগুলো পড়তে মন চায়। ঢাকায় ফাগুনের মতো শেষেরদিকে তাড়াহুড়ো করেন নি কিন্তু শব্দের মেদ কমিয়েছেন।কিছু জায়গায় একটু বিস্তারি�� লিখলেও লেখা যেত কিন্তু যেভাবে লেখা হয়েছে ওভাবেও চলনসই।আমার কাছে মনে হয়েছে সবার না-ও মনে হতে পারে। যেসকল বই পার্ট পার্ট করে আসে সেসবের মধ্যে কোনো না কোনো পার্ট হয় খারাপ হয় না হলে ওরকম করে জমে উঠে না। ঢাকায় ফাগুন আপাতত সেই রিস্কে নাই।
এবার ভিন্ন বিষয় নিয়ে বলি, বাতিঘরের উচিত প্রোডাকশন,বানান, প্রুফ রিডে সত্যিকার অর্থেই জোর দেয়া। এই অভিযোগটা অনেকটা জাতীয় অভিযোগের মতো কিন্তু তবুও আগা সাদেক আর আগা বাকের কে যখন আপনারা ❝আগে সাদেক আর আগে বাকের❞ প্রিন্ট করবেন আর গল্পের সোহাগ আহমদ হয়ে যাবে ❝সুলতান আহমদ❞, তখন সত্যিকার অর্থেই পাঠক খেই হারিয়ে ফেলবে।
হাসান মাহফুজের কথা মনে আছে? সেই যে হাসান মাহফুজ, সময় পরিভ্রমণের চক্রে আবদ্ধ হয়ে ঘুরে এসেছে ঢাকার অলিতে গলিতে। জহির নামের অদ্ভুত এক মানুষের কারসাজিতে নিজেকে হারিয়ে খুঁজে ফিরছিল মাহফুজ। এই গল্পে আরেক হাসান ছিল, হাসান জামিলের সেই ভূমিকা জানতে হবে এবার।
এবার শুনব হাসান জামিলের গল্প। করোনাকালীন লকডাউনের সময়ে অপেক্ষা করছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির। কিন্তু কোনো এক কারণে অদ্ভুতভাবে এক রহস্যে জড়িয়ে যায় সে। সময় পরিভ্রমণের এক গল্প তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় হাসান মাহফুজের সাথে। মাধ্যম? সেই অদ্ভুত ব্যক্তি, জহির। যার ভূমিকা আসলে কী বোঝা যাচ্ছে না। কেন বারবার জামিলের কাছে আসে, কেনইবা জামিলকে হুমকি ধামকি দেয়, হাসান মাহফুজের সাথে তার কী সম্পর্ক — সবই ধোঁয়াশা। আমদের চোখের সামনে যা দেখা যায়, সব সময় সত্যি নয়। সম্পর্কের বেড়াজালে আমরা আমদের যেভাবে উপস্থাপন করি, তাও মিথ্যের আবরণে আবদ্ধ। তাই কখন কী ঘটবে সেটা আগেভাগে বলে দেওয়া অনর্থক।
ঘটনাক্রমে হাসান জামিল সাথে দেখা হয় হাসান মাহফুজের। জানা যায় এক অন্যরকম গল্প। এই ঢাকাতেই আছে কদমে রাসূল। যার সত্যতা আজও জানা যায় না। মিথ্যের উপর ভর করে মানুষ ছুটে চলে, গুজবে ভেসে আসে অনেক কথা। আর কান নিয়ে গেছে শুনে চিলের পেছনে ছুটতে গিয়ে আবিষ্কার হয় মরীচিকা। এখানে কোন সত্য সানে আসবে?
গল্পে জড়িয়ে আছে ঢাকার প্রাচীন ইতিহাস। মিশে আছে ঘষেটি বেগমের কথা! কী ভূমিকা ছিল তার? ঢাকার বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে “গ্লোরি অফ ঢাকা” নামের একটি সংগঠন। যাদের কাজ ঢাকার ইতিহাস সংরক্ষণ করা। সেই প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার উৎস কী? কীসের পেছনে ছুটছে তারা? আর এসবের মধ্যে জড়িয়ে পড়া হাসান জামিল যেন খাবি খাচ্ছে! অথৈ পানিতে ডুবে যাচ্ছে, যেখানে তল খুঁজে পাচ্ছে না। কিন্তু এর একটা বিহিত করতেই হবে। সবার মুখোশ টেনে খুলে দিতে হবে। গঙ্গা বুড়ির শহরে শুরু হচ্ছে নতুন এক অধ্যায়।
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
হাসান ইনাম প্রতিভাবান একজন লেখক। লিখতে অনেকেই পারেন, কিন্তু সঠিকভাবে গল্প বলতে পারে কয়জন? হাসান ইনাম দারুণ গল্প বলেন। সে গল্পে আকৃষ্ট হয়ে যাওয়া যায়। “ঢাকায় ফাগুন যেভাবে এলো” মূলত “ঢাকায় ফাগুন” বইটার সিকুয়াল। “ঢাকায় ফাগুন” বইতে অনেকগুলো সমস্যা ছিল। কিছুটা ধোঁয়াশা ছিল। শেষটা পছন্দ হয়নি। লেখক “ঢাকায় যেভাবে ফাগুন এলো” বইতে সবগুলো ত্রুটি দূর করার চেষ্টা করেছেন। এই দিকটি ভালো লেগেছে। হয়তো লেখক এভাবেই লিখব বলে আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলেন।
“ঢাকায় ফাগুন” গল্পটি আমরা জানতে পারি হাসান মাহফুজের জবানিতে। আর “ঢাকায় ফাগুন যেভাবে এলো” বইটির মূল চরিত্র হাসান জামিল। একটি ঘটনা যখন ঘটে, তখন সেই ঘটনাক্রম একাধিক কুশীলব থাকে। একজনের কাছে ঘটনা জানা গেলে সেটার সত্যতা কতটুকু সেই প্রশ্ন থাকতে পারে। কারণ আমরা মানুষ নিজেদের জাহির করতে পছন্দ করি। নিজেদের ক্ষতি হবে বা নিজের সম্মানের প্রশ্ন থাকে, এমন অবস্থায় তা গল্পে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। থাকে রং ছড়িয়ে গল্প বলার। হয়তো। যে গল্পে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা চলে, সেই গল্পে অন্যকে অপদস্ত করা হয়।
তাই ভিন্ন আঙ্গিকে গল্পের মূল কুশীলব প্রত্যেকের কথা শুনতে হয়। একজনের কথা শুনে আমরা যাকে দোষী ভাবছি, তার নিজের ভাষ্য অন্যরকমও হতে পারে। এতে ভাবনায় ভিন্নতা আসে। সেই চরিত্রকে বুঝতে পারা সহজ হয়। লেখক যে মূল চরিত্রগুলোকে স্থান দিয়েছেন, তাদের বয়ানে গল্প জানানোর প্রয়াশ ভালো লেগেছে। “ঢাকায় ফাগুন”-এর মিসিং লিংকগুলো একাধিক প্রশ্নের সম্মুখীন করেছিল, তার অধিকাংশের উত্তর পাওয়া গিয়েছে এখানে। এখানে সিরিজের পূর্ববর্তী বইয়ের অনেক ঘটনাক্রমের বর্ণনা রয়েছে, তবে ভিন্ন আঙ্গিকে। ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে।
পূর্ববর্তী বইয়ের মতো এখানে ঢাকার অলিগলি বা ইতিহাসে লেখক ঘুরিয়ে না আনলেও, এক অন্যরকম ইতিহাস এখানে নিয়ে এসেছেন। যার সাথে জড়িয়ে আছে মহানবী (সাঃ) এর কদমে রাসূলের গল্প। কীভাবে? সেটাই উন্মুক্ত করবে একশ-এরও কম পৃষ্ঠার এই উপন্যাসিকা।
বইটির দৈর্ঘ্য কম হলেও এর মধ্যে লেখক অনেক কিছুর সমন্বয় ঘটিয়েছেন। বাড়তি কোনো কথা নেই, বাহুল্য বিবর্জিত সাবলীল লেখনী। আমার লেখকের লেখার ধরন বেশ পছন্দের। তিনি এত সহজভাবে গল্প বলতে পারেন! সেই সাথে টুকরো টুকরো চমকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ছোট্ট এই বইতে বেশকিছু চমক ছিল। এত স্বল্প পরিসরে চমকগুলো ফুটিয়ে তোলার কৃতিত্ব লেখকের। ঢাকায় ফাগুন বইয়ের শেষভাগে যে হতাশা কাজ করছিল, এখানে তেমনটি হয়নি। শেষটা আমার যথাযথ মনে হয়েছে।
আমাদের চারপাশে এমন কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ থাকে, যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সব করতে পারে। এতে মানুষের জীবনে কেমন বিভীষিকা নেমে আসতে পারে। হাসান মাহফুজ তেমন পরিস্থিতির স্বীকার। আমাদের চেনা পরিচিত মানুষদের সবসময় আমরা চিনতে পারি না। মুখোশ পরে চারপাশে ঘোরাফেরা করে। সঠিক সময়ে সেই মুখোশ ঠিকই খুলে পড়ে। কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে যায়। প্রিয় মানুষকে ভুলভাবে চিনতে পারার কারণে হয়তো নিজের অসহায় লাগে। কিন্তু নিজেও যে মুখোশের আরো অন্য কোনো অবয়ব নিয়ে সুপ্ত অবস্থায় থাকে, তা কি জানে?
ছোট্ট এই বইতে চরিত্র নিয়ে কাজ করার খুব একটা সুযোগ ছিল না। মূল চরিত্র খুব অল্প। তারপরও স্বল্প পরিসরে লেখক যেভাবে চরিত্র পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, প্রশংসনীয়। তবে কে নায়ক আর কে খলনায়ক, সেটা পাঠককেই বিবেচনা করতে হবে।
▪️বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
ছোট্ট এ বইতে বেশকিছু ছাপার ভুল ছিল। বানান ভুলও ছিল। বিশেষ করে কি/কী এর ভুল ব্যবহার ইদানিং বেশি দেখা যায়। ছোট্ট বইতে যে সংখ্যক ভুল ছিল, না থাকলেও ভালো হতো।
আমার প্রচ্ছদটা ভালো লেগেছে। সিরিজের আগের বইয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাছাড়া দেখতেও এক ধরনের ভিন্টেজ ভাব আছে।
▪️ঢাকার এই অলিগলিতে ঘুরছে রহস্যমানব জহির। যার সাথে জড়িয়ে গিয়েছে দুই হাসান (মাহফুজ ও জামিল)। গ্লোরি অফ ঢাকা ব্যস্ত ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষায়। তারপরও সবাই ছুটছে কোনো এক বিশেষ বস্তুর পেছনে। কী সেটা? গঙ্গা বুড়ির শহর অপেক্ষা করছে নতুন রহস্য উন্মোচনের।
❛বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলির শহর ঢাকা। যুগে যুগে কাল��� কালে ঢাকা হয়তো হারাচ্ছে তার প্রাচীন গরিমা। পূর্বের দালানগুলো ভেঙে হচ্ছে গায়ে গা ঘেঁষা অট্টালিকা। পাশাপাশি দালানে পড়ছে নাভিশ্বাস। তবুও এটা ঢাকা। আছে প্রাচীন ইতিহাস। প্রাচীন ইতিহাসের শেষ স্মৃতিটুকু আগলে তবুও এখনো ধুঁকছে পুরান ঢাকা। মুঘল আমলের শেষ থেকে লাট সাহেব ইংরেজদের স্মৃতিবিজড়িত পুরান ঢাকা।❜
করোনার বন্দী জীবনে মনে আছে হাসান মাহফুজ এক গল্প শুনিয়েছিল? ১৯৪২ থেকে নাকি কোন এক জহির এসে পড়েছে ২০২০ সালে। কী সব অদ্ভুত গপ শুনাচ্ছে সে। এরপর কী করে যেন মাহফুজ নিজেই সেই সময় ভ্রমণের ফাঁদে আটকে যায়। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখে ফেলে এক গল্প। এরপর কী হয়, তার কদিন বাদেই একই গল্প পত্রিকায় ছাপা হয় হাসানের নামে। তবে এ সে হাসান মাহফুজ না। সে ছোট্ট লেখক হাসান জামিল। এরপর তো সময় ভ্রমণ বা স্বপ্নে হাটা সব মিলে কী এক কাহিনি। পলাশী থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার অলিগলিতে চোষে বেড়িয়েছেন এরা। এই তো গেল হাসান মাহফুজের পিঠের গল্প। তবে সব গল্পেই দুইটা বা কয়েকটা পক্ষ থাকে। এই গল্পেও তাই আছে। গল্পের আরেক পিঠে আছে হাসান জামিল নামে ক্ষুদে লেখক। এখন তার ঘটনাই জানা যাক!
জামিল বলছে মাহফুজ মিয়া যেভাবে তার ❛ঢাকায় ফাগুন❜ গল্প ফেঁদেছেন তার অনেকটাই মিথ্যে। সত্য গোপন করেছেন, নিজেকে কোথাও ভিকটিম দেখিয়েছেন আবার নিজের দোষ লুকিয়েছেন। কোথাও বা আবার নিজের লজ্জা ঢেকে সেটাকে মশলা মিশিয়ে স্বাদের পরিবর্তন করে ফেলেছেন। জামিল আর মাহফুজের ঘটনা একইসাথে আর একই ব্যক্তির দ্বারা তথা জহিরকে নিয়ে ঘটলেও গল্পের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। যে মাহফুজ ভাবছে সে সময় ভ্রমণ করছে বা স্বপ্নে কিছু হচ্ছে সেখানে নাকি মূল ঘটনা একেবারেই ভিন্ন! ঢাকার ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে শতাব্দী পুরোনো কিছু সত্য, কিছু মূল্যবান সম্পদ। যার হদিশ গল্পের আকারে মাহফুজের গল্পে ছিল। সে হদিশের সঠিক উত্তর বের করেছে হাসান জামিল। আর এদিকে নাকি ❛গ্লোরি অফ ঢাকা❜ নামে ঢাকার ইতিহাস নিয়ে কাজ করা এক সংগঠন নেমেছে অতীতের এক সম্পদের খোঁজে। এতকিছুর মাঝে বারবার উঠে আসছে ঘষেটি বেগম আর তার লুকিয়ে যাওয়া মূলবান কিছু জিনিস। যার নকশা আছে অলিগলির ওই পুরান ঢাকায়। ইতিহাসের সম্পদ চাপা পড়েছে হয়তো বর্তমানের কোনো স্থাপনার নিচে। ❛কদমে রসূল❜ এর সাথে বা এর কিংবদন্তীর সাথে পুরান ঢাকার সংযোগ ঠিক কোথায়? জানতে হলে বেচারাম দেউরি থেকে জিনজিরা হয়ে একেবারে বরিশালের লঞ্চে উঠে যেতে হতেও পারে!
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝ঢাকায় যেভাবে ফাগুন এলো❞ হাসান ইনামের উপন্যাস। মনে হয় উপন্যাসিকা বলাই শ্রেয়। ❛ঢাকায় ফাগুন❜ এর দ্বিতীয় কিস্তি এটি। প্রথম বই আমার মতো অনেক পাঠকই খুব আশা নিয়ে শুরু করলেও শেষটা সেই আশার তৃপ্তি পর্যন্ত আনতে পারেনি। কিছুটা প্রত্যাশা না পূরণের আক্ষেপ আর কিছুটা উত্তরহীন প্রশ্নের দোলাচলে দুলতে দুলতেই শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় কিস্তিটি তাই বলা যায় সেই আক্ষেপ আর পেন্ডুলামের দোলার সকল উত্তর নিয়ে হাজির হয়েছে। প্রথম কিস্তি যেখানে শেষ হয়েছে এটি সেখানে শুরু এমন বলা যায় না। বলতে হয় প্রথম কিস্তির ভিন্ন দিক নিয়েই দ্বিতীয় কিস্তির আবির্ভাব। ফাগুনে মূল হাসান মাহফুজ হলেও এখানে আমাদের প্রোটাগোনিস্ট হাসান জামিল। যে কিনা করোনার বন্ধে নিজের লেখক সত্তাকে বের করে আনতে চেয়েছিল। আর সেই লেখক সত্তার আবির্ভাবেই লকডাউনের সময়টা একেবারে রোমাঞ্চকর হয়ে ধরা দিলো তার কাছে। মাহফুজের জবানীর কতটা সঠিক ছিল আর কতটা বানোয়াট ছিল জামিল এসেছে সে গল্প নিয়ে। আগে যে নিরীহ মূল চরিত্র ছিল এখানে সেই কি তবে আসল খল? কে জানে! ৯৬ পৃষ্ঠার মাঝে ইতিহাসের অলিগলি আর রহস্যের সৃষ্টি করে টুকটুক করে সমাধান দেয়াটা খুব সোজা কোনো কাজ নয়। সেইসাথে একই গল্পকে ভিন্ন আঙ্গিকে বলে পাঠককে সেখানে আটকে রাখার জন্য গল্প বলার সুন্দর গুন প্রয়োজন, যা লেখকের আছে। একই কাহিনিকে আরেকজনের বিচারে রেখে সেখানে নতুনত্বের আগমন ঘটিয়েছেন। পুরান ঢাকা বা ঢাকা নিয়ে আগ্রহের কারণে এই সিরিজ আমার ভালো লাগে। পুরান ঢাকার ইতিহাস লেখক ভালো জানেন। জানেন তার থেকে সুন্দর গল্প বের করে আনতে। কিংবদন্তীর সাথে ইতিহাস আর রহস্যের সমাহারে ছোট্ট এই উপন্যাস প্রাণ পেয়েছে। পড়তে ভালো লেগেছে। আর অবশ্যই গত বইয়ের না জানা উত্তর মিলেছে এখানে। আর এখানে অজানা উত্তর হয়তো মিলবে কোনো এক গঙ্গা বুড়ির তীরে। তবুও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। সেটা পরে আসবে নাকি জানিনা। বাকরখানি দুধে মিশিয়ে রাতভর রেখে পরদিন খাওয়ার ব্যাপার জামিলের জানার কারণে সালমা আর মাহফুজের অমন ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার কারণ বুঝিনি। প্রথমে বলা হচ্ছিলো, ঘোর করোনা আর লকডাউনের মাঝে এই ঘটনা। আবার বলছে লকডাউন এখন তেমন টাইটফিট নেই। মাঝে সময় কতটা গেছে দ্বিধায় পড়ে গেছি।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
প্রথম প্রচ্ছদের সাথে মিল রেখে বানানো এই প্রচ্ছদটা আমার বেশ পছন্দের। বাতিঘরের এই বইটা একদম ক্লাসিক বাতিঘর স্টাইলে নিজের স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। অত্যধিক বানান ভুল আর টাইপোর মেলা ছিল। আগা সাদেক আর আগা বাকের নামটা আগে সাদেক, আগে বাকের হয়ে গেছিলো। কী/কি এর সন্ধ্যা পুরো বইতে ছিল। বাক্য পূরণ হওয়ার আগেই দাড়ি দিয়ে আবার অন্য বাক্যে চলে গেছিলেন। পরের এডিশনে এগুলো নজর দেয়া যেতে পারে।
পলাশীর অসমাপ্ত ইতিহাস আর ঘষেটি বেগমের সলিল সমাধি আগে ঘটে যাওয়া লুকোচুরির সমাধান হয়তো সামনে আসবে। ততদিন আমরা অপেক্ষা করবো গঙ্গা বুড়ির তীরে।
In this book, the author has shown the strength of his writing in the history section. Especially the various ups and downs of the hero make the story very interesting. Although the narration seems more like a juvenile story, overall a good book to read.
এ পর্যন্ত ইনাম ভাইয়ের যে কয়টা বই পড়েছি,তার মধ্যে এটা সবচেয়ে বেশি ভালো লাগছে।সিরিজের আগের বই থ্রিল,মিস্ট্রি খুব একটা না থাকলেও এটাই সেগুলোর পাশাপাশি পর্যায়ক্রমিক টুইস্ট ও আছে। এছাড়াও ভাইয়ের প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার বিষয়ও(ইসলামিক স্টাডিজ) আছে,জানি না সেগুলোর মাঝে ফিকশনাল ছিলো কিনা। পরিশেষে, সিরিজের ২টি গল্প ভিন্ন ২জন ফিকশনাল লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করার দারুণ লেখনশৈলীও ভালো লেগেছে।