দস্যু বনহুর সিরিজের বিখ্যাত লেখিকা রোমেনা আফাজ এর প্রেমের উপন্যাস ‘কাগজের নৌকা’ ,পরবর্তীতে যেটিকে চলচ্চিত্রে রূপদান করা হয়। বাংলা সিনেমার যে চিরাচরিত ছাঁচ, তার একেবারে মাপে মাপে লেখা হয়েছে উপন্যাসটি। গ্রামের ধনী জমিদারের মা হারা বালক পুত্র (সাজ্জাদ) ও দরিদ্র এতিম বালিকার (সালেহা) পরস্পরের প্রতি ভালো লাগা দিয়ে উপন্যাস শুরু। দু'পরিবারের সামাজিক অবস্থানের বিশাল ফারাক অবধারিতভাবে নায়কের ধনী পিতার জাত্যাভিমানে আঘাত হানে। অতএব, পিতা কর্তৃক পুত্রকে শহরে নামী স্কুলে পাঠিয়ে নায়ক নায়িকার পৃথকীকরণ সময়ের দাবী মাত্র। কোন এক অমোঘ নির্দেশে বালিকা নায়িকার একমাত্র আশ্রয়স্থল নানীর মৃত্যু নায়িকার কঠিন জীবনকে কঠিনতর করে তোলে। শহরে কাজের উদ্দেশ্যে আসা সালেহাকে ‘দুষ্ট লোকেরা’ (‘দুষ্ট লোক’ লেখিকারই সম্বোধন, আমার নয়!) ভুলিয়ে বাঈজী বাড়ীতে নিয়ে আসে। রাতের অন্ধকারে সালেহা দৌড়ে পালিয়ে যাবার পথে ধাক্কা খায় মদ খেয়ে বাড়ী ফিরতে থাকা মওলা মিয়ার সাথে। মওলা মিয়া কে? লেখিকার ভাষায় তাঁর বর্ণনা, “আসলে মওলা মিয়া মাতাল হলেও চরিত্রহীন লম্পট নয়। হোটেলে কাজ করলেও মওলার হৃদয় ছিল মহৎ উদার। সে সালেহাকে নিজের বোনের মত মনে করেই বাড়ীতে নিয়ে চলে”। সালেহাকে বাড়ীতে নিয়ে যাবার আগে মওলা মিয়ার নেশা কেটে গিয়ে তাঁর ব্রুস লী সত্তাটি জেগে ওঠার মাধ্যমে যে দুষ্টের দমন ঘটেছে তা বলাই বাহুল্য।
পৃথিবীর ইতিহাসে সিনেমার নায়ক নায়িকারা জীবনে কখনো দ্বিতীয় হননি। সালেহাও সরস্বতী দেবীর বিদ্যার ভাঁড়ার প্রায় খালি করে এনে প্রথম বিভাগে মেডিকেল পাশ করে। প্রায় এক যুগের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা সাজ্জাদ-সালেহা কে বিচলিত করতে পারেনা খুব একটা, যে কারণে সাজ্জাদের সর্বোত্তম বন্ধু সেলিমের অজ্ঞানতাবশত প্রেম নিবেদনকে সালেহা প্রত্যাখান করে। সিনেমার জগতে দুনিয়াটা খুব ছোট। যা কিছু ঘটনা ঘটে, নির্দিষ্ট একটি পরিচিত গণ্ডির মাঝেই ঘটে। সে কারণেই বোধহয় নায়ক সাজ্জাদ যখন গাড়ী দুর্ঘটনায় হাসপাতালে ভর্তি হয়, তার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পড়ে ডাক্তার সালেহার হাতেই। আর আধুনিক জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর কাছে রহস্য নায়কের শরীরের বিশেষ গুণসমৃদ্ধ রক্ত নায়িকা ছাড়া আর কার দেহে পাওয়া যেতে পারে? বাংলা সিনেমার মনোযোগী- অমনোযোগী দর্শক ভেদে সবাই-ই এর পরের ঘটনা জানেন (আগের ঘটনাও যে জানেননা, তা-ই বা বলি কী করে?) সব মিলিয়ে ‘কাগজের নৌকা’ পড়বার অনুভূতি অনেকটা ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলে বসে নায়ক শাকিব খান, নায়িকা অপু বিশ্বাস ও পার্শ্বনায়ক কারো (যিনি শাকিব খানের চেয়ে বেঁটে, তুলনামূলক ‘অসুন্দর’ ও কম সুদর্শন হবেন) একটি প্যাকেজ সিনেমা দেখবার মত। অবশ্যই, যে সময়ে উপন্যাসটি লেখা হয়েছে, শাকিব খানেরা তখন নিতান্তই শিশু। তবে গত ৪০ বছরের কয়েক হাজার বাংলা ছবির প্লট এক। হলিউড-বলিউডে পুরনো কিছু ছবির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য নতুন আমেজে ‘রিমেক’ করার সংস্কৃতি আছে। সে হিসেবে বাংলা সিনেমা বোধহয় সবচেয়ে বেশী রিমেক করবার বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী।
এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ দুটি সংলাপ এখানে উল্লেখ করছি। প্রথম সংলাপটি নায়ক সাজ্জাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া, তাকে কে রক্ত দিয়ে বাঁচিয়েছে তা জানতে না দেয়ায়, “যে আমার জন্য এতো করেছে, যে নিজের রক্ত দিয়ে আমার প্রাণ রক্ষা করেছে, না না, তার নামই যদি আমি জানতে না পারি-তাহলে কি হবে এ প্রাণ দিয়ে। আমি বাঁচতে চাইনা। আমাকে মেরে ফেলুন। আমাকে মেরে ফেলুন”।
দ্বিতীয় সংলাপটি সার্জন ডঃ সেন এর। সালেহাকে খুঁজতে আহত সাজ্জাদ যখন বেরোচ্ছে, তাকে উৎসাহ দিয়ে, “উইশ ইওর গুড লাক মাই বয়, গুড লাক...”। হলে বসে 'কাগজের নৌকা' চলচ্চিত্র আকারে দেখলে সিটি বাজিয়ে সাধুবাদ জানাতাম সংলাপ দুটিকে।
১৯৯০ সালে নিউজপ্রিন্ট কাগজে প্রকাশিত হওয়া বইটির মূল্য লেখা রয়েছে ২২ টাকা। প্রকাশের ২৪ বছর পর ২০১৪ সালে ফুটপাথের ওপর থেকে ‘যেইটা লইবেন খালি বিশ’ দরে পুরনো মলিন বইটি হস্তগত করলাম। পাঠকীয় দিক হোক আর অর্থনৈতিক দিকই হোক, সব বিচারেই লোকসানের পাল্লাটা মনে হয় আমার দিকেই ভারী বেশী!