বর্তমানে নতুন বই খুব ভেবে চিন্তে কিনি। পছন্দের লেখকের নতুন বই ছাড়া কিনতে খুব একটা সাহস হয় না। কারণ এমন অনেকবার হয়েছে যে কোনো রিভিউ না দেখে কিনেছি কিন্তু পড়ার পর দেখলাম একদমই ভালো লাগলো না কাহিনীটা। তবে এই বইটির বিষয়ে জানার পর পড়ার আগ্রহটা খুব জন্মেছিল। দুদিন ধরে পড়ে শেষ করেছি। সব গল্প সমানভাবে মনে ধরেনি। কিছু গল্প ভালো লেগেছে, আর কিছু অতোটাও না।
এই বইতে মোট ৯ টা ছোটো বড়ো অনুবাদিত গল্প আছে। তিনজন জনপ্রিয় জাপানি লেখকের কয়েকটি রহস্যকাহিনী সংকলিত হয়েছে এই বইতে। মোট নয়টি গল্প আছে এতে। যারমধ্যে প্রথম ৫ টির লেখক হলেন কেইকিচি ওসাকা (অনুবাদক ঋজু গাঙ্গুলী), পরের অর্থাৎ ষষ্ঠ গল্পটির লেখক এডোগাওয়া র্যামপো (অনুবাদক অর্ক পৈতণ্ডী) এবং শেষ ৩ টির লেখক কিদো ওকামোতো (অনুবাদক পার্থ দে)।
এই ৯ টা গল্পের মধ্যে যে ৩টে গল্প আমার বেশি ভালো লেগেছে, সেগুলো হলো~
১) খনি~ কয়লাখনিতে আগুন লাগায় ও-শিনো সেখান থেকে পালাতে পারলেও, তার স্বামী মিনোকিচি ভেতরেই আটকে পরে। এরপর আগুন যাতে বাইরে আসতে না পারে তাই খনির সুরঙ্গের মুখের দরজাটা দিয়ে দিতে বলে ফোরম্যান ও ইঞ্জিনিয়ার। ও-শিনো তার স্বামীকে বাঁচানোর জন্য দরজা খোলার অনেকবার অনুরোধ করলেও দরজা খোলা হয় না। আর এরপরই ঘটতে থাকে একেরপর এক খুন। ও-শিনো -ই কি তাহলে করলো খুনগুলো? সে কি তার স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চাইছে? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোন রহস্য?
২) সাইকোলজিক্যাল টেস্ট~ এই গল্পে লেখক একদম শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছেন যে ফুকিয়া নামক এই ছেলে খুন করেছে একটি বৃদ্ধাকে। কিন্তু সে কেন, কীভাবে খুন করলো আর তাকে ধরতে গিয়ে পুলিশ সহ গোয়েন্দা বিভাগের কী নাস্তানাবুদই না হতে হয়, সেই কাহিনীটা দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
৩) ওফুমির ভূত~ ওমিচি এবং তার মেয়ে ওহারু প্রায় কিছুদিন ধরে তাদের ঘরে মধ্যরাতে একটি নারীর প্রেতাত্মাকে আপাদমস্তক জলে ভেজা অবস্থায় শরীর ঝুঁকিয়ে বসে থাকতে দেখে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, এই প্রেতাত্মাকে কেবল তারা দুজনেই দেখতে পায়। বাকি কারোর নজরে পড়ে না। কেন প্রেতাত্মাটা কেবল তাদেরই দেখা দেয়? কী রহস্য লুকিয়ে রয়েছে এর পেছনে?
উপরের গল্পগুলো বাদে আর যে ২টো গল্প মোটামুটি লেগেছে, তা হলো~
৪) পাথরের লণ্ঠন~ কিকুমুরা পরিবারের মেয়ে ওকিকু, তাদের কাজের মেয়ে ওতাকে কে নিয়ে কান্নোন দর্শন করতে গিয়ে মাঝপথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তারপর ওতাকে বাড়ি ফিরে আসলেও, ওকিকু আর ফেরেনি। কোথায় গেলো সে? কেউ অপহরণ করলো নাকি তাকে? পারবে গোয়েন্দা হানসিচি এই রহস্যের সমাধান করতে?
৫) কাম্পেই-এর মৃত্যু~ ইজুমিয়া পরিবারের ছেলে কাকুতারো নাট্যাভিনয় করতে গিয়ে মারা যায়। তরোয়ালের খাপে কাঠের ভোঁতা তরোয়ালের জায়গায় কেউ ইস্পাতের ধাঁরালো তরোয়াল রেখে দিয়েছিল। এটা যে একটা পরিকল্পিত খুন বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু কে এবং কেন করলো এভাবে খুন? কী রহস্য লুকিয়ে রয়েছে এর পেছনে?
এই গল্পদুটোর শুরুটা ভালো লাগলেও, শেষটা আমার ঠিক মনঃপূত হয়নি। লেখার বাঁধনটা শেষের দিকে আরেকটু জটিল হলে হয়তো বেশি ভালো লাগতো। তবে মোটের উপর ঠিকঠাক ছিল এই গল্পদুটো।
এই মোট ৯ টার মধ্যে ৫ টা গল্প, যা ভালো লেগেছে। কিন্তু বাকি প্রথমদিকের গল্পগুলো আমার অতোটা ভালো লাগেনি। কেন ভালো লাগেনি তার প্রথম কারণ, যেহেতু এতোদিনে অনেক রহস্যকাহিনীই পড়া হয়েছে, তাই যদি সেইসব গল্পের বাঁধনের সাথে তুলনা করি, তাহলে এই গল্পগুলোর বাঁধন খুব হালকা লেগেছে আমার। রহস্যভেদ পদ্ধতি একদমই জটিল না। ক্লাইম্যাক্স ও খুব সরল সাধারণ লেগেছে।
দ্বিতীয় কারণটা অদ্ভুত লাগলেও, এটাই সত্যি যে, প্রথমদিকে নামগুলো মনে রাখতে গিয়েই অর্ধেক খেই হারিয়ে ফেলছিলাম, ফলে গল্পগুলোর সাথে কানেক্ট করতেই পারছিলাম না। এটা আমার অপারগতা। যদিও পরের দিকে সেটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি, আর কাহিনীর বাঁধন কিছুটা ভালো হওয়াতে পড়তেও ভালো লাগছিল।
বইয়ের অনুবাদ যথেষ্ট স্বচ্ছ। পড়তে গিয়ে লেখার মাধুর্য নষ্ট হয়েছে বলে কোথাও মনে হয়নি। যথেষ্ট ভালো অনুবাদ।
এছাড়া আর একটা কথা বলতেই হয়, তা হলো বইয়ের ভেতরের অলংকরণগুলো। প্রত্যেকটা গল্পের সাথে একদম মানানসই, ভীষণ ভালো লেগেছে।
সবশেষে এটাই বলবো, জাপানি রহস্যকাহিনী পড়তে চাইলে একবার পড়ে দেখতে পারেন। আশাকরি ভালো লাগবে। পাঠে থাকুন।