৩.৫/৫ র্যাম্পো'র "সাইকোলজিক্যাল টেস্ট " আর কেইকিচি ওসাকার "সন্তাপ" সবচেয়ে ভালো লেগেছে।মোটাদাগে, কোনো গল্পই খারাপ নয়।অনুবাদও সাবলীল। প্রচুর রহস্য গল্প পড়তে পড়তে এখন কাহিনির টুইস্ট বা মোচড় অবাক করে খুব কম। তবে পড়ার সময় গল্পগুলো রচনার সময়কাল বিবেচনায় রেখে পড়া উচিত।
এই বইটি নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষায় জাপানি রহস্য সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন!
এডোগাওয়া র্যামপোকে জাপানের শার্লক হোমস বলা হয়, আর কেইকিচি ওসাকা তাঁর যুক্তিনিষ্ঠ প্লটের জন্য বিখ্যাত। কিদো ওকামোতোর গল্পগুলিতে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের গভীরতা পাওয়া যায়। এই সংকলন বাংলা ভাষায় জাপানি রহস্য সাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ দিগন্ত উন্মোচন করে।
বইতে মোট ১০টি গল্প আছে ৩জন লেখকে,গল্পের তিন রকম স্বাধ পাবেন লজিক্যাল পাজল, সাইকোলজিক্যাল ডেপথ, কালচারাল কনটেক্সট।
বর্তমানে নতুন বই খুব ভেবে চিন্তে কিনি। পছন্দের লেখকের নতুন বই ছাড়া কিনতে খুব একটা সাহস হয় না। কারণ এমন অনেকবার হয়েছে যে কোনো রিভিউ না দেখে কিনেছি কিন্তু পড়ার পর দেখলাম একদমই ভালো লাগলো না কাহিনীটা। তবে এই বইটির বিষয়ে জানার পর পড়ার আগ্রহটা খুব জন্মেছিল। দুদিন ধরে পড়ে শেষ করেছি। সব গল্প সমানভাবে মনে ধরেনি। কিছু গল্প ভালো লেগেছে, আর কিছু অতোটাও না।
এই বইতে মোট ৯ টা ছোটো বড়ো অনুবাদিত গল্প আছে। তিনজন জনপ্রিয় জাপানি লেখকের কয়েকটি রহস্যকাহিনী সংকলিত হয়েছে এই বইতে। মোট নয়টি গল্প আছে এতে। যারমধ্যে প্রথম ৫ টির লেখক হলেন কেইকিচি ওসাকা (অনুবাদক ঋজু গাঙ্গুলী), পরের অর্থাৎ ষষ্ঠ গল্পটির লেখক এডোগাওয়া র্যামপো (অনুবাদক অর্ক পৈতণ্ডী) এবং শেষ ৩ টির লেখক কিদো ওকামোতো (অনুবাদক পার্থ দে)।
এই ৯ টা গল্পের মধ্যে যে ৩টে গল্প আমার বেশি ভালো লেগেছে, সেগুলো হলো~ ১) খনি~ কয়লাখনিতে আগুন লাগায় ও-শিনো সেখান থেকে পালাতে পারলেও, তার স্বামী মিনোকিচি ভেতরেই আটকে পরে। এরপর আগুন যাতে বাইরে আসতে না পারে তাই খনির সুরঙ্গের মুখের দরজাটা দিয়ে দিতে বলে ফোরম্যান ও ইঞ্জিনিয়ার। ও-শিনো তার স্বামীকে বাঁচানোর জন্য দরজা খোলার অনেকবার অনুরোধ করলেও দরজা খোলা হয় না। আর এরপরই ঘটতে থাকে একেরপর এক খুন। ও-শিনো -ই কি তাহলে করলো খুনগুলো? সে কি তার স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চাইছে? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোন রহস্য?
২) সাইকোলজিক্যাল টেস্ট~ এই গল্পে লেখক একদম শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছেন যে ফুকিয়া নামক এই ছেলে খুন করেছে একটি বৃদ্ধাকে। কিন্তু সে কেন, কীভাবে খুন করলো আর তাকে ধরতে গিয়ে পুলিশ সহ গোয়েন্দা বিভাগের কী নাস্তানাবুদই না হতে হয়, সেই কাহিনীটা দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
৩) ওফুমির ভূত~ ওমিচি এবং তার মেয়ে ওহারু প্রায় কিছুদিন ধরে তাদের ঘরে মধ্যরাতে একটি নারীর প্রেতাত্মাকে আপাদমস্তক জলে ভেজা অবস্থায় শরীর ঝুঁকিয়ে বসে থাকতে দেখে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, এই প্রেতাত্মাকে কেবল তারা দুজনেই দেখতে পায়। বাকি কারোর নজরে পড়ে না। কেন প্রেতাত্মাটা কেবল তাদেরই দেখা দেয়? কী রহস্য লুকিয়ে রয়েছে এর পেছনে?
উপরের গল্পগুলো বাদে আর যে ২টো গল্প মোটামুটি লেগেছে, তা হলো~ ৪) পাথরের লণ্ঠন~ কিকুমুরা পরিবারের মেয়ে ওকিকু, তাদের কাজের মেয়ে ওতাকে কে নিয়ে কান্নোন দর্শন করতে গিয়ে মাঝপথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তারপর ওতাকে বাড়ি ফিরে আসলেও, ওকিকু আর ফেরেনি। কোথায় গেলো সে? কেউ অপহরণ করলো নাকি তাকে? পারবে গোয়েন্দা হানসিচি এই রহস্যের সমাধান করতে? ৫) কাম্পেই-এর মৃত্যু~ ইজুমিয়া পরিবারের ছেলে কাকুতারো নাট্যাভিনয় করতে গিয়ে মারা যায়। তরোয়ালের খাপে কাঠের ভোঁতা তরোয়ালের জায়গায় কেউ ইস্পাতের ধাঁরালো তরোয়াল রেখে দিয়েছিল। এটা যে একটা পরিকল্পিত খুন বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু কে এবং কেন করলো এভাবে খুন? কী রহস্য লুকিয়ে রয়েছে এর পেছনে?
এই গল্পদুটোর শুরুটা ভালো লাগলেও, শেষটা আমার ঠিক মনঃপূত হয়নি। লেখার বাঁধনটা শেষের দিকে আরেকটু জটিল হলে হয়তো বেশি ভালো লাগতো। তবে মোটের উপর ঠিকঠাক ছিল এই গল্পদুটো।
এই মোট ৯ টার মধ্যে ৫ টা গল্প, যা ভালো লেগেছে। কিন্তু বাকি প্রথমদিকের গল্পগুলো আমার অতোটা ভালো লাগেনি। কেন ভালো লাগেনি তার প্রথম কারণ, যেহেতু এতোদিনে অনেক রহস্যকাহিনীই পড়া হয়েছে, তাই যদি সেইসব গল্পের বাঁধনের সাথে তুলনা করি, তাহলে এই গল্পগুলোর বাঁধন খুব হালকা লেগেছে আমার। রহস্যভেদ পদ্ধতি একদমই জটিল না। ক্লাইম্যাক্স ও খুব সরল সাধারণ লেগেছে।
দ্বিতীয় কারণটা অদ্ভুত লাগলেও, এটাই সত্যি যে, প্রথমদিকে নামগুলো মনে রাখতে গিয়েই অর্ধেক খেই হারিয়ে ফেলছিলাম, ফলে গল্পগুলোর সাথে কানেক্ট করতেই পারছিলাম না। এটা আমার অপারগতা। যদিও পরের দিকে সেটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি, আর কাহিনীর বাঁধন কিছুটা ভালো হওয়াতে পড়তেও ভালো লাগছিল।
বইয়ের অনুবাদ যথেষ্ট স্বচ্ছ। পড়তে গিয়ে লেখার মাধুর্য নষ্ট হয়েছে বলে কোথাও মনে হয়নি। যথেষ্ট ভালো অনুবাদ। এছাড়া আর একটা কথা বলতেই হয়, তা হলো বইয়ের ভেতরের অলংকরণগুলো। প্রত্যেকটা গল্পের সাথে একদম মানানসই, ভীষণ ভালো লেগেছে।
সবশেষে এটাই বলবো, জাপানি রহস্যকাহিনী পড়তে চাইলে একবার পড়ে দেখতে পারেন। আশাকরি ভালো লাগবে। পাঠে থাকুন।
জাপানি সাহিত্য, মূলত ওনাদের গোয়েন্দা কাহিনী নিয়ে চর্চা ইদানিং চোখে পড়ার মতন বৃদ্ধি পেয়েছে। সাথের ছবিটি ব্যাঙ্গালোরের একটি বিখ্যাত বইয়ের দোকানে কয়েক বছর আগের তোলা। হিগাশিনোর নাম জানতাম , বাকিদের কথা প্রিয় এই বই এর দোকানের এই জাপানি লেখার স্তুপ থেকে আর কৌশিক মজুমদারের কাছ থেকে জানতে পারি । ইতিমধ্যে ডিটেকটিভ কাগা এবং বেশ কিছু লক রুম মিস্ট্রি গোগ্রাসে গিলেছি ।
উদিত সূর্যের অন্ধকার আরো কিছুটা এগিয়ে একেবারে প্রথম দিকের জাপানি রহস্য কাহিনীগুলির সাথে বাঙালি পাঠকের পরিচয় করিয়েছে। বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা কাহিনীর ক্রমে বিবর্তন নিয়ে কৌশিকববাবুর তথ্য সমৃদ্ধ ভূমিকাটি আলাদা ভাবে উল্লেখযোগ্য । এছাড়া এই বইয়ের আরেকটি বিশেষত্ত হলো লেখক পরিচিতি । আমার মত অনেক পাঠকই এই জাপানি লেখকদের নাম হয়তো প্রথমবার শুনছেন। তাই তাদের কাছে এই লেখক পরিচিতির পাতাগুলি মূল্যবান । প্রতিটি লেখাই উপযুক্ত অলংকরণ / মানচিত্রে সমৃদ্ধ।
কেইকিচি ওসাকার ৫ টি লেখার অনুবাদ করেছেন ঋজু বাবু । এরমধ্যে বাতিঘর আমার কাছে এই সংকলনের সেরা লেখা মনে হয়েছে । খনি গল্পটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । দুর্গম পরিবেশে অ্যাডভেঞ্চারের ছোঁয়া মেশানো রহস্য কাহিনী গুলির পড়তে পড়তে রয়েছে চমক ।
ডয়েল ও পো এর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তারো হিরাই নাম নিয়েছিলেন এডোগাওয়া রামপো । অর্ক পৈতন্ডী এনার সাইকোলজিকাল টেস্ট লেখাটির অনুবাদ করেছেন । কেগরা আকচির গোয়ে��্দাগিরির এই অভিযানটি howcatchem গোত্রের । অর্থাৎ ফুকিয়া নামের চরিত্র টি যে খুনি সেটা শুরুতেই জানিয়ে কাহিনির সূত্রপাত । এরপর রয়েছে যন্ত্রের ব্যবহার , সঙ্গত কারণেই আর বিশদে গেলাম না , তবে এটি নিঃসন্দেহে বারবার পাতা উল্টে পড়ার মতো লেখা ।
কিদো ওকামোতোর সৃষ্ট ইন্সপেক্টর হানসিচির ৩ টি কাহিনি অনুবাদ করেছেন পার্থ দে । অলৌকিক ছোঁয়া অদ্ভুত এই রহস্য কাহিনী গুলির বিশ্বাসযোগ্য জাগতিক ব্যাখ্যা দিয়ে সম্পূর্ণ হয়েছে । প্রতি লেখায় প্রয়োজনীয় টিকার ব্যবহার বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য ।
মগজাস্ত্র নির্ভর গোয়েন্দাদের এই অভিযান গুলিতে পাঠকের মস্তিস্ক চালনার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে । সব মিলিয়ে গোয়েন্দা প্রেমীদের জন্য এই সঙ্কলনটি যথেষ্ট উপভোগ্য ।
অনুবাদ গ্রন্থ পড়ার সময় এক ধরণের অস্বস্তি কাজ করে কারণ সাধারণত অনুবাদের ক্ষেত্রে মূল ভাষার মাধুর্য নষ্ট হয়। কিন্তু এই বইটির ক্ষেত্রে তা একেবারেই পেলাম না। রহস্য গল্পের অনুরাগী হওয়ার কারণে বইয়ের বিষয়ে জানতে পেরে পড়তে আগ্রহী হই। নয়টি জাপানী রহস্য গল্পের অনুবাদ করা হয়েছে এই বইয়ে। প্রতিটি গল্পের চয়ন অসাধারণ। গল্পের শুরুতে প্রত্যেক লেখকের পরিচিতি সম্পর্কে পাঠককে বিস্তারিত ভাবে জানানো হয়েছে, যা এই বইয়ের উপরি পাওনা। জাপানী ভাষার মত কঠিন এক ভাষার অসাধারণ কিছু গল্প অত্যন্ত যত্ন সহকারে পেশ করেছেন অনুবাদকত্রয়ী। বাঙালি পাঠককে একগুচ্ছ অজানা ও প্রায় হারিয়ে যাওয়া সাহিত্যের সাথে পরিচয় করানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। বইয়ের প্রচ্ছদ যথোপযুক্ত। বইয়ের ভিতরের অলংকরণ আরেকটু স্পষ্ট ও বিস্তারিত হলে বড় ভালো হত। জনপ্রিয় লেখকের দ্বারা লিখিত মুখবন্ধ থেকেও অনেক অজানা তথ্য পাঠক জানতে পারবেন। তবে এই মুখবন্ধ কেন অনুবাদক ত্রয়ীর কেউ একজন বা সবাই লিখলেন না তা বুঝলাম না, যেখানে তিনজনেই এই বিষয়ে যথেষ্ট যোগ্য। আগামীতে এই বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ড পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।