ননফিকশন পড়ার যে আনন্দ তার অনেকটাই নির্ভর করে লেখকের উপস্থাপনের উপর। একজন সুলেখক ননফিকশনকে করে তুলতে পারেন পরম উপভোগ্য। প্রায় ৬০ টি আলাদা বিষয়ের নিবন্ধ নিয়ে সাজানো হয়েছে নির্বাচিত সিল্করুট। বেশিরভাগ লিখাকেই ইতিহাসের জনরায় ফেলা যায়। তবে ইতিহাস ছাড়াও স্থাপত্য, সংস্কৃতি, সমরাস্ত্র, রান্না, মহামারীসহ বেশকিছু টুকরো ব্যাপার সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। মুহিত হাসানের লিখা “আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের পূর্বাপর” এবং “ব্রিটিশ ও বাঙালি লেখকের সাহিত্যে চাঁদ সুলতানা” লেখা দুটো আগে পড়া ছিলো। ঠিক কোথায় পড়েছি মনে না পড়লেও লিখাগুলো যে ভালো লেগেছিল এতটুকু মনে আছে।
বইটার সূচিতে চোখ বুলিয়েই মনে হয়েছিল এটা পড়া দরকার। সে হিসেবে বইমেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিলো এই বই। যে প্রত্যাশার জায়গা তৈরি হয়েছিল তার অনেকটাই পূরণও করেছে। বেশিরভাগ লেখা পড়তে গিয়ে আমি নতুন তথ্য, বিশ্লেষণ পাচ্ছিলাম। তাছাড়া যেহেতু একটা নিবন্ধের সাথে অন্যটার কোনো যোগসূত্র নেই তাই বিরতি দিয়েও অনায়সেই পড়া যাচ্ছিল। সবমিলিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা বেশ ভালো।
মাস দুয়েক আগে বিখ্যাত সাংবাদিক জাহিদ রেজা নূর স্যারের একটা কর্মশালায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। যারা কম-বেশি পত্রিকা পড়েন, স্যারের নাম বেশ পরিচিতই ঠেকার কথা। টানা ১৭ বছর ফিচার বিভাগে কাজসহ সাংবাদিকতায় তাঁর অভিজ্ঞতা প্রায় ২৫ বছরের।
তো সেখানে তিনি বলছিলেন যে ফিচার লেখার সময় অধিকাংশ মানুষ যেই ভুলটা বেশি করে, সেটা হল লেখা বেশি তথ্যবহুল করে ফেলা। হ্যাঁ, ফিচারে কল্পনা মেশানো যাবে না, সঠিক তথ্য ব্যবহার করতে হবে বটে, তাই বলে পাঠককে একবারে তথ্য গুলিয়ে খাওয়ানো যাবে না। লেখার সময় মনে রাখতে হবে যেন গল্প লিখছি, ফিচারের কাঠামোর কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। তিনি আরো বলেছিলেন যে কিভাবে সহজ ভাষায় গল্পের ছলে ফিচার হয়ে উঠতে পারে প্রাণবন্ত। . . . প্রায় প্রতিটা পত্রিকাতেই ফিচার নিয়ে আলাদা এক বা দুইটা পাতা দেখা যায়। তবে তার বেশিরভাগই স্মৃতিকথা। অন্যান্য বিষয়াবলি নিয়ে ফিচার খুব কমই দেখা যায়, আর দেখা গেলেও সেগুলো খুব বড় পরিসরে লেখা না। নন-ফিকশন নিয়ে আমাদের কেন জানি একরকম অনীহা কাজ করে।
সেদিক থেকে 'বণিক বার্তা' একটু ব্যতিক্রম৷ ‘বণিক বার্তা’র সাহিত্য সাময়িকী ‘সিল্করুট’ পাতা একদম শুরু থেকেই নন-ফিকশন বা ফিচার লেখাকে বেশ গুরুত্বসহকারে ছাপাচ্ছে৷ ইতিহাস, সংস্কৃতি, ব্যক্তিত্ব, গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনালোচিত ঘটনা-প্রতিষ্ঠান প্রতি সপ্তাহে সিল্করুটের বিষয়বস্তু হিসেবে উঠে আসে।
অনেকেই 'বণিক বার্তা'য় সিল্করুটের পুরোনো সংখ্যাগুলো সংগ্রহে রাখার জন্য চিঠি পাঠান। তাই পাঠকদের চাহিদা মেটানোর জন্য সিল্করুট-এর নির্বাচিত লেখার দুর্দান্ত এক সংকলন হিসেবে আসলো 'নির্বাচিত সিল্করুট'।
এই যেমন এটা পড়তে যেয়ে জানলাম মরুদেশ থেকে বাংলায় মাড়োয়ারিরা কিভাবে আসলো। আবার বিখ্যাত কমিডিয়ান সময় রায়নার কাছ থেকে প্রথম কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কথা জেনেছিলাম, এই বইয়ে 'কাশ্মীরি পণ্ডিত-কথা' লেখাটা পড়ে আরেকটু বিস্তারিতভাবে জানলাম। আরো জানলাম জেমস অগাস্টাস হিকি 'বেঙ্গল গ্যাজেট' চালানোর জন্য কী ধরনের অমানুষিক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছিলেন, খিচুড়ির ইতিবৃত্ত, আফিম যুদ্ধ থেকে চায়ের নেশা কিভাবে এলো, হায়া সোফিয়ার ইতিহাস, চাঁদনি চকের কথকতা, কারির যাদুসহ ৫০টিরও বেশি লেখা রয়েছে এই বইতে৷ . . লেখার মান নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। যাদের লেখা এখানে স্থান পেয়েছেন তারা সবাই চমৎকার লেখেন৷ যেমন এখানে স্থান পেয়েছে শানজিদ অর্ণব, হারুন রশীদ, ইমতিয়ার শামীম, আন্দালিব রাশদীসহ চমৎকার সব মানুষদের লেখা। যদি নতুন নতুন বিষয় নিয়ে আপনার জানার আগ্রহ থেকে থাকে, তাহলে অবশ্যই ভালো লাগবে৷
অর্কর রিভিউ দেখে অনেকদিন ধরে চিন্তা করছিলাম বইটা কিনবো৷ কিন্তু দাম একটু বেশি হওয়ায় তখনই কিনতে পারিনি৷ কথায় কথায় যারীনকে একদিন বলেছিলাম বইটার কথা, এরপর দেখি জন্মদিন উপলক্ষে এই বই উপহার হিসেবে হাজির!
তবে ঢাউস এই বই একটানা না পড়াই ভালো৷ আমি প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে এই বইটা পড়ছিলাম। কারণ একটু একটু করে জমিয়ে না পড়লে আসল মজাটা পাওয়া যাবে না!