বইয়ের নামে "ব্রোথেল" কেন? কেননা, ব্রোথেলের নিয়ম মেনেই এখানে সবাই জীবন-যাপন করছে। নাচে-গানে- রক্তে-মদে- বারুদে- ফেনিয়ে উঠছে এখানে কীর্তিনাশা জীবনের আনন্দের পেয়ালা। পৃথিবীর প্রাচীনতম এক ঋষিমানব বলেছেন, ইতর শ্রেণির মানুষেরা আশপাশের মানুষ নিয়ে কথা বলে, মধ্য শ্রেণির মানুষেরা ঘটনা নিয়ে কথা বলে, আর উচ্চশ্রেণির মানুষেরা আইডিয়া বা ফিলোসফি নিয়ে কথা বলে। Small minds discuss people. Average minds discuss events. Great minds discuss ideas. ঋষিমানবের বক্তব্যের সূত্র দিয়ে এই গল্পের যুবক-যুবতীদের সভ্যদের শ্রেণিকরণ করা কঠিন হয়ে যাবে। এরা একই সঙ্গে ইতর, মধ্য এবং উচ্চশ্রেণির প্রাণ। আপনি শুধু বুদ্ধিবেশ্যা চিনেন, এই গল্পটা আপনাকে বুদ্ধি-গেলমান বিষয়েও ধারণা দিবে। খুবই ঝুঁকিপূর্ণ জীবন-যাপন করা একদল তরুণ-তরুণীর গল্প এটা। এদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ রাজনীতির নেকড়ে, কেউ বিত্তবান ঘরের বখে যাওয়া সন্তান, কেউ বেকার, কেউ ধার্মিক। কেউ আবার স্বপ্ন দেখে (নব্বইয়ের দশকের সামাজিক সিনেমার মতো) একটা শান্ত-সৌম্য ইউটোপিয়ার। একটা নন্দিন জীবনের। কেউ যাচ্ছে গোপনে, নানান এজেন্সির মাধ্যমে বিত্তবান ড্যাডি আর মাম্মিদের সঙ্গ দিতে অভিজাত হোটেল। রিসোর্টে। প্রোগ্রামে। এরাই এখানে প্রোগ্রামার। এদের প্রত্যেকের কিছু ডাকনাম আছে, যেমন- রাষ্ট্রপতি, হযরত, পুরোহিত, প্রোগ্রামার, জোড়াখোর, ফাকরানী, শোভাখানকি, উচ্চাখানকি.. ইত্যাদি, ইত্যাদি! এদের একটা আড্ডাখানা আছে। নাম শুঁড়িখানা। শুঁড়িখানা ভয়ংকর। দুর্বলচিত্তের মানুষদের জায়গা এইটা নয়। ওরা এখানে যারা বসে (ওদের ভাষ্যে), একেকটা জাত বে-জন্মা। বিদ্যা-বুদ্ধি-সাহসে বিকট। শিল্পে ও শিষ্টজ্ঞানে শাণিত। আড্ডায় এবং আলাপে প্রবলভাবে যৌনায়িত। ওরা একই সাথে শ্রমিক এবং পুঁজিপতি। আত্মবিশ্বাসী এবং আত্মঘাতী। ওরা বিশ্বাস করে, পৃথিবী এখনও পৃথিবীর সকল বুড়ো-বুড়িদের পাপেই ভারগ্রস্থ হয়ে আছে, সেইখানে নতুন করে পাপ বাড়ানোর কোনো সুযোগ ওদের হাতে নেই। ওরা তাই ভারহীন। পালকের মতো। উড়ে-উড়ে, উড়ছে; যৌবনে, মৌবনে— [নর্তকী ও পুঁজিপতি শাসিত এই ব্রোথেল পৃথিবীতে ভালোবাসা মূলত একটি সাবঅল্টার্ন আর্তনাদ!]
কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই — মান্না দে’র জনপ্রিয় এই কাজ যেন যুগে যুগে চলমান বন্ধুত্বের আড্ডাকে বর্ণনা করে। বন্ধু থাকে, বন্ধু আছে — তাদের আড্ডায় চলে দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্মসহ নানান কথার ফুলঝুরি। কেউ দর্শনবিদ্যা কপচায়, কেউ আবার আলোচনার নামে সমালোচনা বেশি করে। কিন্তু আড্ডা চলতে থাকে। মতের মিল হয়, অমতের নামে তর্ক চলে। সবকিছু ছাপিয়ে বন্ধুত্ব ফিকে হয়ে না। এমন এক আড্ডার বাহারি নাম আছে। যেমন কফি হাউস, ঠিক তেমনই এই আড্ডার সুঁরিখানা। যেখানে দেশ, দশ, মানুষ, সমাজ, দর্শন সব নিয়ে আলোচনা হয়।
এই আড্ডায় শোয়েব একজনকে নিয়ে আবির্ভূত হয়। যে কিছু সময় আগে মৃ ত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে। আত্মহ ত্যার নামে নিজেকে শেষ করে দিতে চাইছিল। কিন্তু, কেন?
“নর্তকী ও পুঁজিপতি শাসিত এই ব্রোথেল পৃথিবীতে” উপন্যাস মূলত দুইজনকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খায়। একজন তরী, যে আত্মহ ত্যার মুখ থেকে ফিরে এসে বর্ণনা করছে নিজের জীবন। আরেকজন তুসি। ঠিক যার কারণেই এই আত্মহ ত্যার প্রচেষ্টা। হয়তো ভুল বললাম। প্রেম মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু আত্মহ ত্যার মতো সিদ্ধান্ত নিতে অনেক অনুসর্গ-উপসর্গ কাজ করে। যেই মানুষটি ছোট থেকে জীবনের অনেকগুলো অন্ধকার দিক দেখেছে, যার কাছে জীবন মানেই এক ধরনের সংগ্রাম — তার জন্য আত্মহ ত্যার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া খুবই সহজ। একটি সামান্য ঝড়ে ভেঙে যায় জীবনের প্রতি বিশ্বাস।
তরী ছাড়াও এই গল্পে তুসির গল্প প্রাধান্য। এক কিশোরী, তরীর প্রেমে মগ্ন। দুইদিনের পরিচয়, কথাবার্তা এরপর প্রেম। একসময় বাস্তবতার সাথে পরিচয়। প্রেমে টানাপোড়েন আসে। প্রেমিক যেমন অন্যের সাথে নিজের প্রেমিকাকে সহ্য করতে পারে না— ভুল বুঝে, সন্দেহ করে। সেখান থেকে সম্পর্কের ইতি চাওয়া নতুন কিছু নয়। তারপর অনুভব করা! সত্যিকারের ভালোবাসায় দুরত্ব এলেও কি হারিয়ে যায়? কে জানে?
আজকালকার লেখকদের কাছে প্রেম মানে নগ্নতা, যৌনতা। এছাড়া যেন প্রেম পূর্ণতা পায় না। অথচ আমি মনে করি, প্রেম মানে পবিত্রতা। অনুভবে প্রেমের চিত্র তুলে ধরা যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ের লেখক শ্রেণীর কাছে প্রেমকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মাধ্যম আজকাল যৌনতা ছাড়া কিছু নয়। হয়তো তা-ই নিখাঁদ বাস্তব। কিন্তু তা বর্ণনা করারও পন্থা আছে। খোলামেলা এরূপ বর্ণনা আমি কেন জানি নিতে পারি না।
বইটি আমাকে ভীষণ রকমরের হতাশ করেছে। কেননা এখানে কোনো গল্প নেই। দুইজনের প্রেম কাহিনির মাঝে লেখক চেষ্টা করেছেন দর্শন ঢোকাতে। সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে আলোচনা করেছেন গল্পের ফাঁকে ফাঁকে। প্রতিটি বিষয় উপভোগ হয়তো করা যেত, যদি গল্প কিছুটা শক্তিমান হতো। অত্যন্ত দুর্বল এই গল্পের আগামাথা কিছুই খুঁজে পাইনি। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে— কিছুই যেন বোধগম্য হয়নি। তরী আর তুসীর জীবন আর কয়েকজনের গালিগালাজ আর সমাজ নিয়ে দর্শন কপচানো আর আলোচনা ছাড়া কিছুই পাইনি যে ভালো লাগবে।
হ্যাঁ, এই বইয়ে প্রচুর গালিগালাজ আছে। একেবারে শুরু থেকে। আমাদের বন্ধুমহলে প্রত্যেকের কিছু ডাকনাম থাকে, যা খুবই আপত্তিকর হয়। এখানেই এমন কিছু নাম আছে, যা পড়তে বেশ বিব্রত বোধ হচ্ছিল। লেখক এক আধুনিক সমাজ দেখানোর চেষ্টা করছে, যেখানে নারী পুরুষ একসাথে সিগারেট খায়, অশ্লীল আলোচনায় মত্ত থাকে। যেন নারী-পুরুষের সমান অধিকার পরিচয় পাওয়া যায়। তারপরও খুঁজলে দেখা যাবে, নানান ভাবে নারীদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা থাকে। কিন্তু সেই সত্যতা যখন সামনে আসে তখন সহ্য করার উপায় থাকে না। নিজেদের দোষত্রুটি কেউ দেখে না।
বইটির সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় ছিল যৌনতার বর্ণনা। অশ্লীলতা যেন ছেয়ে গিয়েছিল। হয়তো বলতে পারেন, এগুলো বাস্তবতা। মেনে নেওয়া উচিত। কিন্তু ধরা যাক একজন তরুণী প্রকাশ্যে সিগারেট খায়। কোনো বুজুর্গ ব্যক্তি এর বিরোধিতা করার পর সামান্য বাক্য বিনিময় হয়। এরপর সেই তরুণী তার বাবার বয়সী একজনের সামনে নারী পুরুষের সমান অধিকার দেখাতে পুরোপুরি নগ্ন হয়ে পড়ছে, এটা কোথাকার বাস্তবতা? এমন আধুনিক কি সমাজ হয়েছে? হয়তো কোনো এক উর্বর মস্তিষ্কে এমন কল্পনা এলেও আসতে পারে, সেটা সাহিত্যে প্রবেশ হতেও পারে। কিন্তু তা উর্বর মস্তিষ্কের ভাবনা ছাড়া কিছুই না।
যদিও সব যে খারাপ এমন না। বেশকিছু বাণী ভালো লেগেছে। কিছু বিষয় অতিরঞ্জিত মনে হয়েছে। লেখক যে সমাজের অসঙ্গতি দেখিয়েছেন, সেটা যথাযথ। আমরা করলে আরাম আর বাকিদের বেলায় হারাম— এই জিত সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
তবুও বলতে হয়, এই বইটির আসলে কিছুই হয়নি। শেষটা হযবরল, কোথা থেকে কী হলো কিছুই বুঝতে পারিনি। খুবই দূর্বল এক গল্পের হতাশাজনক প্লট, যা কখনোই মনে দাগ কাটতে পারবে না।
▪️বই : নর্তকী ও পুঁজিপতি শাসিত এই ব্রোথেল পৃথিবীতে ▪️লেখক : মুহাম্মদ নিজাম ▪️প্রকাশনী : উপকথা ▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ১.৫/৫
মুহম্মদ নিজামের "জলগাভীদের উপকথা এবং তার পরের কথা" পড়ার পরে আমি এই লেখাটা লিখেছিলম:- "একটি মাত্র বই পড়ে তার অন্য লেখা পড়ার আগ্রহ হচ্ছে কিনা বা সেই আগ্রহ কতোটুকু সেটাই হয়তো পাঠকের কাছে "ভালো লাগার" একক। এক্ষেত্রে আমি লেখক মুহম্মদ নিজামকে অবশ্যই এগিয়ে রাখবো।" ইচ্ছে এখনও আছে, তবে হাতে আরও বই থাকায় ঘুরে ফিরে অন্যগুলোও পড়া লাগে। তাই টাইম ম্যানেজমেন্ট ইস্যুতে হয়তো অন্য বই এখনো পড়া হয় নি। একুশে বইমেলা'২৪ এ বের হওয়া দুটো বইয়ের মধ্যে আমি শুরুতেই "নর্তকী ও পুঁজিপতি শাসিত এই ব্রোথেল পৃথিবীতে" লিস্টে নেই। লেখকের লেখার মধ্যে আমার পড়া ২য় বই এটি। "২য় পড়া" ব্যাপারটা উল্ল্যেখ করার কারন আছে। সেটা পরবর্তী আলোচনায় আসবে।
বইয়ের নাম দীর্ঘ হওয়াতে পরবর্তী আলোচনায় আমি বইটির নাম সংক্ষিপ্ত করেই লিখবো। পাঠক সেভাবে ধরে নিবেন আশা করি।
"নওপশাএব্রোপৃ" = নর্তকী ও পুঁজিপতি শাসিত এই ব্রোথেল পৃথিবীতে
দুই.
"নওপশাএব্রোপৃ" এর শুরুটা যেমন একটা ডার্ক টোনে শুরু (তবে বাস্তবিক এবং বিদ্রুপাত্মক), তখন শুরুতেই পাঠক হিসেবে আমার ভাবনার ডায়নামোতে জ্বোনাকি পোকার শরীর থেকে উৎপন্ন আলোর মতো একটা শব্দই জ্বলজ্বল করতে থাকে - "মরবিড"।
তবে প্রাথমিক ঢাক্কাটা কেটে গেলে যখন গল্প রূপ নেয় বইয়ের মূখ্য চরিত্র "তরীর" ডায়েরির এন্ট্রির মতো বয়ানে বলে যাওয় তার কাহিনি, তখন একটু থমকে যাই। জলগাভীদের উপকথায় "সান্ধ্যলিপি" এবং "একটি অসমাপ্ত খু/ন, অসংলগ্ন প্রেম এবং অমীমাংসিত জীবনকর্মের চিত্র" গল্পের মতো বিচ্ছিন্নতা হয়ে উঠতেছে কিনা এই ভাবনা কাজ করে। একজন চিত্রশিল্পী ছবি আঁকতে নানা রঙের আঁচড় দিয়ে যেমন এবস্ট্রাক্ট একটা টোন তুলে ধরে এমন ধারনা গল্পের প্রথমে ভাবনায় প্রশ্রয�� পেতে পারে। তবে যখন কাহিনি এগুতে থাকে তখন এই ভাবনার কোহরাটুকু গল্পের আঁচে মিলিয়ে যায়। মাইকেল বের "ট্রান্সফর্মার্স" মুভির "অপ্টিমাস প্রাইম" বা "বাম্বলবি" এর দ্রুতগতির গাড়ির অবয়ব থেকে রোবটে (মানুয়ের অবয়ব সদৃশ্য) ট্রান্সফরমেশনের মতো করেই "নওপশাএব্রোপৃ" হয়ে ওঠ একটা পরিপূর্ন গল্পের মতোই। মাইকেল বের মতো যার পরিচালক (পড়তে হবে লেখক) মুহম্মদ নিজাম। বইটি প্রকাশিত হয়েছে উপকথা প্রকাশনী থেকে।
তিন.
"নওপশাএব্রোপৃ" গল্পের শুরু এক শুঁড়িখানায়। এখানে কতিপয় "ওরা (ওদের ভাষ্যে, কতিপয় জাতির বোঝা) আড্ডা, ফান আর ব্রেইন-স্টোমিং করার উদ্দেশ্য নিয়ে সমবেত হয়। পাঠক হয়তো নিজেকে ঠিক শুরুতেই স্নবিশ একটা জায়গায় নিজেকে অবিষ্কার করতে পারেন। অবশ্য লেখক যেভাবে একটা সুদীর্ঘ লাইন এবং সেখানে তিনি পাঠককে শূরুতেই একটা রোলার-কোষ্টার রাইড দিয়েছেন তাতে পাঠক নিজেকেও সেই "ওরা"র দলভুক্ত ভাবতে পারে। অথবা লেখক হয়তো (??) জেনে বুঝেই পাঠককে সেই দলে অর্ন্তভূক্ত করতে একটা বেইন-স্টোর্মিং প্যাকটিস করিয়ে নিলেন। এবং সেটা হলেও খুব একটু সমস্যাও নেই। পড়তে পড়তে (এবং বিদ্রুপটুকু অনুবাদ করে) পাঠকের ঠোটের কোনে হালকা হাসি এক ফালি রোদের মতো ঝিলিক দিতেই পারে।
{সিভিলাইজেশনের উথান এবং পতন X কাফকার মেটামরফোসিস (কমপ্লেক্সিটি অফ ফ্যামিলিয়ার রিলেশনশিপ)} + ফ্রয়েডের ইলেক্ট্রা-ইডিপাস - এই ইক্যুয়েশনের কেন্দ্র না হোক অন্তত পরিধি বরাবর ঘুরে এসে এবং সেখানেই শেষ না সাথে আছে শাহাদুজ্জামানের "ক্রাচের কর্নেল" এবং বেগম রোকেয়ার অবরোধবাসিনী - এবং তাহার ফলাফল শুঁড়িখানা। ঐকিক নিয়ম হোক আর যৌগিক নিয়মে - পাঠক হিসেবে আমি যখন কয়েকবার উক্ত লাইনে বিচরন করি ব্যাপরটা তখন অনেকটা "ফ্রয়েডের লুসিডিটির" মতো হয়ে পড়ে। অনেকটা হয়তো এক ধরনের ইলিউশনের ফল, তবে উপভোগ্য; যদি একটু সময় নেয় পাঠক।
তাই সরল কষতে কষতে গল্পের স্টাকচারে যখন আমি দেখি লেখক "আয়ুর দিনগুলোকে" সরল ও সরস .... সরস ও সুখপ্রদ..সুখপ্রদ ও নির্বরোধ..নির্বিরোধ ও নৈরাজ্যময় .. ন্যারটিভে আগাচ্ছেন কোথাও কোথাও, তখন আমার "ফিবোনাচি ক্রম" এর কল্পনা ভেসে ওঠে মাথায়। একি সাথে গল্পের শুরু এবং এমন ন্যারেটিভের বেইন-স্টোর্মিং আমাকে যেমন মুরাকামির অন্ধকার অলি-গলি ভ্রমন শেষে আবার আলোকিত সমাজের রিয়ালিটিতে ফিরে আসার কথা মনে করায় - একি সাথে সেই "ফ্রয়েডের লুসিডিটির" মতো অবস্থা হয়। যেদিকে তাকাই শুঁড়িখানা। মনে হয় এই প্যাঁচানো পথ বেয়ে একবার শুঁড়িখানার ওদের আড্ডায় ঢুঁ-মেরে আসা যায় হয়তো।
চার.
শুঁড়িখানার সার্কেলে তরীর আগমনের হেতু শোয়েব। তরীর বন্ধু। স্যোসাল-ডারউইনিজমের মন্ত্রে বিশ্বাসী শোয়েব তরীকে যখন তুলে ধরে সার্কেলে, তখন শুঁড়িখানার সবাই কেনা ধরনের "প্লেজার" না পেলেও পাঠক তার ধারনাগুলো ডিল করার একটা জায়গা পায়।
স্যোসাল-ডারউইনিজম!
সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট।
"নওপশাএব্রোপৃ" কাহিনির সকল চরিত্রগুলো তখন এই ঘূর্নির মধ্যে পড়ে যায়। শুঁড়িখানার "ওরা", তরী, তুসী, তরীর বড়ভাই অথবা ইকবাল আঙ্কেল - ফিট না আনফিট - এরূপ একটা ভাবনা বৃত্তের মধ্যে চলে আসে। তবে ফিট হোক বা আনফিট, পাঠক তাদের "লুনাটিক" বলে বাতিল করে দিতে পারবে না হয়তো। কারন, অপছন্দের ভেতর দিয়েও যে কিছু রূঢ় সত্যি বের হবে না তা না। তবে এই বৃত্ততারে একটু এক্সপান্ড করে নেবার অবকাশ থাকে।
তখন চলে আসে "মুখ" এবং "মুখোশের" সরল অংক। শুঁড়িখানার "ওদের" আইডেন্টিটি যখন রিভিল হয় মুখোশের আদলে কিছু নামে যেমন - পুরোহিত, হযরত, রাষ্ট্রপতি, তখন পাঠকের মনে উঁকি দেয়াই স্বাভাবিক লেখক মুখোশের আড়ালে মুখের সংলাপ বলতেছেন নাকি মুখের উপর মুখোশ বসিয়ে বলে যাচ্ছেন কিছু কঠিন সত্য। মুখ হোক বা মুখোশ - বলা বাহুল্য যে, সকল সরল অংকের রেজাল্ট শূন্য না। পাঠকের নিয়মে কষকে কষতে হয়তো এর উত্তর অভিজ্ঞতা, প্র্যাকটিস এবং বিশ্বাস-অবিশ্বাসে এসে দাঁড়াবে।
এই অংক রাতের বারান্দায় ইজিচেয়ার এবং কার্নিশের ফুলের সাথে ঐকিক নিয়মে এগিয়ে পাওয়া চাঁদের ভগ্নাংশের মতো রোমান্টিক না। কিছুটা কম্পলিকিটেড।
পাঁচ.
কম্পলিকিটেড তরীও। গল্পের মূখ্য চরিত্র। একি সাথে সরলও। তবে কম্পলিকেটেড ধরে এগুলো সকল চরিত্রই সেম বৃত্তে জায়গা পেতে পারে। তরীর প্রেমিকা তুসীও। হয়তো পাঠক শুরুতে তরীকে "মেন্টালি আনফিট" ধরে গল্পে আগানোরও জোড় সম্ভাবনা আছে। এবং শেষে সেটা পরিবর্তন নাও হতে পারে। পাঠক চাইলে তরীকে একজন "সুই/সাইডাল মানুষের" ট্যাগে ভাবতেই পারেন।
পাঠক কোন চোখে এবং বিশ্বাসে পড়বে গল্পটা তার উপর নির্ভর করতে তরী এবং তার আশেপাশের চরিত্রগুলো আরও কম্পলিকিটেড হতে থাকবে নাকি পাঠক একটু নড়েচড়ে সেই "বিশ্বাসের" বদলে "অভিজ্ঞতা" দিয়ে আগবে। একটু নির্মোহ ভাবে দৃষ্টি দেবে সকল চরিত্রগুলো দিকে।
তরীর দিকে তাকানোর আগে তাকে দিয়েই আগে একটু দেখে নেই লেখক মুহম্মদ নিজাম কাদের গল্প বলছেন এখানে। ম্যাক্সিম গোর্কির "দ্য লোয়ার ডেপথস", হুমায়ূন আহমেদের "মধ্যবিত্ত" নাকি সমাজের কোন হাই-ক্লাসের গল্প? তরী যে ক্লাসের প্রতিনিধি হোক - আদতে তরী কোন ক্লাস না বরং সমস্ত "পুরুষ" মানুষকে এমার্জ করেই আপহোল্ড করতেছে। "নওপশাএব্রোপৃ" কোন ক্লাস-এমার্জ নির্ভর বলে আমার মনে হয় নি। বরং তরী যেকোন ক্লাসের "পুরুষের" ছায়াতে ফিট খায়।
তখনই চলে আসে "নার্সিসিস্ট" অথবা "সুপিরিয়র কমপ্লেক্সিটি" এর কথা। গল্প কথক তখন আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন এক অমোঘ সত্যের সামনে। স্বীকার করুক বা নাই করুক, প্রতিটা পুরুষই কোন না কনো পর্যায়ে একজন “তরী” অথবা "নার্সিসিস্ট" এর বীজ বহন করেই চলে।
ছয়.
"মানুষের প্রাপ্তির খাতা বেশি ভারী হয়ে যাওয়াটা যে ভালো কিছু না.." অথবা "সুযোগের অপেক্ষায় অ-প্রেমিকা" এই ধরনের কথাগুলো আমাদের আসলে খুব পরিচিত। স্বপ্নের ভেতর এবং রিয়েলিটির ভেতরও। তবে "খুব খেয়াল করে" তাকানো বা মুখোমুখি না হওয়ার মতো ব্যাপার। যেমন, ২০০০ সালের আশেপাশে যখন নেট কানেকশন আগের থেকে একটু বেশি এভেএইলএবেল এবং অধিকাংশ তরুন-তরুনী mirc নামক চ্যাট অ্যাপে একটা জমজমাট সময় কাটাচ্ছে - ওই সময়টাকে এমন একটা কথা খুব প্রচলিতি ছিল। "ভার্জি/নিটি ইস নট ....কোয়ালিটি..এ ল্যাক ....অপারচুনিটি".. এই ধরনের কথাগুলো এথনোগ্রাফিক্যাল ডকুমেন্ট হয়তো হয়ে ওঠে না। তবে এর ভাবনাগুলোর সাথে আমাদের হয়তো অভিজ্ঞতা আছে; প্রাকটিস নেই। মানুষ মাত্রেই তার ভাবনার সাথে সাথে নিজের জন্য একটা খাঁচা তৈরী করে রাখে। একটা খাঁচা সত্যকে ফাঁকি দিতে তো অন্য খাঁচাটা সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে।
"নওপশাএব্রোপৃ" পড়তে পড়তে তখন মনে হয় বা অন্য পাঠকেরও মনে হতে পারে, লেখক মুহম্মদ নিজাম কিসের গল্প বলেছেন?
স্বাভাবিকের অস্বাভাবিকতার গল্প নাকি অস্বাভাবিকের স্বাভাবিক গল্প?
নাকি আপগ্রাউন্ডে বসে আন্ডারগ্রাউন্ডের গল্প -যা আমরা টের পাই হয়তো কোন কম্পনে? নাকি আন্ডারগ্রাউন্ডে বসে আপগ্রাউন্ডের গল্প - যেটা এক্সপান্ড করতে করতে হয়তো দৃষ্টি অস্বচ্ছ হয়ে যায় কিছুটা ভয়ে সেটার মুখোমুখি হতে?
সাত.
"নওপশাএব্রোপৃ" কাহিনির সার্বিক টোন ধরে এগুতে এগুতে (শেষ-টুকু পড়ার আগে) ভাবতেছিলাম লেখকও হয়তো "রাইসুস্কি" রোগে আক্রান্ত। কাহিনির সংলাপ বা টোন তো মূলতঃ একজন লেখকের ভাবনা বা বিশ্বাসের প্রতিফলন। তাই যতই শেষের দিকে যাচ্ছিলাম বারবার মনে নচিতেকার গানটা ব্যালাডের মতো ভেসে আসতেছিল.."শুধু বী/ষ... শুধু বী/ষ দাও...অমৃত চাই না"।
এবং অবশ্যই লেখক সেই ভাবনাটাকে কর্পুরের মতো ভ্যানিস করে দিয়েছেন শেষটা দিয়���। তুসীর ফিরে আসা বা তরীর সুখ পাঠককে অনেকটাই ব্রিদিং স্পেস দিবে। তুসীর ফিরে আসা দিয়েই লেখক তার গল্পের মোড় একটা অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। তবে যদি "তুসী না ফিরতো" এবং যদি "তুসী শোভা বা রাইমা হয়ে উঠতো" তাহলেও সত্য বদলাতো? বা সত্য অন্য রকম হতো? যদি'র কথা নদীতে। কাহিনির পরিনতি যেভাবে - সেই মেজাজটাকে ধারন করে আহ্লাদিত হওয়া যায়। এমন সমাপ্তি হয়তো অনিবার্য ছিল না, তবে পুরো বই জুড়ে পাঠক যে এক্সপেরিয়েন্সের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে তাতে এইটুকু ব্রিদিং-স্পেস লেখক আরোপ করে গল্পের প্রতি এবং পাঠকের প্রতিও সুবিচার করেছেন বিশ্বাস করি।
আট.
কাহিনিতে তরীর বড় ভাইয়ের তেমন স্ট্রং উপস্থিতি না থাকলেও একদম শেষে এসে তরীকে একটা ব্যাপারে ডিরেক্ট সাপোর্ট পাঠককে এই চরিত্রের প্রতি সহমর্মিতা এবং ভালোলাগার একটা সুযোগ করে দেয়। সকল চরিত্রগুলোর মধ্যে তরীর বড় ভাইয়ের চরিত্রটি অনেকটা সেই স্যোসাল-ডারউইনিজম বা "সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট" সূত্র ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। যদিও কার্যক্ষেত্রে তিনি অনৈতিক।
এই চরিত্রটা অনেকটা হুমায়ূন আহমেদের অনেকগুলো চেনা বড় ভাইয়ের চরিত্রের মতোই। "সেমি নেগেটিভ" একটা চরিত্রের প্রতি পাঠকের ভালোলাগার প্রকাশের অদলে একটা চরিত্র। আমরা জানি তার কাজের স্বরূপ এবং পুরো কাহিনিতে তার উল্লেখযোগ্য কোন উপস্থিতি লক্ষ্যনীয় না হয়েও তরীর পাশে স্ট্রং ভাবে দাঁড়ানোর কারনেই আমরা কিছুটা (অথবা আমি পাঠক হিসেবে) কিছুটা আর্দ্র হই। একধরনের এমপ্যাথি বা সিমপ্যাথি বা ভালোলাগায় আক্রান্ত হই। এবং একি সাথে খেয়াল করি লেখক পাঠককে বা আমাদের এই অনুভূতিটাকেও একটা প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন।
আমাদের এমপ্যাথিগুলোও কি ক্ষেত্রবিশেষে একচোখা? হিপোক্রেট?
এই দাঁড় করানোটা ইনটেনশনালি বা আন-ইনটেনশনালি - সেটা লেখক ভালো বলতে পারবেন।
নয়.
মুহম্মদ নিজামের লেখা থট প্রভোকিং। "নর্তকী ও পুঁজিপতি শাসিত এই ব্রোথেল পৃথিবীতে" থট প্রভোকিং। শুরুতে "২য় বই পড়া" কথাটার উল্ল্যেখ এজন্যেই যে, এই ধরনের লেখার সাথে বা মুহম্মদ নিজামের লেখার সাথে পূর্ব পরিচয় না থাকলে একটা হ্যাঙওভারের আশংকা থাকে। ব্যাচেলর পয়েন্ট নাটকের অভিনয় শিল্পীদের মতো "লেবু পানিতে" এই হ্যাঙওভার হয়তো যাবে না। তার দীর্ঘ লাইন যেমন পাঠককে একধরনের ঘোরে ফেলে দিবে এবং সেটা বোঝার জন্যে কয়েকটি পাঠ জরুরী হয়ে পড়ে, তেমনি একি সাথে ছোট ছোট বাক্যের ঋজুতাও পাঠককে স্বস্তি দেবে।
অন্য দেশের মতো আমাদের "জিনি (Genie)" নেই। জ্বীন আছে। তবে স্বস্তির বিষয় এই যে, এই জ্বীনের আছরে হুজুর বা ওঝার ঝাড়-ফুঁকের কোন প্রয়োজন নেই। (এই অংশের কনটেক্সট-টুকু হয়তো লেখক বুঝবেন শুধু যেহেুত জলগাভীর সাথে সংযুক্ত)। ব্রেইন-স্টোর্মিং, হ্যাঙওভার বরং একধরনের সুযোগ বৃত্তের বাইরে উঁকি দেবার। ইদানিংকালে অধিকাংশ লেখা যে গণ্ডির ভেতর শোচনীয় রকমের ঘুরপাক খাচ্ছে তার বাইরে এসে সাহিত্য পাঠের একটা সুযোগ হতে পারে এই বই। তাতে গল্পের প্রোটাগনিস্টের ইলিউশন জ্বীনের মতো পাঠকের উপর ভর করলেও পাঠক তার পূর্ববর্তী এব পরবর্তী ভাবনার দ্বৈরথ উপভোগ করবেন নিঃসন্দেহে।
এন্ড নোট: রকমারিতে বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৫২ দেয়া আছে। আদতে ১৩৫। এটা দ্রুত কারেকশন করে নেয়া উচিৎ।
মুহম্মদ নিজামের লেখার হাত চমৎকার, চমৎকার উনার গল্প বলার ধরণও। তবে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে কালো হরফে লেখা লেখকের চিন্তার অবাধ বিচ্ছুরণগুলোকে। কিন্তু আফসোস, সমাজের অনেক অসঙ্গতি কিংবা সেসকল অসঙ্গতির বিরুদ্ধে নিজের বিদ্রোহী মনোভাব শৈল্পিক আকারে প্রকাশ করতে যে পরিমাণ ব্রেইন স্টোর্মিং তিনি বইয়ের প্রথম ৮০ ভাগে করেছেন, শেষবেলায় এসে (প্রকাশকের তাড়াহুড়োয় বা অন্য কোনো কারণে) খেইটা তিনি ধরে রাখতে পারেননি। শেষটা আরও ভালো হতে পারতো। যৌনতায় আমার সমস্যা নাই, কিন্তু এখানকার যৌনতাগুলো আরও ম্যাচিউর হলে ভালো লাগতো। নিজাম সাহেবের দুটো বই আগে পড়েছিঃ ১। 'ঝড় ও জনৈক চিন্তাবিদ' এবং ২। 'অগ্নিপুরাণ'। বই দুটো খারাপ লাগেনি, আবার ভালোও লাগেনি। 'নর্তকী ও পুঁজিপতি শাসিত এই ব্রোথেল পৃথিবী'ও যে খুব ভালো লেগেছে, তা নয়; তবে অনেক খারাপ লাগা থাকলেও, এই বইয়ের কিছু ব্যাপার আছে, যেটা চিন্তার খোরাক যোগায়। ব্যক্তিগতভাবে বই পড়ার মূল উদ্দেশ্য আমার সেটাই।
বি দ্রঃ বাংলা সাহিত্যে 'পোস্টমডার্নিজম' চর্চা হয় না বললেই চলে, কেন হয় না, সেটা অনলাইনীয় বইয়ের গ্রুপগুলোতে এই বইয়ের বাজে রিভিউ দেখলেই বোঝা যায়। আমাদের পাঠকেরা এখনও 'ফর্মুলা-বহির্ভূত' বইয়ের জন্য রেডি না। সুতরাং, আশা করছি আরও অনেক খারাপ রিভিউ চোখে পড়বে।
যা আপনাকে বিনোদিত করে,এনগেইজ করে রাখে__ এজাতীয় সমস্ত সংজ্ঞায় এই বইটা নিঃসন্দেহে উৎরে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশ ও বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে এই বই একটা কলঙ্ক, অনেকগুলো ১৮+ শব্দের স্তুপ করা আবর্জনা। গল্পের দোহাই দিয়ে এরকম শব্দচয়ন কে নরমালাইজ করার চেষ্টা করলে পৃথিবীতে চটি বই বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। শিল্প-সাহিত্য সংশ্লিষ্ট লোকেরা নাকি প্রগতিশীল, মার্জিত ও ম্যাচিউর হয়। কিন্তু এইটা কোন ধরণের ম্যাচিউরিটি ভাই? দেশীয় সাহিত্য এমন আবর্জনার উদাহরণ বিরল। বই পড়ে লেখককে বেশ পরিপক্কই মনে হয়েছে, স্বাভাবিক শব্দচয়নে নৈপুণ্যে তৈরি করে _ এমন লোকদের অন্তর্ভুক্ত মনে হয়েছে। এরকম মানের লেখক কেন এমন আবর্জনা লিখে__ আল্লাহ মালুম।
পড়ছি অনেক দিন হয়ে গেল। সব মনে নাই। গালিগালাজসহ অশ্লীল কথাবার্তা আছে, এগুলাতে ট্রিগার্ড হওয়ার অভ্যাস থাকলে এই বই পইড়েন না। যদ্দূর মনেপড়ে বইশেষে সন্তুষ্টি ছিল না, তবে রাইটিং স্টাইল ভালা। লেখন সাহেবের আরও বই পড়ার ইচ্ছা রাখলাম।