প্রাণঘাতী এক ভাইরাস আকস্মিকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। গুজব ভেবে কেউ পাত্তা দিল না, ভুলটা হলো এখানেই। মানুষ মরতে শুরু করল দেদারসে। যন্ত্রণাদায়ক আর বীভৎস এই মৃত্যুভয় ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত, দেখা দিল বিশৃঙ্খলা। এই মৃত্যুভয়ের আড়ালে চলছে আরেক খেলা। নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে মরিয়া এক গোষ্ঠীর কাছে এত মানুষের মৃত্যু কেবলই সংখ্যা। ষড়যন্ত্রে জয়ী হতে এরা নির্মম, নিষ্ঠুর। প্রাণঘাতী এই ভাইরাস প্রাকৃতিক নয়, কৃত্তিম-আর তা ছড়াতে ব্যবহার করা হয়েছে এক বিশেষ প্রজাতির প্রাণী! গবেষক আকবর খানের মৃত্যুটাও সন্দেহজনক। বিচ্ছিন্ন কিছু তথ্য মিলিয়ে ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের সদস্যরা মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে ছুটল বনে, সমাধানের সূত্র কি তবে সেখানেই? হিমঘুম, নিনাদ এর সফলতার পর বাপ্পী খানের 'বুনো' সিরিজের শেষ আখ্যান ক্রান্তি-যেখানে পাঠক মানুষরূপী কিছু দানবের স্বরূপ খুঁজে পাবেন।
ছোটবেলা থেকেই বন - প্রকৃতি - বন্যপ্রাণী এগুলো আমাকে ভীষণ টানতো। আর তাই চাঁদের পাহাড়, আরণ্যক, জিম করবেট অমনিবাসের উপর বুদ হয়ে থাকতাম একসময়। এখন আমি মোটাদাগে থ্রিলার প্রেমী। থ্রিলার পড়ার সুবাদেই ২ বছর আগে আমার সংগ্রহে আসে বাপ্পী খানের বুনো ট্রিলজির ‘হিমঘুম’ বইটি। সাপ নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ না থাকলেও এই বইটি আমার ভীষন পছন্দ হয়ে যায়। অতঃপর আজ এই ট্রিলজির সর্বশেষ বই ‘ক্রান্তি’ শেষ করলাম।
এই বইটি লেখা একটা ভবিষ্যত সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে। যে সম্ভাবনাটা সত্যি হলে আমাদের জন্য সেটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রানীদের সম্পর্কে অবগত হওয়া, ন্যূনতম জ্ঞান রাখা সেক্ষেত্রে বিপর্যয় রোধে কিছুটা হলেও সহায়ক হতে পারে। গল্পটার শুরু নরসিংদীর পলাশ উপজেলার, শীতলক্ষ্যা নদী হতে। যেখানে গত কয়েকদিন ধরেই মরে ভেসে উঠছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী। যেগুলো খেয়ে মারা যাচ্ছে চিল, বক, পানকৌড়ি, বাঘডাশ ও বনবিড়ালের মতো আরো অসংখ্য প্রাণী। অথচ পানি পরীক্ষা করে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া কিংবা সেরকম কোন কিছুর উপস্থিততিই খুঁজে পাওয়া যায় না, যেন সেটা হাওয়ায় উবে গিয়েছে। এর কিছুদিন পর আঘাত হানে এক অজ্ঞাত ভাইরাস। মানুষ মরতে শুরু করে হাজারে হাজারে। ছড়িয়ে পড়ে বীভৎস এক মৃত্যুভয়। এই মৃত্যুভয়ের আড়ালে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে আরেক গোষ্ঠী। চলছে ষড়যন্ত্রের আরেক খেলা। সেই খেলার খেল কি খতম করতে পারবে কায়সার, আবরার, সিনথিয়া, আদনান আজাদ, সরোয়ার পাঠান সহ ডিপ ইকোলজির অন্যান্য সদস্যরা?
গল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এর চরিত্র এবং প্লট। অধিকাংশ চরিত্রগুলো বাস্তবের। সরোয়ার পাঠানের ‘এক ডজন শিকার কাহিনী’, ‘নিষাদ অরন্য’ যারা পড়ে দেখেছেন তারা পাঠান সাহেবের প্রেমে পড়তে বাধ্য। আদনান আজাদ ; প্রখ্যাত বন ও বন্যপ্রাণী বিশারদ এবং স্বনামধন্য আলোকচিত্রশিল্পী। তার এবং সংশ্লিষ্ট ফটোগ্রাফারদের দিয়ে তোলা অসংখ্য ছবি দেখার সুযোগ মিলবে প্রত্যেকটা বইয়ের শেষে দেওয়া QR কোড স্ক্যান করে। এই ছবিগুলো দেখলে সত্যি ভিমড়ি খাওয়ার যোগাড় হবে। প্রত্যেকটা প্রাণীর কত অদ্ভুত প্রজাতি রয়েছে অবাক হয়ে সবগুলো দেখেছি। বাপ্পী খান নিজেও গল্পে উপস্থিত। ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের অসংখ্য চরিত্রও উপস্থিত। আর এসব চরিত্র একদম বাস্তবের।
গল্পের কথা যদি বলি তাহলে শীতলক্ষ্যা নদীর ঘটনাও কিন্তু খাটি সত্য। আসলে প্রাণী নিয়ে যতগুলো তথ্য আছে তার সবগুলোই সত্য। এমনকি এসব ক্রাইম অহরহ ঘটছে আমাদের চারপাশে।
লেখক বাপ্পী খানের একটা কথা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে।
প্রতিটি প্রাণই মূল্যবান। প্রকৃতিতে মানুষ ও প্রাণীর সহ-অবস্থান নিশ্চিত করা গেলে পারস্পরিক সংঘর্ষ কমানো সম্ভব। সেজন্য দরকার উপযুক্ত জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, যোগ্যতা, আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
আর এসবের চাইতেও জরুরি, সদিচ্ছা।
আমাদের দেশের উচ্চপদে বিরাজমান সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোর মধ্যে একদিন সত্যেই এই সদিচ্ছা জন্মাবে, এই কামনা করি। বন ও প্রকৃতি রক্ষায় সবাই সোচ্চার হলে, সহজেই দেশের দূষণ এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে ভূমিকা রাখা সম্ভব।
শেষ হলো বুনো সিরিজ। চলমান একই ধারার থ্রিলার বই থেকে এই তিনটা বই একদম ভিন্ন বলতে গেলে। যেখানে বন্য প্রাণীদের কথা বলা হয়েছে।বলা হয়েছে কিভাবে জগতের শ্রেষ্ঠ জীব এদের অত্যাচার করে নিজের স্বার্থ হাসিল করে। ক্রান্তি বইটাকে চমৎকার একটা সমাপ্তি বলা যায় সিরিজের। প্রথম থেকেই রহস্যের জাল বিছিয়ে গিয়েছেন লেখক। প্রাণঘাতী ভাইরাসের লক্ষণ ও তার ফল সবগুলো অনেক দুর্দান্ত ছিল। সাথে হিমঘুমের মত আবারও সাপের কামড়ে মারা যাচ্ছেন প্রভাবশালী লোকেরা। সব মিলিয়ে একটা জম্পেশ অবস্থা। বইয়ে অনেক প্রাণীর বর্ণনা আছে যেগুলো গল্পের খাতিরে এসেছে এবং সেগুলোর বর্ণনাও বিরক্ত করে না। হিমঘুম,নিনাদ ও ক্রান্তি আমাদের দেশীয় থ্রিলারে সবসময় এগিয়ে থাকবে।
দিস বুক ইস সোললি এস্পন্সারড বাই 'ডিপ ইকোলজি'। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিলো যে, কোনো গল্প/উপন্যাস পরছি? নাকি কোনো একটা প্রতিষ্ঠান প্রচার প্রচারণা শুনছি? লেখাটা পড়লেই বুঝা যায়, এই বইটা স্রেফ "ডিপ ইকোলজি" এবং এর সদস্যদের মন খুশি করার জন্য লেখা৷ কারণে অকারণে গল্পের মধ্যে এক গাদা মানুষের নাম, ওগুলো যে বাস্তবিক 'ডিপ ইকোলজির' সদস্যদের নাম, এটা বুঝতে খুব হাই আইকিউ এর দরকার হয় না৷ মনে হচ্ছিলো যেন কারো নাম বাদ পড়লে তারা লেখকের উপর অভিমান করবে! শতভাগ ফরমায়েশী একটি লেখা, যার আদোও কোনো সাহিত্য মুল্য আছে কিনা আমার জানা নেই৷ কিন্তু এটা জানি যে, একটা ফরমায়েশী লেখা কে উপন্যাস নামে চালিয়ে পাঠকদের যন্ত্রনা না দিলেও পারতেন৷
বাপ্পী খানের 'বুনো' সিরিজের তৃতীয় বই "ক্রান্তি"। লেখক বলেছেন এই বইয়ের মাধ্যমেই তার বুনো সিরিজের সমাপ্তি। বইয়ের শুরু হয় সাপের ছোবলে একজন বিজ্ঞানীকে খুন করার মাধ্যমে। ডিপ ইকোলজির সদস্যদের উপর নানান বিধিনিষেধ এবং সিরিজের আগের বইগুলোর নায়ক ক্যাপ্টেন কায়সার জেলে বন্দি। এরই মাঝে একদল মানুষ নিজের সুবিধার জন্য অবলা প্রানীদের মাধ্যমে প্রাণঘাতী এক ভাইরাস ছড়িয়ে দিলো দেশের আনাচেকানাচে। গুজব ভেবে কেউ পাত্তা দিলো না, ভুলটা হলো এখানেই। মানুষ মরতে শুরু করল দেদারসে। যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুভয় ছড়িয়ে পড়লো দ্রুত। এই মৃত্যুভয়ের আড়ালে চলছে আরেক খেলা। কী খেলা জানার জন্য পড়তে হবে " ক্রান্তি"।
যদিও সিরিজের বই কিন্তু কাহিনী আলাদা। আমার কাছে সিরিজের এই বইটা বেশ ভালো লেগেছে৷ শুরু থেকেই বইটা বেশ গতিশীল কিন্তু চরিত্রায়ন, কাহিনী এগিয়েছে আস্তেধীরেই।
বইয়ে লেখক অনেক বার্তা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। অবলা প্রাণীদের নিয়ে বিভিন্ন সত্য ঘটনার রেফারেন্সও দিয়েছেন। এতোকিছুর ভীড়ে থ্রিলার বই হিসেবে আমার কাছে বইটা অনেক ভালো লেগেছে। শিকার কাহিনী পছন্দ হওয়ায় সরওয়ার পাঠানকে আগে থেকেই চিনতাম। নিনাদের পর উনাকে এই বইয়ের চরিত্র হিসেবে আনাতেও ভালো লেগেছে। যতগুলো চরিত্র ছিলো সবাই কাহিনীর প্রয়োজনেই এসেছে।
এইভাবে ভাইরাস ছড়ানো এবং পরিবেশ বিপর্যয়ে আমাদের নিজেদের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি।
যাইহোক আমার কাছে সব মিলিয়ে এই বইটা নিনাদের থেকেও বেশি ভালো লেগেছে। একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভালো ছিলো বইটা । আমার মতে সিরিজ হিসেবে না হলেও এই জনরার বইগুলো আলাদাভাবে কন্টিনিউ করা উচিত। সিরিজের তিনটা বইই দারুণ।