কলকাতার কাছাকাছি ছোট্ট এক জনপদ মল্লারপুর। সেখানে পাশাপাশি বাড়িতে বড় হয়েছিল ইতু আর বর্ষণ। ইতু এখন ডাক্তার। স্বাচ্ছন্দ্যেভরা একটি সংসারের কর্ত্রী সে এখন। বর্ষণ প্রাইভেট কোম্পানির সামান্য চাকুরে, একটি নাট্যদলের পরিচালক। সামাজিক সীমানা অগ্রাহ্য করে একদিন তারা একে অপরের কাছে পুরনো মল্লারপুর খুঁজতে আসে। চৌত্রিশ বছরের ওপার থেকে উঠে আসে প্রেম ও বন্ধুত্বের স্মৃতি। ওদের দু’জনের কৈশোরের গায়ে লেগে আছে সত্তরের দিনগুলোর আবছা জলছাপ। যদিও দ্রুত বদলে গেছে সময়। পালটে গেছে ইতু-বর্ষণের স্বপ্নময় মল্লারপুরও। ওদের চোখে পড়ে না এখানকার ক্ষত, শরণার্থী ক্যাম্পের ভাঙা টিনের চালে বেড়ালের কান্না, দুঃস্থ কিছু পরিবারের হাহাকার। মার খাওয়া এমনই একটি পরিবারের বেকার ছেলে পল্লব। অন্যদিকে মেঘনা। তার মধ্যে ইতুর আদল খুঁজেছিল বর্ষণ। কিন্তু পায়নি। এই পাওয়া, না-পাওয়ার গহন ভিতের ওপর গড়ে উঠেছে সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের এই মরমী উপন্যাস।
সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ২১ জানুয়ারি ১৯৬১, হুগলির উত্তরপাড়ায়। পিতৃপুরুষ বিহারে প্রবাসী। মাতৃবংশ বাংলাদেশের দিনাজপুরে। স্কুল-কলেজের পাঠ উত্তরপাড়ায়। ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। একটি ফটোপ্রিন্টিং সংস্থার কারিগরি বিভাগের প্রধান। ছাত্রজীবনে লেখালিখির শুরু। দেশ পত্রিকায় প্রথম গল্প প্রকাশিত হওয়ার পর বৃহত্তর পাঠক মহলে সমাদর লাভ।শ্রেষ্ঠ উপন্যাস রচনার জন্য ১৯৯৯ ও ২০০২ আনন্দ-স্নোসেম শারদ অর্ঘ্য, শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ও শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প রচনার জন্য ২০০৩ সালে আনন্দ-ন্যাশানল ইনসিয়োরেন্স শারদ অর্ঘ্য এবং শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প রচনার জন্য ২০০৬ সালে ডেটল-আনন্দবাজার শারদ অর্ঘ্য পেয়েছেন। এ ছাড়া ১৯৯৭-এ পেয়েছেন গল্পমেলা পুরস্কার, ২০০১-এ সাহিত্যসেতু পুরস্কার, ২০০৫-এ বাংলা আকাদেমি থেকে সুতপা রায়চৌধুরী স্মারক পুরস্কার, ২০০৭-এ শৈলজানন্দ জন্মশতবর্ষ স্মারক পুরস্কার, ২০১৩-এ তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্য সম্মান, ২০১৪ সালে গজেন্দ্রকুমার মিত্র ও সুমথনাথ ঘোষ স্মৃতি পুরস্কার।
মল্লারপুরে ঘুরে এলাম। এ যাত্রায় কটা ঘণ্টা খারাপ কাটল না। উপন্যাসটি হয়তো বা অসাধারণ নয়, তবে লেখকের সাবলীল কলমজোরে পাঠ অভিজ্ঞতা মোটের ওপর মনোরম। কিছু মানুষের লেখনীতে থাকে এক অদ্ভুত গ্রহণযোগ্যতা, একটা আপন করে নেওয়ার প্রবণতা। লেখকও তেমন এক দলের সভ্য। ওনার অনেক লেখাই হয়তো বা অসাধারণত্ব-এর নাগাল পেতে পেতেও পায় না, তবে কোনো অলস দুপুরে বা ট্রেনের অবিরত দুলুনি উপেক্ষা করে, তার উপন্যাসের চরিত্রগুলো আমাদের কোনো কাছের মানুষের মতোই কথা বলে ওঠে যেন।
এবারেও যখন বইখানা পড়ছি, ক্ষণিকের অসাবধানতায় হঠাৎই চোখ চলে যায় জানালার বাইরে। দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে মল্লারপুরের আসল রেল-স্টেশন! এক অদ্ভুত সমাপতনের সম্মুখীন হয়ে বসে থাকি বেশ কিছুক্ষণ। কোথায় গিয়ে যেন ধুয়েমুছে একাকার হয়ে যায় বাস্তবের ও কল্পনার মল্লারপুর! মিশে যায় দুটি স্বতন্ত্র দুনিয়া। পাঠকমনে না চাইতেও পড়ে থাকে একফালি ভালো লাগা, এবং একরাশ পুঞ্জীভূত মেঘ। বইটি সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের সেরা কাজেদের দলে নাম লেখাবে না, বলাই বাহুল্য। তবুও আপনি চাইলে একবার পড়ে দেখতেই পারেন, অবশ্য না পড়লে বিশেষ ক্ষতি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, সেই দাবি আমি করছি না। সামাজিক উপন্যাসের এখানেই তো স্বার্থকতা।
😌 বহুকাল পরে কারোর প্রেমে পড়েছি, 😀😀😀 এই যে - আমাদের সকলের প্রিয় লেখক, তার লেখনীর প্রেমে 🤗🤗🤗
গতকাল দুপুরে একটানা ১.৫ ঘণ্টায় শেষ করলাম মল্লারপুর। ছোট করে বলি -
✍️উপন্যাসের নামের শহরে একটি ছোট নাটকদলের আসন্ন নাটকের রিহার্সাল। পরিচালক 'বর্ষণ' যোগ্য নায়িকা খুঁজতে হয়রান। ঠিক সময়ে আগমন গল্পের ও নাটকের নায়িকা - মেঘনার। ব্যাক্তিগত জীবনের এক লড়াই জেতার জেদেই মেঘনা নিজেকে একজন সফল অভিনেত্রী রূপে দেখতে চায়। কিন্তু দীর্ঘদিন একসাথে পথ চলতে চলতে তার বৃহত্তর স্বার্থ অর্থ বদলে ফেলে। অভিনয়ের থেকে বেশি টান অনুভব করতে থাকে বর্ষণের প্রতি। কিন্তু বিপরীত দিকের অছিলায় মেঘনার সবটাই যেনো গুলিয়ে যায়।
✍️অন্যদিকে বর্ষণ নিজেও এক অতীতের সাথে প্রত্যহ লড়াই করে চলেছে। মাঝে মাঝে পথ ভুলে গেলেও সামলে নেয় নিজেকে। কিন্তু অতীত যখন আঁকড়ে ধরে চারিদিক দিয়ে, তখন পালানোর পরিধিটাও বোধহয় খুবই সংকীর্ণ হয়ে যায়। ইতুর বারবার হাতছানি বর্ষণের জীবনে প্রতিকুলতাগুলোকে আরো বেশি জটিল করে দেয়।
✍️উপন্যাসের আর এক বিরাট স্তম্ভ পল্লব - আমাদের বাস্তবিক সমাজ জীবনের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। ছন্নছাড়া ছেলে, কাজকর্মের বালাই নেই, গুন্ডাদের সাথে ওঠাবসা। এমন চরিত্রের জন্য পাঠকের চোখে জল আসে সেটা কি কল্পনা করা যায়???
যায়, এখানেই চরিত্রের সার্থকতা এবং এখানেই লেখকের অসাধারণ লেখনীর প্রেমে পড়া। 😌😌😌😌😌😌😌
পল্লব এমন কি করতে পারে? কি হতে পারে তার সাথে যে পাঠকের মনকে নাড়া দিয়ে যেতে পারে?
মল্লারপুর, এক মফস্বলের নাম, যেখানে সব রাজনীতি, ক্যাম্প, মদের ঠেক সব কিছুকে উপেক্ষা করে বেঁচে আছে বর্ষণ। ঠিক শ্রাবনের ধারার মতোই সে ভেঙে পরে এই মল্লারপুরের ধূসর জমিতে, আগলে রাখতে চায় শৈশবকে, শৈশবের প্রেমিকাকে। কিন্তু এই শৈশব হয়ে ওঠে তার "মেঘ না" দেখার অন্যতম কারণ। গল্পের অন্যদিকে আছে পল্লব, যে সাদা রাজহংসীর মতো দেখে বেড়ায় তার ভালোবাসাকে, কিন্তু কি হয় শেষে? এই দোটানার শেষে কে পায় তার ভালোবাসাকে?
📘 মফস্বলের একটা ছোট নাট্য দলের পরিচালক বর্ষণ। নতুন নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র অনেক খোঁজার পর সন্ধান মেলে মেঘনার, যার মধ্যে বর্ষণ খুঁজে পায় তার পুরো শৈশব, কৈশোর জুড়ে থাকা বন্ধু/ ভালোবাসা ইতুর প্রতিচ্ছবি। যে ইতু এখন অন্যের স্ত্রী, এক সন্তানের জননী হলেও নিজের থেকে কোনোদিনও তাকে পুরোপুরি আলাদা করতে পারবে না বর্ষণ। আবার ধীরে ধীরে মেঘনা ভালোবাসে ফেলে বর্ষণকে, বর্ষণও কিছুটা প্রশ্রয় দেয়। 📗 ওদিকে মেঘনার বাবা সত্যবিকাশের, মাল খাওয়ার ঠেকে পল্লব নামের একটি ছেলের সাথে বেশ সদ্ভাব। পল্লব আগে মাস্তানি করে বেশ টু পাইস কামাত। কিন্তু ওর লিডার হঠাৎ উবে যাওয়ার পর থেকে ওর অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ পড়তির দিকে। এমনকি পল্লবের মা আস্তে আস্তে বাস্তব জগতের সঙ্গে খেই হারিয়ে ফেলছে। 📙 আর এতগুলো চরিত্রকে এক সূঁতোয় গেঁথে রেখেছে যে মফস্বল, তার নাম - মল্লারপুর। উপন্যাস পড়তে পড়তে সশরীরে উপস্থিত হই মল্লারপুরে। ওই ছোট্ট নাট্যদলের সদস্য হতে খুব ইচ্ছে করে। এই উপন্যাস পড়ার মাঝে কোথাও ওঠা যায় না। আঠার মতো আটকে থাকি বইয়ের পাতায়। উপন্যাস শেষে করে থম মেরে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকি বেশ কিছুক্ষণ। জানি, সিলিঙের দিকে তাকিয়ে তো আছি, কিন্তু খুঁজে বেড়াচ্ছি মল্লারপুর। 🙂