প্রায় ২০০ বছর আগে রমনার এক টিলায় গড়ে উঠেছিল ঢাকার প্রথম কফি হাউস, এ খবর জানতেন? বিরল গাছপালার খোঁজে, মসলিন কাপড়ের বৈভবের টানে কিংবা স্রেফ নিখাদ কৌতূহল থেকে বিজ্ঞানী ডাল্টন হুকারের মতো একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন – সেই সব সফরের খতিয়ান কি মিলবে? ঢাকার রাস্তায় চলা প্রথম কলের গাড়িটি শহরে পৌঁছে দিয়েছিলেন নবাব সলিমুল্লাহর ভিনদেশি গাড়ি ব্যবসায়ী ‘তরুণ বন্ধু', তিনি আদতে কে? দা ভিঞ্চির নয়—আরমানিটোলায় যে এক বিখ্যাত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান শিল্পীর আঁকা 'দ্য লাস্ট সাপার' নামের একটি চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে, কখনো শুনেছেন? সেকালের ঢাকায় বানানো বজরার কদরই ছিল আলাদা, খোদ রবীন্দ্রনাথেরও ছিল এক ঢাকাই বজরা—সেই শিল্প কোথায় হারাল? ফুলবাড়িয়ার বিলুপ্ত রেলস্টেশনের অসামান্য বইয়ের দোকান ‘হুইলার’ কেন বন্ধ হলো? আধুনিক ঢাকা গড়ে তোলার নেপথ্যে ডাক্তার সিম্পসন ও উদ্যানবিশারদ প্রাউডলক সাহেবের ভূমিকাই বা কী? এ বইয়ে ইতিহাস গবেষক তারেক আজিজ ঢাকার অতীত ইতিহাসের এমনই অজানা ও অশ্রুতপূর্ব এক ডজন আশ্চর্য আখ্যান তুলে এনেছেন।
বইয়ের নামে "ঢাকা" ও "আশ্চর্য " শব্দদ্বয় উপস্থিত থাকলেও মূল বইতে ঢাকা বা "আশ্চর্য"র অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে বেশ কয়েক জায়গায়। লেখক ঢাকার ঠিক কোন কোন বিষয় নিয়ে লিখতে চেয়েছেন তাও স্পষ্ট নয়। কিছু অংশ পড়লে মনে হয়, বইয়ের নাম হওয়া উচিত ছিলো "বিদেশিদের চোখে প্রাচীন ঢাকা" বা "উপমহাদেশে প্রথম।"
ঢাকা নিয়ে লিখতে যেয়ে আনুষঙ্গিক অন্য বিষয় এসে পড়লেও উচিত ছিলো সেগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করে মূল বর্ণনা ঢাকার জন্য বরাদ্দ রাখা। কিন্তু প্রায়ই সেটা রক্ষিত হয়নি। যেমন - "ডাল্টন হুকার যখন ঢাকায়"প্রবন্ধটা ৭ পাতার। এর মধ্যে অর্ধেক পৃষ্ঠাই গৌরচন্দ্রিকা যা হুকারের ব্যক্তিজীবন নিয়ে লেখা। ঢাকার বিবরণ বাকি অর্ধেকে।কোনো মানে হয়? "ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের হুইলার" প্রবন্ধে উপমহাদেশে রেলস্টেশনে বইয়ের দোকান চালুর ইতিহাস বিধৃত হয়েছে। ৮ পাতার লেখায় ঢাকা আছে অর্ধেকেরও কম জায়গায়। কফি নিয়ে লেখাটাও মূলত ভারতবর্ষে কফি প্রচলনের ইতিহাস এবং ঢাকা সেখানে খুব অল্প জায়গা জুড়েই আছে। বিজ্ঞাপনে ও নামে দাবি করা হয়েছে, বইটিতে অনেক আশ্চর্য ঘটনা আছে যা আসলে নির্জলা সত্য। কিন্তু বইতে কি সত্যিকার অর্থে অনেক আশ্চর্য ঘটনা আছে? উনিশ শতকের বিবর্ণ, মলিন শহরের বর্ণনাই তো পড়লাম বেশি।
মূলত উনিশ শতকের ঢাকা প্রসঙ্গে বারোটা লেখা নিয়ে এ বই। প্রথমে ভেবেছিলাম এলোমেলো করে সাজানো বিচ্ছিন্ন কিছু নিবন্ধ হবে। বইটা পড়ে সে তুলনায় মনে হলো, বিবিধ বিষয়ের লেখা হয়েও একটা সময়রেখা অনুসরণের মৃদু চেষ্টা করেছে।
সেই কারণে লেখাগুলোর মধ্যে সময়কালটা এভাবে ধরা যায়, ১৮০৮ থেকে ১৯০৩ সালে এ শহরে ঘটে যাওয়া টুকরো টুকরো ঘটনা ও অনুষঙ্গের সাথে শেষ লেখাটা দিয়ে বিংশ শতকে প্রবেশ করেছেন লেখক। যেহেতু বইয়ের দোকান হুইলার এন্ড কোম্পানির একটা শাখা (পূর্ববাংলার একমাত্র?) ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনে টিকে ছিল কমলাপুর নির্মিত হওয়ার আগ অব্দি (১৯৬৮)।
আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে বজরা নিয়ে লেখাটা। ১৯২৬ সালে ঢাকায় এসে রবীন্দ্রনাথ নবাবদের বজরায় বসে বুড়িগঙ্গার বাতাস খাচ্ছেন, দৃশ্যটি আমার অপরিচিত নয়। তবে পাশাপাশি, পারমিতা সেনের বই স্মৃতিগদ্যের সূত্রে নজরুলের একটা ঘটনারও উল্লেখ মিলল। কবি ঢাকায় এসেছেন। নবাববাড়ি থেকে বজরায় আপ্যায়নের নিমন্ত্রণ গেছে। তো নির্দিষ্ট দিনে সবাই অপেক্ষা করছেন, কিন্তু নজরুলের দেখা মেলে না। পরে নবাবের কর্মচারীরা কবির সন্ধান পান ঢাকাস্থ এক বন্ধুর বাসায়। আড্ডা দিচ্ছিলেন নজুদা, যথারীতি হৈহুল্লড়ের সঙ্গে। দাওয়াতের কথাটা তার মনেই ছিল না। পরে অবশ্য তিনি গিয়েছিলেন নবাববাড়িতে। চড়েছিলেন বজরায়।
এ রচনাটা ভালো লাগার আরও কিছু কারণ, বজরা নির্মাণের শুরু থেকে পরিণতি পর্যন্ত একটা স্কেচ পাওয়া যায়। ঢাকায় নির্মিত বিলাসী এই নৌযানগুলোর শেষ যা ছিল, রীতিমতো শেকসপিয়ারিয়ান।
আর্মানিটোলার 'লাস্ট সাপার' ও এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান চিত্রকর শিরোনামের রচনাটিও প্রশংসার দাবি রাখে। এই এক লেখায় ডিরোজিও, ডেভিড হেয়ার, চার্লস পোটের কলেরায় মৃত্যুর বিবরণ মেলে। সঙ্গে পোগোজ স্কুলের প্রতিষ্ঠার বিবরণ। শিল্পী চার্লস পোটের কবরটা যে হারিয়ে গেলো লেখার শেষে এসে, তখন ভার হয়ে ওঠে মন।
সবকটি লেখা যে খুব প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পেরেছে, এমন না, কিন্তু ১১২ পৃষ্ঠা জুড়ে লেখক যা বলতে চেয়েছেন তা পরিষ্কার শোনা যায়, তথ্যের ভারে আক্রান্ত না হয়েই: বৃটিশ সাহেবরা এ ঢাকাকে আবিষ্কার করেছিলেন মোটামুটি পুরনো দিনের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জঙ্গলাকীর্ণ প্রাক্তন এক মোগলাই শহর হিসেবে। তাই ঢাকার প্যানোরোমা আঁকেন চার্লস ডয়েলি, ডালটন হুকার মায়ের জন্য অল্পদামে কিনে নিয়ে যান সাতনরি সোনার হার, প্রাউডলক সাহেব স্বপ্ন দেখেন ঢাকাকে বানিয়ে তুলবেন দ্বিতীয় পারি, আর বঙ্গভঙ্গের ফলে সেই স্বপ্ন থেকে কেবল দূরেই সরে যেতে থাকে এই প্রাচীন মহানগর।
ঢাকার ইতিহাস নিয়ে লেখা অন্যান্য বইগুলো যাদের কণ্ঠস্থ, তাদের জন্য খুব নতুন কিছু আছে এখানে এমন দাবি করতে পারছি না। তবে, তারেক আজিজের লেখা সুপাঠ্য এ বই আমাদের এই আশ্চর্য শহরের জাদুকরী ইতিহাস নিয়ে যে কাউকেই মনে হয় আগ্রহী করে তুলতে পারে। সেইটা বেশ দরকারি একটা কাজ বলেই আমার ধারণা।
ঢাকার ইতিহাস আগ্রহীদের মাঝে যারা আধা-মনোযোগ দিয়েও পড়েছেন মুনতাসীর মামুনকে, এই বইয়ের বহু চরিত্র/ঘটনার অনেকাংশই তাদের জ্ঞাত। উল্লেখ করতে হয় মীজানুর রহমানের ‘ঢাকা পুরাণ’ এর কথাও, সেখানেও আমার শহর ঢাকার ইতিহাসের নানা খুচরো তথ্য উঠে এসেছে।
তারেক আজিজ-এর উদ্দিষ্ট বইটির সার্থকতা যেখানে, উক্ত বইগুলোতে পাওয়া তথ্যের সাথে সেটা প্রায়ই নতুন একটা-দুটো তথ্য যোগ করেছে। যেমনঃ পাগলা সাহেব চার্লস ডজের হাতে রেসকোর্স নির্মাণের কথা আমাদের জানা, এই বই থেকে জানা গেলো “ডজ’স ফলি” ছিলো এই এলাকায় কফিপায়ীদের প্রথম সমবেতস্থল। তারপর ধরা যাক ফুলবাড়িয়া স্টেশনের হুইলারের বইয়ের দোকানটির প্রসঙ্গ। মীজানুর রহমানের লেখায় হালকা উঠে এলেও তারেক আজিজ বেশ বিস্তারিত করে জানালেন হুইলারের আদ্যপান্ত।
একদম নতুন- অন্ততঃ আমার কাছে - বিষয় তুলে এনেছে, বইয়ের ১২টি প্রবন্ধের মাঝে তেমন প্রবন্ধ আছে ৩টি। সেই আলোচনাগুলো (ক) ডাল্টন হুকারের ঢাকা ভ্রমণ, (খ) আরমানিটোলা গির্জার ‘দা লাস্ট সাপার’ নামক ছবি আর (গ) ঢাকার প্রথম কলের গাড়ি বিষয়ক। ঢাকাই বজরার চারশো বছরের ইতিহাস তুলে আনা লেখাটাও বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।
২০১৫ সালে পড়া ফার্স্ট ৫ তারা বই এটা। ৪০০ বছরের ঢাকা বিষয়ে আমার আগ্রহ প্রচুর হলেও খুব বেশি বই পড়া হয়নি। যেগুলো পড়া হয়েছে সেগুলো থেকে এখানে থাকা ১২টা প্রবন্ধের ৫-৬টা প্রবন্ধই কমন পড়েছে। স্টিল বইতে স্পেশাল কয়েকটা প্রবন্ধ আছে যেগুলোর কারণেই ৫ তারা দেয়া যায়। যেমন : আর্মানিটোলার 'লাস্ট সাপার', বজরার ইতিহাস নিয়ে ডিটেইল একটা প্রবন্ধ, ঢাকায় কফি প্রচলনের গল্প ও প্রথম কফি হাউজের গল্প ইত্যাদি ইত্যাদি।
এতো আগ্রহ নিয়ে কবে আমি নন-ফিকশন শেষ করেছি মনে পড়েনা। এতো সুন্দর করে সব অধ্যায় লেখা যে, সেসব নিয়ে আমি একদিন একদিন ভাগ করে কথা বলতে পারবো।
ঢাকা নিয়ে যখন আমি কোনো বই পড়ি,খুব আগ্রহ নিয়েই পড়ি৷ আসলে ঢাকা না,আমাদের দেশীয় ইতিহাসের, অতীত স্মৃতির বইগুলো দেখলেই লালা চলে আসবার যোগাড় হয়।মানুষ অতীতের স্মৃতি পড়তে পছন্দ করে,অতীত বর্তমান অবস্থা মিলিয়ে নিতে পছন্দ করে। তবে আমি একটানা নন-ফিকশন আমি পড়তে পারিনা। তবে এই দ্বিতীয় বারের মতোন একটানা পড়ে শেষ করেছি। অবশ্য ছোট বই,এটাও একটা কারণ হতে পারে।
এই বইয��ে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে কফি হাউসের ইতিহাস আর হুইলার সাহেবের ইতিহাস। এর ইঙ্গিত অবশ্য ঢাকা পুরাণে পেয়েছিলাম।বিশদ এক ইতিহাস, সাথে তথ্যসূত্রগুলোর সন্ধান পেয়ে যেনো বিরাট কিছু পেয়েছি।
এই বইয়ের আরেকটা দিক হলো এর বইগুলো।মানে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভিন্ন বই,সাময়িকীর নাম উঠে এসেছে। এটাকেই সমৃদ্ধ এক লিস্ট বলা যায়৷ অবশ্য গুনেগুনে দু-তিনটের বেশি পড়িনি। এর মাঝে ঢাকা পুরাণ আছে,শ্যামলী নিসর্গ, ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল।ট্যাব দিয়ে রেখেছি,লিস্টটা দেবো একটা সময়।
এবারকে পড়ার সময়কার চিন্তাভাবনাগুলো বলি।বইয়ের একটা অংশে রমনা পার্কের একটা অংশ আছে। প্রউডলক ঢাকাকে নিয়ে একটি অন্যরকম স্বপ্ন দেখেন।যার অনেকটা অংশজুড়ে আছে গাছ। এই অংশে যে ঢাকা শহরের কথা বলা হয়েছে,সে এক অচেনা রাজ্য। যার ছিটেফোঁটা এখন নেই।
বইটার নাম মাফিক "আশ্চর্য" হই নাই, আর "ইতিহাস" হবার জন্যে যে পরিমাণ তথ্যের গভীরতা প্রয়োজন, সেটা অনুপস্থিত। কে প্রথম ঢাকা আসলো, কি লেখলো, এইসব দিয়ে আর ঢাকা নিয়ে লেখা ভালো কিছু লেখকের বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে দিয়ে বই লেখার দায়িত্ব কোনমতে পার করেছেন। আরো গভীরে যাবার অবকাশ ছিল। বই থেকে গ্রহণ করার মতো ব্যাপার হচ্ছে শুধু: নির্ঘণ্টতে, কোন কোন বই পড়লে ভালো করে জানতে পারবেন ঢাকা বা সংশ্লিষ্ট টপিক সম্পর্কে - এটাই। এর বাইরে নেট ব্রাউজিং করে আরো বেশি তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। বই দেখে যেমন আশা ছিলো, আশানুরূপ ফলাফল পেলাম না।
ঢাকার জাদুকরী ইতিহাসের অধরা সব চিত্রপট আর এখনকার চিরচেনা প্রেক্ষাপটের মিল-অমিলের হিসেব করতে করতে বইটা পড়া শেষ হলো। কত বৈচিত্র্যময় গল্পের সাক্ষী ঢাকা এখন স্রেফ একটা ক্লান্তিকর যান্ত্রিক শহরমাত্র! খানিকটা দুঃখই হয়। ঢাকার বজরার গল্প পড়বার সময় সেইসব সন্ধ্যারাতের আলো ঝলমল বুড়িগঙ্গার রূপ কল্পনা করে রীতিমতো মনটাই বিমর্ষ হয়ে যায়। বারোটা প্রবন্ধের মধ্যে মনে রাখার মতো আরেকটি অধ্যায় রমনীয় ঢাকার স্বপ্নদ্রষ্টা বিলেতের প্রাউডলক সাহেব। কী অদ্ভূত, অপরিচিত এক সেগুনবাগিচা, শাহবাগ, রমনা, নীলক্ষেত দেখতে পেলাম- কল্পনায়! ঢাকার কী নৈসর্গিক ল্যান্ডস্কেপিং করে গিয়েছিলেন এই ভদ্রলোক! ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের গল্পও এক রূপকথার মতো মনে হয়! সত্যিই কী এমনই ছিল আজকের এই জঞ্জালের শহর ঢাকা? দুঃখ হয়। মিটফোর্ড হাসপাতাল আর আর্মেনিয়ান চার্চের অজানা কাহিনীগুলোও মনে থাকবে ভীষণ।
পুনশ্চ: ঢাকা পুরাণ বইটা জলদি সংগ্রহে নিয়ে পড়তে হবে।
৩.৫/৫ মুঘল আমলের পর থেকে ঢাকা তার পুরনো জৌলুশ হারাতে থাকে। অদূরেই কলকাতা তখন ইংরেজদের কেন্দ্রস্থল। সমস্ত মনোযোগ তাই কলকাতাতেই নিবদ্ধ। তাই এই সময়কার কলকাতাকে যতোটা জানা যায় ঢাকার ক্ষেত্রে ততোটাই কম তথ্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময়ে ঢাকায় কাজ কিংবা ভ্রমণে আসা ইংরেজ বা পর্যটকদের খুচরো লেখাই সেক্ষেত্রে সম্বল। এই বইয়ের লেখক তারেক আজীজ ওসব বইপত্তর ঘেটে বিষয়ভিত্তিক কিছু নিবন্ধ লিখেছেন। একদম নতুন তথ্য পাওয়ার ঘটনা কম থাকলেও পড়তে মন্দ নয়।
ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর বা নগরী হচ্ছে ঢাকা৷ এই ঢাকার ইতিহাস কত পুরনো তা আসলে সঠিক ভাবে বলা যায় না৷ কারণ বঙ্গ ইতিহাস পাল মোগলদেরও আগের। তাই এই অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে এই ঢাকা। আসলে ঢাকাকে ঘিরেই এই জনপদের সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকায় প্রথম গাড়ি আসা থেকে শুরু করে রেসকোর্স উদ্যান সব কিছু এখন যা দেখা যায় তা বৃটিশদের অবদান। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
ঢাকাকে কেন্দ্র করেই তাদের এই বাংলার শাসন চলেছে৷ বরং ইতিহাসের বিখ্যাত কুখ্যাত সব কিছুই যেন এই ঢাকাকে ঘিরেই এসেছে।
পড়ে শেষ করলাম কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত "অতীত ঢাকার আশ্চর্য ইতিহাস - কফি হাউস থেকে কলের গাড়ি"৷ এই বইটি লিখেছেন তারেক আজিজ। যদিও বস উনি লেখার চেয়ে টুকলি করেছেন বেশি। তাতে নিজের বাক্যচয়ন জুড়ে দিয়েছেন।
ইতিহাস বা ইতিহাস সম্পর্কিত বইয়ের সবচেয়ে কঠিন দিক হচ্ছে এর ধারাবাহিকতা। কোন ঘটনা কোথা থেকে এসে কোথায় শেষ হয়েছে সেটা বর্ণনা। পাঠক যেন সেই সময়টা উপলব্ধি করতে পারেন। তবেই এই ধরনের বইয়ের সার্থকতা ফুটে উঠে। উনি অনেক বইয়ের রেফারেন্স নিয়ে এসেছে বইটিকে দাড় করিয়েছেন রেফারেন্স অবশ্যক দরকার। কিন্তু মোটামুটি যা আছে তা মুনতাসীর মামুন এর ঢাকা সমগ্র পড়লেই পাওয়া যাবে।
লেখক বইটির আকার ছোট করতে গিয়ে ইতিহাসের ঘটনা গুলোয় লাফ দিয়েছেন। ঘটনার ভেতর অনেক ঘটনা কে পাশ কাটিয়ে ফেলেছেন আপনাদের কাছে মনে হতে পারে যে এতে কি সমস্যা। সবচেয়ে বড় সমস্যা পরবর্তিতে যখন পুরো ঘটনা জানা যায় তখন ওই সময়টা অন্য রকম হয়ে যায়।
আমার মতে বইটি আরও বিস্তারিত হওয়া দরকার ছিল। এত ছোট বইয়ে পুরো ইতিহাস তুলে আনা সম্ভব না।
ঢাকার ইতিহাস নিয়ে আমার পড়া দ্বিতীয় বই এটি। অসাধারণ একটা কাজ করেছেন লেখক। এমনকিছু বিষয়ের তথ্য তিনি একত্র করেছেন যেগুলোর ইতিহাস আমরা আলাদা করে কোথাও পাইনা। বিভিন্ন ভাবে এসব ইতিহাস হয়তো চাপা পড়ে গেছে মূল ঘটনার ফাঁকে। যেমন ধরুন আপনি কি জানেন, আর্মেনিয়ান চার্চের ভেতর দ্য লাস্ট সাপার নামের এক বিখ্যাত পেইন্টিং রয়েছে যার জন্ম এই ঢাকায়? বা ঢাকায় সর্বপ্রথম কলের গাড়ি কে কিনেছিলেন, কার কাছ থেকে কিনেছিলেন, কি ঘটনা ঘটেছিলো সেই গাড়ি ঢাকার অলিগলিতে চলার সময়? আবার ধরুন ঢাকায় কফির প্রচলন কি করে হলো, প্রথম কফির দোকান কোনটা ছিল। ঢাকাই বজরার কত সুনাম ছিল সেসময়ে বা রমনা পার্কের এত এত বৃক্ষরাজি কে লাগিয়েছিলেন? আরো নানারকম তথ্যে ভরপুর এই বইটি পড়ে আমি খুবই আনন্দ পেয়েছি৷ লেখক কি পরিমাণ রিসার্চ করে বইটি লিখেছেন, সেটি দেখেও আমি যারপরনাই অবাক।
" ঢাকা " নামটা শুনলেই এখন ইট, পাথরের বহুতল ভবন আর কালো ধোঁয়া আর বাস, কার, সিএনজি তে জ্যাম লেগে থাকা রাজপথ ভাসে মনের স্মৃতি তে। কিন্তু আজ থেকে ১০০-২০০ বছর আগে বা মাত্র ৫০-৬০ বছর আগেও কি ঢাকা এমন ছিলো! কেমন ছিলো মোঘল আমলের জৌলুসপূর্ণ ঢাকা ! ব্রিটিশ পিরিয়ডে অনাদরে অবহেলায় জৌলুস হারিয়ে কিভাবে টিকে ছিলো এই জাদুর নগরী ঢাকা!
লেখক তারেক আজিজ চমৎকার ভাবে নানা সময়ের নানা রূপের ঢাকা কে চিত্রিত করেছেন তার নিবন্ধের মাধ্যমে এই বইতে। বিভিন্ন সময়ের ঢাকার ছবি যুক্ত করেছেন নিবন্ধের সাথে । এতে পড়ার সাথে সাথে কিছুটা চোখেও দেখা হয়ে যায় পুরোনো দিনের ঢাকাকে।
বইতে ঢাকার ইতিহাসের থেকে ঢাকার সাথে সম্পৃক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তি বর্গের ইতিহাস বেশি উঠে এসেছে। শুধুমাত্র ঢাকা শহর নিয়ে আরো বিস্তারিত ইতিহাস আশা করেছিলাম। সাবলীল বর্ণনাতে বইটা উপভোগ্য। বই শেষ হয়ে গেলেও ঢাকা কে নিয়ে জানার আগ্রহ মিটে যায়নি। বরং চেনা ঢাকার আরো অচেনা রূপ জানার তৃষ্ণা জাগিয়ে দিয়েছে এই বই।
অতীত ঢাকার আশ্চর্য ইতিহাস - কফি হাউস থেকে কলের গাড়ি লেখক: তারেক আজিজ Tareq Aziz প্রকাশনা: কথা প্রকাশন প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পৃষ্ঠা: ১১২ দাম: ২২০/- মান: ৪.০/৫.০ ধরন: ইতিহাস/তথ্য
যারা অতীত থাকার ইতিহাস জানতে চায় তাদের জন্য এই বইটি একটি সুন্দর বই। বইটিতে ঢাকার পরিপূর্ণ ইতিহাস না থাকলেও ছোট ছোট অনেক ঘটনার খন্ড খন্ড ইতিহাস রয়েছে। সব মিলিয়ে বইটিতে এক ডজন প্রবন্ধ রয়েছে এবং তার সবগুলি চিত্তাকর্ষক। প্রথম প্রবন্ধ রয়েছে কালেক্টর ডয়লি ও মান্ডি র ঢাকা শহরের ঘুরে বেড়ানোর ইতিহাস তাও আবার ১৮০৮ সালে। এরপর রয়েছে মধুসূদনের বন্ধু ভোলানাথ চন্দ্রের চোখে দেখা উনিশ শতকের ঢাকা এবং এবং মুসলিন কাপড়ের তাঁতিদের খুঁজে বেড়ানোর ইতিহাস। পরবর্তীতে রয়েছে উদ্ভিদবিজ্ঞানী ডাল্টন হুকারের ঢাকায় আসার ঘটনা।
এ বইয়ের বিভিন্ন প্রবন্ধে ঢাকার বজরার কথা অনেকবার উঠে এসেছে; এমনকি বজরা নিয়ে একটি পুরো প্রবন্ধেই রয়েছে যেখানে বজরার অনেক সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। আরো একটি প্রবন্ধ রয়েছে আর্মেনিয়াম চার্চ সোসাইটির দুটি অতীত চিত্রকর্মের মেরামতের কাহিনী। মিটফোর্ড হাসপাতালের অসাধারণ ইতিহাস একটি প্রবন্ধে সুন্দরভাবে স্থান পেয়েছে। দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকের নৈপথ্যের ঘটনা যা আমাকে অনেক বেশি মুগ্ধ করেছে।
ঢাকার রমনা পার্কের আশেপাশের এলাকা কেন এত সবুজ তার কাহিনীও এই বইয়ে খুজে পাওয়া যায়; রয়েছে ঢাকায় কফির ইতিকথা। নবাব সলিমুল্লাহর হাত ধরে ঢাকায় প্রথম কলের গাড়ি আসার ইতিহাস থেকে শুরু করে আরো অনেক টুকরো অতীতের গল্প রয়েছে এই বইটিতে।
লেখক তারেক আজিজ স্যার কে ধন্যবাদ একটি সুন্দর গবেষণালব্ধ ইতিহাসের বই আমাদের প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। স্যারের আগের বইটিও খুব তথ্য সমৃদ্ধ ছিল (সেকালের ছবিওয়ালা)। আশা করি আগামীতে একই রকম ভাবে আর একটি তথ্যসমৃদ্ধ বই নিয়ে হাজির হবেন আমাদের মাঝে। #ধূসরকল্পনা
বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির ঢাকা শহরকে নিয়ে আছে অজস্র অজানা-অচেনা ঘটনা। সেসব থেকে লেখক ১২টি বিষয়ের আলোকপাত করেছেন। সেসবের বেশিরভাগ ঘটনার সময়কাল মূলত আঠারোশো শতাব্দী, যখন জৌলুস হারিয়ে ঢাকা ধ্বংসের দিন গুনছে। শুরুর তিনটি প্রবন্ধে লেখক তুলে এনেছেন চার্লস ডয়লি, ভোলানাথ চন্দ্র ও ডাল্টন হুকারের চোখে দেখা ঢাকাকে। এরপর ঢাকার ঐতিহ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ন অংশ 'বজরা' নিয়ে আছে দারুন সব অজানা তথ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঢাকাই বজরা নিয়ে স্মৃতিচারন বেশ উপভোগ করেছি। এই বইয়ের আরেকটি অন্যতম আকর্ষনীয় প্রবন্ধ হলো চার্লস পোটের আর্মেনি গীর্জায় থাকা "দ্য লাস্ট সাপার" পেইন্টিং নিয়ে আলোচনা।
যার ঐকান্তিক চেষ্টায় মিটফোর্ড হাসপাতাল পরিণত হয়েছিলো উন্নত চিকিৎসার এক নির্ভরযোগ্য কেন্দ্রে, সেই ইংরেজ ডক্টর আলেকজান্ডার সিম্পসনের বাঙালীর আপন একজন হয়ে উঠার চিত্রও দেখতে পাই এই বইয়ে। আরো দেখতে পাই নীলকরদের অত্যাচারের সময়ে দীনবন্ধু মিত্রের ইংরেজ বিরোধী নাটক নীল দর্পন কিভাবে সৃষ্টি ও মঞ্চস্থ হয়। কফির মতো জনপ্রিয় একটি পানীয় আমাদের বাংলায় কখন ও কিভাবে এলো এবং ঢাকার প্রথম কফি হাউস কিভাবে ব্যান্ড সংগীত শিল্পীদের প্রিয় আড্ডার স্থান হয়ে উঠলো তা লেখক তার নস্টালজিয়াময় লেখায় তুলে ধরেছেন।
এছাড়াও ঢাকার রমনার এক অপরিচিত রুপ আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন লেখক, যার স্থপতি ছিলেন রবার্ট লুইস প্রাউডলক। ঢাকার নগর ঐতিহ্যে সাইনবোর্ডের বিবর্তনের আখ্যান পড়ে অবাক হয়েছি। তাছাড়াও আছে ঢাকায় প্রথমবার কলের গাড়ীর আগমনের ইতিবৃত্ত। হুইলার এন্ড কোম্পানির মতো চমৎকার বুকশপের ঢাকায় আগমন ও হারিয়ে যাওয়ার গল্প ইত্যাদি সব মিলিয়ে এই বইটি আমার জন্য বেশ সুখপাঠ্য ছিলো। প্রবন্ধ পড়তে সাধারনত আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়। কিন্তু এই বইটির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেছে। কারন লেখকের লেখার ধরন এমন যে পড়লে মনে হয় যেন গল্প শোনাচ্ছেন। কিসের গল্প? অতীত ঢাকার আশ্চর্য ইতিহাসের!
বইটির নাম অনেক আকর্ষণীয়, "অতীত ঢাকার আশ্চর্য ইতিহাস: কফি হাউস থেকে কলের গাড়ি", শুরুর আগে তাই আলাদা একটা আগ্রহ কাজ করছিলো। কিন্তু পুরোটা পড়ে মনে হয়েছে, এটি আসলে শুধুমাত্র ঢাকা কেন্দ্রীক কোনো ইতিহাসগ্রন্থ নয়; ঢাকা এখানে মূখ্য কিন্তু প্রধান না। ঢাকাকে ঘিরে নানা সময়ের টুকরো টুকরো ইতিহাসের গল্পগুলোর সংকলন এই বই। লেখক বইয়ের শুরুতেই জানিয়েছেন, প্রবন্ধগুলো আগে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, তাই ধারাবাহিকতার ঘাটতি কিছুটা থেকেই গেছে।
অনেক জায়গায় ঢাকার বাইরের প্রসঙ্গও এসে পড়েছে, যা কখনো কখনো মূল বিষয় থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়। তবুও লেখকের লেখনী ভঙ্গি ও ঐতিহাসিক তথ্য উপস্থাপনার ধরণ পাঠককে ক্লান্ত করে না। যাঁরা হালকা অথচ তথ্যসমৃদ্ধ বর্ণনায় ঢাকার অতীতের বিচিত্র দিকগুলো জানতে চান,তাঁদের জন্য বইটি বেশ উপভোগ্য হবে। আমার কাছে এটি ঢাকার ইতিহাস নয়, বরং “ঢাকাকে ঘিরে অতীতের কিছু আশ্চর্য টুকরো সময়ের গল্প” বলেই বেশি মনে হয়েছে।
অতীত কলকাতা আর ঢাকা দুইটাই আমাকে খুব টানে। শামসুর রাহমানের স্মৃতির শহর দিয়ে ঢাকার অতীত জানা শুরু। সেটা ঢাকা পুরাণ, জিন্দাবাহার, মুনতাসীর মামুন বা কিংবদন্তির ঢাকা পেরিয়ে একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে। তারেক আজিজের বইটিতে সব যে খুব চমকপ্রদ তাই আমার কাছে অমনটি না হলেও সুখপাঠ্য লেখনশৈলীতে পড়ে খুব আরাম পেয়েছি। পাশাপাশি বাংলাদেশেও ভালো ভালো ননফিকশন হচ্ছে এটাও আমাকে স্বস্তি দেয়৷