“চির উন্নত মম শির” প্রতিজ্ঞা নিয়ে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি নামের যে মানুষ গড়ার কারখানা, সেখানে বৈশ্বিক মানদণ্ড বজায় রাখা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ আকারে চিটাগাং এর ভাটিয়ারী এলাকায় ১৯৭৬ সালে যাত্রা শুরু করে। শুরু থেকে আজতক একাডেমি তার সুনাম ও অর্থবহ যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। ৪৫ বিএমএ লং কোর্সের দুই বছর মেয়াদী প্রশিক্ষণে অংশ নিতে, রাজীব নামে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে সদ্য পাশ করা এক তরুন ২০০০ সালের ১২ জানুয়ারি একাডেমিতে যোগদান করে। সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে একদিক থেকে যেমন তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়েছে, একই সঙ্গে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তাঁকে অব্যাহতভাবে পথ চলতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কঠোর প্রশিক্ষণ, সামরিক কায়দা কানুন, নিখুঁত লক্ষ্যভেদ আর একজন সামরিক উপদলনেতা হিসাবে প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি তাঁর প্রশিক্ষণার্থীদের শিখিয়েছে ভ্রাতৃত্ববোধের সংজ্ঞা। তাঁরা হয়তো সময়ের সন্তান, তবে তাঁদের প্রত্যেকেই সূর্যমুখী ফুলের মতো করে নতুন সূর্যোদয়ের জন্য মুখিয়ে থেকেছেন। এই শতকের শুরুর সময়টা, প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা এই তরুণদের জন্যেই নির্ধারিত রয়ে গেছে।
রাজীব হোসেন এর লেখার পরিধি বিচিত্র। গ্রামে জন্ম নেয়া এবং সেখানে ক্ষেতের আইলে দৌড়ে বেড়ে ওঠার কারণে, দস্যিপনায় ভরা স্মৃতিমুখর শৈশব। লুকিয়ে মাছ ধরা, আম চুরি করা আর তল্লাট চষে বেড়ানো সেই শিশু, তার কৈশোরে এসে পাড়ি জমায় ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের বিস্তৃত প্রাঙ্গনে। ১৭৫ একরের চারণভূমিতে ভিত গড়ে ওঠা। এক সময় সেনাবাহিনীতে যোগদান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ আর্মি স্পেশাল ফোর্সে কাজ করার সুযোগ হয়। সেনা পরবর্তী দ্বিতীয় জীবনে সুন্দরবনের গহীনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার কঞ্জারভেসন প্রজেক্টে কাজ করার সুবাদে, গহীন জঙ্গলের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা রয়েছে। একজন আন্তর্জাতিক আল্ট্রা ম্যারাথন রানার হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। এহেন বিচিত্র কর্মজীবন হবার কারণে অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা বাবা খন্দকার আবু হোসেন একজন রাজনীতিবিদ এবং মা শামসুন্নাহার একজন শিক্ষিকা ও নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী হবার কারণে, প্রান্তিক মানুষের জীবনের সাথে জীবনভর সখ্যতা। জগত সংসারের অনেক ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ পথের অভিযাত্রী রাজীব হোসেন কবিতা, রম্য রচনা, ভ্রমণ কাহিনী, এডভেঞ্চার, প্রকৃতি কিংবা মিলিটারি বিষয়ে লিখলেও- প্রথম বইয়ের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন নিজের লাইফ কোডঃ “কমান্ডো”। লম্বা সময় ধরে সোশ্যাল মিডিয়াতে খণ্ড আকারে প্রকাশ পাওয়া এই বইটির পাঠক চাহিদা থাকায়, বইটির আয়োজন। লক্ষ্য- তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি সম্মান ও পরিশ্রমের জীবনের চিত্র তুলে ধরা। যাত্রা সবে শুরু হলো। তিনি চান, সামনের দিনগুলোতে পাঠকের আত্মার কাছে পৌঁছানোর লেখা নিয়ে আসতে, যেন মানুষের বই পড়ার অভ্যাস আরও পোক্ত হয়।
অনেক বই পড়েছি, কিন্তু ‘মিলিটারি একাডেমির ডায়েরি’ বইটা যেন সব পড়া বইকে ছাড়িয়ে গেছে। জেন্টলম্যান ক্যাডেট রাজীব হোসেন থেকে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট রাজীব স্যার হয়ে ওঠার গল্পটা কখনো হাসিয়েছে, কখনো চোখ ভিজিয়েছে, আবার গভীরভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন আমাকেও তৌফিক দেন — আমিও যেন তার মতো একনিষ্ঠ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে পারি। আর ভবিষ্যতে তার মতো কিছু স্বর্ণহৃদয় মানুষ পাশে পাই — এটাই কামনা। 🌿
এই বইটি আগের কমান্ডো, ইম্ব্যাল্যান্সড বাফালো ও লাভ ইট অর লিভ ইট বইগুলোর প্রিক্যুয়েল। এখানে লেখক তার সেনাবাহিনীর অফিসার হবার জন্য, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমীতে আড়াই বছর প্রশিক্ষণের সময়টার স্মৃতিচারণ করেছেন।
তবে, তার চারটি আত্মজৈবনিক রচনার মধ্যে আমি এই বইটিকে সবচেয়ে এগিয়ে রাখবো। এই বইটিকে অন্যগুলোর তুলনায় আমার অনেক বেশি ‘সৌলফুল’ মনে হয়েছে। বিশেষ করে বইয়ের শেষভাগ অনেকটাই গ্রিম এবং ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা ডিপ্রেসিং।
ভরুণ গ্রোভার আমার প্রিয় একজন ভারতীয় স্টান্ড-আপ কমেডিয়ান। এছাড়াও তিনি একজন লেখক ও গীতিকারও। তার কয়েকটা গান যেমন, ‘মোহ মোহ কে ধাগে’, ‘শখ’, ‘জাবরা ফ্যান’ অনেক জনপ্রিয় সাথে গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরের এক্সেন্ট্রিক গানগুলো তো আছেই। তিনি ‘অল ইন্ডিয়া র্যাংক’ নামে এক সিনেমা বানিয়েছেন সম্প্রতি; সেই সিনেমার এক প্রচারণা সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সতেরো বছর আসলে অনেক কম বয়স নিজের বাকি জীবনটা আমি কী করতে চাই সেটা ঠিক করে ফেলার জন্য। এমন একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা যায় এই বইটিতেও। ১৮-১৯ বছরের একটা ছেলে আইডেন্টি ক্রাইসিস ভুগছে, নিজের কাজ-দায়িত্ব পালন করার জন্য পর্যাপ্ত মোটিভেশন না থাকায় পিছিয়ে যাচ্ছে আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে সঠিক অনুপ্রেরণা পেয়ে। চমৎকার ‘কামিং অফ এজ’ স্টোরি, কিছু কিছু অংশ মনে করিয়ে দেয় ‘ডেড পোয়েটস সোসাইটি’ কে।
রাজীব হোসেন ভালো গল্পকথক। তার, এই স্মৃতিচারণমূলক বইগুলোর বেশ ভালো এন্টারটেইনিং ভ্যালু আছে। অবশ্য, বইগুলোর বিষয়বস্তু ইটসেলফ এত আকর্ষণীয় যে ভালো না লেগে উপায় নেই; রাজীব হোসেনের সেন্স অফ হিউমার বইগুলোকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।