লোকটাকে আগে কেউ দেখেনি হিরণগড়ে। স্মৃতিভ্রষ্ট সেই মানুষটিকে নিয়ে শুরু হল গোলমাল। রনেশ গুণ আশ্রয় দিল লোকটাকে। নাম দিল, গোপাল। রমেশের মৃত বাবা দীনেশ গুণ আবার ভূত হয়ে এসে গোপালের সঙ্গে দেখা করলেন। গোপাল যে কে সেটা বোঝা মুশকিল। কারও মতে সে গ্যাংস্টার লালু নণ্ডল। আবার পুলিশ তাকে ভাবছে এসডিপিও মাধব সরকার। এদিকে হিরণগড়ের জঙ্গলে বাঘুর সঙ্গে পরিচয় হল নীলুর। সে খুব ভাল গাছে চড়তে পারে। নজর রাখে দুষ্টুলোকেদের উপর। ওদিকে স্বপ্নে এক সাধুবাবা এসে রনাচরণকে ওয়ান পার্সেন্ট ব্রহ্মজ্ঞান দিয়ে গেলেন। সেই ব্রহ্মজ্ঞান আবার কথা বলে রনাচরণের সঙ্গে। এইসব নিয়ে ‘হিরণগড়ের ব্যাপারস্যাপার'।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
অদ্ভুতুড়ের নতুন পাঠক হলে দিব্যি এই উপন্যাসটাকে চার বা সাড়ে চার তারকা দিয়ে দিতাম। আমি এই সিরিজের ২১ বছরের সাবেকি পাঠক, গল্পটার ছাঁচ তার চেয়েও দ্বিগুণ বয়সী।শীর্ষেন্দুর লেখার ধার কিন্তু একটুও কমেনি। পড়ার সময় বিমলানন্দ পেয়েছি।
অনেকদিন পর অদ্ভুতুড়ে সিরিজে হারিয়ে গেছিলাম তিনটা ঘন্টা। খুব ছোট্ট একটা গল্প। সাদামাটা প্লট। কিন্তু শীর্ষেন্দুর লেখার সেই ধাচ কারিশমা ঐটা আজও আমাকে মুগ্ধ করে রেখেছিল।
অনেক দিন পর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের বই পড়ে মজা পেলাম খুব। ভূত, চোর, আজগুবি কাণ্ড নিয়ে এই কাহিনীগুলো সবসময়ই হাসির খোরাক জোগায়। একই সাথে বেরিয়ে আসে টুকরো রহস্য!
আমার সামান্য কিছু সাহিত্য পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে যা বুঝেছি তা হল গল্প বা উপন্যাসের যেটা সবথেকে জরুরী অর্থাৎ টানটান ধরে রাখার ব্যাপার, তা শীর্ষেন্দুর প্রায় প্রতিটি গল্প-উপন্যাসেই পাওয়া যায়। আর অদ্ভুতুড়ে সিরিজ সম্বন্ধে আলাদা করে কিছু বলার নেই। আমার মত অনেকেই এই সিরিজের সাথেই বড় হয়েছে। এক সময় ছিল যখন আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী মানে প্রথমেই শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজ পড়ে ফেলা ও পড়তে পড়তে মুচকি মুচকি হাসা। সাথে দেবাশীষ দেবের অসামান্য সব অলংকরণ। যা আজও অব্যাহত। বড় হওয়ার সাথে সাথে শৈশবের অনেক কিছুই হারিয়ে যায়, কিন্তু শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও দেবাশীষ দেব আমাদের এখনও সমান আনন্দ প্রদান করে চলেছন তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে। শৈশবের সেই একটুকরো আলো আমি আজও উপভোগ করি।
হিরণগড়ের ব্যাপারস্যাপার এইরকম এক মন ভালো করা উপন্যাস। প্রণাম স্রষ্টাকে। এই সিরিজ যেকোন ভাষার শিশুসাহিত্যের গর্ব হতে পারে। এই ধারা অব্যাহত থাকুক।
বেশ লাগল পড়তে। না আনন্দের ৩০০ টাকার বই কিনে পড়িনি। ১৪২৭-এর শারদীয়া আনন্দমেলা থেকে পড়লুম। কোন কারণে সেই বছর পড়তে মিস করে গেছিলাম। পুরোনো বইপত্তর ঘাটতে গিয়ে সকালে খোঁজ পেলুম আর সন্ধ্যে অবধি বেশ আয়েশ করতে করতে পড়ে ফেললুম। ভাগ্যে বই হিসেবে কিনে ফেলিনি আলাদা করে। তা অদ্ভুতুড়ে সিরিজের গল্প নিয়ে নতুন করে কী বা বলার। সেই একগাদা চরিত্র, মজার সংলাপ, কোন একটা রহস্য, কমপ্লিমেন্টারি হিসেবে মজার ভূত নিয়ে এটিও বেশ জম্পেশ প্যাকেজ। গল্প এগিয়েছে হিরণগড়ে আগত স্মৃতিলোপ পাওয়া এক লোককে নিয়ে। হিরণগড়ে সে আশ্রয় পায়, গোপাল বলে নতুন নাম পায়। কিন্তু সারা গল্প জুড়ে খোঁজ চলে যে সে কে? আর সেই পরিচিতি উদঘাটন হয় এক ধুমধাড়াক্কা ক্লাইম্যাক্সের মধ্যে দিয়ে। তবে উপন্যাসের শেষ লাইনটি আবার সবটা সন্দেহের মধ্যেই শেষ করে। সবটাই ভালো তবে রমাবাবুর ব্রহ্মজ্ঞানের ব্যাপারটা খোলসা হল না আর নীলু ভূতও সাইডেই পড়ে রইলো, লাইমলাইট পেল না এই যা। আহামরি কোন প্লট না, তবে একবেলা হালকা মেজাজের মজার কিছু পড়তে চাইলে একদম সেরা চিজ।