খয়েরির সঙ্গে কলাবতীর পরিচয় হয় রাস্তায়। সেদিন স্কুল থেকে সে প্রতিদিনের মতো হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। পিঠে স্কুলব্যাগ, তার মধ্যে টিফিন বক্স, কাঁধে ঝুলছে ওয়াটার বটল। সেদিন টিফিন বক্সটা খোলার তার দরকার হয়নি, খাবার যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেছে। তাদের ক্লাসের মিঞ্চুর মা পাটিসাপটা বাড়িতে তৈরি করেছিলেন, তারই অনেক পলিথিন ব্যাগে ভরে মিঞ্চু নিয়ে এসেছিল তাই খেয়েই কলাবতীর টিফিন করা হয়ে যায়।
স্কুল থেকে বাড়ি আসার পথে স্কুটার—মোটরবাইক সারাবার দোকানটার পাশে পাঁঠার মাংসের একটা দোকান, তার পেছনে টিনের এবং টালির চালের অনেক বাড়ি। মাংসের দোকানের সামনে ফুটপাথে কয়েকটা ষণ্ডামার্কা কুকুরকে কলাবতী রোজই দু’বেলা দেখে, ওরা রাস্তা দিয়ে যাওয়া লোকজনের দিকে ফিরেও তাকায় না। বেশ নিরীহ বলেই মনে হয়। তবে দোকান থেকে হাড় বা মাংসের ছাল ছুড়ে দিলে সেটা খাওয়ার জন্য ওরা নিজেদের মধ্যে তুলকালাম ঝগড়া ও কামড়াকামড়ি শুরু করে দেয়।
সেদিন বাড়ি ফেরার সময় কলাবতী ওই কুকুরগুলোর থেকে একটু তফাতে নতুন একটি কুকুরকে বসে থাকতে দেখল। তার রং খয়েরি কিন্তু মাথার তালুর লোম সাদা, খুবই রুগণ, কোমরের ও বুকের হাড় প্রকট। মাংসওলা একটা ছোট হাড় ওর দিকে দয়াপরবশ হয়ে ছুড়ে দিল। সে হাড়টা মুখে নিতে যাচ্ছে তখন দুটো ষণ্ডা কুকুর ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। তাকে ফুটপাথে ফেলে একটা কুকুর ঘাড় কামড়ে দিতেই সে পরিত্রাহি আর্তনাদ তুলে লেজটা দু’পায়ের ফাঁকে গুটিয়ে ছুটে পালাল সেইদিকে যেদিকে কলাবতী যাবে।
হাঁটতে হাঁটতে কলাবতী সব লক্ষ করল। তার মনে হল, কুকুরটা বোধ হয় অন্য এলাকার, খিদের জ্বালায় এই এলাকায় খাবার খুঁজতে এসেছিল। বাড়ির কাছাকাছি এসে সে কুকুরটিকে আবার দেখতে পেল সত্যানন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সামনে ফেলে দেওয়া মালসা থেকে দই চেটে খাচ্ছে। বেচারা! নিশ্চয় সারাদিন খাওয়া জোটেনি। কলাবতী দাঁড়িয়ে পড়ল। স্কুলব্যাগ থেকে টিফিন বক্স বার করে তাই থেকে মাখন লাগানো পাউরুটির দুটো স্লাইস নিয়ে হাতে ধরে ওকে ডাকল, ”আয় আয়” বলে জিভ দিয়ে ”চুক চুক” শব্দ করল। কুকুরটি হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইল। কলাবতীর মনে হল, ও বিশ্বাস করতে পারছে না মাখন লাগানো রুটি নেওয়ার জন্য তাকেই ডাকা হচ্ছে।
কয়েকজন পথিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে চলে গেল। একজন যেতে যেতে মন্তব্য করে গেল, ”মানুষ খেতে পায় না, কুকুরকে খাওয়াচ্ছে!” কথাটা কানে যেতেই তার মাথা গরম হয়ে উঠল। লোকটা দূরে চলে গেছে নইলে সে বলত, ”মানুষ তো তার নিজের খাবার ভিক্ষে করেও জোগাড় করে নিতে পারে। কিন্তু কুকুর কি তা পারে?”
খাবার পর কুকুরটি কলাবতীর পিছু পিছু একদম বাড়ির সামনে পর্যন্ত এলো। কলাবতী বিরক্ত হলো বললো "আর দিতে পারবো না কিছু''। কলাবতী বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল, দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল মুরারি। সে বলল, ”কাকে কী দিতে পারবে না কালুদি?” কলাবতী বলল, ”একটা কুকুরকে, খাবার।… দ্যাখো তো মুরারিদা, এখনও গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কিনা, খয়েরি রঙের।” উঁকি দিয়ে দেখে মুরারি বলল, ”কই কেউ নেই তো!”
”খয়েরি” শব্দটি মুখ থেকে বেরোতে তখনই কলাবতী মনে মনে নামকরণ করে ফেলে— খয়েরি! এইভাবেই খয়েরির সঙ্গে কলাবতীর প্রথম আলাপ। পরদিন স্কুলে টিফিন খাওয়ার সময় কলাবতীর মনে ভেসে উঠেছিল খয়েরির ক্ষুধার্ত চাহনি। আর খাবার পেয়ে কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে থাকার ছবিটা। সে পাউরুটির দুটো স্লাইস না খেয়ে রেখে দেয় যদি আবার দেখা হয় রাস্তায় তা হলে খেতে দেবে।
কলাবতীর সাথে খয়েরির পথচলা এরপর কতদূর পর্যন্ত যায় না সেটা আমি এখনই বলবো না। কিন্তু কলাবতীর জীবনে খয়েরির ভূমিকা কিন্তু শেষমেশ চমকে দেবে আপনাদের।
🥧পাঠ প্রতিক্রিয়া 🥧
"কলাবতী ও খয়েরি" মতি নন্দীর লেখা আরেকটি দারুন কিশোর উপন্যাস। আমি তো এটাকেও বলবো একদম পিওর কিশোর উপযোগী বই। কলাবতীকে নিয়ে মতি নন্দী অনেকগুলো বই লিখেছেন বলে এটাকে সিরিজ বলা যায়। তবে কোনো বইয়ের সাথে কোনোটার খুব বেশি সামঞ্জস্য নেই প্রধান চরিত্রগুলো ছাড়া। মতি নন্দীর লেখা সবসময়ই ভালো লাগে কারণ কিশোর উপন্যাসে উনি সব বইয়ে চেষ্টা করেছেন ভাষা বেশ সহজ ও প্রাঞ্জল রাখতে।
কলাবতী সিরিজের এই গল্পে কালুর সঙ্গী খয়েরি। জানেন তো কুকুর কিন্তু খুব প্রভুভক্ত প্রাণী। আপনি আদর করে একটু শুকনো রুটিও বাড়িয়ে দেন দেখবেন আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতায় ওদের মাথা নুইয়ে আসবে। আপনার কথা মনে রাখবে। কিন্তু আমরা তো সবাই স্বভাবে পশুর থেকেও খারাপ। কুকুর বেড়ালের গায়ে গরম পানি ফেলি, ভাতের মাড় ফেলি, পিটিয়ে পা ভেঙে ফেলি। কলাবতী কী করেছিল জানেন আদর করে খয়েরিকে খেতে দিয়েছিল। আর এই ছোট্ট কাজের জন্য ওই কুকুরটি সবসময় কলাবতীকে আগলে রেখেছে।
এই বইটার বর্ণনাগুলো এত কোমল লেগেছে। পড়তে খুব ভালো লাগছিল। মন খারাপ ছিল আমার, এই বই পড়তে পড়তে মন ভালো হয়ে গেল। মতি নন্দীর বই মানেই খেলাধুলা আসবেই। এই বইয়ে কলাবতী উইকেটকিপার হবার ইচ্ছা নিয়ে কঠোরভাবে ক্রিকেট শেখা শুরু করে। বাড়িতে রীতিমতো পিচ বানিয়ে প্রাক্টিস করে। এবং লেখক কলাবতীর দাদুর মাধ্যমে ক্রিকেটের বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন আরো খানিকটা। দাদুর মুখে কলাবতী বিভিন্ন ম্যাচের গল্প শুনেছে। জেনেছে অনেক বিষয়।
কলাবতী সিরিজের বাকি বইগুলোও পড়ে ফেলার ইচ্ছা আছে। আমি প্রচুর কিশোর উপন্যাস পড়ি বলে আমার তো দারুন লেগেছে। কলাবতীর সাথে খয়েরিকে ভালো লাগলো। আমাদের বাসার সামনে একটা কুকুর এসে বসে থাকে। আমরা খাবার দেই। এখন ও আমাদের দেখলেই চিনতে পারে। আমি ডাকলে আমার দিকে তাকিয়ে যেন সাড়া দেয়। এই বইয়ের খয়েরিও একটা রাস্তার নেড়ি কুকুর ছিল। কিন্তু দেখুন কলাবতীর ভালোবাসায় সে পরিবারের একজন হয়ে রয়ে যায় ওদের বাড়িতে। আমরা কী প্রাণীদের জন্য এইটুকু ভালোবাসা দেখাতে পারি না যে আঘাত নয় পারলে ওই ক্ষুধার্ত মুখগুলোর সামনে কিছু খাবার রেখে দেই।
🥧বইয়ের নাম: "কলাবতী ও খয়েরি"
🥧লেখক: মতি নন্দী