থিক অ্যাজ থিভসঃ অ্যাটোলিয়াতে মিডিয়ার সাবেক রাজদূত নাহুসেরেশের একান্ত ব্যক্তিগত সচিব কামেটের জীবনে শুধু একটাই উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে তা হলো, পুরো মিড সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়া। কিন্তু তার এই ইচ্ছা যে পূরণ হবার নয়। কারণ তার পায়ে যে আছে দাসত্বের শৃঙ্খল। হঠাৎই একদিন কামেটের সামনে এসে যায় অভূতপূর্ব সুযোগ। এক রহস্যময় বিদেশী তাকে দাসত্ব থেকে পালানোর জন্য প্রস্তাব দেয় এক ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের। স্বয়ং অ্যাটোলিয়ার রাজার কাছ থেকে নাকি এসেছে এই প্রস্তাব। একি শুধুই তার মহানুভবতার প্রকাশ? নাকি আরও কোন উদ্দেশ্য আছে এর পেছনে?
রিটার্ন অভ দ্য থিফঃ ক্ষুদ্রত্তর উপদ্বীপের রাজ্যগুলির মধ্যকার যুদ্ধবিরতির চুক্তি রক্ষা করতে ইউজেনিডিসকে এবার গ্রহন করতে হয়েছে ত্রিরাষ্ট্রিয় সম্রাটের পদ। ওদিকে বিশ্বাসঘাতক ব্যারন এরনডাইটস আঁটছে নতুন ষড়যন্ত্রের জাল। এমন সময় আকস্মিক এক দৈববানীতে বেজে উঠলো রাজতস্ককরের মৃত্যঘন্টা। ইতিমধ্যে খবর এসেছে যে, পুরো উপদ্বীপকে নিজেদের অধীনে আনবার জন্য নতুনভাবে আঘাত হানবার প্রস্তুতি নিচ্ছে শক্তিশালী মিডরা। অবশেষে এই যুদ্ধে কার শিরে উঠতে চলেছে বিজয়ীর মুকুট?
Megan Whalen Turner is the author of short stories and novels for children, teenagers and adults. She has won the LA Times Book Award for Young Adult LIterature, a Boston Globe/ Horn Book Honor and a Newbery Honor. She won the Mythopoeic Award and was shortlisted twice for the Andre Norton Award.
মিথ, ইতিহাস, ভূ-রাজনীতি, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, প্রেম ভালোবাসা, প্রতিশোধ প্রতিহিংসা, যুদ্ধ এবং রক্তক্ষয়ের এক অমর আখ্যান ❝দ্য কুইন্স থিফ❞ সিরিজ। সিরিজের ছয়টি বইয়ের মধ্যে প্রথম বইটি ইয়াং অ্যাডাল্ট ঘরানার হলেও বাকি বইগুলো পলিটিক্যাল ফ্যান্টাসি ঘরানার। সিরিজের ছয়টি বই নিয়ে প্রায় ২০০০ পৃষ্ঠার এই বিশাল যাত্রা। অসংখ্য চরিত্র নিয়ে তার আগমন ও প্রস্থান৷ চরিত্রগুলো যতই ঋণাত্মক হোক না কেন, তাদের চিরকালের মতো প্রস্থান হৃদয়ে ছাপ রেখে যায়। এখানেই এই বড়ো মহাকাব্যিক সিরিজের মুন্সিয়ানা।
কাহিনি সূত্রঃ মধ্যম মহাসাগরীয় ক্ষুদ্রতর উপদ্বীপ অঞ্চলের ত্রি রাষ্ট্র অ্যাটোলিয়া, ইডিস ও সুনিস। এছাড়া রয়েছে কতগুলো স্বায়ত্তশাসিত দেশ নিয়ে জাতিপুঞ্জ রাষ্ট্র। এই ছোট দেশগুলোকে গ্রাস করার জন্য রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী দেশ মিডিয়া। ইডিসের রাজতস্কর ইউজেনিডিসকে যখন দেশ ছাড়তে হলো ঘাড়ের ওপর ষড়যন্ত্রের খড়্গ নিয়ে। প্রথম বইয়ে হ্যামায়থিসের রত্ন চুরির পরে জেন দ্বিতীয় বইয়ে অন্য মানুষে রূপ নেয়। প্রথম বইয়ে তার চিরপরিচিত হাস্যোজ্জ্বল মুখ, সরস বক্রোক্তি, তার খেয়ালি পনা মুখ যেন পাথরের মূর্তির রূপ নেয়। নিজের নামের সুবিচার করে যেন বারেবারে তার মাঝে ধরা দেয় স্বয়ং তস্কর দেবতা ইউজেনিডিস। অ্যাটোলিয়ার রানী ইউজেনিডিস বা জেনকে প্রাসাদে অবৈধ অনুপ্রবেশের জন্য এমন এক শাস্তি দেয় যা জেনের পুরো জীবনকে বদলে দেয়। আর শেষ বইয়ে জেন নিজেই স্বীকার করেছে এই শাস্তিটুকু না পেলে আজকের জেনকে সে কখনোই ফিরে পেতো না। রানীর দেওয়া শাস্তি মাথা পেতে নিয়ে সে নিজেই এমন এক প্রতিশোধ নেয় রানীর ওপর, যা রানী স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি৷ কী ছিল সেই প্রতিশোধ? রানীকে বিয়ের প্রস্তাব, তাও আবার মাঝ সমুদ্রে ডিঙি নৌকায় রানীকে ডুবিয়ে মারার হুমকি দিয়ে। অ্যাটোলিয়া আর জেনের সেখানেই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়ে যায়। সে চুক্তিতে রানী সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন নিজের জনগনের অধিকার পূর্ণমাত্রায় রক্ষায়। কে এই রানী অ্যাটোলিয়া? ছায়া কুমারী আইরিন থেকে যে হয়ে উঠেছিল নিষ্ঠুরতার প্রতিশব্দ। নিজেকে একটা খোলসের মধ্যে আবদ্ধ করেছিল যাতে ব্যারনরা এই অ্যাটোলিয়া রাজ্যকে ছিন্নভিন্ন করতে না পারে। কিন্তু তার মধ্যে একজন স্নেহময়ী, প্রেম পূর্ণ এক নারীর রূপ কি বিলীন হয়ে গিয়েছিল? না, ইউজেনিডিস ছিল তার কাছে ত্রাতার মতো, অ্যাটোলিয়ার ত্রাতা৷ যে রানী এতকাল ধরে সাম্রাজ্যবাদী দেশ মিডিয়ার শত ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আগলে রেখেছিল প্রিয় স্বদেশকে, আজ জেন যেন হয়ে উঠল তার মুহুর্তের অবকাশ। তৃতীয় বইয়ে অ্যাটোলিয়াবাসী বিশেষ করে ব্যারনদের কাছে একজন ভিনদেশী রাজ তস্করের অ্যাটোলিয়ার রাজা হয়ে ওঠার গল্প। তার সংগ্রামের গল্প। নিজের দেশের জনগণকে, ব্যারনদের তো তরবারির ভয় দেখিয়ে রাজা হওয়া যায় না। কারণ প্রতি পদে পদে আছে ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো। আর এ বইয়ে জেন তার সুচতুরতায়, সাহস, রণকুশলে পারঙ্গমতা দেখিয়ে জয় করে নেয় রাজ মুকুট। তাই ব্যক্তিগতভাবে তৃতীয় বইটি সবচেয়ে প্রিয়। চতুর্থ বইয়ে সুনিসের যে লাজুক, বইপোকা যুবরাজ সোফোস, যার বাইরের জগৎ সম্পর্কে ছিল না ভালো জ্ঞান। তার পরিবারের ওপর যে অত্যাচার নির্যাতন আর নৃশংস মৃত্যু নেমে এসেছিল, সেই ঘাত প্রতিঘাত সয়ে যে নতুন মানুষ তৈরি হয়ে, সেই সোফোস ছিল ভয়ংকর এক প্রতিরূপ। যেন নিজের অল্টার ইগো ফিরে এলো নিজের সুরক্ষায়। সোফোসের সুনিসের রাজা হওয়ার যে রক্তাক্ত পথ বেছে নিয়েছিল, সেই আখ্যান নিয়েই চতুর্থ বই।
পঞ্চম বইঃ থিক অ্যাজ থিভস-
নিজের দেশে রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেও বহিঃশত্রুর আক্রমণের জন্য ক্ষণ গুনছিল অ্যাটোলিয়া রাজ্য। সাম্রাজ্যবাদী দেশ মিডিয়ার সুলতানের রাজদূত নাহুসেরেশের ক্রীতদাস ও একান্ত ব্যক্তিগত সচিব কামেটকে এক বিদেশী এসে তাকে দাসত্বের শৃঙ্খল ছেড়ে পালানোর প্রস্তাব দেয়। আর সেই প্রস্তাব আসে নাকি স্বয়ং অ্যাটোলিয়ার রাজা ইউজেনিডিসের পক্ষ থেকে! কামেট কেনই বা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল রাজকীয় দাবা খেলার গুটির চাল হিসেবে? কী আছে সামনে অ্যাটোলিয়া, মিডিয়া, না কামেটের ভাগ্যে? কামেটের বয়ানে রচিত হয় পঞ্চম বই।
ষষ্ঠ বইঃ রিটার্ন অব দ্য থিফ-
অ্যাটোলিয়ার রাজা জেনের এই শেষ গল্পে রয়েছে নিজের অ্যান্যাক্স বা ত্রি রাষ্ট্রের সম্রাট হওয়ার গল্প। আর যুদ্ধের দামামা বেজে গেছে যখন, মিডিয়া যখন আঘাত হানার জন্য এগিয়ে আসতে থাকে উপদ্বীপের দিকে, জেনের কোন চরিত্র সামনে প্রকাশিত হয়? ত্রি রাষ্ট্রের সম্রাট নাকি একজন রাজ তস্কর রূপ, নাকি স্বয়ং দেবতা ইউজেনিডিস। যুদ্ধের জয় পরাজয় হিসাবে কী পরিণতি হয়ে এই আখ্যানেরে এত এত চরিত্রের! কোনো কোনো চরিত্রের মৃত্যুতে সত্যি চোখে পানি চলে আসতে বাধ্য। এই বই রচিত হয় ফেরিসের বয়ানে, যে ছিল ইউজেনিডিসের এক ষড়যন্ত্রকারী ব্যারনের নাতি। প্রতিবন্ধী হিসেবে জন্ম নেওয়ায় নিজ পরিবার এমনকি নিজের মা পর্যন্ত ফেরিসকে দূরে ঠেলে দেয়। অথচ, সে ষড়যন্ত্রকারী পরিবারের রক্তবীজ হওয়া সত্বেও রাজা জেন তাকে গ্রহণ করে নেয় নিজের সহচর হিসেবে৷ এখানেই হয়তো সবচেয়ে আলাদা হলো জেন। আমাদের অতি প্রিয় ইউজেনিডিস। আমাদের রাজ তস্কর!
ব্যক্তিগত অনুভূতি-
এই সিরিজের আখ্যান অনুপ্রাণিত হয়েছে ইতিহাসের দ্বারা৷ অনুবাদকের বয়ানে- মিডিয়া সাম্রাজ্য যেন ইসলাম পূর্ব প্রাচীন পারস্য সভ্যতাকে ইঙ্গিত করে৷ মিডের প্রশাসনিক এবং সমাজব্যবস্থা আলেকজান্ডারের পারস্য বিজয়ের পূর্বে আক্কামেডিয়ান রাজবংশের সময়ের পারস্য সভ্যতার অনুকরণে তৈরি৷ এই প্রাচীন পারস্য গ্রাস করত সেই সময়ের অন্য ছোট দেশগুলোকে। পরবর্তীতে গ্রীক আর মেসিডোনিয়া মিলে রুখে পারস্যের এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। তেমনই যেন মিডিয়ার এই আগ্রাসন রুখে দিতে এগিয়ে যায় ক্ষুদ্রতর উপদ্বীপ ত্রি রাষ্ট্র। কিন্তু কী হয় তাদের পরিণতি? জানতে হলে দ্রুত পড়ে ফেলতে হবে এই সিরিজের শেষ বইটি। এই বইয়ে পুরাণের আখ্যান আইম্মাকুক আর ইন্নিকারের গল্প যেন গিলগামেশের কাব্য অনুরূপ। গিলগামেশ - এনকিদু আর আইম্মাকুক - ইন্নিকার, অমর বন্ধুত্বের প্রতিরূপ। পঞ্চম বইয়ে তাদের রূপক এনে কামেট আর কস্টিসের এক অপূর্ব বন্ধুত্বের গল্পই তুলে ধরেছেন। পঞ্চম বইটি একটি অভিযানের গল্প। যদিও এই অভিযানের বীজ বপন করে দিয়েছে রাজনীতি। চমক অপেক্ষা করে আছে ষষ্ঠ বইয়ে।
ষষ্ঠ বই হলো সব বইয়ের সুতো একত্রিত করার গল্প। আর তাই সবচেয়ে বেশি উপভোগও করেছি এই বইটা। লেখিকা মেগান হোয়ালেন টার্নার গল্পের যে সুতোগুলো ছেড়ে এসেছেন পূর্বের বইগুলোতে, তার পরিণতি দেখতে পেয়ে দারুণ লেগেছে। তবে, একতরফা ভাবে সিরিজ শেষ হয়নি। পাঠকদের জন্য অনেক সূত্র ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই আখ্যানের শেষে চিরচেনা "অতঃপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল" এমন সমাপ্তি নেই৷ পাঠকের মনে এক ধাক্কা দিয়ে যায়। সিরিজটির শেষে এক বিষন্নতা পেয়ে বসে৷ বড়ো কোনো সিরিজের পরে এমন অনুভূতি হয়৷ কৈশোরে পড়া হ্যারি পটারের পরে এমন কোনো সিরিজের জন্য এই অনুভূতি তৈরি হলো।
অনুবাদ প্রসঙ্গে -
পুরো সিরিজের ছয়টি বইয়ের অনুবাদক ঝিলম বিশ্বাসের জন্য এক বড়ো অভিবাদন৷ এই সিরিজের শেষ বইটির মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৬৮৭। আগের বইগুলোও ৬০০ পৃষ্ঠার ওপর। এই সুদীর্ঘ সাড়ে ছয়শ পৃষ্ঠার আখ্যানে কোথাও পড়ার গতি নষ্ট ��য়ে যায়নি, বা ধীরগতি হয়ে যায়নি। চমৎকার শব্দচয়ন, বিশেষ করে মিডিয়ান আর উপদ্বীপের দেশগুলোর মধ্যে শব্দের ব্যবহারে নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন। বারোশো শতাব্দীর প্রাচীন বাইজেন্টাইন আমল যেমন প্রদর্শন করে অ্যাটোলিয়ার সময়কে, তেমনি প্রাচীন পারস্যকে ইঙ্গিত দেয় মিডিয়ার। প্রতিটি চরিত্রের ভিন্ন ভিন্ন সত্তা হিসেবে তাদের কথোপকথনেও ভিন্নতা আনতে সক্ষম হয়েছেন অনুবাদক। লেখিকা মেগান হোয়ালেন টার্নারের অসম্ভব সুন্দর কাব্যিক বর্ণনা, হাস্যরস, চরিত্রদের মধ্যকার টানাপোড়েন এসব নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অনুবাদক। বইয়ে কোথাও ইংরেজি শব্দের ব্যবহার করেননি অনুবাদক। বানান ভুল নেই। মুদ্রণপ্রমাদ নেই বললেই চলে৷ এই সিরিজকে লেখক গড়ার কারিগর বলা হয়, তেমনি এই ছয়টা অনুবাদ পড়লেও নতুন লেখক, অনুবাদকদের জন্য পথ নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে৷ উল্লেখ্য, অনুবাদক ঝিলম বিশ্বাস এই সিরিজের অনুবাদের জন্য চলন্তিকা সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩ অর্জন করেছেন।
এই সিরিজ সম্পাদনা করেছেন স্বনামধন্য লেখক আশরাফুল সুমন। তাকে অভিনন্দন এতো সুবিশাল সিরিজের অসাধারণ সম্পাদনার জন্য।
বেনজিন প্রকাশন কে নিরন্তর শুভকামনা তাদের টপনচ প্রোডাকশনের জন্য। সিরিজের অসাধারণ প্রচ্ছদ করেছেন জুলিয়ান ভাই। অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হওয়া এই সিরিজের প্রচ্ছদ দেখেছি, তাই তুলনা করে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রচ্ছদ জুলিয়ান ভাইয়ের করা সবচেয়ে ভালো।
বই পরিচিতি-
বইয়ের নাম- থিক অ্যাজ থিভস, রিটার্ন অব দ্য থিফ লেখক- মেগান হোয়ালেন টার্নার অনুবাদক- ঝিলম বিশ্বাস সম্পাদনা - আশরাফুল সুমন প্রচ্ছদ - লর্ড জুলিয়ান ঘরানা- পলিটিক্যাল ফ্যান্টাসি পৃষ্ঠা সংখ্যা ৬৮৭ মুদ্রিত মূল্য ১০০০/
আজ "কুইন'স থিফ" ট্রিলজি পড়ে শেষ করলাম, এখন প্রচন্ড শূন্যতা অনুভব হচ্ছে, এবং মনে হচ্ছে প্রচুর গল্প অব্যক্ত রয়ে গেছে। তাই নিজেকে স্বান্তনা দিতে পারছি না।🤍🖤🌻