Abanindranath Tagore (bn: অবণীন্দ্রনাথ ঠাকুর), was the principal artist of the Bengal school and the first major exponent of swadeshi values in Indian art. He was also a noted writer. He was popularly known as 'Aban Thakur'. Abanindranath Tagore was born in Jorasanko, Calcutta, to Gunendranath Tagore. His grandfather was Girindranath Tagore, the second son of Prince Dwarkanath Tagore. He is a member of the distinguished Tagore family, and a nephew of the poet Rabindranath Tagore. His grandfather and his elder brother Gaganendranath Tagore were also artists.
'আপন কথা' দিয়ে মনের ভেতর চিরতরে জায়গা করে নিয়েছিলেন 'ছবি লিখিয়ে' অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যদিও তখনও পড়া বাকি রয়ে গিয়েছিল তাঁর আরও অনেকগুলি রচনা। তখনও ব্যক্তি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কেও অনেক কিছু পড়া বাকি। তাঁর 'নালক'-এ যেখানে পুরো ক্যানভাস চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, 'আপন কথা'য় সেখানে বাকি অংশ ঘোলা রেখে, শিল্পী যেন খানিক অংশের দিকে আমাদের চোখ স্থির করে দেন। আর তাই কি হওয়ার কথা না? ছোটবেলার স্মৃতি কি আমাদের ল্যান্ডস্কেপের মত মনে থাকে সব ডিটেইলস সমেত, ফ্রেম বাই ফ্রেম? অন্তত আমার তো তেমন করে মনে নেই। সেই ক্যানভাসগুলির বেশির ভাগটাই ঘোলাটে, অস্পষ্ট। কিন্তু স্পষ্ট অংশটুকু দারুণ উজ্জ্বল। খানিকটা যেন চোঙার মধ্যে দিয়ে দেখা। আবার শিশুদের মতো চোখ দিয়ে শৈশব দেখানোও কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়।
এক তারা কমায়ে দিছি, কারণ যাই বলবো তাতেই ত বায়াস রয়ে যাবে, ভারসাম্যের দরকার। তা, বায়াস আর কমলো কই, অবন ঠাকুরের লেখা নিয়ে এক ধরনের উগ্র মুগ্ধতা কাজ করে নিজের ভেতর, তিনি যে বাংলাটা লেখেন, যেভাবে লেখেন, তা নিয়ে। আর কে বা বাংলায় ঝাড়বাতি ঝোলাবার মস্ত হুকেরে তুলনা করেছে হেটমুণ্ড কিম্বাচক চিহ্নের সাথে, আর কে-ই ছোটো একটা গণ্ডি থেকে পুরা দালানে বের হওয়ারে এভাবে বর্ণনা দেবে। খুব বেশি লিখেন নাই, দুঃখ, লিখেছেন কেবল নির্দিষ্ট কিছু খাপে দাঁড়ায়েই, এও আরেক দুঃখ, হয়ত সময়ের অভাব, কত পরিচয় এই লোকের, কিন্তু এত পরিচয় দিয়ে কী হবে, আর দুঃখ করেই বা কী হবে, পুরনো ঝুলের মত হাওয়ায় উড়ে যাওয়ার মত সব বিষয়াশয়রে যেই বলিষ্ঠতায় দরজার চৌকাঠে গেরো দিয়ে গেছেন অবনীন্দ্রনাথ।
বাংলা ভাষার একপ্রান্তে যদি দৃষ্টান্ত হয় কমলকুমার, তাহলে আরেক মাথায় অবন-ঠাকুররে মাথায় তুলে রাখতে হবে আমার।
শৈশব স্মৃতি মানুষের জীবনের সবচে'সুন্দরতম অংশ। যেখানে 'মলিনতা' নামের শব্দটির প্রবেশাধিকার মেলে না বললেই চলে। তবে সবার ভাগ্যে তো আর অনিন্দ্য সুন্দর শৈশব জুটে না। কারো কারো শৈশব চুরি হয়ে যায় নানান দুর্বিপাকে। আমরা যারা মোটামুটি ভাগ্যবান তাদের সবার বুকের ভেতরে মুখ গুঁজে মুখ টিপে আজীবন হেসে যায় আমাদের নানান রঙের শৈশবের দিনগুলো। প্রজাপ্রতির ডানায় ভর দিয়ে উড়ে যাওয়া সে শৈশবের রঙ কখনোই মলিন হয় না যেন! নিজেদের শৈশব প্রিয় বলেই হয়ত অন্যের শৈশবস্মৃতির ব্যাপারেও আমাদের বেশ আগ্রহ থাকে। আর সেটি যদি হয় জাঁকালো কোন মানুষের তবে তো হয়েই গেল! পড়ে পাওয়া চৌদ্দানা পাওয়ার আনন্দ নিয়ে বসে যাই শুনতে সে গল্প। 'ক্ষীরের পুতুল' খ্যাত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আপন কথা' সেভাবে আগ্রহ নিয়ে বসিয়ে দিলো বইটি পড়তে। চমৎকার সহজ সরল ভাষায় বলে গেছেন বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর জমিদারের বংশধর এই মানুষটি তাঁর ছেলেবেলার গল্প। এ্যাকুরিয়ামে রঙিনমাছ দেখে তাতে লাল রঙ ঘুলে দেবার ঘটনায় হুট করে কী আমাদের শৈশবের কোন দুষ্টুমির একটা ঝলক এসে হাজির হয় না চোখের সামনে? ছোট্ট মনটা কিভাবে আস্তে ধীরে ভাবতে শেখে, জানবার পরিধি কিভাবে গড়িয়ে গড়িয়ে ঋদ্ধ হয় এসবের খুঁটিনাটি চমৎকার ভঙ্গিতে 'আপন কথা'য় ওঠে এসেছে।
তবে তাঁরা জমিদার বলেই হয়ত বা চাকর, দাসী এমন সব শব্দগুলো অবলীলায় ব্যবহার করে গেছেন যা খুব সাধারণ পরিবারে মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তেমন সহজপাচ্য হয়নি কেন জানিনা! স্ববিরোধীতা কমবেশি আমাদের সবার মধ্যেই আছে। কিন্তু যাঁরা সমাজের প্রতিনিধিত্বের সারিতে পড়েন তাঁদের কাছ থেকে তেমন আশা করতে চাই না আমরা। এও হয়ত মানুষের অদ্ভূত মানসিকতা। তাই তিনি যখন তাঁর শৈশবের পদ্মদাসীর বর্ণনার সময়ে 'কালো' শব্দটি বার কয়েক উচ্চারণ করেন ভেতরের আমিটা ফস্ করে বলে ওঠে আমাদের অবনঠাকুর বর্ণবৈষম্যে বিশ্বাসী ছিলেন! ঠাকুর বাড়ির যে মানুষটি বলে গেছেন 'মানুষের উপর থেকে বিশ্বাস হারানো পাপ' মানুষ'ই সবের কেন্দ্র এই ভাবনাটাই তো তাতে প্রাধান্য পেয়েছে, ধর্মটা নয় কোনভাবেই; সেই তাঁদের পরিবারের ভেতরে যখন দেখি ছ্যুৎমার্গের চূড়ান্ত তখনই মনটা কেমন করে ওঠে! আমার একান্ত নিজস্ব ভাবনায় ভড়কে গিয়ে পাঠক যদি 'আপন কথা' থেকে নিজেকে বঞ্চিত করেন তবে সেটা একদমই ঠিক হবে না। বইটি পড়তে গিয়ে সময় যে কখন পাশ ফিরছে টেরটিও পাওয়া যায় না। বই পড়বার আনন্দে যারা ভাসতে চান তাদের জন্য এটি একটি আনন্দপাঠ হবে সন্দেহ নাই।
অবন ঠাকুরের ছেলেবেলার, কচি শৈশবের আলতো-নরোম-ভাষায় আঁকা স্মৃতিপট। পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিল এই আত্মকথা কোন প্রুশিয়ান প্রিন্স কিংবা য়ুরোপের অভিজাত পরিবারের সন্তানের হতে পারত খুব সহজেই, এখানে ওখানে সামান্য পরিবর্তন আনার অপেক্ষা শুধু। দাসী চাকর মালি দারোয়ান মিস্ত্রী অধঃস্তন পরিবেষ্টিত এক উপগ্রহ জীবন, যেখানে শিশুর সারল্যমাখা দৃষ্টিতে অবন তাকিয়েছেন চারিপাশে, যা দেখেছেন লিখে গেছেন।
পড়তে পড়তে মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল ’লোনলি প্লানেট: ট্রাভেলারস গাইড টু দ্য ইন্টেরিওরস অফ ঠাকুরবাড়ি’-র নামের বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছি। বিরক্তি আসেনি, আবার মোহগ্রস্তও হইনি। পাল্লা সমানে সমান। ‘যাঃ শালা, ব্যাপটাইজ হয়ে গেলি!’ শুনে হাসি পেয়েছে।
বইয়ের শেষে অবন যে ভয়ের কথা বলেছেন, এই স্মৃতিমাখা ঘরবাড়ি কোনো মাড়োয়ারি প্রফিটিয়ারের হাতে চলে যাবার, যে শুধু বস্তু দেখবে, বস্তুবিজড়িত গল্পগুলো জানবে না; আমরা তার পরবর্তী জীবনকাহিনি থেকে জানি— বার্ধক্যে ভয়টা সত্যি হয়েছিল। মন খারাপ করার মতন একটা ব্যাপার।
এই আর কি। চলে। এক তারা বাড়তি দিলাম সত্যজিতের প্রচ্ছদগুণে। জানি, নট ফেয়ার, কিন্তু কি হইছে ত্তে!
দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের ৫ নং এবং ৬ নং বাড়ির দুটি মিলেই হয়েছিল কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি। প্রথমটি ছিল বৈঠকখানার দালান আর পরেরটি অন্দরবাড়ি। পরবর্তীতে বৈঠকখানা বাড়িটিকে বসবাসযোগ্য করে সংস্কার করা দুই দালান মিলে হয় এক বাড়ি।
৬ নং বাড়িটিতেই বেড়ে উঠেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাড়িটি এখনো আছে। শুধু ধুলো হয়ে উড়ে গেছে ৫ নং বাড়িটি। এই ৫ নং বাড়িতেই বড় হয়েছিলেন বাংলার চিত্রশিল্প জাগরণের অত্যতম প্রধান পুরুষ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্র।
অবন ঠাকুর বাড়ীটির অনেক উত্থান পতন দেখেছিলেন বছরের পর বছর ধরে। কিন্তু এই বাড়িটির মৃত্যু ওনাকে খুব তীব্রভাবে আহত করেছিল। তাই বাড়িটি ভেঙে ফেলার পর অবশেষে সরকার সম্পত্তি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে আর ফিরে আসেননি তিনি।
অবনীন্দ্রনাথেরা ছিলেন তিন ভাই। ভাইয়ের অতিরিক্ত বিলাসী জীবনের জন্য জমে গিয়েছিল প্রচুর ধার। বাড়ি, সংলগ্ন বাগান বিক্র��� না করে কিছুতেই সম্ভব নয় সেই ধার পরিশোধ করা। ততদিনে রবিঠাকুরও আর নেই। এক মারোয়াড়ীর কাছে বিক্রি হয়ে যায় দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের ৫ নং ব��ড়ী, সাজানো বাগান। কিনেই মারোয়াড়ী ভেঙে ফেলেন বাড়িটা। পুরো একটা সময় যেন দালানের ধুলোর সাথে উড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিকথামূলক বই আপনকথা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৬ সালে। সেই সময় মারোয়াড়ীকে বাড়ি বিক্রির কথা অনেকটাই চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোচ্ছিল। সেই দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেয়েছি বইটি একেবারে শেষ পাতায়। তার আগ পর্যন্ত শুধু করে বাড়িটির স্মৃতিচারণ। সেই জন্মের পর চোখ খোলা থেকে বুদ্ধি জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত যা স্মৃতিঘরে কুড়িয়ে পেয়েছে জমা দিয়েছেন এখানে।
সেই সময়ের দেবেন ঠাকুর, নিজের বাবামশায়, মায়ের ঘর, নিজের চাকর রামলাল, পুরোহিত, ফার্সী শেখার মৌলবী, ডাক্তার,
নিলামের ম্যানেজার, মালী, দাসী, ভিস্তিওয়ালা, সহিস, ঝাড়ুদার কাউকে বাদ দেননি লেখক। পুরো বাড়িটিকে লিখে নয়, ছেনি দিয়ে খোদাই করে দিয়েছেন ছোট্ট বইটাতে।
লেখক যদিও বলেছেন উনি বইটি লিখেছেন শিশুদের জন্য। উনি এই লেখা তুলেও দিতে চেয়েছেন শিশুদের হাতেই কিন্তু আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে এই লেখা শিশুদের জন্য নয়, লেখকের নিজের জন্যেও নয়। এই লেখা ৫নং বাড়িটির জন্য।
লেখনীর ধারা একদম সহজ নয়। অবন ঠাকুরে অন্য লেখায় প্রতি লাইনে লাইনে গল্প দাঁড়ালেও, আপন কথা বইটিতে দাঁড়িয়েছে প্রতি শব্দে শব্দে। বইটি পড়তে গেলে প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ মনোযোগ। তবে একবার এগিয়ে যেতে পারলে চিন্তা জগতে ইল্যুশন সৃষ্টি করে। আমি প্রথম তিন অধ্যায় পড়ে অনুভব করলাম। অবন ঠাকুর মত চেষ্টা করলাম আমার জন্মের পর এখনো স্মৃতিতে কি জমা আছে একটু মনে করে দেখে। কতটা দূর যেতে পারি।
কবি প্রকাশনীর এই বইটি শেষে ৫ নং বাড়ির, বাগান আর লেখকের ১৬ খানা ছবি সংযুক্তি করা হয়েছে। আর এগুলো দেখে বইটার বাড়তি দামের দুঃখ ঘুচে গেছে একাবারে।
"আমি যখন এসেছি - তখন স্বপ্নের আমল, আরব্য উপন্যাসের যুগ বাঙলা দেশ থেকেই কেটে গেছে। বঙ্কিমচন্দ্রের যুগ তখন আরম্ভ।" উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ঠাকুরবাড়ির অন্দরের নানান ব্যক্তিগত স্মৃতিকে অবন ঠাকুর তাঁর শৈশবের চোখ এবং বুড়োবয়সের মন দিয়ে তুলে ধরেছেন এই ছোট্ট বইটিতে। ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনীর সঙ্গে এই বইয়ের বেশ কিছু ঘটনার সাদৃশ্য থাকলেও অবন ঠাকুরের 'আপন কথা' সত্যিই তাঁর একান্ত আপন। সেই ব্যক্তিগত অনুভবের ছোঁয়া বইটিকে স্বতন্ত্র করেছে। ছেলেবেলার আবছা স্মৃতির ঝাঁপির ভেতর লুকিয়ে থাকা বিস্ময়ের জগৎ এত সুন্দর করে লেখক নির্মাণ করেছেন, যে পড়তে পড়তে মনের ভেতরে মায়ার আশ্চর্য পরশ লাগে। বিশেষত 'পদ্মদাসী', 'সাইক্লোন', 'এ বাড়ি ও বাড়ি' শীর্ষক নাতিদীর্ঘ অধ্যায়গুলির কথা মনে থাকবে বহুদিন। অবন ঠাকুর কেবলমাত্র সাদা পাতায় কালো অক্ষরে নিজের শৈশবের গল্প শোনাতে চাননি, তিনি তাঁর শিশুমনটিকে খুঁজেছেন রঙে, রেখায়, স্বপ্নময় চিত্রকল্পে। আমরাই বোধহয় শেষ প্রজন্ম যারা স্মার্টফোন থেকে বহুদূরে তাদের শৈশব কাটাতে পেরেছি। তাই আমাদের স্মৃতির সঙ্গে অবন ঠাকুরের ছবি মাঝে মাঝে আশ্চর্যরকমভাবে মিলে যায়। রাত্রে বালিশে এসে পড়া আলোর ফোঁটাকে ধরতে চাওয়া, জ্বর আসার আগে চোখের সামনে ভয়ঙ্কর ছবি ভেসে ওঠা কিংবা ফলের বীজ পেটে গেলে গাছ গজাবার ভয় - পড়তে পড়তে মনে হয় এ তো আমারই 'আপন কথা'! মাঝে মাঝে অবশ্য ঠাকুরবাড়ির অন্দরের আভিজাত্য এবং বৈভবের বর্ণনা নীরস লেগেছে। কিন্তু মূর্তিমান আঁটির জন্যে তো আর পাকা আমের সোয়াদকে অস্বীকার করা যায় না! বরং সেই স্বাদের কাছে আবার ফিরতে ইচ্ছে করে।
"কড়ে আঙুল বলে খাবো; আংটির আঙুল বলে কোথায় পাবো; মাঝের আঙুল বলে ধার করোগে; আর একটা আঙুল, তার নাম যে তর্জনী, তা জানিনে, কিন্তু সে বলে জানি, শুনবো কিসে; বুড়ো আঙুল বলে লবডংকা। কি সেটা, দেখতে লঙ্কার মতো আর খেতে ঝাল না মিষ্টি তাই জানিনে, কিন্তু খুব চেঁচিয়ে কথাটা বলে মজা পাই।"
২০১৯ সালে ২৪টি বই পড়বো বলে রিটন খান ও বইয়ের হাট এর কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আপন কথা, মিষ্টি কথায় বিষ্টিতে নয় ,তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম---- এ তিনটি বই এর বাইরে। মেয়ের অনুরোধে এই শিশুতোষ বই পড়া।পড়া শুরু করার আগে মনোযোগ ঠিক করা। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "আপন কথা" পড়তে খুব মজা পেয়েছি। শিশুমনের প্রাণের কথা ---- টুকটাক, ছোট ছোট বিষয় শিশু মনে কতো আলোড়ন তোলে তা পড়তে পড়তে ছোটবেলায় ফিরে যাওয়া।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'আপন কথা' বইটিতে তাঁর বাল্যস্মৃতি লিখেছেন, যার মধ্যে দিয়ে ঠাকুর পরিবারের এবং জোড়াসাঁকোর রঙ্গিন লেখ্যচিত্র গড়ে উঠেছে। তাঁর লেখা এতই জীবন্ত যে পাঠক সেই সময়ের ঘটনা প্রবাহকে লেখনীর মধ্যে দিয়ে অনুভব করতে পারে। বইটির গুরুত্ব অনেক বেশি, কিন্তু তার পাশাপাশি এটাকে অনেক গুলি ছোট গল্পের সংকলন ও বলা যেতে পারে।যা অত্যন্ত সুখপাঠ্য।
প্রথমেই বলি, প্রচ্ছদে ইংরেজি দেখালেও বইটি কিন্তু বাঙলায়। ঠাকুরবাড়ির ছোট্টশিশুর স্মৃতিসমগ্র পরিণত বয়সের লেখনীতে ফুটে উঠেছে। দেখার ভঙ্গিমা থেকে শুরু করে বলার কৌশল- সবটুকুতেই সেই অনিমেষ ভালোলাগা।
একটু যেন কঠিন করে লেখা। ছোটদের জন্য লেখা, ভাষাটা আরেকটু সহজ সরল হলে ভালো হতো। সে আমলের একটি শৈশবের স্মৃতিকথা। সে স্মৃতি কথার সাথে অাষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে অাছে জোড়াসাকোর ঠাকুরবাড়ীর তিনতলা বাড়িটা। শৈশব স্মৃতি বলেই অনেক ধোয়াশা, অনেক ভুলে যাওয়া কথা আছে। রবি বাবুর জীবনস্মৃতি তেও পড়েছি ঠাকুর বাড়ীর ট্রাডিশান ছিলো ছেলেদের একটা বয়েস পর্যন্ত চাকর-দাসীদের তত্ত্বাবধানে রাখা, তারপর ধীরে ধীরে পড়াশোনার জগতে ঢোকা। বাবা- মায়ের ভূমিকা সেখানে অনেকটা গৌণ। তাই বই শুরু হয় মা বা বাবা এমনকি দাদু দিদার কথা দিয়ে নয় পদ্ম দাসীর কথা দিয়ে। সেকালের একটি পুরোনো বাড়ি, একটি শিশু, তার প্রায় নিঃসঙ্গ শৈশব, শৈশব থেকে তার কৈশোরে উত্তরন এই হচ্ছে আপন কথা। দাদামশাইটির কথা যে বলা হয়েছে তিনি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বাকিরা কে কারা চিনতে পারলাম না। কৈশোর আর যৌবনের আত্মস্মৃতি পড়তে পারলে বোধহয় আরো ভালো লাগতো, আরও বর্ণিল, ঘটনাবহুল হতো নিশ্চয়ই। এই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কঠিন করে বলার কায়দার জন��য এক তারা কম দিলাম।
যে বই বড় বয়সে সুখপাঠ্যতা হারায় তা বোধহয় ঠিক শিশুতোষ নয় — এই আপ্তবাক্য প্রথমেই মনে পড়লো এই অনাবিল সুন্দর বইটি নতুনকরে পড়তে পেরে। একজন সহজসরল খেয়ালী বৃদ্ধ যিনি মোটেই ধরাবাঁধা ঢঙে ও অবিচল পেশাদারীত্বে স্মৃতিকথা লিখতে বসেননি, বসেছেন কথার কম্পোজিশনে ছবি বুনতে, দৃশ্য আঁকতে, তাঁর কাছেই তো আবদার করা যায় 'ওপুন চিসুম' অর্থাৎ 'চশমা খোলো, গল্প বলো।' একেক বাহারের একেক ছবির সমাহার, স্মৃতির দেরাজ থেকে যত্নে তুলে নিয়ে সাজিয়ে দেয়া অক্ষরের রেকাবিতে।