ঠিক গতানুগতিক নয়। হরর বা অতিপ্রাকৃত ক্যাটাগরিতেও পুরোপুরি ফেলা যাচ্ছে না। বাস্তব, অবাস্তব, পরাবাস্তব এই শব্দগুলোও ছোটগল্পের আলোচনা-সমালোচনায় ব্যবহার হতে হতে ক্লিশে প্রায়। কোনো ক্যাটাগরিতে না ফেলেও, মুরাদুল ইসলামের লেখার যে স্বতন্ত্রতা, তাতে বাংলা ছোটগল্প অঞ্চলে এই গল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
৩.৫/৫ "পলায়নপর" পড়ার হতাশা অনেকটাই কাটিয়ে উঠলাম এ গল্পগ্রন্থ পড়ে। অতিপ্রাকৃত বা পরাবাস্তব উপাদানের পাশাপাশি গল্পের দার্শনিক জিজ্ঞাসা, অনির্দেশ্য যাত্রা বা নিরীক্ষাপ্রবণতা বেশ উপভোগ্য। সবচেয়ে ভালো লেগেছে - মালেক আব্দুর রহমান, কয়েকটি খরগোশ আর চক্রাকার প্রায়শ্চিত্ত।
(বইয়ের নাম নিয়ে যাদের কৌতূহল আছে তাদের জন্য - যে পীর সাহেব খুবই কম কথা বলেন বা কথা বলেনই না তাকে "নিমাত্রা পীরছাব" বলে ডাকা হয়।)
গল্পকারেরা অনেক প্রকারের হয়ে থাকেন। কেউ গদ্যকে বেশি প্রাধান্য দেন, কেউ কাহিনিকে। আবার কেউ আছেন এমন যারা উভয় বিষয়ের প্রতি সমান নজর রাখতে চেষ্টা চালান।
মুরাদুল ইসলামকে বলা যায় কাহিনির প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়া গল্প লেখক। তার গদ্য নিয়ে বেশি কাজ করতে দেখা যায় না। ফেসবুকে তার লেখা আর গল্পের ভাষা পড়তে গেলে মিল পাওয়া যায়—আলাদা করে মলাটে লেখকের নাম না থাকলেও বোঝা যাবে যে একই ব্যক্তির লেখা।
মুরাদুল ইসলামের বই আগে পড়েছি উপন্যাস। ওয়েবসাইটে সম্ভবত একটি গল্পও পড়েছিলাম। তবে, গল্পগ্রন্থ এবারে প্রথম। বলতেই হবে যে আশাহত হইনি। পাঁচটি গল্পের একেকটি একেকরকম। আলাদা আলাদা। কাহিনিগত মিল পাওয়া যায় না। তবে, দুইটা জিনিস সবক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যাবে। এক, গল্পগুলোকে পুরোপুরি রহস্যময় না বলা গেলেও ঐ গোত্রীয় বলা চলে। দুই, লেখক পুরো বিষয় স্পষ্ট করে দিচ্ছেন না। অনেকটা আমাদের জীবনের মতো।
জীবন আমাদের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় না। আমরা সব বুঝতে পারি না, কিন্তু, বোঝার চেষ্টা চালিয়ে যাই। গল্পগুলোও লেখক আমাদের কাছে এভাবেই হাজির করেন। পড়া শেষ করে পুরো জীবন জলের মতো হবে না, লেখকও ব্যাখ্যা দিবেন না। এই জিনিসটা আগ্রহ ধরে রাখে তাই পাঠ শেষ হয়ে গেলেও।
এই অস্পষ্টতার মধ্যে সবচেয়ে ভালো লেগেছে মালেক আব্দুর রহমান। কাহিনি যেমন আগ্রহজাগানিয়া তেমনি লেখক যেমন জীবনসংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে ফেসবুকে, নিউজলেটারে লেখালেখি করেন তাদের অনেক কিছুই এখানে চোখে দেখা যায়।
দুইটা গল্প সম্ভবত আগেই পড়ছি অনলাইনে। এরপর বাকি যা থাকা এর মধ্যে চক্রাকার প্রায়শ্চিত্ত প্রায় বলতে গেলে কিছুই বুঝি নাই। ঘটনার বর্ণনা আছে কিন্তু যেন গল্প নেই। শেষ গল্প শিরোনামের যে গল্প সেটাও যত না গল্প তারচেয়ে কথন। আর এটা আমার জীবনের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। ভালো লাগছে কয়েকটি খরখোশ... কিন্তু অন্য সব গল্পের মতোই ফিনিশিংয়ে আনন্দ পাইনি। যেন বা একটা গল্প হতে চেয়ে আর হলো না। সবগুলো গল্পই বানানো গল্প। মনে হয় যে বানিয়ে বানিয়ে লেখা আরকি। অন্যরকম সব গল্প পড়ে আনন্দ আছে। কিন্তু শেষ না হওয়ার বিরক্তিও আছে। যে গল্পগুলোর মধ্যে রস থাকলেও গল্প যে নাই তাই মনে হয়। অবাস্তব পৃথিবীর গল্প, অবাস্তব পৃথিবীর ক্রাইসিস এই দুনিয়ায় যা কখনোই এগজিস্ট করে না আসলে। তবু ভালো লাগে আরকি।
P.S: লেখক নিজে অনেক পড়াশোনা জানা বলে অনেক পড়াশোনাও ঢুকে যায় গল্পে। ইতিহাস, ধর্ম, সাইকোলজি। অনেক সময় মনে হয় অপ্রয়োজনীয় নয় কি! এমন।