আকিও মায়েহারা, একজন সাধারণ মধ্যবয়সী জাপানিজ পুরুষ। প্রায় দেড়যুগ ধরে সংসার করা স্ত্রী ইয়াইকো, কিশোর ছেলে নাওমি আর বৃদ্ধ মা মাসায়েকে নিয়ে বসবাস টোকিওতে ওর মা-বাবার বাড়িতে। বাবা বার্ধক্যজনিত শারীরিক মানসিক রোগে ভুগে মারা যাওয়ার পর তার বাড়িতেই পরিবারসমেত থাকে আকিও।
বাইরে থেকে খুব স্বাভাবিক পরিবার মনে হলেও আদতে আকিওর পরিবারের সদস্যের মধ্যকার বন্ধন ওরকম দৃঢ় নয়। একদিকে স্ত্রীর প্রভাবে নিজের বাবা মায়ের যত্ন না নিতে পারার অনুতাপ, অন্যদিকে কিশোর নাওমি তথা সংসারের উপর নূন্যতম নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারার ব্যর্থতা। সবমিলিয়ে সাংসারিক অশান্তি থেকে বাঁচার জন্য ধীরে ধীরে পরিবার থেকেই বিচ্ছিন্ন হতে থাকে সে, কাজে ব্যস্ত থেকে শুরু করে আরও নানাভাবে।
অন্যদিকে ইয়াইকো, সংসারে নিজের ছেলেকে নিয়েই যার সব চিন্তা, একটা ফুলের টোকাও পড়তে দেয় না নাওমির উপর। সেই সাথে সে নিজের শ্বাশুড়িকে করে তুমুল অপছন্দ। বার্ধক্যজনিত কারণে মাসায়েও ভুগছে স্মৃতিভ্রংশ রোগে। সবকিছুর প্রভাবে নাওমির আচরণ মানসিকতা খারাপ হতে থাকে দিনকে দিন, সম্মান নেই নিজের বাবা-মার প্রতি একটুও। এমনই করে জীবন কাটছিল আকিওর।
সব হিসেবনিকেশ বদলে যায় একদিন, যখন আকিওকে ইয়াইকো অফিস শেষে কল দিয়ে ভীত কন্ঠে জরুরি প্রয়োজনে বাসায় আসতে বলে। বাসায় এসে সে দেখে তাদের বাগানে পড়ে আছে একটা বাচ্চা মেয়ের লাশ, তাদের ছেলে নাওমির আকামের ফল। শুরুতেই পুলিশে খবর দিতে চাইলেও স্ত্রীর প্ররোচনায় আর নিজেদের সম্মানের কথা ভেবে আকিও নেমে পড়ে এক বিপদজনক রাস্তায়।
টোকিও মেট্রোপলিটন পুলিশে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত মাতসুমিয়া, যার পিতৃতুল্য মামা তাকামাসা এখন মৃত্যুশয্যায়। সে যতোটা সম্ভব চেষ্টা করে তার মামাকে হাসপাতালে সময় দিতে। কিন্তু ওনার একমাত্র ছেলে, মাতসুমিয়ার মামাতো ভাই কিয়োচিরো কাগা একবার ওনার মুখটাও দেখতে আসে না। সাত বছরের মেয়ে ইউনার লাশ পাওয়া যাওয়ার পর তদন্তে নামে টোকিও মেট্রোপলিটন পুলিশ আর স্থানীয় থানা। তদন্তদলে আছে ডিটেকটিভ কাগা আর মাতসুমিয়া উভয়েই।
ক্লু অনুযায়ী কাগা ঠিকই হাজির হয় অপরাধীর দোরগোড়ায়। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আকিও করে ভয়ংকর এক পরিকল্পনা। কি সেটা? আসল অপরাধী কি শাস্তি পাবে? কোন গোপনীয়তা লুকিয়ে আছে পরিবারের মাঝে? কেনই বা কাগার সাথে তার বাবার এই দূরত্ব? এই নিয়ে জনপ্রিয় জাপানি লেখক কেইগো হিগাশিনোর অন্যতম চরিত্র ডিটেকটিভ কাগাকে নিয়ে লেখা বই 'দ্য রেড ফিঙ্গার'।
কেইগো হিগাশিনো আমার অতি পছন্দের লেখক। হাতের কাছে তার বই পেলেই সংগ্রহ করে ফেলি। কিন্তু সালমান হকের অনুবাদে 'দ্য রেড ফিঙ্গার' এর অত্যাধিক সমালোচনা দেখে বইটা পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। পরবর্তীতে ডিটেকটিভ কাগার সাথে পরিচয় 'নিউকামার' বইটা দিয়ে। একটা সাধারণ মার্ডার মিস্ট্রিকে হিগাশিনো একদম ভিন্নধারায় প্রকাশ করেছেন সেই বইয়ে। সেই বইয়ে চমৎকার গল্পকথন বাদেও ক্ষুরধার বুদ্ধি আর কমনীয় ব্যক্তিত্বের পাঠকপ্রিয় গোয়েন্দা কিয়োচিরো কাগাকেও ভালো লেগেছিল খুব।
এরপরে পড়ি ডিটেকটিভ কাগাকে নিয়ে লেখা হিগাশিনোর সবচেয়ে জনপ্রিয় বই 'ম্যালিস'। টানটান উত্তেজনার দূর্দান্ত রহস্য, মাইন্ড গেম দিয়ে ভরা সেই বইটা শেষ পর্যন্ত একটু খারাপ লাগার কারণ ছিল এক্সপেক্টশন অনুযায়ী শেষের রহস্যভেদটা ভালো লাগে নি, আর তাতে ডিটেকটিভ কাগার ব্যক্তিত্বের বুদ্ধিভিত্তিক তদন্ত ছাড়া অন্যকিছু ফুটে উঠে না। পরবর্তীতে কাগার গল্প দেখি হিগাশিনোর বই থেকে ব��নানো 'দ্য ক্রাইম দ্যাট বাইন্ডস (২০১৮)' সিনেমায়।
সেই সিনেমার গল্পে হিগাশিনো সুলভ রহস্য, কাগার বুদ্ধিমান তদন্ত, তাতে তার ব্যক্তিগত জীবন জড়িয়ে পরা, শেষে আবেগের সাথে রহস্যভেদ সবমিলিয়ে দূর্দান্ত লেগেছিল। ফিল্মমেকিং আর কাগা চরিত্রে অভিনেতা হিরোশি আবের অভিনয় ছিল চমৎকার। এরপরেই দেখেছিলাম রেড ফিঙ্গার বই থেকে বানানো টিভি মুভিখানা, কারণ কাগার ব্যক্তিগত জীবনের গল্পটা শুরু হয় এই গল্পেই। ফলে 'দ্য রেড ফিঙ্গার' বইয়ের গল্পটা আমার জানা।
তারপরও পড়লাম কারণ ডিটেকটিভ কিয়োচিরো কাগা আমার খুব পছন্দের চরিত্র হয়ে গিয়েছে। সেই সিরিজের অনুবাদকৃত সবগুলো বই-ই পড়ার ইচ্ছে। 'দ্য ক্রাইম দ্যাট বাইন্ডস' এর সোর্স ম্যাটেরিয়াল বই 'দ্য ফাইনাল কার্টেইন' ইতিমধ্যেই বাংলায় অনূদিত হয়ে গিয়েছে, সেটাও পড়ব। এছাড়া সংগ্রহে সিরিজের 'এ ডেথ ইন টোকিও' বইটাও আছে।
যাইহোক, অনেক অযথা বকলাম, এবার বইয়ের ব্যপারে আসি। প্রথমত গল্পটা পুরো জানা ছিল, এটা হিগাশিনোর অন্যান্য বইগুলো থেকে একদম সাদামাটা। মূল গল্পে রহস্যের চেয়েও বেশী জাপানের (এককথায় বলতে গেলে সব দেশেরই) পরিবারগুলোর মধ্যে থাকা কিছু সামাজিক ইস্যু আর মনস্তত্ত্বকে দেখাতে চেয়েছেন লেখক। একারণে গল্পে বিশেষ রহস্য নেই, এটা হিগাশিনোর অন্যান্য বইগুলোর মতো হাউ-ডান-ইট আর ওয়াই-ডান-ইট ফর্মূলায় পরে না।
গল্পের রহস্য অনুযায়ী পুলিশের তদন্তকার্যও সাদামাটা, তবে এর মধ্যেও ডিটেকটিভ কাগা তার মেধার সাক্ষর রাখতে পেরেছে, প্রকাশ পেয়েছে তার সহানুভূতিশীল মনোভাবও। অন্যান্য চরিত্রগুলোর মধ্যে আকিওর চরিত্রায়ন ভালো ছিল, যেভাবে তার পরিবার নিয়ে মানসিক টানাপোড়েন, অধঃপতন একইসাথে অপরাধবোধটা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তা বেশ বাস্তবিক। মূল অপরাধী হিসেবে সে হিগাশিনোর 'সাসপেক্ট এক্স', 'ম্যালিস' কিংবা 'দ্য নেম অব দ্য গেম ইজ অ্যা কিডন্যাপিং' বইগুলোর চরিত্রের মতো কোনো বুদ্ধিমান মাস্টারমাইন্ড নয়, বরং তার কাজকর্ম চিন্তাভাবনা একজন সাধারণ মধ্যবয়সী মানুষ হিসেবে বাস্তবসম্মত ছিল।
এরবাদে গল্প অনুযায়ী মাতসুমিয়া আর কাগার বাবা তাকামাসার চরিত্র গঠন ভালো ছিল। বাকীসব চরিত্র একমাত্রিক। গল্পে হিগাশিনোসুলভ টুইস্ট ছিল দুয়েকটা, প্রেডিক্ট করা খুব একটা কঠিন না। আর শেষে বরাবরের মতো একটা ইমোশনাল টোন ক্রিয়েট করতে চেয়েছেন লেখক। সেটা মোটামুটি হয়েছে, পুরোপুরি কাজে দেয় নি। কারণ বিষয়টা মা-চান রিলেটেড, কিন্তু গল্পের প্রয়োজনেই তাকে স্পেস দেওয়া হয় নি ঠিকমতো।
এই বইয়ে লেখক যেই সামাজিক ইস্যুটা তুলে ধরেছেন তা অবশ্যই চিন্তার বিষয়, কিন্তু গল্পে সেটার ফুটে ওঠাটা কতটা সার্থক? আমার মতে খুব বেশী যুতসই হয় নাই। কারণ এতে ইয়াইকো বা নাওমির মতো চরিত্রগুলোর গঠন একেবারে একমাত্রিক ছিল। বলছি না যে তাদের প্রতি সিম্পেথি তৈরি করতে, কিন্তু একটু বহুমাত্রিকভাবেও উপস্থাপন করা যেত। তবে ভালো লেগেছে কাগার ব্যক্তিগত জীবনের গল্পটা, কিংবা বইয়ের এন্ডিং।
সবমিলিয়ে 'দ্য রেড ফিঙ্গার' আমার পড়া হিগাশিনোর সবচেয়ে দূর্বল বই। উপন্যাস হিসেবে মানায় না এটাকে, একটা বড়গল্প হলেও হতো। তবে এই ডিটেকটিভ সিরিজটা পড়লে 'দ্য রেড ফিঙ্গার' পড়া উচিত, কারণ এই বইয়ের কাগার গল্প পূর্নতা পাই সিরিজের শেষ বই 'দ্য ফাইনাল কার্টেইন'এ। সালমান হককে বেশ কষ্ট করে আনঅফিশিয়াল ভার্শন থেকে এই বই অনুবাদ করার জন্য ধন্যবাদ। আনঅফিশিয়াল হলেও অনুবাদ সাবলীল, প্রাণবন্ত; অভিযোগ করার উপায় নেই।
📚 বইয়ের নাম : দ্য রেড ফিঙ্গার
📚 লেখক : কেইগো হিগাশিনো
📚 অনুবাদ : সালমান হক
📚 বইয়ের ধরণ : ক্রাইম থ্রিলার, ডিটেকটিভ, মিস্ট্রি থ্রিলার
📚 ব্যক্তিগত রেটিং : ৩/৫