পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের ঠিক লাগোয়া একস্থানে পাওয়া গেল একজন বিদেশির লাশ। বাংলাদেশ প্রত্নবিভাগের অফিসার রাজিয়া এবং পুলিশের তদন্তের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন ভারত থেকে এক সেমিনারে যাওয়া মনোময়। প্রথমে মূর্তি পাচারের কথা ভাবা হলেও দেখা গেল প্রাচীন অ্যালকেমি বিদ্যার মাধ্যমে সোনা তৈরির এক চক্র সক্রিয় এখানে। পরপর কয়েকটি খুন হয়ে গেল এবং আক্রান্ত হলেন রাজিয়া ও মনোময়। এদিকে বাংলাদেশের তদন্তকারী অফিসারদের একাংশ চাইছেন না মনোময় এর মধ্যে থাকুন। সে কি মনোময় ভারতীয় বলে, নাকি তাদের আসলে যোগ রয়েছে এই চক্রের সঙ্গে? নানা প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে কী করবেন মনোময় এবং রাজিয়া? বৌদ্ধ ও হিন্দু তন্ত্রক্ষেত্রগুলি নিয়ে রহস্যময় তথ্য সামনে আনতে শুরু করলেন মনোময়। সত্যিই কি এর সঙ্গে যোগ রয়েছে অ্যালকেমি নিয়ে চর্চা করা ওই চক্রের। চক্র কি আসলে একটি, নাকি একাধিক? সেই চক্র কি আন্তর্জাতিক?
✨সদ্য পড়ে শেষ করলাম লেখক রজত পাল মহাশয়ের লেখা , ইতিহাস ধর্মী এডভেঞ্চার থ্রিলার "রস রত্নাকর" বীরভূমের বজ্র রহস্যের পর এটি রজত পাল মহাশয়ের লেখা মনোময় সিরিজের দ্বিতীয় গল্প , বীরভূমের বজ্র রহস্যতে আমরা যেমন প্রাচীন বাংলার চর্যাপদের আড়ালে থাকা বাংলার রাজনৈতিক সামাজিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারি ঠিক সেই মতই এই গল্পের ভিত্তি হল , বৌদ্ধ তন্ত্র ও হিন্দু ধর্মের মাতৃ শক্তির পীঠস্থান গুলির আদলে অতিপ্রাকৃতিক বিজ্ঞান চর্চা । সমগ্র ভারতের নিরিখে দেখলে , সব কটি মঠ ও শক্তি ক্ষেত্র গুলি নির্দিষ্ট কিছু সাঙ্কেতিক চিহ্নের আদলে তৈরি , লেখক খুব সুনিপুণ ভাবে তা নিজের লেখায় চিত্র সহকারে তুলে ধরেছেন।
✨ বাংলাদেশের পাহাড়পুর অঞ্চলের বৌদ্ধ বিহারে হঠাৎ একজন ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেলে , প্রত্ন বিভাগের অফিসার রাজিয়া ও ঘটনা সূত্রে ভারত থেকে সেমিনারে যোগ দিতে আশা মনোময় এই ঘটনার সাথে জড়িয়ে যান। মূর্তি চুরির ঘটনা হিসেবে তদন্ত শুরু হলেও আসতে আসতে বোঝা যায় একটি চক্র রয়েছে যারা, প্রাচীন আলকেমি বিদ্যার মাধ্যমে মাইন্ড স্টোন বা পরশ পাথর পুনরায় তৈরি করার প্ল্যান নিয়ে ঘটিয়ে চলেছে একেরপর এক ঘটনা ।
✨ পাঠ প্রতিক্রিয়া - বীরভূমের বজ্র রহস্য আগে পড়ার সুবাদে বলতেই পারি, বাংলার ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে এরকম গবেষনা মূলক থ্রিলার ঘরণার বই প্রায় নেই বললেই চলে , সেই হিসেবে রস রত্নাকর বাড়তি পাওনা । আগের বইতে প্রচুর তথ্যের মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছিলেন যে প্রাচীন ভারতে কিভাবে পদাবলী ও চর্যাপদের আদলে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস ও সামাজিক জীবন। যদিও রহস্যের দিকটি সেই হিসেবে ডানা না মেললেও , বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে নানান অজানো তথ্য জেনে ভালই লেগেছিল। এই বইয়ের ক্ষেত্রে বলতে হবে , রহস্য ও যেমন রয়েছে ঠিক সমান তালে ইতিহাস ও অ্যালকেমির চর্চাও হয়েছে সমান ভাবেই।। অ্যাল কেমি সম্পর্কিত নানান অজানা বিষয়ের ওপর লেখক খুব গুছিয়ে পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছে, যেখানে মূত্র শোধন করার বিষয়টি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ,এরকম একটি বিষয় জেনে অনেক পাঠকই অবাক হবে। অ্যালকেমিতে যে স্থান মাহাত্ম্য রয়েছে তার বিষয়ে লেখক , বাংলার বৌদ্ধ মঠ ও মাতৃ শক্তির আরাধনার জায়গা গুলিকে ডায়াগ্রামের সাহায্যে জ্যামেতিক চিহ্নের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন । এই বিশেষ স্থান গুলিতে সাধনা ও বিজ্ঞান চর্চা ও অ্যালকেমির মাধ্যমে নানান কাজ সমাধা করতেন প্রাচীন ভারতের লোকেরা। সেই হিসেবে দেখতে গেলে, হিন্দুদের পূজো পদ্ধতি যে কিছু ক্ষেত্রে অ্যালকেমি তা পরিষ্কার বোঝা যায়।। কারণ এক পর্যায় গিয়ে সমগ্র বিষয়টি আসলে বিজ্ঞান ভিত্তিক হলেও মূল ধরার বিজ্ঞানের সাথে এর সম্পর্ক খুব একটা না থাকলেও এটা মেনে নিতে সমস্যা নেই কিছু ক্ষেত্রে এই অ্যালকেমির ওপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে । satanist দের পেন্টাগ্রাম হোক কিংবা ইহুদীদের স্টার অফ ডেভিড বা আমাদের স্ত্রী যন্ত্রম সবই প্রাকৃতিক শক্তি আরোধনার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে আরও শক্তিশালী করতেই উদ্যত। মাইন্ড স্টোন আদলে অবিশাপ না আশীর্বাদ তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে তবে তার জন্যে কত কিছুই না ঘটেছে , সেক্ষেত্রে বিচার করলে পরশ মনি হয়তো মানুষের সুখের থেকে দুঃখের কারণ বেশি বটে।। গল্পের পুরো বিস্তৃতি ভারতের পশ্চিম বঙ্গ ও বাংলাদেশের নানান জায়গা জুড়ে থাকায় ভৌগোলিক দিক থেকেও লেখক এই গল্পটিকে এক বিশেষ মাত্র দিয়েছেন, বইতে দেওয়ায় ম্যাপ গুলি পাঠক হিসেবে খুব ভালো লেগেছে।।। এছাড়াও রয়েছে অ্যালকেমি সম্পর্কিত প্রচুর তথ্য যা অনেকেরই অজানা , ভাবতে অবাক লাগে আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে এই বাংলার বুকে , মানুষ বিজ্ঞান চর্চা করেছে ধর্মীয় আচার অনুচারের গন্ডিতে থেকে।। বীরভূমের বজ্র রহস্য আবিষ্কার যতটা উত্তেজনাময় ছিল , রস রত্নাকর বই হিসেবে এককাঠি ওপরে আমার মতে।। *শুধু ক্লাইম্যাস টি লেখক যে ভাবে শেষ করেছে আশা করা যায় মনোময় ও সর্দারের আবার হয়তো কোনো জায়গায় দেখা হবে ,আবার হবে বুদ্ধির লড়াই ।। লেখককে ধন্যবাদ আগের বইটির থেকে এই বইটিকে আরও সাজিয়ে গুছিয়ে পাঠকদের কাছে তুলে ধরার জন্যে।।
✨ ভালো লেগেছে যে বিষয় গুলি ১)লেখার ধরন রজত বাবুর খুব ভালো বেশ একটা ক্লাসরুম লেকচার বা সেমিনারের ছোঁয়া পাওয়া যায়। ২) এই গল্পে বিশেষ করে যেটি পেয়েছি সেটি হলো আন্ডার কারেন্ট , থ্রিল বলাটা বেশি হয়ে যাবে, একটা চোরা স্রোতের মত রহস্য হাতছানি দিয়েছে বার বার। ৩) একটি দেশের সাধারণ পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে যে তদন্তগত ফারাক ও টানাপোড়েন থাকে সেটি খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। ৪) বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবেও যে একটি দেশের সরকারী কর্মী অন্য দেশের কোনো ঘটনায় সরাসরি হস্তক্ষেপে করতে পারে না , সে যতই যোগ্য লোক হোন না কেন এটিও খুব সুচারু ভাবে লেখক তুলে ধরেছেন। ৫) হালকা প্রেমের হাতছানি থাকেলও বৃহত্তর স্বার্থে অনেক সময় পিছিয়ে আসতে হয় ,মনময়ের চরিত্রে এই হালকা প্রেমের পরশ বেশ লাগলো । ৬) যেহুতু গবেষণা ধর্মী লেখা সেক্ষেত্রে একটু সিরিয়াস পাঠকই এই বই দাবি করে।। ( বাচ্চাদের জন্যে একেবারেই নয়)
✨খারাপ লাগার জায়গা একটাই - বইটিতে একটি পৃষ্ঠার কিছুটা - উল্টো প্রিন্ট হয়েছে ✨ রেটিং - ৮.৫/১০