অদূরে দফ বেজে চলেছে। সুরতরঙ্গের মূর্ছনায় ডুবে যাচ্ছে এক অংশনীয় শক্তির স্বত্ববান। উত্তম শক্তির বিপরীতে সে একজন শয়তানের বাহক। স্বীয় জন্মলগ্ন থেকে নরকের অগ্নিতে দগ্ধ হওয়ার জন্য অদৃষ্ট তৈরি ছিলো আন্দ্রেয়াজের। এক অভিশাপ, লোভ, আশংকা সমস্ত কিছুর প্রতিফলনের ফলে জন্ম নেয় শয়তানের দূত। অথচ অসত্যের ধ্বংসক সত্যের পরাজয় কখনো সম্ভব নয়। অভিশাপকে মথিত করবে নীল রঙের আলো। যে জন্ম নিয়েছে আন্দ্রেয়াজের অতি প্রিয়ভাজন হিসেবে। আফারীতদের বাদশাহ এসমাদের সামনে বিশাল এক প্রহেলিকা। সত্যকে রক্ষা করতে সে কি শেষ অবধি পরিত্রাণ পাবে মহামান্য আন্দ্রেয়াজের বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলার থেকে? সবকিছুর পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে। কিংবা চক্রকারে পুনরায় শুরু হতে চলেছে সব।
পুরো সিরিজটার গল্পের প্লট আমার ভালো লেগেছে। কল্পনার জগতের মতই অবাস্তব, সুন্দর আর অদ্ভুত। লেখনশৈলী আগের থেকে উন্নত। আর ভাষাগত কদর্যতা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। যেন জ্বীনজগতের ভাষা তো এমনই হবে! কিছু প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই গল্পটি শেষ করা হয়েছে, কিছুটা রহস্য রেখে যাওয়া গল্পের সৌন্দর্য। কিন্তু এখানে একটু বেশি অপূর্ণতা রয়ে গেছে। এই গল্প পড়তে হলে মস্তিষ্ককেও সেরকম ভাবে গুছিয়ে নিতে হবে। গল্পে বাস্তবিকতা আশা করা যাবে না, এটা ফ্যান্টাসি জনরার বই। পরিপক্কতাও আশা করা উচিৎ না একই কারণে। তাহলেই আনন্দের সাথে পড়া যাবে।
❝কল্পনার রাজ্যে এক মহাযাত্রা❞ "Fantasy is hardly an escape from reality. It's a way of understanding it." --------- Lloyd Alexander
🔰 কল্পনার রাজ্যে এক মহাযাত্রা, যেখানে আলো আঁধারের সীমানা ঝাপসা হয়ে যায়...
🔮 ❝প্রথম খণ্ড: নিষিদ্ধ প্রেম ও গোপন দরজা❞
তিন খন্ডের তথা ট্রিলজির এই আখ্যানের প্রথম খণ্ডে সামিয়া খান প্রিয়া খুলে দিয়েছিলেন এক গোপন দরজা। যেখানে মনুষ্য কন্যা আম্মিরা ও যুবরাজ এসমাদের নিষিদ্ধ প্রণয় কাহিনীর পাশাপাশি, গোপনে বয়ে চলা রাজনীতির খেলা, অভিশাপের বিষাক্ত শিকড় আর মানুষের ভুলের অমোচনীয় দাগের এক গোলক ধাঁধায় ঘুরছিলাম আমি। পাতা থেকে পাতা গড়াতে গড়াতে যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম অদেখা এক আকাশের নিচে। যেখানে প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে ছিল জাদু, ভয় আর আকর্ষণের এক অসাধারণ উপস্থাপন। .
🔰দ্বিতীয় খণ্ড: অসাধারণ কিছু অনুভূতিদের জড়ো হওয়ার যাত্রাঃ
দ্বিতীয় খণ্ড যেন সেই আকাশের আরও উঁচুতে উড়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছিল আমার জন্য। চরিত্রগুলোর উপস্হাপনার দক্ষতায় তারা যেন আমার চেনা মানুষ উঠেছিল এ পর্যায়ে। যাদের আনন্দে আমি হাসছিলাম আবার দুঃখে আমার মনাকাশে গুমোট বাতাবরণের আভাস পাচ্ছিলাম। কিন্তু এখানেও সমাপ্তি এসেছে অসমাপ্তের আফসোসে। মোহমুগ্ধ এক টান যা তৃতীয় খণ্ডের দিকে আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছে। .
⚔️ তৃতীয় খণ্ড: নিয়তির মহাযুদ্ধঃ
আর তারপর এল… আফারীত ৩, নিয়তির লিখন এখানে মুছে যায়নি... এক অবধারিত মহাযুদ্ধ যা আসবেই বলে রব উঠেছিল আর তাতে সত্যের আলোকপাতে অশুভ শক্তির বিনাশতো হওয়ারই ছিলো। এই শেষ খণ্ডে সব প্রশ্নের উত্তর মিলেছে পরিপূর্ণ ভাবে। অতীতের রহস্য, লুকানো ইতিহাস আর ভবিষ্যদ্বাণীর তাৎপর্য সব একসূত্রে গাঁথা হয়েছে চমৎকার ভাবে। এসমাদ-আন্দ্রেয়াজ, আনাহিতা-আম্মিরা, এসমাদ-জিবাদের চরিত্র গুলোর মতো সম্পর্কগুলোর সূক্ষ্ম আবেগী রসায়ন গল্পে যে গভীরতা এনেছে, তা একদম ফ্যান্টাসি জগৎ ছাপিয়ে বাস্তবের অনুভূতিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু আমার কাছে এই খণ্ডের সব আলো ও অন্ধকার যে একটি নামের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছিল......আন্দ্রেয়াজ ছিলো যার নাম।
“ Characters are not created by writers. They pre-exist and we only discover them. ” ----------Elizabeth Bowen
প্রথম খন্ড থেকে এসমাদ আর আম্মিরার প্রণয়কে মূল প্লটের থিমের প্রধান অংশ ভাবা আমার এই পাঠক মনের সবটা আকর্ষন টেনে নিয়েছে মহামান্য আন্দ্রেয়াজ। তার শক্তি যেমন বিশাল, তেমনি তার অন্তরের দ্বন্দ্বও ছিল ভয়ঙ্কর। সে জানতো ভুল পথে যাচ্ছে কিন্তু নিজেকে থামাতে পারছে না। এই অসহায় নিয়ন্ত্রণহীনতা, ভেতরের ভালো মন্দের লড়াই, প্রিয়জনের কাছ থেকে আশ্রয় চাওয়ার সরলতা সবটা মিলিয়ে তার প্রতি এক অদ্ভুত মায়া কাজ করেছে আমার মধ্যে। আলো কিংবা ছায়া না হয়েও এ দুইয়ের মাঝের এক অদ্ভুত ধূসরতা হয়ে এসেছে আন্দ্রেয়াজ। যা প্রথমে বিভ্রান্ত করলেও পরে মোহিত করেছে, আবেশিত করে আবেগের এক নতুন নাম হয়েছে। আনাহিতা আর এসমাদের ওকে নিয়ে দ্বন্দগুলো গল্পে আবেগের আলাদা মাত্রা স্পর্শ করেছে।
সব মিলিয়ে সামিয়া খান প্রিয়া চরিত্র নির্মাণে, প্লট বুননে এবং সমাপ্তির মহাকাব্যিকতায় অসাধারণ একটা ট্রিলজি উপহার দিয়েছেন।
▪️বি:দ্র: লেখকর প্রতি অনুরোধ থাকবে বাক্য গঠনের দিকে আরেকটু মনোযোগী হবেন। এতো চমৎকার উপন্যাসের কোন ত্রুটি বিচ্যুতিই মানতে ইচ্ছে হয় না। খুব ভালো কিছু কারও কাছে পেলে তার প্রতি কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়।