মানবসভ্যতার প্রায় আদি মানুষ মৃৎশিল্পীরা। তাঁরা কোথায় না ছিলেন। সেই সুদূর হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোয়, চিনে-মিশোরে-মায়া-মেসোপটেমিয়ায়। পূরাণে মহাভারতে। গরাম থানে বড়াম থানে মাটির হাতিঘোড়ায়। ভাঁড়ে-প্রদীপে-ঘটে-মঙ্গল কলসে। ছিলেন মাটির মৃদঙ্গে, গানে গম্ভীরায়, এমনই এক কুম্ভকার গ্রামসমাজকে কেন্দ্র করে লেখা কথাকার নলিনী বেরার 'মাটির মৃদঙ্গ'। ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার সুদূর মরুডা থেকে দাদার মোটর বাইকে চড়ে সুন্দরী 'পাত্রী' এসেছে বাংলার এক অখ্যাত গ্রামে 'পাত্র' দেখতে। গ্রামে পা দিতেই সে ঘোষণা করেছে, "ভাই, আমে যে-মনিষকু বাহা হেবি সে হেব তুমর পরি ভল-অ ও সুন্দর-অ।" অর্থাৎ যাকে আমি বিয়ে করব সে হবে তোমার মতোই ভালো ও সুন্দর। ...দাদা-সোহাগি মেয়ের এহেন ঘোষণা নিস্তরঙ্গ গ্রামটায় রীতিমতো তরঙ্গ তুলে দিল। এই তরঙ্গে আলোড়িত হয়েছে বাংলা-ঝারখন্ড-ওড়িশার কুম্ভকার সমাজ। রচিত হয়েছে একই অঙ্গে ধ্রুপদি ও আধুনিক এক বিরল উপখ্যান।
নলিনী বেরার জন্ম পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গোপীবল্লভপুরের নিকট বাছুরখোয়াড় গ্রামে। ছোটবেলা থেকে দারিদ্রের সাথে লড়াই করে পড়াশোনা করেছেন তিনি। তাঁর শিক্ষা সম্পন্ন হয় মেদিনীপুর কলেজে ও পরে নকশাল আন্দোলনের কারণে ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজে। ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের আধিকারিক হিসাবে চাকরিতে ঢোকেন।
কবিতা লেখা দিয়ে তাঁর সাহিত্য জীবন শুরু। ১৯৭৯ সালে নলিনী বেরার প্রথম গল্প 'বাবার চিঠি' দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি পল্লীপ্রকৃতি নিয়ে সমাজসচেতন সাহিত্যরচনায় পারদর্শী। তাঁর উপন্যাসগুলি হল শবরচরিত, কুসুমতলা, ফুলকুসমা, দুই ভুবন, চোদ্দ মাদল, ইরিনা এবং সুধন্যরা, এই এই লোকগুলো, শশধর পুরাণ ইত্যাদি। চার দশকের সাহিত্যচর্চায় অজস্র ছোটোগল্প ও উপন্যাস লিখেছেন।
২০০৮ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান নলিনী বেরা তাঁর শবরচরিত উপন্যাসের জন্য। সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা উপন্যাসের জন্য ১৪২৫ বঙ্গাব্দের আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হন তিনি। পুরস্কার হিসেবে প্রাপ্ত ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা ছাত্রা ছাত্রীদের জন্য দান করেন এই সাহিত্যিক।
মাটির মৃদঙ্গ বইটা যদিও একটা উপন্যাস ঠিক কোনো গল্প ধারণ করে লেখা বই এটা না। একটা গবেষণাধর্মী ভাব আছে বইটাতে। গ্রামবাংলার কুম্ভকার জাতিকে নিয়ে লেখা এই বই। তাদের জীবনযাপন, সমাজগঠন ইত্যাদি বইতে চিত্রায়িত হয়। দেখা যায় একই গ্রামে পাশাপাশি কুমারদের সাথে সাওতালদের সহাবস্থান। এরই সাথে চলে আসে জাতিগত ভেদাভেদ আর তার বিদ্রোহও। লেখক উপন্যাসের মধ্যে নিয়ে এসেছেন নানা ছড়া গানসহ লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান। সম্ভবত জাদুবাস্তবতার ছোয়াও আছে।