১৯৮৭ থেকে ১৯৯৩ – এই ছয় বছর লেখিকা মস্কোতে ছিলেন লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার ছাত্রী হিসাবে। সরাসরি দেখেছেন সেই সময়ের রাশিয়ার অশান্ত, অস্থির, দিশেহারা সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবস্থা। লেনিনের নেতৃত্বে জারের রাশিয়া থেকে পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নে উত্তরণের ইতিহাস একটু একটু করে ভাঙতে দেখেছেন এই ৬ বছরে। একটি ইতিহাস ভাঙতে দেখার সাক্ষী লেখিকা। তারই বর্ণনা এই গ্রন্থে তুলে ধরেছেন।
কলকাতার মেয়ে সেরিনা জাহান ভালো রেজাল্টের সুবাদে সুযোগ পেয়ে যান মস্কোর এক ইউনির্ভাসিটিতে পড়ার। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন রাশিয়াতে। সোভিয়েত রাশিয়ার একদম হৃদপিন্ডের কাছে থেকে দেখেছেন তার ভেঙে পরা। সেইসব স্মৃতিকথা নিয়ে এই বই। তিনি কোন পক্ষপাতিত্ব না করে যা দেখেছেন যা শুনেছেন তাই বর্ণনা করেছেন কিছু জায়গায় নিজের মনের কথাও তুলে ধরেছেন। সোভিয়েত রাশিয়া নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তারা লিস্টে রাখতে পারেন। চমৎকার বই।
This book is about the last years of Moscow during the fall of Soviet Union. The writer’s prose in describing the hopelessness feels a little too real sometimes..
'১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর যে প্রজাতন্ত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্যপদ গ্রহণ করে, সেই ইউক্রেন। রাশিয়ার সঙ্গে যে প্রজাতন্ত্রের সবথেকে বেশি ভাব, সেই ইউক্রেন। রুশিদের সঙ্গে যে প্রজাতন্ত্রের বাসিন্দাদের বৈবাহিক সম্পর্কের সংখ্যা সব থেকে বেশি, সেই ইউক্রেন। যে প্রজাতন্ত্রের কথ্য ভাষার এমনকী হরফের সঙ্গেও রুশ ভাষার সব থেকে বেশি মিল, সেই ইউক্রেন। রাশিয়ার সঙ্গে যে প্রজাতন্ত্রের সাংস্কৃতিক মিল সবচেয়ে বেশি সেই প্রজাতন্ত্র হলো ইউক্রেন। ' - রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর সেরিনা জাহানের লেখা এই লাইনগুলো ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না। কেমন যেন ঘোরলাগা ভাব তৈরি হয়। সত্যিই কী ইউক্রেনের সাথে এত দোস্তি ছিল রুশিদের!
কলকাতার মেয়ে সেরিনা জাহান। সবাই বলে, সোভিয়েত ইউনিয়নপন্থি রাজনীতির সাথে বাবা, কাকা কিংবা কাছের কেউ জড়িত না থাকলে সেখানে পড়তে যাওয়া যায় না। সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী সেরিনা তা-ই জানতো। অন্তত আশেপাশে দেখত। তবুও কপাল ঠুকে সোভিয়েতে পড়ার জন্য আবেদন করল। ভাগ্য প্রসন্ন ছিল। তাই হয়তো সোভিয়েত জমানার অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পেট্রিস লুমুম্বা মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে গেল। তরুণী সেরিনা দু'চোখে স্বপ্ন নিয়ে ১৯৮৭ সালে পাড়ি জমালো সোভিয়েত ইউনিয়নে। ছয় বছর পর তরুণী সেরিনা দেশে এলো। তবে এবার তার অভিজ্ঞতার ঝুলি এত বেশি সমৃদ্ধ যে, তাকে বিচিত্র অভিজ্ঞতার কারণে আর তরুণী বলার জো নেই।
রবিবাবু জানতে চেয়েছিলেন, কবে সেই মহাপুরুষ আসবেন, যার হাতে থাকবে কাঁচি! এদিকে সেরিনার বান্ধবী এন্দির মতে, সোভিয়েত ইউনিয়নে এক মহাপুরুষ আসবেন। যিনি হবে জড়ুলধারী। সেই মহাপুরুষ সাক্ষাৎ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবেন সোভিয়েত ইউনিয়নকে। আর, সেরিনা যখন মস্কো পৌঁছে ততদিনে সেই মহাপুরুষ ক্ষমতায় আসীন। যার নাম মিখাইল গর্বাচভ।
আশ্চর্য এক সময়ে আ্যরোফ্ল্যাতে করে রাশিয়ার মস্কো পৌঁছাল গোটা বিশেক ভারতীয় শিক্ষার্থী। সবাই তারা বৃত্তি নিয়ে সোভিয়েতে পড়তে এসেছে। কীভাবে রুশি কর্তৃপক্ষ তাদের সাদরে গ্রহণ করবে তা নিয়েও কেউ কেউ রোমাঞ্চিত। কেউ-বা রুশিদের মন জয় করার জন্য টাটকা গোলাপ ভারত থেকে বয়ে এনেছে। কিন্তু বিধিবাম! দীর্ঘসময় অপেক্ষা করা সত্ত্বেও রুশি কর্তৃপক্ষের দেখা নেই। ভাষা জানে না। তাই বিমানবন্দরে কারো সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। উপরন্তু, চারপাশে প্রাণের কোনো উচ্ছ্বাস চোঝে পড়ে না। বরং নির্জীব ও বিষণ্ণতার এক চাদর সবাইকে যেন ঘিরে ধরে আছে। কারো মুখে নেই হাসি৷ কিছু ভারতীয় ছাত্র সেদিন খোঁজ নিতে বিমানবন্দরে না এলে সেরিনাদের হয়তো পরেই ফ্লাইটেই স্বদেশে ফিরতো হতো। তাতে তিনি যেমন বঞ্চিত হতেন ; তেমন আমরা জানতে পারতাম না সোভিয়েত ভাঙনের সুর কেমন ছিল তা সম্পর্কে।
প্রায় এক শ ত্রিশটির বেশি দেশের শিক্ষার্থীরা প্যাট্রিস লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তাই সত্যিই এটিকে কসমোপলিটান বলা যায়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিনদেশি শিক্ষার্থীদের পহেলা ছয়মাস শিখতে হয় রুশভাষা। আর, রুশিরা শেখে ইংরেজি বা স্প্যানিশসহ যে কোনো আন্তর্জাতিক ভাষা।
হলে রুমমেট হিসেবে জর্জিয়ার ও আফ্রিকার দুইজন মেয়েকে পেল সেরিনা। তখন চারপাশে বাকস্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের যৌবন। সোভিয়েতকে রক্ষা করার জন্য 'মহাপুরুষ' গর্বাচেভ এসব পদক্ষেপ নিয়েছেন। আর, সেই পদক্ষেপের কারণেই জানা যাচ্ছে রুশিরা অ-রুশিদের এতকাল কত শোষণ করে এসেছে। রাশিয়ার বাইরের প্রজাতন্ত্রগুলোর যা কিছু ভালো তার সব কিছুই চালান হয়ে যায় মস্কোতে। তা নিয়ে বাকি প্রজাতন্ত্রগুলো এতদিন মুখ খুলতে পারেনি। গর্বাচেভের বাকস্বাধীনতার ঘোষণায় সবাই কম-বেশি সরব হচ্ছে।
সেরিনার তখন অবাক হওয়ার পালা। মস্কোর রাস্তায় বিশাল বিশাল দোকানগুলো খালি পড়ে থাকে। কোথাও মাখন কিংবা রুটি পাওয়া যাচ্ছে - এমন সুসংবাদে সবাই সেখানে পড়িমরি করে ছুটছে। কারণ খানিকবাদেই দোকানের রেশন শেষ হয়ে যাবে। চারপাশে শুধু নেই আর নেই ও চাই আর চাই।
স্ট্যালিন ততদিনে খলনায়কে পরিণত হয়েছেন। তাকে যা ইচ্ছে তাই বলা যায়। লেনিনকে লোকে ছাড় দিচ্ছে। তবে খুব কম। বাকিদের তো যখন-তখন ধবলধোলাই দেওয়া হচ্ছে। এতদিন দেশ বেলাইনে চলতো। তা প্রমাণ করে দিচ্ছেন খোদ রুশি শিক্ষক। তা-ও ভিনদেশি শিক্ষার্থীদের সামনে।
সমাজতন্ত্রের দোহাই ও সাম্যবাদের ওয়াদার ভিত্তিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে উঠেছিল। সেরিনা তা-ই জানতো। কিন্তু বাস্তবের সাথে মিল সে পেলো না। অরুশিদের হতাশা, ক্ষোভ তখন রূপ নিয়েছে ঘৃণায়। সেই ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে পারে সোভিয়েত ইউনিয়নকে।
শোষণমুক্ত সমাজের বদলে সকলের একটাই স্বপ্ন ডলার কামানো। চোরাচালান , ছিনতাইসহ যাবতীয় মন্দকাজ হয়ে উঠলো সোভিয়েতবাসীর ডলার কামাই করার উৎস। বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানিসহ কিছু ভিনদেশি ছাত্র জড়িয়ে পড়ে এই সিন্ডিকেটে। তাদের নিয়ে অনেক ঘটনাই লিখেছেন সেরিনা জাহান। ডলার কামাইয়ের নেশায় শিক্ষক ছাত্রকে অনৈতিকভাবে বেশি গ্রেড দিতো৷ এমনকি সন্ধ্যার পর রুশি মেয়েরা ভিড় জমাতো বিদেশি ছেলেদের হোস্টেলের কাছে। কারণ শরীর বিক্রি করে হলেও চাই ডলার।
কোনো আদর্শে ঘুণ ধরে গেলে ক্ষমতাসীনরা তা টের পায় না। কারণ তারা বরাবরের মতো মূক ও বধির। তাই গর্বাচেভ নিজেও বুঝতে পারলেন না কখন তার সাধের সোভিয়েত ভেঙে পড়েছে! এমনকি তাকে বন্দি করে ক্যু হয়ে গেল। সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা সেরিনা জাহান থ্রিলারের মতো লিখেছেন।
মহান সোভিয়েত ইউনিয়নকে চোখের সামনে ভাঙতে দেখলেন সেরিনা জাহান। মস্কো শহরে সেদিন যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল তা প্রত্যক্ষদর্শীর বাইরে কোনো মানুষের পক্ষে কল্পনা করার সম্ভব নয়। সবকিছু যেন মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে গেল। রুবলের দাম পড়তে পড়তে তখন তা কাগজের চাইতে কম দামি। চারিদিকে হাহাকার। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে লাখ লাখ মস্কোবাসীর জীবন অবসন্ন। আগে প্রবীণদের, শিশুদের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রের। প্রবীণ নাগরিক পেতেন ভাতা। তা দিয়ে তিনবেলা খাবার খরচের বাইরে ভদকা কিনতে পারতেন। এখন মূল্যস্ফীতির কারণে শুধু ভদকাই কিনতে পারেন। খাবার জোটে না। পরিণাম পারিবারিক বন্ধন ভেঙে গেল, অপরাধ বাড়তে থাকলো হুহু করে। সন্ধ্যায় পর লোকে বাইরে বের হওয়া বন্ধ করে দিল। অবশেষে সেরিনা সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি ফিরবেন। আর নয় এই অশান্তময় রাশিয়ায়।
সেরিনা জাহানের আশা ও ভঙ্গ আশার দিনগুলির নাম 'ধূসর মস্কো'। তিনি বামপন্থি ছিলেন না। ডানপন্থি হননি। তাই তার বয়ান যে কোনো লেখকের চাইতে ঢের বেশি শুদ্ধ। একটি স্বপ্নের, একটি মহান আদর্শের অপমৃত্যুর সত্যিকাহিনি 'ধূসর মস্কো'। যা পড়তে গিয়ে বিষণ্ণ লাগে। সোভিয়েতপন্থি না হয়েও সোভিয়েতের ভাঙনে যেন চিড় ধরে হৃদয়ে। লেখক হিসেবে সেরিনা জাহান সার্থক।
ইংরেজিসহ আন্তর্জাতিক ভাষায়গুলোতে সোভিয়েতের ভাঙনের প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান নিয়ে বই-পুস্তকের অভাব নেই। বাংলাতে এই ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মশিউল আলম লিখেছেন। সমর সেনের স্মৃতিচারণ রয়েছে। মনজুরুল হক ও দ্বিজেন শর্মার লেখাজোখা পাবেন। তাদের প্রায় সবাই বামপন্থি। তাই আদর্শিক কারণে শতভাগ শুদ্ধতা বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন। এঁদের চাইতে সেরিনা জাহানের লেখা অনেক বেশি প্রাণবন্ত মনে হয়েছে। তিনি ডানপন্থিদের মতো সোভিয়েতের ভাঙনে পৈশাচিক আনন্দ পাননি ; ভেঙে পড়েননি বামপন্থিদের মতো। অথচ ভাঙনের সুরের নৈরাশ্য তাঁর কলমকে ছুঁয়ে গেছে। অন্তরকে গভীরভাবে করেছে স্পর্শ।
সবকিছু মিলে, অকালপ্রয়াত সেরিনা জাহানের 'ধূসর মস্কো' অনবদ্য স্মৃতিকথা। যেখানে ইতিহাস, ভূগোল বাদ যায়নি। পাবেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অলিগলির বিচিত্র ছবি। বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ হলে অত্যন্ত খুশি হবো। এমন বইয়ের প্রচার ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বজুড়ে।
১৯৮৭-১৯৯১ এর রুশ সমাজ বাস্তবতার আলোকে লেখিকা তুলে ধরেছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন কেন ভেঙে গেল,ভাঙন পরবর্তী সমাজের চিত্র(১৯৯২-১৯৯৩) ও যেখানে ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। সমতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গড়ে তোলা সোভিয়েত রিপাবলিক ধরে রাখতে পারেনি তার প্রতিশ্রুতি, কারণ বাস্তবতা যে বড়ই কঠিন!
এই বিষয়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ' বইটি সাজেস্ট করে রাখলাম।
লেখিকা সেরিনা জাহান মস্কোর ‘প্যাট্রিস লুমুম্বা ফ্রেন্ডশীপ ইউনিভার্সিটিতে’ আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা বিভাগে অনার্স মাস্টার্স করতে গিয়েছিলেন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ৬ বছর মেয়াদী। সেই সময়ে খুব কাছ থেকে দেখেছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন। সেই ৬ বছরের দর্শন, অভিজ্ঞতা, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিই তুলে ধরেছেন বইটিতে।
আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। একটানা পড়ে শেষ করেছি৷ লেখার মান খুবই ভালো। ভ্রমণকাহিনী এবং ইতিহাসের সংমিশ্রণ। নতুন কিছু টার্মের সাথেও পরিচিত হয়েছি । যা পড়েছি এগুলো খুব সহজেই মনে থাকবে।
pdf পড়েছি -
বই : ধূসর মস্কো লেখক : সেরিনা জাহান (কলকাতার বাসিন্দা) প্রকাশক : একুশ শতক, ১৯৯৬, কলকাতা পৃষ্ঠা : ২২৪ ২৭ মার্চ ২০২৪