১৯৬২ সাল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি আমি প্রায় অর্ধশতাধিক উর্দু গল্প অনুবাদ করেছি এবং বিভিন্ন সময়ে তা দেশের বিশিষ্ট পত্র-পত্রিকাগুলোতে হাপা হয়েছে। এই গল্প-সম্ভার থেকে বাছাই করে একটি অনুপম গল্প সংকলন পাঠকদের উপহার দেয়া হলো। আশা করি উপমহাদেশের সব রকমের গল্প পড়ার স্বাদ পাঠকরা এই একটি বই থেকে পাবেন। এই গল্পগুলো বাছাই করার সময় দুটি বিষয়ে আমি বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছি। তা হলো, উর্দু ছোটগল্পের জনক মুন্সী প্রেমচান্দ থেকে শুরু করে আজকের নবীন উর্দু লেখকদের মাঝে মোটামুটি একটি ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং ছোটগল্পের বিষয় ও আঙ্গিকগত বৈচিত্রের দিকে লক্ষ রাখা। বইটি প্রকাশের মুহূর্তে আজ আমার বিশেষভাবে মনে পড়ছে সাপ্তাহিক পূর্বদেশের সম্পাদক ও 'নটীর প্রেম' খ্যাত সাহিত্যিক কাজী মোহাম্মদ ইদরিস-এর কথা। প্রথম দিকে আমি কবিতা ও ছোটগল্প লিখতাম। কিন্তু তা থেকে হঠাৎ অনুবাদের জগতে প্রবেশ করার পেছনে কালী ভাইর প্রথম প্রেরণা আমার জীবনের অন্যতম প্রধান ঘটনা। কাজী ভাই বলেছিলেন, আমাদের এখানে অনুবাদের বড় অভাব। তুমি অনুবাদ করো, আমি 'তিতাস বুকস' থেকে তোমার একটা সংকলন করিয়ে দেব। কিন্তু আজ তিতাসও নেই, কাজী ইদরিসও নেই এবং সেই প্রস্তাবিত সংকলন বের হলো দীর্ঘ দেড় দশক পরে মুক্তধারা থেকে। বইটিতে এমন দু'একটি গল্প রয়েছে যেগুলোর অনুবাদ প্রথম দিকের এবং কিছুটা কাঁচা হাতের ছাপ রয়েছে তাতে। সময়ের স্বল্পতার জন্য লেখাগুলো মাজাঘষা করা সম্ভব হয়নি। আগামীতে সংকলনটিকে আরো পরিমার্জিত করার ইচ্ছে রাখি। সহৃদয় পাঠকরা যদি বইটির উৎসর্ষ-অপকর্ষ সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেন তাহলে আমরা বিশেষ বাধিত হবো।
প্রাবন্ধিক, অনুবাদক মােস্তফা হারুণ বাংলা ভাষায় অনুবাদের জন্য বিশেষ স্থান গড়ে গেছেন। তাঁর অনুবাদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে হয়। ‘আমি গাধা বলছি’, ‘গাঞ্জে ফেরেশতে’, ‘ভগবানের সাথে কিছুক্ষণ’, ‘মান্টো এবং কালাে শেলােয়ার’-এর মতাে বিখ্যাত বইয়ের প্রাণবন্ত অনুবাদ কর্মের জন্য ১৯৮৭ সালে শ্রেষ্ঠ অনুবাদক হিসেবে ত্রয়ী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসাবে প্রায় দুই দশক যাবত সক্রিয় মােস্তফা হারুণ দৈনিক পয়গাম, আজাদ ও ইত্তেফাকের সাথে যুক্ত ছিলেন।
মোস্তফা হারুনের সাবলীল অনুবাদে কৃষণ চন্দর কিছু বই আগেই পড়া ছিল। তবে এরকম উর্দু গল্প সংকলন আমার জন্য প্রথম। এতে প্রথমেই আছে মুন্সী প্রেমচাঁদের লিখা পঞ্চায়েত। বিচারকের আসন অলংকৃত করলে বন্ধুত্ব বা শত্রুতা সব থেকে দূরে সরে যে সঠিক বিচার করতে হয়, এই গল্পের মূল আলেখ্য সেটিই। পরের গল্পটি কৃষণ চন্দর রচিত করিম খান। এটি স্যাটায়ার ঘরানার। এর পরের সা'দত হাসান মান্টোর শহীদ গল্পটিও আসলে স্যাটায়ারই। কিন্তু মন্টোর অন্য যে গল্প বোতল এতে যে আসলে লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন, আমার মাথায় আসেনি। রামুর হাঁসুলী তে খাজা আহমদ আব্বাসের কলমে বর্ণিত হয়েছে চিরাচরিত অবহেলিত পিছিয়ে থাকা কৃষক সমাজের চিত্র। যেখানে ফসলের উৎপাদন বেশি হোক আর কমই হোক, তাদের ভাগ্য ফেরে না, বউয়ের জন্য হাঁসুলীও এ বছর না পরের বছর এই করে চলতে থাকে। কুররাতুল আইন হায়দারের সেই দুটি চোখ কিছুটা হলেও স্তম্ভিত করে দেয়। প্রতারণার আড়ালে প্রেমিক-প্রেমিকার বিচ্ছেদের পরেও, যে অসম্ভব ঘটনার সমপাতনে প্রেমিকার চোখদুটি হাজির হয়ে যায় জীবনে, তা তো স্তম্ভিত করে দেয়ার মতোই! তার অন্য গল্প কারমিনও আরেকটি বিচ্ছেদের গল্প, খানিকটা একই ছাঁচে গাঁথা। "জীবনের যাত্রাপথে পদে পদে পা পিছলে যাবার ভয়, বাঁকে বাঁকে সাদা কালো নেংটা ভগবানদের দর্শন মেলে। অসহায় পথিকদের গন্তব্যে পৌঁছে দেবার জন্য ভগবানদের হস্ত সর্বদা সচকিত।" কুদরতুল্লা শাহাব এই বাক্যদুটি দিয়ে যে কী এক বেদনাদায়ক কাহিনী শুনিয়ে গেলেন অনাথ আশ্রম গল্পের মধ্য দিয়ে! মাঝে মাঝে মানব জীবন নিয়েও কুঁকড়ে যেতে, মিলিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়; এই গল্পের বর্ণিত আখ্যানও তেমনই। তার পরের গল্প মাতেও তিনি সহজ-সরল এক মাঁজী এর কথা বর্ণনা করেছেন; ঠিক গল্প যেন এটি নয়। রবীন্দ্র সিংহ এর পরিখা গল্পটিও হোঁচট খাইয়ে দেয়। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ হলেও তা যেন প্রাণবন্ত নয় বরং প্রাণহারক। পরের গল্পগুলো খুব বেশি উল্লেখযোগ্য নয়। তবে বইয়ের শেষ গল্প, খাজা আহমদ আব্বাসের সোনার চুড়ি এক মানুষের মানবসত্তা ও তার ভিতরের শয়তানের দ্বন্দ্ব সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
নতুন-পুরাতন মিলিয়ে ১৪ জন লেখকের ২৪টি গল্প আছে এতে। মুন্সী প্রেমচান্দ, কৃষণ চন্দর, মান্টো, কুদরতুল্লাহ শাহাব, খাজা আব্বাস, কুররাতুল আইন হায়দারসহ আরও অনেকের গল্পই আছে এতে। গল্পগুলো সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে লেখা। প্রেমচান্দের ‘পঞ্চায়েত’ গল্পে উঠে এসেছে দুই বন্ধুর সম্পর্কের রসায়ন। ‘শহীদ’ গল্পে মান্টো দেখিয়েছেন কোনো কারণ ছাড়াই মানুষ কীভাবে মরে। ‘পর্যটক’ গল্পে কুররাতুল আইন হায়দার লিখেছেন এমন একজনের কথা যিনি নেমেছেন বিশ্বজয়ে। অথচ তার কাছে টাকা পয়সা নেই। ‘ঠাণ্ডা গোস্ত’ গল্পের নিদারুণ কাহিনি এখনও মনকে স্তিমিত করে দেয়। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, কুররাতুলের লেখা ‘সেই দুটো চোখ’, বেজাহাত আলী সিন্দিলুভীর ‘চতুর্থ পথ’, মান্টোর গল্পগুলো।