সালটা তখন ১৮৬৫, চট্টগ্রাম শহরে পুলিশ প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন এক ব্রিটিশ তরুণ অফিসার 'থমাস হারবার্ট লুইন'। চট্টগ্রামে কাজ শুরু করতেই তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে শুরু করে শহরের পূর্বদিকের নীলাভা ধূসর দিগন্ত রেখায় ভেসে থাকা পার্বত্য অঞ্চলগুলো। খবর নেওয়া শুরু করতেই কানে আসে অদ্ভুত বিচিত্র অবিশ্বাস্য অতিলৌকিক গুজবে ভরপুর সব গল্প। ওই পার্বত্যভূমিতে নাকি যারা বাস করে তারা হিংস্র,বর্বর, অসভ্য। তারা সাপ,ব্যাঙ, কীটপতঙ্গ থেকে শেয়াল, কুকুর, হাতি, অজগর হেন কিছু নাই ওরা খায় না। কোনো কোনো জাতি নাকি জ্যান্ত মানুষও কাঁচা খেয়ে ফেলে। এ অঞ্চল তাই সমতল মানুষদের জন্য নিষিদ্ধ এক অঞ্চল।
অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমি লুইন এসব গালগল্প শুনে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেন। ���াঁর বুকে নতুন করে একটা অঞ্চল আবিষ্কারের নেশা জাগতে শুরু করে। একসময় যেখানে ফ্রান্সিস বুকাননের পা পড়েছিলো, এবার তাঁকে ছাড়িয়েও আরো এগিয়ে যাওয়ার আশায় বুক বাঁধে থমাস হারবার্ট লাইন।
লুইন তার আশার পরিপূর্ণতা দিতেই দক্ষিণে বান্দরবানের পাহাড় জঙ্গলাকীর্ণ পথ কেটে, পায়ে হেটে, স্রোতস্বিনী নদীতে নৌকা বেয়ে কালাদান নদীর ওপারে এক নিষিদ্ধ অঞ্চলে গিয়েছিলেন, যেখানে বাস করতো এক দুর্ধর্ষ জাতি সেন্দু, সেই এলাকায় প্রবেশ করে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার সঙ্গী হয়েও ফিরে আসতে হয়েছিলো দুই দুইবার বহুকষ্টে প্রাণ নিয়ে চট্টগ্রামে।
চট্টগ্রামের আরেক দুর্ধর্ষ জাতি ছিলো লুসাই, যাদের আগ্রাসনে তটস্থ হয়ে থাকতো পাহাড় কী সমতল সব জায়গারই বাসিন্দারা। এরা হুট করে এসে কোনো এক পাহাড়ি গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর পুড়ে ছারখার করে দিতো, ধরে নিয়ে যেতো সব নারী, শিশু, তরুণদের আর ব্যবহার করতো দাস হিসেবে। এই দুর্ধর্ষ লসাইয়েরই এক সর্দার রতন পুইয়াকে লুইন জয় করে নিয়েছিলেন নিজের কূটনৈতিক বুদ্ধি দিয়ে। যে গল্প আরেক দারুণ উপখ্যান।
এই পার্বত্য অঞ্চলের গহীনের নানান জাতির সাথে পরিচয় হওয়ার ফলে লুইন জানতে পেরেছিলো তাদের নানান সব আচার সংস্কারের, তাদের খাদ্যাভাসের সাথেও পরিচয় ঘটেছে লুইনের। এই যেমন লুসাই জাতির কথাই ধরা যাক, এদের কেউ মারা গেলে তাদের আত্মীয়স্বজনরা ঐ লাশকে বসিয়ে ভালো কাপড় পরিয়ে তার সামনে খাবারদাবার, অস্তপাতি রেখে তামাকের পাইপ দিয়ে এক কফিনের মধ্যে ভরে কোনো গাছের নিচে পুঁতে দেয়। কিছু কিছু জাতির কিন্তু আরো অদ্ভুত রীতিনীতি রয়েছে। যখন কোনো গোত্রপ্রধান মারা যায়, তখন তারা মৃতদেহ আগুনের উপর রেখে শুকিয়ে তারপর একটা গাছে ঝুলিয়ে রাখে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব নানান অভিজ্ঞতার ফুলঝুরিতে ভরপুর এই 'থাংলিয়ানা' বইটি। বইটিকে আপাদমস্তক একটা ভ্রমণবৃত্তান্ত মনে হলেও প্রতিটা ভ্রমণের কাহিনি পড়ে মনে হয়েছে এক একটা রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারের গল্প পড়ছি। থমাস হারবার্ট লুইনের পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিদের সাথে যে আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো তার বর্ণনা পড়েও হয়েছি মুগ্ধ। ভদ্রলোকের এই বইটি পড়ে স্বীকার করতেই হবে তিনি একই সাথে যেমন দুর্ধর্ষ সাহসী এবং কৌশলী ছিলেন আবার একই সাথে পাহাড়ী এই অঞ্চলে থাকা সহজ-সরল মানুষগুলোর প্রতি ছিলেন আন্তরিক। একই ভাবে তার এই পাহাড়ি মানুষদের জন্য কিছু করার প্রচেষ্টা সেই মানুষগুলোর নিখাত ভালোবাসা জয় করে নিয়েছিলো।
তাই যেকোনো উৎসবেই পাহাড়ী গোত্রপ্রধান বন্ধুর মতো নিমন্ত্রণ করতো লুইনকে, তার সাহসিকতার প্রতি যেমন সম্মান করতো, আবার তার কাছে সহযোগিতাও করতো। তবে সবগল্পই যে সুখকর তেমন কিন্তু না। সব গোত্রপ্রধানই যে তাঁকে পছন্দ করতো এমন কিন্তু না, সেই কাহিনিও বইটিতে স্থান পেয়েছে। আছে এসব গোত্রদের নানান বিশ্বাস, মিথ আর অদ্ভুত আচার, খাদ্য অভ্যাসের বর্ণনা।
বইটি থমাস হারবার্ট লুইনের A Fly On The Wheel এর অনুবাদ বলা যায় না, মূল বই থেকে সম্পাদনা করে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে লেখা ভ্রমণ বৃত্তান্তগুলোই স্থান নিয়েছে এই বইটিতে। অবশ্য পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে লেখা বলেই আমারও বইটি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। বইটির নামটাও বেশ চমৎকার, এই নামের পিছনেরও আছে একটা গল্প। অবশ্য সেটা আমি এখানে উল্লেখ করছি না, কেউ বইটি পড়লে তাঁকে বিষয়টা দারুণ আমোদিত করবে বলে মনে করি।
শেষদিকে এসে লুসাইসহ কয়েকটা গোত্রের কার্যক্রমে অতিষ্ঠ হয়ে ব্রিটিশদের চালানো এক অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ আছে বইটিতে যেখানে থমাস হারবার্ট লুইনও ছিলেন, তার কুটনৈতিক দক্ষতা আর পাহাড়ি সহজসরল মানুষগুলোর তার প্রতি বিশ্বাসের ভিত্তিতে অভিযান সফল হয়েছিল, উদ্ধার করা হয়েছিলো কিছু অপহরণ করা ব্রিটিশ মানুষদের। মূলত এই অভিযানটা করা হয়েছিলো এক ছয় বছর বয়সি মেরি ওয়ইনচেস্টার বা জেলুটির জন্য, তার সেই অপহরণ হওয়া নিয়েও বিস্তারিত আছে বইটিতে।
সেই অভিযানের পরে লুসাই জাতির সাথে এক ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো লুইন বা থাংলিয়ানার সাথে। যাকে পাহাড়িরা নিজের গোত্রপ্রধানের মতোই বিশ্বাস করতো। এবং কী পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলস কাজ করে যাওয়া, নানান সব আইন পদ্ধতির সংস্কারসহ পাহাড়ি মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই বইটিতে। সত্যি বলতে বইটি পড়ে লুইনের পাহাড়িদের প্রতি যে ভালোবাসা, আন্তরিকতা ফুটে উঠেছে তা খুবই বিরল এখনকার সময়েও।
থাংলিয়ানা আমার পড়া চমৎকার একটা বই, যা হৃদয়ে দাগ কেটে গেছে। বইটি ভ্রমণ কাহিনি হলেও এক একটা অধ্যায় যেনো গল্পের বই থেকে তুলে আনা টানটান উত্তেজনাকর কোনো গল্প মনে হয়েছে আমার। ফ্রান্সিস বুকাননের বইটি পড়ে যতটা না বিরক্ত হয়েছি, থাংলিয়ানা পড়ে ঠিক তার চেয়েও বেশি হয়েছি মুগ্ধ। কেননা ফ্রান্সিস বুকাননের ভ্রমণ ছিলো বাণিজ্যিক, যার ফলে তার বর্ণনায় রসকষহীন ভৌগোলিক অবস্থাই স্থান পেয়েছে বেশি। কিন্তু থাংলিয়ানার পার্বত্য অভিযান স্বপ্রণোদিত হওয়ায় ছিলো স্বতস্ফূর্ত বর্ণনা। যেখানে পাহাড়ি মিথ, আচার, খ্যাদাভাস, উৎসব, তাদের জীবনধারাসহ নানান দিকও উঠে এসেছে গল্পের ছলে।
বইটি বের হয়েছে কথাপ্রকাশ থেকে, তাদের প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে আসলে বলার কিছু নেই। অনুবাদ একেবারে ঝরঝরে, বানানভুলও চোখে পড়েনি একদম। সব্যসাচী হাজরার প্রচ্ছদও আমার কাছে দারুণ মনে হয়েছে, তবে মূদ্রিত মূল্যটা বেশি মনে হয়েছে ২০০ পৃষ্ঠা একটা বইয়ের। যদিও বইটি পড়ে যাকে বলে পয়সা উসুল করা বই মনে হয়েছে আমার।