লেখালেখির চর্চা শুরু স্কুল জীবনেই। প্রথম লেখা ছাপা হয় আসানসোল রামকৃষ্ণ মিশনের স্কুল ম্যাগাজিনে। কলেজের পত্রিকার সম্পাদক ১৯৬৮-৬৯ সালে। চাকরি জীবনের শুরুতেও অনেক লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা। লিখেছেন ‘উত্তরবঙ্গ সংবাদ’ পত্রিকায়। টেলিগ্রাফ সানডে ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজি ছোট গল্প। কর্মজীবনে দায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কলম বন্ধ পড়ে থাকে প্রায় দুই দশক। ২০১৫ সালে, ৬৫ বছর বয়সে সমস্ত রকম কাজ থেকে অবসর নিয়ে নতুন করে লেখা শুরু। প্রথমে সামাজিক মাধ্যমে লেখা দিয়ে শুরু করে গত কয়েক বছরে লিখেছেন খান দশেক বই, যা পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। সাত দশক পেরিয়েও নিজেকে ব্যস্ত রাখেন পড়াশোনা, ছবি আঁকা এবং দেশ বিদেশ ঘোরার নেশায়।
বিনয়বাবু ও তাঁর বন্ধু তথা পরিচিতদের নিয়ে অলৌকিক কাহিনির যে সিরিজটি 'তিব্বতি পুঁথি' দিয়ে শুরু হয়েছিল, তার তৃতীয় আখ্যানটি স্থান পেয়েছে এই বইয়ে। কাহিনির সূত্রপাত হয় গঙ্গার তীরে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি দেখতে যাওয়ায় মধ্য দিয়ে। সেই বাড়িতে অশুভ শক্তির উপাসনার শতবর্ষ-প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে যায় তেমন উপাসনার বর্তমান অস্তিত্ব এবং তার উপাসকদের সন্ধানে সুদূর আমেরিকায় চলতে থাকা এক গোপন অনুসন্ধান। হিংস্রতা ও মৃত্যুর এই দুই সমান্তরাল ঘটনাক্রম বিনয়বাবুর পরিচিত প্রফেসর দাশগুপ্তের জামাতা ও তার স্ত্রী-পুত্রকে কেন্দ্র করে একবিন্দুতে মিলিত হয়। আর তারপর একে-একে উন্মোচিত হয় এক ভয়ংকর সংগঠনের আগ্রাসী রূপ। তখনই প্রশ্ন দেখা দেয়, মন্ত্র বা যন্ত্রের অতি সীমিত পুঁজি নিয়েও কি বিনয়বাবুরা এই দুর্ধর্ষ দুশমনদের মোকাবিলা করতে পারবেন? এটি একটি সার্থক হরর উপন্যাস যার লক্ষ্য প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক। এতে বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচিত হয়েছে নানা দেশ ও কালে অশুভ শক্তি উপাসনার খণ্ড-খণ্ড রূপ। এসেছে সমকালীন রাজনীতি, দুর্নীতি এবং সামাজিক অপরাধের নানা সূত্র। তবে সামগ্রিকভাবে এটি একটি নিপুণ শুভ বনাম অশুভ সংঘাতেরই রূপ নিয়েছে— যাতে অশুভশক্তির বিরুদ্ধে যোদ্ধা হিসেবে দেখা দিয়েছে দুটি অপ্রত্যাশিত শক্তি। লেখনী অত্যন্ত সহজ। গল্প যে সলিড তা তো আগেই লিখেছি। তবে বইটি প্রকাশের আগে আরেকটু পরিমার্জনা করলে লেখাটা আরও ঠাসবুনট হত; সবক'টি চরিত্রও যথাযথ গুরুত্ব পেত। সখেদে জানাই, এই সিরিজের প্রটাগনিস্ট বিনয়বাবুই এই বইয়ে আদ্যন্ত পার্শ্বচরিত্র হয়ে রয়েছেন। গল্পের শেষটাও বড়ো বেশিরকম 'ডিউস এক্স মাখিনা' গোছের হয়ে গেছে। তবু, প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য হরর উপন্যাস হিসেবে এটি দারুণ লেখা। অতি সামান্য ক'টি ছাড়া মুদ্রণপ্রমাদও পাইনি। তাই সব মিলিয়ে বলব, হরর উপন্যাস পড়তে চাইলে এটিকে উপেক্ষা না করলেই ভালো। অলমিতি।
কিছু টেকনিক্যাল ত্রুটি থাকলেও গল্প মোটামুটি ভালোই জমেছিলো (যদিও প্রায় ৫০ পাতার পরে)। শেষার্ধ বেশ সিনেম্যাটিক, আর গল্পের মুখ্য এন্টাগোনিস্ট যেহেতু অলৌকিক শক্তিধারী, তাই হয়তো ক্লাইম্যাক্সে আধিদৈবিক শক্তির অবতারণা করা হয়েছে, মানুষ চরিত্রেরা সেখানে দর্শকমাত্র।
তিব্বত, নন্দাদেবীর মতো পার্বত্য এলাকার বদলে কলকাতা আর চুঁচুড়ার শহুরে পরিবেশে এই অকাল্ট ফ্যান্টাসি বেশ উপভোগ্য, আর গল্পের পরিধি এবার দেশ ছাড়িয়ে ইন্দোনেশিয়া থেকে ইতালি, নেদারল্যান্ড হয়ে মার্কিন মুলুক অবধি বিস্তৃত। এছাড়া চুঁচুড়ার ঔপনিবেশিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ বেশ ভালো লেগেছে।
গল্পে শেষ অবধি অশুভের পরাজয় আর শুভশক্তির জয় হয়েছে। হয়তো এই কাহিনীর পরের সিক্যুয়েল আসবে, লেখক কিঞ্চিৎ সূত্র রেখেছেন। পরবর্তী উপন্যাসের অপেক্ষায় রইলাম...
প্রকাশককে অনুরোধ বইটির এডিটিং আরেকটু ভালো করে করানোর জন্য। বেশ কিছু জায়গায় অহেতুক বাক্য আছে, যা কাটছাঁট করলে কাহিনী আরও সুঠাম হবে।
লেখকের তিব্বতি পুঁথি সিরিজ এর তৃতীয় বই এটি। লেখনী as usual ভালো, গতিময়, টানটান। তবে আরেকটু পরিমার্জন করা যেতো উপন্যাসটা। কোনো রকম কোথাও info dumping আছে বলে আমার মনে হয়নি। তবে এরকম একটি লেখার ending টা আরও ভালো হতেই পারত।