তিব্বতে অভিযানের সময় অসীম সাহসী অতীশ দীপঙ্করকে যেমন আমরা মনে করেছি, তেমনই বারবার মনে হয়েছে শরচ্চন্দ্র দাসের কথা। তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম গুপ্তচর। তাঁর গুপ্তচর পরিচয় কোনো সময় জানা যায়নি। এই কারণেও শরচ্চন্দ্র দাস আমাদের কাছে এক বিস্ময়! চট্টগ্রামের মানুষ, কলকাতায় লেখাপড়া করেন। দুর্গম তিব্বতে একাধিকবার মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে মহাগোপনীয় মিশন সাফল্যের সাথে শেষ করে দার্জিলিংয়ের ‘লাসা ভিলা’য় জীবন কাটিয়ে গেলেন রহস্যময় মানুষটি। এই বই শরচ্চন্দ্র দাস সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে অনেক সহায়ক হবে।
শরচ্চন্দ্র দাস ব্রিটিশদের পক্ষে তিব্বতে গুপ্তচর হিসেবে কাজ করতে গিয়েছিলেন ১৮৭৯ ও ১৮৮১ সালে। ব্রিটিশরা তাদের সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের উপায় হিসেবে বিভিন্ন দেশে তাদের চর পাঠাতো সেসব দেশের ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য। এটা মাথায় রেখেই বইটা পড়া শুরু করেছিলাম। তিব্বত পাহাড়ি দেশ যেখানে ভ্রমণ করা এমনিতেই অত্যন্ত বিপদজনক।আজ থেকে প্রায় ১৪০ বছর আগে তীব্র শীতে, ভয়াবহ কষ্ট উপেক্ষা করে, নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে শরচ্চন্দ্র যেভাবে লাসাসহ তিব্বতের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেছেন, তিব্বতিদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করেছেন ও তিব্বতি ভাষার প্রেমে পড়েছেন তা পড়ে বিস্ময়ে হতবাক হতেই হয়। কিন্তু ভ্রমণশেষের ঘটনা, যা হারুন রশীদ বিধৃত করেছেন, পড়ে মর্মপীড়ায় ভুগছি। শরচ্চন্দ্র তিব্বত ছেড়ে চলে আসার পর তিনি যে ব্রিটিশদের গুপ্তচর এ পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়। তাকে যারা সাহায্য করেছে তাদের প্রত্যেককে নির্মম পরিণতি বরণ করতে হয়। মন্ত্রী লামা সেংচেন দোরজেচান শরচ্চন্দ্রকে অসীম মমতায় তিব্বতে আগলে রেখেছিলেন। এই মানুষটি বিজ্ঞানের বিবিধ বিষয়ে ছিলেন তুমুল উৎসাহী। তাকেও মেরে ফেলা হয় শরচ্চন্দ্রকে সহায়তা করার অপরাধে। অথচ মন্ত্রী তার কাছে আশ্রয় নেওয়া "নিরীহ বাঙালি"টির আসল পরিচয় কিছুই জানতেন না। শরচ্চন্দ্র কি কোনোদিন এই মানুষগুলোর মৃত্যুর নৈতিক দায় মেনে নিয়েছিলেন?
গুপ্তচর কাহিনী ভালোবাসে না এমন পাঠক পাওয়া দুষ্কর। মাসুদ রানার সাথে স্পাই ইউনিভার্সে হারিয়ে গেছেন কত বাংলাদেশী পাঠক। সেইসব আর এই গুপ্তচর কাহিনী একই না হলেও শরচ্চন্দ্র দাসকে মাসুদ রানার গুরু রাহাত খানেরও গুরু বলা যায়! কারণ বাঙালি গুপ্তচর হিসেবে তিনি নিষিদ্ধ দেশের উদ্দেশ্যে যে দু:সাহসী অভিযান চালিয়েছিলেন তা বাঙালি হিসেবে গর্বে আধহাত বুক ফুলিয়ে দেয় বৈকি! হারুন রশীদের প্রাণবন্ত অনুবাদে আমি সম্পূর্ণভাবে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম শরচ্চন্দ্র দাশের এই অভিযানের সাথে৷ তাঁর দার্জিলিং থেকে যাত্রা এবং বহু দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে লাসাতে পৌঁছানো পর্যন্ত আমিও সঙ্গী হয়ে দেখে নিচ্ছিলাম প্রাচীন পাহাড়ী জীবনযাত্রা, চমরি গাই, ইয়াকদের। খাবারদাবারের বৈচিত্র্য আর জনপদের মানুষের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি অভিভূত করছিল। শরচ্চন্দ্র যথেষ্ট ভাগ্যবান ও ছিলেন কারণ নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয়ে এক পর্যায়ে তিনি যেভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তাতে বাড়াবাড়ি কিছু হলে এই ভ্রমণকাহিনীটাই অবশ্য লেখা হয়ে উঠত না। অচেনা জনপদে একটা আবছা পরিচয়ে ভালো চিকিৎসাব্যবস্থা ছাড়াও তিনি যে সেরে উঠে কাজটা শেষ করতে পেরেছেন তা নিশ্চয়ই একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। পরবর্তীতে তাঁর এই অভিযান তিব্বতে যাঁরা তাঁর পরিচয় সম্পর্কে না জেনে সাহায্য করেছিলেন, তাঁদের জীবনে দুর্বিষহ যন্ত্রণা বয়ে আনলেও ব্রিটিশ ভারতের উপরমহল কর্তৃক শরচ্চন্দ্র আদৃতই হয়েছিলেন। সিক্রেট এজেন্ট হওয়া সত্ত্বেও তিনি আসলে কেবল ঐ উদ্দেশ্যেই লাসা যেতে চাননি৷ তাঁর তিব্বতি ভাষা শেখার আগ্রহ, সেই দেশকে জানার আগ্রহ, দেশটির প্রতি ভালোবাসা এসবও গুরুত্ব রেখেছিল। যাত্রার ফাঁকে ফাঁকে আমরা পরিচিত হয়েছি সেখানকার জীবনযাত্রার সাথে৷ সেখানে নারীদের একাধিক স্বামী গ্রহণের যে সংস্কৃতি তা উচ্চপদস্থ নারী দ্বারা কিন্তু প্রশংসিত হয়েছিল। ভারতীয়দের তুলনায় নিজেদের উন্নতই মনে করতেন তাঁরা। শরচ্চন্দ্র এর জন্ম চট্টগ্রামে৷ ছোট ভাই নবীনচন্দ্র কবিগুণাকর। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কলকাতা প্রেসিডেন্সিতে সিভিল ইঞ্জিয়ারিং পড়ার সময় ব্রিটিশ সরকারের তরফ থেকে দার্জিলিং এ ভুটিয়া শিক্ষক হওয়ার সাদামাটা প্রস্তাবটাই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় তাঁর৷ "দার্জিলিং যাবার কয়েক বছরের মধ্যে তিনি জড়িয়ে পড়েন উনিশ শতকে মধ্য এশিয়ায় বৃহৎ শক্তিবর্গের মধ্যেকার দ্য গ্রেট গেমের জালে।" ফ্ল্যাপের লাইনটি হুবহু তুলে দিলাম অভিযানটি গুরুত্ব বোঝাতে৷ শরচ্চন্দ্রকে অনেকেই হয়তো চেনে না তাঁর নিজের শহরেও। তবে রাজদূতের বাড়ি বললে কিন্তু এখনো লোকে বাড়িটা চিনিয়ে দেয়। পরিমল ভট্টাচার্য এর শাংগ্রিলার খোঁজে বইতে শরচ্চন্দ্র সম্পর্কে অনেকটা জেনেছিলাম৷ এই বই পূর্ণাঙ্গ একটা অনুভূতির স্বাদ দিল।
১৮৪৯ সালে চট্টগ্রামের পটিয়া থানার ধলঘাট ইউনিয়নের আলামপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এক দুঃসাহসিক বাঙালি শরচ্চন্দ্র দাস নামক ছেলেটি ১৮৭৯ সালে গোপন ব্রিটিশ পরিকল্পনায় এক মিশন নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলো তিব্বতে। যা খুব কম মানুষই জানে এবং কী শরচ্চন্দ্রের জন্মস্থানের মানুষও এই খবরটি জানে না এখনো অনেকে। বেশির ভাগ লোক তার নামও জানে না। তার বাড়ি খুঁজতে গিয়ে বলতে হবে রাজদূতের বাড়ি যেতে চাই কারণ তার পূর্বপুরুষের সেই ভিটা এখন রাজদূতের বাড়ি নামে পরিচিত, আর শরচ্চন্দ্র দাসই ছিলেন সোয়া শতক আগের ব্রিটিশদের আশীর্বাদপুষ্ট রাজদূত।
সময়টা তখন ১৮৭৪ সাল, ছোটো ভাইয়েরই জোড়াজুড়িতে শরচ্চন্দ্র দাস শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন দার্জিলিং শহরের ভুটিয়া বোডিং স্কুলে। এই স্কুলে এসেই তিব্বতি নানান জনের পরিচয় আর তিব্বত সম্পর্কে বই পড়ে তার আগ্রহ জন্মে তিব্বত ভ্রমণে যাওয়ার। কিন্তু তিব্বত ভ্রমণের জন্য ব্রিটিশ সরকারের অনুমতির জন্য গেলেই পার্বত্য চট্টগ্রামের থাংলিয়ানা নামে খ্যাত ডেপুটি কমিশনার থমাস হার্বার্ট লুইন বেশ তাচ্ছিল্য করেই তাকে অপমান করে।
অবশ্য সেই অপমান তাকে সরাতে পারেনি তিব্বত ভ্রমণ থেকে, ১৮৭৯ সালের ২২শে মে ঠিকই অনুমতি নিয়ে উগেন গিয়াৎসোকে সঙ্গে নিয়ে দূর্গম অঞ্চল পাড়ি দিয়ে তিব্বতের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায় শরচ্চন্দ্র দাস। যার প্রথম সফরটি হয় তিব্বতের তাশিলুম্পোতে। যার যাত্রা থেকে আবার দার্জিলিং এ ফিরে আসার আগ পর্যন্ত প্রতিটি বর্ণনা শরচ্চন্দ্র লিখেছেন তার ডায়রির পাতায়, প্রতিটি তারিখের ক্রমান্বয়ে প্রতিটি পদক্ষেপের গল্প।
যেখানে দূর্গম পর্বত পাড়ি দেওয়া থেকে শুরু করে খরস্রোতা নদী পার হওয়া, কখনো তুষারে পা হরকে নিচে পতিত হওয়ার গল্প লিখেছেন বইটিতে। আছে যাত্রা পথের প্রতিটা রাতের গল্প, যে রাতগুলোর কোনোটা কেটেছে গুহায় কিংবা শীতে কাঁপতে কাঁপতে তাবুতে, তো কোনো কোনো রাত কেটেছে পাহাড়ের চূড়া কিংবা পাদদেশের গ্রামের গোয়াল ঘর কিংবা আরামদায়ক রুমে। কখনো কখনো সীমান্ত পার হওয়াটাও ছিলো কঠিন থেকে কঠিনতর, তাই সরাসরি সীমানা অতিক্রম না করে ছুটতো হয়েছে নেপাল হয়ে যাওয়ার জন্য।
সফরটি শরচ্চন্দ্রের জন্যও যেমন আনন্দের ছিলো, ব্রিটিশদের জন্যেও ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশরা শরচ্চন্দ্রকে একজন গুপ্তচর হিসেবেই নিয়োগ করেছিলেন সফরটিকে যা সফল ভাবে শেষ করেন তিনি। যার জন্য তাকে রায়বাহাদুর উপাধি ও সিআইএ পদক দেওয়া হয়েছিলো��
এই সফরের বর্ণনায় বইটিতে যেমন প্রাকৃতিক বর্ণনা পাবেন তার পাশাপাশি এই অঞ্চলের নানান গ্রাম শহরের স্থানকাল ভেদে যে খাবার, ধর্মীয় বিশ্��াস, সংস্কৃতি, মিথসহ নানান উৎসব নিয়ে পরিচয় হবে। শরচ্চন্দ্র দাস তার ডায়রিতে সেই সব বর্ণনাও উপস্থাপন করেছেন।
এই সফরেরই শরচ্চন্দ্রের সাথে পরিচয় হয় মন্ত্রী শেংচেন দোরজেচানের, যিনি বন্ধু হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলেন শরচ্চন্দ্রকে, বৌদ্ধধর্মে শিক্ষা দীক্ষার বয়বস্থা করেছেন। তাদের বন্ধুত্ব এতলটাই গাঢ় ছিলো যে তারা প্রায়ই গণিত, মহাকাশ সহ বিভিন্ন বিষয়ে মেতে থাকতেন। মন্ত্রী শরচ্চন্দ্রকে উপহার হিসেবে অনেক প্রাচীন তিব্বতি পান্ডুলিপি দিয়েছিলেন, সেই সাথে অনুরোধ করেছিলেন পরের বার যখন তিব্বত আসবেন সাথে প্রিন্টিং মেশিন আনার জন্য। মন্ত্রীর সাথে তার এই পরিচয় সফরটিকে আরো সহজ করে দিয়েছিলো শরচ্চন্দ্রের জন্য।
যার প্রেক্ষিতে শরচ্চন্দ্র দ্বিতীয়বার আবারও তিব্বত সফর করেন সফলভাবে, যে সফরে তিব্বতে গুটিবসন্ত ছড়িয়ে পড়ায় বেশ অসুবিধায় পড়তে হলে হয় তাকে। সেই সাথে শরচ্চন্দ্র নিজেই জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রোগে আক্রান্ত হয়ে বেশ বিপাকেই পড়েন সেবার। অবশ্য অসুখ থেকে সুস্থ লাভ করেই সেইবার তিব্বতের লাসায় মহান দালাই লামার সাথে দেখা করার সুযোগ হয় তার, সাথে দর্শন লাভ করার সুযোগ হয় তিব্বতের বিখ্যাত পোতালা প্রাসাদে ভিতরের। এই সফর থেকেও শরচ্চন্দ্র বেশ ভালো ভাবে ফিরে আসেন দার্জিলিং এ।
বইটি মূলত শরচ্চন্দ্রের সেই দুই দুইবার তিব্বত সফরের বিস্তারিত বর্ণনা স্থান পেয়েছে। যা প্রতিবেদন হিসেবে জমা দিয়েছিলেন ব্রিটিশ সরকারকে। আর ব্রিটিশ সরকার তা বহুবছর টপ সিক্রেট হিসেবে গোপন রেখেছিলো নিজেদের আর্কাইভে। শরচ্চন্দ্র দাস যে সময়ে তিব্বত সফর করেন সেই সময়ে তিব্বতিরা বিদেশিদের সহ্য করতে পারতো না, তার সাথে চীনা আগ্রাসনের কারণে তাদের মনোভাব আরো কঠিন হয়ে উঠে। আর তাই এই সময়ে শরচ্চন্দ্র দাসের বহিরাগতদের জন্য নিষিদ্ধ তিব্বত ভ্রমণ বেশ দুঃসাহসিকই বলতে হয়। যার রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং প্রাকৃতিক নানান বাঁধা তাকে পেরিয়ে এই সফলতা অর্জন করতে হয়েছিলো।
বইটি আপাদমস্তক একটা ভ্রমণ কাহিনি বলতে পারেন, যেখানে শরচ্চন্দ্রের ভ্রমণ বৃত্তান্তে প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি, তিব্বতি অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতি, রাজনীতিসহ নানান বিষয় লেখক তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। যার বর্ণনাটা করা হয়েছে অনেকটা তারিখ অনুসারে ডায়রি লেখার মতো করে।
নির্ঝঞ্ঝাট ভ্রমণ কাহিনি যারা পড়তে চান তাদের জন্য বইটি আমার মনে হয় বেশ ভালোই লাগবে। তবে এই গল্পে তিব্বত আপনাকে আগ্রহ তৈরি করতে পারবে কি না আমার সন্দেহ আছে। কারণ এখানে শরচ্চন্দ্র তিবতের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা বেশ সাদামাটাই বলতে হবে। আর তাই সব বর্ণনা রোমাঞ্চকর মনে হবে না। তবে মিথ থেকে বের হয়ে বাস্তবের উনিশশতকের তিব্বতকে দেখতে চাইলে বইটি চমৎকার চয়েস হবে।
বইটিতে শরচ্চন্দ্রের সফরের রিপোর্টের অনুবাদের পাশাপাশি তাকে ঘিরে এবং তার তিব্বত সফর পরবর্তী সময়ে তিব্বতের রাজনৈতিক পালাবদল নিয়ে ধারণারও উল্লেখ আছে। এই অংশটা আমার কাছে বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে, যা মনে দাগ কাঁটার মতোই।
বইটি শরচ্চন্দ্রের ব্রিটিশের কাছে তাঁর দুইবারের তিব্বত সফরে জমা দেওয়া প্রতিবেদন থেকে যে কয়টা কপি ইংরেজি ছাপানো হয়েছিলো তা থেকে হারুন রশীদ বইটি অনুবাদ করেছেন সাথে শরচ্চন্দ্র দাস সম্পর্কেও বেশ কিছু তথ্য যুক্ত করেছেন বইটিতে। এক্ষেত্রে হারুন রশীদের কাজটি বেশ চমৎকার লেগেছে আমার, সাথে সব্যসাচী হাজরার বইটির প্রচ্ছদ আমার বেশ আকর্ষণীয় লেগেছে যদিও দামটা বেশ বেশিই বলতে হবে। তবে কেন যেনো মনে হয়েছে এই প্রতিবেদনে অনেক কিছুই উল্লেখ নেই যা গুপ্তচরের দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে শরচ্চন্দ্র ব্রিটিশদের জানিয়েছিলেন।
কেউ নিতান্তই সাদামাটা ভ্রমণ কাহিনি পছন্দ করলে তার জন্য বইটি ভালোই লাগবে। কিন্তু তিব্বত নিয়ে আমরা যে মিথলজিক্যাল কল্পনা করি তার কিছুই বইটিতে পাবেন না। তাই তিব্বতের প্রকৃতি, ধর্ম, রাজনীতি, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি এসব বিষয় নিয়ে যদি আপনার আগ্রহ থাকে তাহলে বইটি আশাকরি ভালো লাগবে।
হারুন রশীদের ‘শরচ্চন্দ্র দাস: নিষিদ্ধ তিব্বতে প্রথম বাঙালি' বইটা নিয়ে লিখবো লিখছি করতে করতে অনেকটা সময় গড়িয়ে গেছে। আগে পছন্দসই বই পড়ার পরপরই গুডরিডসে মোটামুটি পাঠপ্রতিক্রিয়া দেওয়া হতো। নানা ব্যস্ততা আর বাস্তবতায় এখন তাতে বেশ ভাটা পড়েছে। আবার যখন গুডরিডসে নিয়মিত হওয়ার একটা তাগিদ মনের ভেতর বুড়বুড়ি কাটা শুরু করেছে, ভাবলাম ভুলে যাওয়ার আগে শরচ্চন্দ্র দাসের জবরদস্ত বৃত্তান্ত পড়বার অনুভূতিটুকু লিখেটিখে রাখি।
এই বই বিখ্যাত বাঙালি অভিযাত্রী, পণ্ডিত ও তৎকালীন দুর্গম তিব্বত বিষয়ে অভিজ্ঞ শরচ্চন্দ্র দাসের জীবন, সাহসিকতা এবং অনুসন্ধানমুখী কার্যক্রম ঘিরে লেখা। ১৮৪৯ সালে জন্মগ্রহণকারী শরচ্চন্দ্র দাস মূলত একজন বিদ্বান ও গবেষক ছিলেন, তবে তিনি নিজেকে কেবলমাত্র একজন গবেষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি এক সাহসী অভিযাত্রী ছিলেন, এবং এমন সময়ে তিব্বতের অন্তরে প্রবেশ করেছিলেন, যখন এটি ছিল বিদেশিদের জন্য নিষিদ্ধ এবং রহস্যময় এক স্থান।
বইটা শরচ্চন্দ্র দাসের শৈশব, কৈশোর এবং শিক্ষাজীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে শুরু হয়েছে। এরপর তিনি কীভাবে তিব্বত অভিযানে নামলেন এবং সেই অজানা ও বিপজ্জনক অঞ্চলে প্রবেশ করলেন, সেসব এখানে বিশদভাবে বলা হয়েছে। হারুন রশীদ অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে সেই অভিযানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। যেমন শরচ্চন্দ্রের ভাষা-শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বোঝার চেষ্টা, এবং সেই দেশের মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন ইত্যাদি।
এ বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এতে শরচ্চন্দ্রের বৌদ্ধ দর্শন, তিব্বতের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, এবং তিব্বতের ভূগোল ও সাংস্কৃতিক দৃশ্যপটের ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে। লেখক তিব্বতে অবস্থানের সময় শরচ্চন্দ্র দাসের বিভিন্ন গুহা, মঠ, এবং পর্বত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। কীভাবে শরচ্চন্দ্র দাস তিব্বতের অধিবাসীদের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতেন, এবং কীভাবে তিনি সেখানে বেশ কয়েক বছর বাস করে বাঙালি পাঠকদের জন্য এক নতুন জগতের দরজা খুলে দিয়েছিলেন– তার মনোঞ্জ বর্ণনা রয়েছে এখানে।
হারুন রশীদের বর্ণনাভঙ্গি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তিনি পাঠককে এক ঐতিহাসিক যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যান, যেখানে শরচ্চন্দ্র দাসের মতো বাঙালি পণ্ডিতদের ভূমিকা বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। বইটি পাঠককে শরচ্চন্দ্রের মাধ্যমে তিব্বতের অজানা পথে নিয়ে যেতে সক্ষম, এবং লেখক তিব্বত সম্পর্কে বাঙালি পাঠকের কৌতূহলকে সার্থকভাবে প্রভাবিত করেন।
নিষিদ্ধ তিব্বতের কাহিনি পাঠ শেষে খুব সাধারণ একজন পাঠক হিসেবে এই পাঠকের মনে মিশ্র এক অনুভূতি জন্ম নেয়। শরচ্চন্দ্রের মতো বিদ্বান এবং বিবেচক একজন মানুষ ঠিক কোন যুক্তিতে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের স্বার্থ উদ্ধারের গুটি বা চর হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন? ওরকম চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা তিনি কি স্রেফ প্রভুশক্তিকে খুশি করার তাগিদেই গ্রহণ করেছিলেন, না কি তার পেছনে ছিল তাঁর অনুসন্ধিৎসু মনের নিদারুণ তৃষ্ণা! তাঁর নিষিদ্ধ অভিযানের কারণে তিব্বতের যাদের কাছ থেকে তিনি সাহায্য গ্রহণ করেন, তারা বিপদে পড়তে পারেন, এমন ভাবনায় তাঁকে বিচলিত হতে না দেখাটা পীড়াদায়ক। ত��ে একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়, তাঁর বিতর্কিত অভিযানসমূহ বাংলার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে পাঠকদের কাছে তুলে ধরে। লেখক-অনুবাদক হারুন রশীদকে এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের জন্য সকৃতজ্ঞ ভালোবাসা জানাচ্ছি।
সব শেষে বলা যায়, ‘শরচ্চন্দ্র দাস: নিষিদ্ধ তিব্বতে প্রথম বাঙালি,’ বইটি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুনভাবে পাঠকদের কাছে তুলে ধরে।
তিব্বতের ব্যাপারে বিশেষ জানা ছিল না। জানতাম নিষিদ্ধ দেশ, বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের দেশ - কিন্তু সমতল থেকে এত উঁচুতে অবস্থিত নিষিদ্ধ এই দেশের কৃষ্টিকালচার, প্রথা সমাচার নিয়ে জানার তেমন সুযোগ পাইনি। শরচ্চন্দ্র দাসের দুই ভ্রমণের সঙ্গে নিজেকে কাগজী সঙ্গী করে শুধু জানাই হলো না, দারুণ রোমাঞ্চকর দুটো যাত্রারও অভিজ্ঞতা হলো। জানলাম, বুঝলাম, অনুভব করলাম, শেষটায় খানিকটা পীড়িতও হলাম। তারও শেষে হলো আফসোস। আফসোসের পর ভুগলাম পাপবোধে। এতগুলো বছর শরচ্চন্দ্র দাসের নামটা পর্যন্ত না শোনা অবশ্যই পাপ।।