গ্রামীণ জীবনের খুবই নিশিস্তরের পাঁচজন লড়াকু নারীর পাঁচটি গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে এই গ্রন্থটি। পাঁচটি গল্পের প্লট ভিন্ন। প্রতিটি গল্প বলার ক্ষেত্রেও আলাদা আলাদা ভাষা রইল ব্যবহার করা হয়েছে। কোনটাতে বর্ণনা এবং চরিত্রের মুখের ভাষা দুটোই আঞ্চলিক। কোনোটাতে বর্ণনা চলিত কিন্তু মুখের ভাষা আঞ্চলিক। আবার কোনটাতে বর্ণনা ও চরিত্র দুটোই চলিত ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। ভাষা প্রয়োগের এই বিশিষ্টতা প্রতিটি গল্পকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। তবে সবকিছু ছাপিয়ে লড়াক উপার্জন নারীর কাহিনী আমাদের বোধে অন্যরকম একটা ধাক্কা দেবে।
প্রতিটা প্রাণময় অস্তিত্বের একেকটি গল্প আছে। হাসিময়, অশ্রুভেজা কিংবা প্রেরণার গল্প। সমাজের উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্তেরাই শুধু প্রাণময় গল্প বয়ে বেড়ান না। নিম্নবিত্তের গল্পেও আছে প্রাণ, প্রেরণা, বহু কান্না ও দুর্লভ হাসি।
সাহিত্যে ছোটগল্প কিংবা উপন্যাসের সম্ভার সমৃদ্ধ করতে সমাজের ভদ্রশ্রেণির জীবন বেছে নেয়ার একমুঠো প্রবণতা অনেক সাহিত্যিকের মাঝেই ভীষণরকম স্পষ্ট। এদের দিক থেকে নজর ফিরিয়ে দলিতশ্রেণির গল্প যে একেবারেই কেউ লেখেন না, তা নয়।
তবে সে গল্পগুলো ঠিক প্রাণময় হয়ে ওঠে না। গল্পগুলো পড়ামাঝেই টের পাওয়া যায়, সেই দলিতশ্রেণির গল্পের প্রটাগনিস্টের মুখ দিয়ে লেখক নিজের বিশ্বাস-দর্শন ছড়িয়ে দিচ্ছেন পুরো গল্পজুড়ে। অনেক সময় সেই চরিত্রগুলোর আত্মভাবনা থেকে শুরু করে সংলাপেও বহুমুঠো দার্শনিকতার প্রলেপ মেখে দেন লেখক। লেখকের বিশ্বাস-দর্শন আরোপিত সেই গল্পগুলো তখন পাঠযোগ্য হলেও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না।
কথাসাহিত্যিক কামরুন্নাহার দিপা’র ‘ভাতের কেচ্ছা’ গল্পগ্রন্থটি এই ত্রুটি হতে মুক্ত। এর প্রতিটা গল্প শুধু পাঠযোগ্যই না, একইসাথে তীব্ররকম বিশ্বাসযোগ্যও। কখনো এমনও হয়েছে, ‘ভাতের কেচ্ছা’র কিছু গল্পের সমাপ্তি ঘটেছে এমন কিছু ঘটনাপ্রবাহের পরিণতিতে, পাঠক হিসেবে যা আমার বিশ্বাসের পরিধি অতিক্রম করেছে। সেই বিখ্যাত উক্তি তখন ভেসে ওঠেছে চোখের সামনে, “Truth is stranger than fiction” ; কল্পনার চেয়েও সত্য বড়ই অদ্ভুত।
পৃষ্ঠার হিসেব করলে পাঁচটি গল্পে সাজানো এই গল্পগ্রন্থ কিছু কিছু ম্যারাথন পাঠকের বেলায় এক বৈঠকেই পড়ে শেষ করা সম্ভব। আমি তিন বৈঠকে পড়েছি। আমাকে থেমে থেমে পড়তে হয়েছে। এছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না। প্রতিটা গল্পের বর্ণনার ধাঁচ ও মোচড় এমন তীব্র ছিল, যা আমাকে ধারাবাহিকভাবে এক গল্পের আখেরি বাক্যশেষে পরের গল্পে যেতে পাতা উল্টোতে দেয়নি।
একেকটা গল্প শেষ হওয়ার সাথে সাথে বহুমুঠো ভাবালুতা আমাকে ঘিরে ধরেছে। কিছু গল্পের বেলায় এমনও হয়েছে, গল্পপাঠ শেষে আবারও পেছনের কয়েক পাতা উলটে গল্পের প্রথম দিকের বর্ণনায় চোখ বুলিয়েছি।
বইয়ের পাঁচটি গল্পের শিরোনাম বেশ অর্থবহ, গল্পের সাথে যৌক্তিকরূপে প্রাসঙ্গিক। ‘ফিরোজা’, ‘পরসমাচার’, ‘ভাতের কেচ্ছা’, ‘ক্ষয়ে যাওয়া জীবন’, ‘কপোত এবং একজন লেকু মিয়া’।
একে একে প্রতিটা গল্প নিয়ে আলাপ তুলে ধরতে চেষ্টা করছি।
‘ফিরোজা’ গল্পে আমরা পরিচিত হবো এমন এক নারীর সাথে, এক জীবনে যাকে অসংখ্যবার বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে, কিন্তু যথাযোগ্য ভালোবাসা পেয়েছে হাতে গোনা ক’জনের কাছ থেকেই।
একের পর এক বিয়ে ভেঙে যাওয়া, পেটের দায়ে পরের বাড়িতে ঝি-গিরি করা- এসবের মাঝেই তার জীবন বিষময় বাষ্পে ভরে ওঠছিল। উপর্যুপরি না-পাওয়ার ঝুলি যখন পূর্ণ হচ্ছিল, যখন জীবনের ওপরই বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠেছিল গল্পের ‘ফিরোজা’ ওরফে ফিরুর মন, তখনই এক সন্ধ্যেবেলায় নতুন জীবনের ঝিলিক নিয়ে হাজির হয় তারই ঘরপোড়া ভাগ্যের মতো এক বিশেষত্বহীন বয়স্ক পুরুষ। এ দুনিয়ায় সেই পুরুষের সত্যিকার কাছের মানুষ বলতে কেউ নেই। ফিরুকে সে বিয়ে করতে চেয়েছিল ফিরুর দুরবস্থার সাথে নিজের অবস্থার মিল পেয়ে।
অতঃপর ফিরুর সাথে সেই মানুষটির বিয়ে হয়। ফিরুর নিজ নিবাস থেকে বহুদূরের নিবাসে নিয়ে যায় তার নতুন সঙ্গী, যেখানে কেউ ফিরুকে চেনে না, ফিরুর প্রথম জীবনের কষ্টের কথা জানে না।
এক চমৎকার ছায়াঘেরা নিভৃত পল্লীর সবুজ-শ্যামল পরিবেশে শুরু হয় শুধু দু’টি মানুষের একান্ত প্রেম-ভালোবাসা ঘেরা নতুন জীবন।
‘পরসমাচার’ গল্পটি গল্পের বিচারে খুবই সাদামাটা। দীর্ঘদিন নিরুদ্দেশ প্রবাসী পুরুষ রজব আলীর স্ত্রী সুফিয়ার সংগ্রামের কিছু ছিঁটেফোঁটাময় আভাস দিয়ে গল্পের শুরুর অংশ এগোয়। একসময় রজব আলী দেশে ফেরে, সাথে করে গোপনে নিয়ে আসে আপাতদৃষ্টের কিছু ‘মূল্যবান’ সম্পদ। অভাবের সংসারে এই ‘মূল্যবান’ সম্পদকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে থাকে গল্পের চরিত্র।
স্বাভাবিকভাবেই গল্পের পরিণতি তেমন সুখকর নয়। কিন্তু গল্পটি অন্য আঙ্গিক থেকে পাঠককে ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। সেই আঙ্গিক হলো এর বর্ণনারীতি। কিছু বাক্য তুলে ধরছি;
“দুপুরের রোদটা খুব চড়া। গায়ে যেন আগুনের আঁচ লাগছে। তাড়াতাড়ি করে একটা ভ্যানগাড়ি ঠিক করে উঠে পড়ে। গিয়ে আবার দুপুরের রান্না বসাতে হবে। সুরুজের আব্বা একটু ওলকচু দিয়ে মুরগির মাংস খেতে চেয়েছে। সকালে মুরগি ধরে ঢেকে রেখে এসেছে। জবাই করে কুটে বেছে রান্না করতে দেরি হয়ে যাবে। “ এট্টু তাড়াতাড়ি প্যান্ডেল মার ভাই”-বলে ভ্যানওয়ালাকে তাড়া দেয়।”
“সব শুনতে শুনতে সুফিয়ার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। এত সতর্কতার পরেও মানুষের কানে কথা গেছে এবং তা ডালপালা মেলে রীতিমতো মহিরুহ হয়ে গেছে। আপনজনেরা এবার সন্দেহ করতে শুরু করেছে। তিলকে তাল করবে। তারপর সেই তালের রস কেন তাদের দেওয়া হয়নি, এই নিয়ে হবে মনোবিরোধ।”
“ভ্যান চলছে ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে৷ রজব আলী শক্ত করে স্ত্রীর হাতটা ধরে আছে। ওরা যখন ভবিষ্যতের ছবি নতুন করে আঁকার চেষ্টা করছে তখন বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড রোদে চরাচর তেতে উঠছে। মানুষের ছায়া ছোট হচ্ছে, গরমে হাঁসফাঁস করছে মানুষ। এ সময়টুকু বড় কষ্টের। তবে বেলা পড়বে। মরে আসবে রোদের তাপ। তখন আবার মানুষের ছায়া হবে মানুষের চেয়ে বড়।”
‘ভাতের কেচ্ছা’ গল্পটিও সমান হৃদয়বিদারক। বালিকা হনুফার জীবনের একটাই লক্ষ্য, প্রতি বেলায় পেটপুরে গামলাভর্তি ভাত খাওয়া। হনুফার আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে তার খাওয়ার আধিক্য বেমানান। তার এই ভাতের দাবী মেটাতে অক্ষম তার পরিবার তাই তাকে পরের বাড়িতে পেটেভাতে থাকার চুক্তিতে কাজ করতে পাঠায়।
পেটপুরে ভাত খেতে পায় সে ঠিকই, বিনিময়ে পায় অমানুষিক অত্যাচার, ওঠতে-বসতে লাঞ্ছনা। এই ভাতের দাবী মেটাতে মেটাতেই তার বাল্য, কৈশোর কেটে যৌবনে পা রাখে সে।
একসময় পরের বাড়ির ঝি থেকে সে পরের বাড়ির বউ হয়। সেখানেও প্রতি প্রাহরিক গঞ্জনার মাঝেই তাকে আটকে পড়তে হয়। এই গল্পের শেষ অংশজুড়ে পাঠক হনুফার প্রতি কিছুটা বিরক্ত হবে, অতঃপর বুকভরা করুণা নিয়েই গল্পের সমাপনী অংশে নিজেকে খুঁজে পাবে।
একই অনুভূতি হবে ‘ক্ষয়ে যাওয়া জীবন’ গল্পটি পড়ার মাঝেও। এ দুনিয়ায় কে চালাক, কে বোকা, কে বিবেচক, কে অসতর্ক — তা বাইরে থেকে দেখে সবসময় বলে দেয়া যায় না। দুনিয়ার নিষ্ঠুরতা এমনই গাঢ়, সময়ের ফেরে কিছু ব্যক্তিত্বশীল মানুষকে এমন দুয়ারে গিয়েও হাত পাততে হয়, যেখানে সে কখনো হাত পাতা তো দূরের কথা, পা মাড়ানোর চিন্তাও করতে পারে না।
একটা বিষয় সবসময়ই সত্য, আপনি নিরাপত্তা বজায় রাখতে পথের পাশের ফুটপাত দিয়ে হাঁটলেও অসতর্ক ট্রাক ড্রাইভার ফুটপাতে হাঁটতে থাকা আপনার ওপর ট্রাক ওঠিয়ে দিতে পারে।
তাই নিজে সতর্ক থাকলেই যে সবসময় বিপদমুক্ত থাকা যায়, এমন নয়। নিজের বাস্তববুদ্ধি থাকার পরেও অন্যের সরল খেয়ালিপনার জন্যে মানুষকে আটকে যেতে হয় জীবনের নানা ধাপে।
‘ক্ষয়ে যাওয়া জীবন’ গল্পে এমনই এক বৃদ্ধার গল্প ওঠে এসেছে, যার নিজের বাস্তববুদ্ধি থাকার পরও অন্যের খেয়ালিপনায় জীবনটাকে চোখের সামনেই ক্ষয়ে যেতে দিতে হয় তাকে।
ঠিক এমনই খেয়ালিপনার বলি হতে দেখি এ বইয়ের সর্বশেষ গল্প ‘কপোত ও একজন লেকু মিয়া’ গল্পেও। মানুষ হিসেবে নিজের শখ পূরণ অবশ্যই জরুরী। তবে মূর্খের শখ পূরণকে যদি সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা যেত, তবে সেটা বড় ভালো হত।
নিষিদ্ধের দাবী কেন তুললাম? মানুষের তো শখ থাকতেই পারে। কিন্তু বিবেচক মানুষ জানে, কী করে সমস্ত বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিজের শখের পরিচর্যা সম্ভব। মূর্খ সেটা জানে না।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বেশ চমৎকার একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। ‘পুন্দত নাই ত্যানা, মিডে দিয়েরে বাত হাদ্দে”; অর্থাৎ, “পরনে ত্যানা নাই, আসছে মিঠা দিয়ে ভাত খেতে!”
‘কপোত এবং একজন লেকু মিয়া’ গল্পের লেকু মিয়া চরিত্রটি ঠিক এই পর্যায়ের মূর্খের দলেই পড়ে। তার খুব শখ, নানা জাতের কবুতর সংগ্রহ করা। তার নামে রেখে যাওয়া পৈতৃক সম্পত্তির অনেকগুলো অংশই সে নামমাত্র মূল্যে বিলি করে দিয়েছে শুধু কবুতর কিনে নিজের পাখিশালাকে সমৃদ্ধ করতে।
সেসবের জন্যে দুর্ভোগে পড়ে তার স্ত্রী-পুত্র ও অসুস্থ মা। তার কিশোরপুত্র তো তাকে ‘বাবা’ হিসেবেই মেনে নিতে চায় না। প্রতিটা দিন পেরোয় বাবার প্রতি ক্ষোভ ও ঘৃণা নিয়ে। স্ত্রীর হাতেই সংসারের সমস্ত দায়িত্ব। ভাতের জোগান থেকে শুরু করে অন্যান্য খরচ জোগাতে দিবারাত্রি তাকে কঠোর পরিশ্রম করে যেতে হয়।
কিন্তু তার শৌখিন স্বামী লেকু মিয়া কোনো কাজকর্ম করে না। বরং শখ পূরণের জন্যে প্রয়োজনীয় অর্থ হাতে না পেলে চুরির দিকে হাত বাড়ায়। লেকু মিয়ার এই অদ্ভুত স্বভাবের কারণে পুরো গ্রামে এই পরিবারটি হাসির পাত্রে পরিণত হয়। তাই লেকু মিয়াকে সবসময়ই একরকম শাসনের ওপর রাখে তার স্ত্রী।
গল্পটি এটুকু পর্যন্ত থেমে গেলে সেটা পাঠককে অন্তত স্বস্তি দিত। পাঠক বুঝে নিত, লেকু মিয়াকে শক্ত শাসনের ওপরে রেখেই তার শখের লাগাম টেনে রাখা হয়েছে। কিন্তু গল্পটি এভাবে শেষ হয় না।
বাস্তবতাবিবর্জিত লেকু মিয়া ব্যক্তি হিসেবে একেবারেই সরল নয়, বরং প্রবলভাবে নার্সিসিস্ট। নিজের খায়েশ মেটাতে গিয়ে যে অন্যের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, সেসবের কথা সে ভেবেই দেখে না।
ব্যাপারটি এমন নয় যে, লেকু মিয়া সম্ভাব্য ক্ষতি টের পায় না। কিন্তু সে হলো বর্তমানে বাঁচতে চাওয়া মানুষ। তাই তার বর্তমান সুখকে কিনতে গিয়ে গোটা পরিবারকেই সে ঠেলে দেয় ধ্বংস ও অনিশ্চয়তার মুখে।
কামরুন্নাহার দিপা রচিত ‘ভাতের কেচ্ছা’ গল্পগ্রন্থের এই পাঁচটি গল্পে একটি মূল সুর অটুট রয়েছে। প্রতিটা গল্পই ভিন্ন আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে অবস্থান করা ভিন্ন নারীর গল্প। এই নারীকুল শহুরে-সভ্য নারীবাদীদের চিন্তার বলয়ের বাইরে।
নারীবাদীদের চিন্তা আবর্তিত হয় থিওরির গর্ভে। এদিকে ‘ভাতের কেচ্ছা’র নারীদের গল্প আবর্তিত হয় বাস্তবতায়। এক ভয়ঙ্কর, সুকঠিন সত্য পৃথিবীর মাঝেই তাদের জীবন গড়ে ওঠে, কিংবা খসে পড়ে। ‘ভাতের কেচ্ছা’র প্রতিটা গল্পের প্রতিটা প্রটাগনিস্টই কায়িক পরিশ্রমী নারী। তাদের কেউ পরের ঘরে ঝি-গিরি করে তো কেউ নিজের সংসারের অন্দর-বাহিরে খেটে রক্ত জল করে।
গল্পের নারীরা ত্রুটিমুক্ত নয়। তাদেরকে ত্রুটিমুক্ত রাখতে পারতেন লেখক। কিন্তু তাতে করে সুসাহিত্যের প্রতি অবিচার ঘটত। দোষেগুণেই যেমন মানুষ গড়ে ওঠে, তেমনিভাবে গড়ে ওঠে আধুনিক কথাসাহিত্যের ছোটবড় চরিত্রগুলোও। পাঁচটি গল্পের মাঝে তিনটি গল্পের সমাপ্তি পাঠকের মনকে কষ্টভারে বিষাদিত করবে। আর দু’টি গল্পের সমাপ্তি পাঠকের বুক থেকে এক শূন্য উদাসী নিশ্বাস বের করিয়ে আনবে।
যখন বইটি পড়ছি, তখন একেকটা গল্প শেষ করার পর বইয়ের পেছনের ফ্ল্যাপে লেখকের হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি দেখে ঈর্ষান্বিত হচ্ছিলাম। একজন পাকা গল্পকারের প্রতি আরেক নবীন গল্পকারের সুপ্ত ঈর্ষা।
‘ভাতের কেচ্ছা’ পড়তে গিয়েই কামরুন্নাহার দিপা রচিত দু’টি উপন্যাস ‘আঙ্গারীঘাট’ ও ‘মানতাসার জঙ্গলে’ পড়ার তৃষ্ণা জেগে ওঠে। শিশুদের জন্যে লেখা তাঁর ‘পিক্কিন’ সংগ্রহ করা হয়নি। তবে শীঘ্রই সেটি পড়ার ইচ্ছে রাখি।
লেখকের একটি অনলাইন সাক্ষাৎকারে জেনেছি, এ বইয়ের গল্পগুলো তিনি লিখেছেন সত্যিকারের পাঁচ প্রান্তিক নারীর জীবনের গল্পের আদলেই। লিখতে গিয়ে বহুদিন সময় নিয়েছেন। এইটুকু প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা অল্প ক’জন কথাসাহিত্যিকের মাঝেই খুঁজে পেয়েছি।
বাংলাদেশের সমসাময়িক সাহিত্যে এক চমৎকার কথাসাহিত্যিকের সন্ধান পেয়ে পাঠক হিসেবে সত্যিই প্রাণিত হয়েছি। এদেশের ছোটগল্পের খরা কাটানো এখন সময়ের দাবী। লেখক সেই খরা কাটাতে সমসাময়িক অগ্রগণ্যদের মাঝে ভূমিকা রাখবেন বলেই আমার বিশ্বাস।
ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘ভাতের কেচ্ছা’ ছোটগল্পপ্রেমীদের জন্যে অবশ্যপাঠ্য একটি গল্পগ্রন্থ।