‘কিছু এর রেখে যাই' বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়প্রবাসী অর্থনীতিবিদ ড. আলী আহমাদ রুশদীর স্মৃতিকথা। আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথার মধ্যে ফারাক রহিয়াছে। আত্মজীবনী ও জীবনীর মধ্যে পার্থক্য নাই-কেবল লেখক ভিন্ন।স্মৃতি কথা অন্য জিনিস। ইহা ব্যক্তির স্মৃতি রোমন্থনের ফসল। সিলেক্টিভ। স্মৃতির ভাণ্ডারে কত কিছু না সঞ্চিত থাকে। লিখিতে বসিলে সবকিছু স্মরণে আসে না। কিছু কথা বাদ পড়িয়া যায়। অন্যদিকে কিছু কথা অপ্রতিরোধ্যভাবে বিস্মৃতির অতল হইতে উদ্ভাসিত হইয়া ওঠে। লেখক তাহার স্মৃতিগ্রন্থের নাম দিয়াছেন 'কিছু এর রেখে যাই' ইহা বাস্তবোচিত হইয়াছে। জঁ জাক রুশো তাহার ‘কনফেশনস'-এ কেবল নিজের কথাই লিপিবদ্ধ করেন নাই-সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতির নানা ঘটনাবলির অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ছেন। তদ্রুপ 'কিছু এর রেখে যোই' নামীয় স্মৃতিকথা কেবল একজন ব্যক্তির স্মৃতি রোমন্থন নহে, ইহাতে পারিপাশ্বিক সময়ের বস্তুনিষ্ঠ ভাষ্যও রহিয়াছে। ড. রুশদী দার্শনিক নহেন কিন্তু বইয়ের নানাস্থানে দার্শনিকোক্তি রহিয়াছে যাহা তাহার গভীর মননশীলতার পরিচয় বহন করিতেছে।
আলী আহমাদ রুশদী পরিচিত মুখ নন। দীর্ঘকাল ওশেনিয়াপ্রবাসী রুশদী পেশায় অর্থনীতিবিদ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর করটিয়া সাদাত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই স্মৃতি সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশকে অত্যন্ত গভীরভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। রুশদী দেখেছেন স্বাধীন দেশে কীভাবে সবকিছু ভেঙে পড়েছে। সাক্ষী হয়েছেন দেশপ্রেমের নামাবলী গায়ে দিয়ে কীভাবে কতিপয় লোক চারপাশে অরাজকতা তৈরি করেছিল। এই বইয়ের চুম্বক অংশ হলো করটিয়া সাদাত কলেজে লেখকের স্মৃতি। এমনই একটি ঘটনা:
'লতিফ সিদ্দিকীর বাবা আব্দুল আলী মোক্তার সাহেব এসেছিলেন একবার ইকনোমিক্স অনার্স কোর্সে এক ছাত্র ভর্তির ব্যাপারে । ভর্তির জন্যে আমরা যে নিম্নতম যোগ্যতা ঠিক করে দিয়েছিলাম এই ছেলেটি তার মধ্যে পড়ে না। আমি তাই মোক্তার সাহেবকে অপারগতা জানালাম। তিনি বললেন ছেলেরা যখন প্রিন্সিপালের বাসায় এসে ককটেল মারবে তখন আর আমাদের সুপারিশ লাগবে না এমনিতেই ভর্তি হয়ে যাবে। '
আয় বুঝে ব্যয় করতে হয়। তা শুধু ব্যক্তির ক্ষেত্রে ফরজ নয় ; রাষ্ট্রের জন্যও একই বিধি প্রযোজ্য। আশির দশকের মাঝামাঝিতে নাইজেরিয়ার সোকাতো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তেলসমৃদ্ধ দেশটির তখন রমরমা অবস্থা। প্রচুর বিদেশি মুদ্রা তারা আয় করে। আবার, খরচ করে ঢের বেশি। দুর্নীতি সেখানে সর্বগ্রাসী। এতটাই প্রকোপ যে, শিক্ষক হিসেবে বাসা পেতে তাকে ঘুস দিতে হয় এবং ঘুস নেওয়া ব্যক্তি সেই টাকায় হজে চলে যান! স্বল্প সময়ের মধ্যেই নাইজেরিয়ার আয়ের প্রধান উৎস তেলের দাম পড়ে যায়। যেমন: ১৯৮০ সালে তেল রপ্তানি করে আয় করে ২৬ বিলিয়ন। যা ১৯৮৩ সালে ১২ বিলিয়ন এবং সেই বছরেই কমে মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে যায়। লেখক পর্যবেক্ষণ করেছেন, সীমাহীন দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের বল্গাহীন খরচকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় নাইজেরিয়া উন্নত হতে পারেনি। যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই পড়ে আছে। নাইজেরিয়ার থেকে আমাদের অনেক শেখার আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন রুশদী। বিলেতে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ঢাবির পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারেননি। অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান। সেখানেই যোগ দেন অস্ট্রেলিয়ার ভোক্তা সংরক্ষণ বিভাগে। দীর্ঘদিন কাজ করেছেন সেখানে। তাই অস্ট্রেলিয়ার সমাজ, সংস্কৃতি ও কর্মপরিবেশ - ইত্যাদি নিয়ে অনেক কিছুই লিখেছেন রুশদী। পড়তে খারাপ লাগবে না। আবার আফসোসও হবে।
অস্ট্রেলিয়ার হেক্স নামে শিক্ষাঋণ প্রকল্প আছে। যার ধারণা সুন্দরভাবে ব্যাখা করেছেন লেখক। এমন পদ্ধতি বড়ো পরিসরে দেশে চালু করা যায় কি না, ভাবা উচিত।
অস্ট্রেলিয়ার ভোক্তা সংরক্ষণ বিভাগ থেকে অবসর নেওয়ার পর বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন রুশদী। অর্থনীতির এই শিক্ষক অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে উল্লেখ করেছেন, এখানকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নম্বরপদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ। তার দাবি, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সন্তুষ্ট করতে অনেকটাই উদারহস্তে নম্বর দিতে কর্তৃপক্ষ উৎসাহিত করে থাকে। যা প্রকৃত মূল্যায়নে বড়ো বাধা।
বইটির একটি সুখপাঠ্য ভূমিকা লিখেছেন ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। মূলত, তার তারিফের কারণেই বইটি কেনা। উচ্চাশা ছিল। যা মেটাতে পারেনি আলী আহমাদ রুশদীর 'কিছু এর রেখে যাই'। পহেলা সারির স্মৃতিকথা বললে অসত্য হবে। তবে, পড়ার মতো। বেশ একটা মজলিশিভাব আছে। তরতরিয়ে পড়া যায়। একটি যুগের দলিল এই বই। যা হারিয়ে গেছে। তবুও কিছু সুন্দর, মূল্যবান ও শিক্ষণীয় স্মৃতি রেখে গেছে সেই যুগের মানুষদের স্মৃতির মণিকোঠায়। বইটি অসাধারণ নয় ; আবার 'ধুর ছাই' বলার সুযোগ রাখেনি প্রতীক প্রকাশনীর ২শ ৩২ পাতার বই 'কিছু এর রেখে যাই'।