বইটির নাম হতে পারত আর্ট অফ ট্র্যাভেল। কোন বিমানে যাবেন, কোন হোটেলে থাকবেন এসব নিয়ে কিছু লিখেননি। ভ্রমণের নন্দনতত্ত্ব বইটির উপজীব্য। কোন স্থাপত্যের সামনে দাঁড়িয়ে কী দেখবেন? কীভাবে চট করে বুঝে ফেলবেন, গথিক, বারোক না নিওক্লাসিকাল। তৈলচিত্রে কী দেখবেন? কোন ছবিটা রোমান্টিক, আর কোনটা ইমপ্রেশনিস্ট? রোমান্টিক ছবি চেনার উপায় কী? ভাস্কর্য কী দিয়ে তৈরি? ব্রোঞ্জ, সীসা না মার্বেল? মার্বেলে জাতভেদ আছে কিনা। ভাস্কর্যটা কি ম্যানারিস্ট না বারোক? পোশাকটার জন্ম ইউরোপের কোন দেশে? কোন শতকের পোশাক এটা? গয়নাটা কোন শতকের? কাটা হয়েছে কোথায়, ভারতে না ইউরোপে? দেখে জানা যায় নাকি? বাগানটা কি ফরাসি না ইতালিয়ান? ফরাসি বাগানের বৈশিষ্ট্য কী? প্রাসাদের পাথরের মাঝে লুকিয়ে থাকা নৃপতির চরিত্র। তখন আর মনে হবে না, ইউরোপের সব প্রাসাদ একই রকম। স্থপতির কথা না জানলে, প্রাসাদ পরিণত হয় কয়েক টুকরো পাথরখন্ডে। ফরাসি দেশের ব্যক্তিগত ভ্রমণকাহিনী লিখতে গিয়ে হয়ে গিয়েছে সমষ্টির স্মৃতিচারণ। এক সময় মনে হবে, ফরাসি দেশের কাহিনী বাংলাদেশের গল্প। পৃথিবীর সব দেশ, ইতিহাস এক সুতোয় গাঁথা।
বাংলাদেশে প্রকাশমান বইয়ের ধারায় 'লেতা সেমোয়া' গ্রন্থ হিসেবে বেশ ব্যতিক্রমী, সাথে সাথে গুরুত্বপূর্ণ ও বটে। 'লেতা সেমোয়া' ঠিক কোন জনরায় পড়ে তা বলা মুশকিল। একই সাথে গ্রন্থটি ফরাসি দেশ বিষয়ক প্রবন্ধসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনী, ইতিহাস, শিল্পকলা পরিচিতি-সমালোচনা, রাজনৈতিক ভাষ্য, পপ-কালচার রেফারেন্স ইত্যাদির মিশেলে বাংলায় অভূতপূর্ব এক কাজ।
শিল্প-সভ্যতার ইতিহাসে ফরাসি মুলুকের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 'এস্থেটিক' চর্চা করা যে কোন মানুষের পরম আগ্রহের বিষয় ফ্রান্স। যে কোন বাঙালি পাঠকের ফরাসি মুলুকের সামগ্রিক সুলুকসন্ধানের প্রথম ধাপ হতে পারে উক্ত গ্রন্থ। একখণ্ড ফ্রান্স পাঠকের টেবিলে সযত্নে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন বইটির লেখক মাহবুবুর রহমান। তিনি তাঁর সমস্ত জ্ঞান-অভিজ্ঞান উক্ত বইতে মেলে ধরেছেন। ফরাসি দেশ নিয়ে লেখকের পঠনপাঠনের পরিধি বিশাল ও বিস্ময়কর। এমন হেন বিষয় নেই যা নিয়ে তিনি আলাপ উত্থাপন করেন নি।
মাহবুবুর রহমানের গদ্য বেশ সুপাঠ্য। পাঠককে নন-ফিকশন বই পড়িয়ে শেষ করতে পারাটা কঠিন কাজ। সেই কাজে লেখককে মোটামুটি সফল বলা যায়। বাংলা বইয়ের তুলনায় বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি টপ নচ। বইতে প্রচুর রঙিন চিত্র রয়েছে। কেউ যদি বইটি না পড়ে শুধু দেখার উদ্দেশ্য কিনেন তাতেই পয়সা উসুল হয়ে যাবে তার।
এতসব প্রশংসার পরেও বইটির কিছু খামতির কথা না বললেই নয়। বইটি ঠিক সাধারণ পাঠকের মনঃপুত হবার নয়। কারন মাহবুবুর রহমানের গদ্য সুপাঠ্য হলেও তাতে হিউমারের অভাব রয়েছে ফলে একটানা পড়তে থাকলে খানিকটা বিরক্তি আসাটা স্বাভাবিক। তাই একদিনে বইয়ের একটা করে চ্যাপ্টার পড়া ভালো। ফিকশনের মতো একাধারে আসলে নন-ফিকশন বই পড়াও যায় না।
তাছাড়া লেখক ধরেই নিয়েছেন যে পাঠক ফরাসি দেশের যে কোন আলোচনাদি শুনতে আগ্রহী। তিনি আভ্যন্তরীণ এমনসব ইতিহাসদি নিয়ে লম্বা আলোচনা করেছেন যা আম পাঠকের রিলেভেন্সি ধরে রাখতে অক্ষম। বইটি আসলে কালেক্টর'স পিস হিসেবে অত্যন্ত যুতসই। এরকম আরো গ্রন্থাদি বাংলায় লেখা জরুরী। সম্ভবত মাহবুবুর রহমান লিখবেন ভবিষ্যতে।
ফরাসি দেশ শিল্প, সাহিত্য ও মানবতার দেশ। লেখক ফরাসি দেশের শিল্প, ইতিহাস, স্থাপত্য ইত্যাদি গভীর কিন্তু সুপাঠ্য লেখা লিখেছেন উক্ত বইতে। লেখকের জ্ঞানের পরিধি ব্যাপক যা একই সাথে গুণ এবং দোষ বলে পরিলক্ষিত হয়েছে। ফরাসি মুলুক সম্পর্কে সাধারণ তথ্যকোষ টাইপ বইটি নয়, যদিও এতে প্রচুর তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। বইটির প্রোডাকশন কোয়ালিটি দুর্দান্ত এবং প্রচুর রঙিন ছবি রয়েছে যা বইটিকে 'কালেক্টরস পিস' হিসেবে অতুলনীয় করে তুলেছে।
অনেকদিন ধরে সময় নিয়ে ধীরে ধীরে বইটা পড়লাম। ধীরে পড়ার মতোই বই এটা। ফরাসি শিল্পকলা, স্থাপত্যকলা, সাহিত্য নিয়ে এমন অনেক বিষয় জানতে পেরেছি, যা আগে জানা ছিলনা।
প্রচুর সাইড-নোট নিয়েছি, রেফারেন্সগুলো নিয়ে স্টাডি করেছি। বলা যায়, বইটি পড়া ছিলো আমার জন্য একটা হিস্টরিক্যাল জার্নি।
ফরাসি চিত্রকর্ম নিয়ে, স্থাপত্য নিয়ে যাদের আগ্রহ, তাদের জন্য মাস্ট রিড।