📖 #চেরিবসন্ত
✒️লেখক - রাকা দাশগুপ্ত
🖌️অলঙ্করণ ও প্রচ্ছদশিল্পী - চিরঞ্জিৎ সামন্ত
🔖 প্রকাশনা - ধানসিড়ি প্রকাশন
🔖 মূল্য - ৩৫০ টাকা
" চেরি ফোটে। তার
ছায়াতে, অচেনা
বলে কেউ নেই "
- কোবায়াশি ইসা (১৭৬৩ - ১৮২৭)
'দূরপ্রাচ্য। জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়া। অত্যুন্নত দুটো দেশ, অথচ আধুনিকতার আলগা প্রসাধনটুকু সরিয়ে নিলেই বেরিয়ে পড়ে ইতিহাস আর রূপকথার দুই কল্পরাজ্য। সেখানে শহরের ব্যস্ততম কেন্দ্রস্থলেই টিলার নীচে ঘুমিয়ে থাকেন অতীত যুগের রাজারানিরা, হাওয়াতে উড়ে বেড়ায় ড্রাগন আর ফিনিক্সপাখির গল্প।'
🔹দক্ষিণ কোরিয়ায় পদার্থবিজ্ঞানের পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চের কাজে গিয়ে লেখিকা বেশ কিছু বছর ছিলেন সমুদ্র তীরের পোহাং শহরে। সমুদ্র পেরোলেই আর এক ছবির মতো দেশ, জাপান। এই দুই দেশ তাদের জল-হাওয়া, কবিতা, কাগজ-লন্ঠনের আলো, সংস্কৃতি একসাথে মেখে যেন কোথাও গিয়ে এক ও একাকার হয়ে যায় বসন্তের প্রারম্ভে, যখন গাছের আঁকাবাঁকা ডাল বেয়ে একটু একটু করে ফুটে ওঠে মরশুমের প্রথম চেরি ফুল।
এই চেরি ফুল, বসন্তের দূত হয়ে আসে, সৌন্দর্য্য ও পবিত্রতার প্রতীক হয়ে। বাঙালির এক চৈত্রমাসে লেখিকা ঘুরে আসেন জাপানে, প্রত্যক্ষ করেন চেরিফুলের উৎসব বা সাকুরা মাৎসুরি (সাকুরা - চেরিফুল) যা উদিত সূর্যের দেশে এক আদি অকৃত্রিম সেন্টিমেন্ট, উন্মাদনা ও উৎসব।
'আমার এ দেশে
এমনকি ঘাসও
চেরি হয়ে ফোটে'
- কোবায়াশি ইসা (১৭৬৩ - ১৮২৭)
🔹রাকা দাশগুপ্ত আরো বেশি করেই হয়তো একজন কবি বলে তা��র এই বই ক্রমশ গড়িয়েছে ব্যক্তিগত দিনলিপি, অভিজ্ঞতা থেকে ভ্রমণকথায়, ভ্রমণকথা থেকে কবিতায়, কখনো বাঁক নিয়েছে মেদহীন সরস গদ্যের আধারে প্রবন্ধে-নিবন্ধে। তার চলন একমুখী তো নয়ই, বরং পাহাড়ী নদীর মতই আপন খেয়ালে ছুটে চলে, পাথরে ধাক্কা খেয়ে অক্ষর - শব্দ জলবিন্দুর মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে এবং যেমন একদিকে ছুঁয়ে যায় চেরিফুল, কাগজ - লন্ঠন, সেরামিক নকশা প্রাচ্যের শিল্পরীতিকে, ঠিক তেমনই ছুঁয়ে যায় এক উপকথার শ্বেতসারসের দেশকে যেখানে আজও সাহিত্য - দর্শন চর্চায় উঠে আসে বৌদ্ধ শ্রমণ রচিত চা-এর স্তবগাথা, শতাব্দী প্রাচীন কোরিয়ান শিজো কবিতা।
" যাচ্ছ তুমি? যেতেই হবে? কেনই বা যাও? ক্লান্ত বলে ?
কিম্বা কোনও বিরক্তি, ক্ষোভ? কেউ কি তোমায় বললো যেতে?
যাবেই যখন, তোমার চোখে অমন কাতর দৃষ্টি কেন ! "
কবি রাকা দাশগুপ্তের হাইকু আর শিজো নিয়ে একটি আলোচনা পড়েছিলাম, গুরুচন্ডা৯'র ওয়েবসাইটে। সেখান থেকে স্মৃতির সরণি বেয়ে আবার ফিরে এলাম বছরখানেক আগে পড়া সেই লেখায়...'চেরিবসন্ত'র হাত ধরে। শিজো ও হাইকু - কোরিয়া ও জাপানে তাদের ভিন্ন নাম, আবেদন এক, সংক্ষিপ্ত তিনটি লাইন ও গঠন, শাণিত, সহজ ও সুন্দর। তাতে লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির বর্ণনা, কবির সুখ-দুঃখের টুকরো টুকরো স্মৃতি, প্রেম ও বিরহ। রাকার এই বিশেষ নিবন্ধ ও কবিতার অনুবাদগুলি এই বইয়ের এক বিশেষ সম্পদ। অনুবাদ ও আলোচনার ক্ষেত্রে যত্ন ও কবিতার প্রতি 'এই' ভালোবাসা আমার মতোই অন্যান্য কবিতাপ্রেমী পাঠককে ভীষণভাবেই আকৃষ্ট ও ঋদ্ধ করবে বলে আমার বিশ্বাস।
🔹লেখিকার নিজের ছোটো ছোটো অভিজ্ঞতা গল্প, অদ্ভুত সুন্দর ভাবে গদ্যের মাধ্যমে তিনি মিশিয়ে দিয়েছেন এই ভ্রমণকাহিনীতে। তথ্যের ভারে তা একবারের জন্যেও পড়তে গিয়ে থমকে দাঁড়াতে হয়নি বরং এই স্বপ্নের দেশ স্বপ্নের মতোই ধরা দিয়েছে পাঠকমনে। প্রতিটি পাতায় গল্পের মতো করে উঠে এসেছে প্রচুর অজানা তথ্য ও বিবরণ এবং ইতিহাস। বসন্ত সমাগমের আগে কোরিয়া - জাপানে চেরি ব্লসম ফোরকাস্ট করে সরকার যে আলাদা ফুলের ক্যালেন্ডার বের করেন, তা যেমন জানা ছিল না, সেইরকম জানা ছিল না তাদের মন্দিরবাস, ভাষা, খাদ্যাভাস, উৎসব কোনো কিছুই। কী ভীষণ প্রাঞ্জল সেই বিবরণ, সুনিপুণ ভাবে কলমের দক্ষ আঁচড়ে রাকা কোরিয়ান নটে বুনেছেন অপূর্ব কথার ঝালর। এই অস্থির সময়ে এই বই পড়তে গিয়ে অবাক হয়েছি জেনে,
কোরিয়ানদের ঘুড়ি ওড়ানোর রুলবুকে 'ভো-কাট্টা' বা 'মাঞ্জা' শব্দ দুটি নেই। ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসবে রংবেরঙের ঘুড়ি, কোনওটা ডানামেলা চিলের মতো দেখতে তো কোনওটা ময়ূরপঙ্খী। সার দিয়ে তারা উড়ছে আকাশে। পাশের ঘুড়িগুলোকে কাটতে না শিখলে নিজে ওড়া যাবে না, সেটা বোধহয় এরা মানেন না। সবাই যে যার মতো আপন খেয়ালে ওড়ার আনন্দেই বিশ্বাসী। নীল আকাশের মতোই উদার সেই ভালোবাসা।
ছোটো ছোটো গল্পের মাধ্যমে উঠে এসেছে সুপ্রাচীন ইতিহাস। কপিলাবস্তুর সেই সর্বত্যাগী রাজকুমারটির কথা স্মরণ করে আজও এই দেশে দুর্গম পর্বতশিখরের বৌদ্ধমন্দিরে উচ্চারিত হয় ভোরের প্রার্থনাসংগীত। ভারতবর্ষের শাক্যমুনি এখানে হয়ে ওঠেন কোরিয়ার 'সেওকগোমুনি'।
উঠে আসে টুকরো মজার ইতিহাস, যেমন ফিলিপিনসের লুদোং মাছের কথা, এত দামী ও দুষ্প্রাপ্য সেই মাছ, যে কিনত, সে নাকি আর বাজারের ব্যাগে ঢোকাত না, রাস্তা দিয়ে দেখাতে দেখাতে নিয়ে যেত, সোনার সমতুল্য লুদোং। অনেকটা বাঙালির পদ্মার জোড়া ইলিশ রাস্তা দিয়ে ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতোই।
🔹শেষে তিনটি কথা বলতে চাই এক মুগ্ধ নগণ্য পাঠক হিসাবে,
১) রাকা দাশগুপ্তের কলম আর চিরঞ্জিৎ সামন্তের তুলিটান আর জলরঙের আয়না ছুঁয়ে পাড়ি দিন দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে, যেখানে শীতের শেষে অপেক্ষা করে থাকে চেরিফুলে মোড়া এক বসন্ত, যার জীবনচক্র মাত্র সাতদিনের জন্যেই সীমিত। চিরঞ্জিৎ সামন্তের উদ্দেশ্যে, এই বইতে প্রতিটি পৃষ্ঠাতে তাঁর ভালোবাসা, নিষ্ঠা ও তুলির আঁচড় যেভাবে জড়িয়ে আছে, তাঁকে ও তাঁর শিল্পসৃষ্টিকেই কুর্নিশ জানাই। শুধুমাত্র প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণের জন্যেই এই বই সংগ্রহে রাখা যায়। তার উপর ধানসিড়ি প্রকাশনের অনবদ্য প্রোডাকশন তো আছেই।
২) ভ্রমণমূলক গদ্য নিয়ে বহু সুখপাঠ্য রচনা ও চিরায়ত সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যে আছে। কবিদের গদ্যের বইয়ের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। 'চেরিবসন্ত' সেই সারিতে ভীষণভাবেই প্রথমদিকে আছে ও থাকবে তার বলিষ্ঠ উপস্থিতি নিয়ে। চেরিফুলের জীবনের মতোই আমার সাতদিনের এই 'চিরবসন্ত' পাঠকসত্ত্বাকে যা জড়িয়ে রেখেছিল এক ভালোবাসার ওমে, বরফের দেশে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়া চেরিফুলের মতোই।
৩) ঐ, অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় কথা-দুটি।
'প্রতিটি শাখা থেকে
ফুলেরা উড়ে গিয়ে ঝরেছে টুপটাপ
বলছে - 'শিগগির!'
ফুরোল মধুমাস। সে ফিরে গেছে, তার গমনপথরেখা পড়ে না চোখে আর।'
‘আমি লিন বুর বাড়ি চললাম’
এই ভ্রমণ, এই পাঠ আপনার শুভ হোক পাঠক। অলমিতি।