বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। গণতন্ত্র মানে স্রেফ ভোটাভুটি নয়। জনগণের ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে- গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এই রীতিনীতি নিয়ে কোনো তর্ক করা চলে না। কিন্তু খোদ রাষ্ট্রকাঠামোই যদি অগণতান্ত্রিক হয়, তাহলে নির্বাচন জনগণের কষ্টে উপার্জিত অর্থের শ্রাদ্ধ ছাড়া আর কিছুই হয় না। বাংলাদেশের সাংবিধানিক ক্ষমতাকাঠামোর ধরনটাই এমন যে, জনগণের ভোট দেওয়া না দেওয়ায় কিছু যায় আসে না। তবু ‘মন্দের ভালো’ পঞ্চবার্ষিকী ভোটাভুটিটুকুও যে উঠে গেল, এর বীজ আমাদের ‘মহান’ সংবিধানেই ঘাপটি মেরে ছিল। সেই অগণতান্ত্রিক মহাদানব এখন মাথা চাড়া দিয়ে দৃশ্যমান হওয়ায় আমাদের মাথাখারাপ দশা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই সারকথা। জনগণ তার প্রয়োজনে রাষ্ট্র গঠন করে, প্রশাসন পরিচালনা করে, নিজেদের মৌলিক অধিকার সংবিধানে টুকে রাখে। এর অন্যথা হলে বুঝতে হবে রাষ্ট্রটা আর গণতান্ত্রিক নাই, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এ থেকে পরিত্রাণের পথ স্পষ্ট, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিগঠনের গণসচেতনতা গড়ে তোলা।
“যদি স্বাধীনতা বলতে কিছু বোঝায় তবে এর অর্থ লোকেরা যা শুনতে চায় না তা বলার অধিকার” – জর্জ অরওয়েল
স্বাধীনতার ক্ষেত্রে মানুষ মুক্ত পাখির মত হতে চায়। তারা কখনও আবদ্ধ থাকতে চায় না। তাদের লক্ষ্য থাকে তারা সব সময় মুক্ত থাকবে। পাখি বা যেকোন প্রানী কোন ভাবেই আবদ্ধ থাকতে চায় না। তারা চায় না কোন শিকল পরতে। তবুও মানুষ তাদের শিকল পরায়। মানুষকেও এক সময় শিকল পরতে হয়েছে। আর এই শিকল থেকে মুক্ত পাবার জন্য মানুষ লড়াই করেছে। হয়ত অন্য প্রানীর লড়াই করার ক্ষমতা থাকলেও তাদের মানুষের মত বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নেই। তাই তারা খাচা ভেতর জীবন পার করে। কিন্তু মানুষ বন্দি থাকতে চায় না, তারা চায় স্বাধীনতা, মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেয়ার অধিকার। . স্বাধীনতা ও সার্বোভৌমত্ব মানুষের জন্মগত অধিকার। এই অধিকার কেড়ে নেয়ার ক্ষমতা সরকারের কারো নেই। এটি তাকে দিয়েছে রাষ্ট্রো। মানুষ জন্মগত ভাবে এই অধিকার পেয়ে থাকে। তাই এই অধিকার খর্ব করার ক্ষমতা সরকার বা কারো থাকে না। প্রতিটি মানুষের কাছে তার স্বাধীনতা ও সার্বোভৌমত্ব গুরুত্ববহন করে থাকে। সার্বোভৌমত্ব মুলত একটি দেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। কারণ একটি সার্বোভৌম রাষ্ট্রের উপর অন্য কোন রাষ্ট্র, ব্যক্তি, সরকার কারো প্রভাব থাকতে পারে না। যদি থাকে তবে সেটা আর স্বাধীন বা সার্বোভৌম রাষ্ট্রে তালিকায় থাকবে না। . “স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন” . আমরা মোটামুটি সবাই এই বাক্যটির সাথে পরিচিত। তবুও আবার কিছুটা পরিচয় করিয়ে দেয়া যাক। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু এই অর্জন করার জন্য আমাদের অনেক ঘাত, সংঘাত, প্রতিরোধ-প্রতিবাদ, এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা পেয়েছি। দাসত্ব ও পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেয়ে আমরা নতুন ভাবে একটি দেশ পেয়েছি, রাষ্ট্র পেয়েছি, যা আমাদের মুক্তি ভাবে বাচার অধিকার দিয়েছে। এই স্বাধীনতা অর্জন করার পর পর আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে মুলত আমাদের এই স্বাধীনতাকে রক্ষা করা। বাইরের এবং ভেতরের শত্রু থেকে স্বাধীনতাকে বাচিয়ে রাখাতে হবে। তবেই মুলত আমাদের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন থাকবে। . একটি রাষ্ট্র গঠনের সময় অনেক কিছুর সাথে তার পরিচয় হয় এর ভেতর থাকে রাষ্ট্র পরিচালনা, সরকার, রাজনীতি, সংবিধান, রাজনৈতিক আদর্শ নীতি, সহ অনেক কিছু। এই যে রাজনীতি মুলত দেশ গঠন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কারণ রাজনীতি হচ্ছে ক্ষমতা মুল উৎস। এর মাধ্যমেই একটি দেশ রাষ্ট্র তার আদর্শ নীতি নিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে নিজদের তুলে ধরতে সক্ষম হয়ে থাকে। . পৃথিবীতে অনেক ইতিহাস আছে যাদের দেশ রাষ্ট্র পরিচালনার সময় আগে রাজনীতির পট পরিবর্তনের কারনে তারা দেশ গঠন করতে পারেনি। হয়ত তার আগেই দেশ শেষ হয়ে গিয়েছে নয়ত শত্রুরা দখল করে রেখেছে। এখন তারা স্বাধীন হতে পারেনি। . রাজনীতির একটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন অংশ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। এখন রাজনীতির মুল কথা হচ্ছে দলীয় বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়ক কর্মকাণ্ডের সমষ্টি, উদাহরণস্বরুপ সম্পদের বণ্টন হল এমন একটি কর্মকাণ্ড। তবে এখানে বলা যায় যে রাজনীতি কোন ছোট অর্থে ব্যবহার করার শব্দ নয়। আমরা ছোট অর্থে বলি জনতা বা জনগণের জন্য যা ভাল এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের ভালোর কথা ভেবে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তা রাজনীতির অন্তর্ভূক্ত। . অপর দিকে এই রাজনীতির ভেতর অংশের কথা যদি বলি তবে এখানে দল, মত, জনতা, সব কিছু এক সাথে আসবে। সেই সাথে আসবে বাকস্বাধীনতা। যা রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাকস্বাধীনতা মুলত আপনার মত প্রকাশের স্বাধীনতাকেই বোঝায়। তবে এই মত প্রকাশ যেন উদ্ধত্যপূর্ণ ও প্রতিহিংসামুলক না হয় সেটাও কিন্তু দেখতে হবে। . এবার আসুন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী আমাদের চিন্তা করা যাক। বাংলাদেশের রাজনীতি ও বাকস্বাধীনতা দুটোই যেন বিপরীতমুখী অবস্থানে রয়েছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গত ২০ বছরে আমুল পরিবর্তন ঘটেছে, আবার বাক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য হবে। তার মানে এই যে রাজনীতি ও বাক স্বাধীনতা পাশাপাশি চললেও তারা এক সাথে নেই। . “এই ভেবে সফেদ পর্দার ধুল হয়ে সাময়িক ভাড়াটে বাড়ির বাসিন্দার মতো জীবনকে যাপনযোগ্য করি। ঝাড়া দিলেই পড়েই তো যাব, এত সামান্য, আহা, এ ধুলাজীবন, মহিমাহীন!” - সালেহীন শিপ্রা . কি সুন্দর ভাবে লেখা আমাদের এই জীবন কে তুলে ধরেছেন। আমরা আপাতত এর ব্যাখ্যা যাব না। তবে বাক স্বাধীনতা নিয়ে অল্প কথা না বললেই নয়। আপনি যেটা বলতে চাচ্ছেন সেটা আপনাকে বলতে দেয়া না হলে তখন আপনার কেমন অনুভূতি হবে। আপনি জানেন আপনি সঠিক কিন্তু আপনি বলতে পারছেন না। আপনার কন্ঠকে আটকে ধরা হয়েছে। আপনি চিৎকার দিয়ে কথা বলতে চাচ্ছেন কিন্তু পারছেন না। অজানা আশংকা, ভয় আপনাকে ঘিরে ধরে। হ্যা, এটাই আপনার বাক স্বাধীনতা কে হরণ করা। আর কিছু নয়। . এই যে রাজনীতি ও বাক স্বাধীনতা কথা বলছি, মুলত এর কারণ একটি বই। বইটি হচ্ছে সারোয়ার তুষার ও সহুল আহমদ এর লেখা “মারণ-রাজনীতি” । বইটি মুলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, নির্বাচন, বিচারবহির্ভূত কর্মকান্ড, বাক স্বাধীনতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এই বিষয় গুলোর উপর লেখা হয়েছে। মুলত লেখকদ্বয় মানুষের সামনে বর্তমান সময়ের একটি আয়না তুলে ধরেছেন। এটা বললেও ভুল হবে না যে তারা মানুষের দুর্বলতা, রাজনৈতিক দল গুলোর দুর্বলতা ও প্রশাসনের বেপরোয়া হয়ে ওঠাকে সুন্দর ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। . এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বাক স্বাধীনতার উপর। কারণ বর্তমানে আপনার বলার, সমালোচনা করার স্বাধীনতা শুন্যের কোঠায়। একদিন হয়ত এটাও থাকবে না। তবে আপনি বলতে পারেন তাহলে এই বই প্রকাশ পেল কিভাবে। সেটা আমিও ভাবছি। তবে যেভাবেই হোক পেয়েছে। আপনি জানতে ও বুঝতে পারছেন। তবে ঠিক এই জায়গাতেই কিন্তু আবার একটা বই নিষিদ্ধও হয়েছে। সেটাও আপনাকে দেখতে হবে। . “বাকস্বাধীনতা হল এমন একটি নীতি যা প্রতিশোধ, সেন্সরশিপ বা আইনি অনুমোদনের ভয় ছাড়াই একজন ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের তাদের মতামত এবং ধারণা প্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে।” . উপরের উক্তি থেকে আমরা দেখতে পাই যে আপনার মত প্রকাশের স্বাধীনতা হচ্ছে আপনার কাছে। আর রাষ্ট্রের উচিত এই অধিকার যেন খর্ব না হয় তা দেখা। তাহলে আমরা কি দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশ কি আদৌ এই জায়গাতে রয়েছে। আমাদের কি আদৌ এই অধিকার খর্ব হচ্ছে না। আজ কোন কিছু নিয়ে আপনি প্রশ্ন করতে পারছেন কিনা সেটা ভেবে দেখুন তো। . এই যেমন হুট করেই একটা ঝামেলা তৈরি করা। মুলত এসব হুট করে হয় না। সব কিছুর পেছনে পরিকল্পনা থাকে। এই বইয়ের একটি উল্লেখিত ঘটনা না বলে পারছি না। সেটা হচ্ছে প্রীতম দাশের ঘটনা। যারা শ্রীমঙ্গলের ঘটনা জানেন তারা প্রীতম দাশ কে চিনে থাকবেন। তার বিরুদ্ধে কিন্তু কোন রাজনৈতিক অভিযোগ আনা হয়নি। আনা হয়েছিল রিলিজিয়াস। অথচ যেই পোস্ট বা উক্তি দিয়ে অভিযোগ আনা হয়েছিল সেটি লিখেছিলেন মুনতাসীর মামুন তার এক কলামে, সেটি শেয়ার করেছিলেন আর অনেক বুদ্ধিজীবি মানুষ। অথচ ধরা হল প্রীতম দাশ কে। কেন কারণ তার পেছনে সুক্ষ্ম ভাবে রাজনৈতিক কারণ ছিল। আর সেটি হচ্ছে তিনি চা শ্রমিকদের আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। . ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যে কতটা ভয়াবহ সেটা এখনও কেউ উপলব্ধি করেছন কিনা আমি জানি না। তবে এই বইটিতে যেসব ঘটনা উল্লেখ আছে আমরা তা পত্র পত্রিকায় পড়েছি। এমনকি মিডিয়াতে দেখেছি। তবুও এর বিরুদ্ধ আন্দোলন এখন আর আগের মত জোর নেই। যদিও চেষ্টা করা হচ্ছে। তবুও এই আইন বাতিল করা সম্ভব হবে কিনা জানি না। কারণ এই আইনের কারণে প্রশাসন যে কাউকে যখন তখন ধরে নিতে পারে। এটা তাদের ইনডেমিনিটি দিয়েছে। অথচ আইন হবার কথা ছিল জনগন বান্ধব। . ঠিক এই বইটিতে আপনি দেশ সমাজ রাষ্ট্র ও রাজনীতির একটি সার্বিক পরিস্থিতি দেখতে পাবেন। জানতে পারবেন। বর্তমানে আমরা কি অবস্থানে রয়েছি। আমরাদের কি করা উচিত। তবে আমার মনে হয় ক্ষমতা তো সারা জীবন আর থাকে না। সবাইকেই চলে যেতে হয়, যেতে হবে। তখন কি হবে। তখন কে কোথায় রবে। সেই বিষয়ে কি তারা কখনও চিন্তা করে দেখেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিত্র হয়ত আরও সামনে দিকে ভয়াবহ হতে পারে আবার নাও হতে পারে। তবে কিনা এই জায়গাতে সাধারণ বা আমজনতা শুধু মাত্র ভয় ও আশংকায় দিন কাটাচ্ছে। না কিছু বলতে পারছে না করতে পারছেন।
“Without freedom of thought, there can be no such thing as wisdom - and no such thing as public liberty without freedom of speech.” - Benjamin Franklin