৬ জুলাই ১৯৮২, শতাব্দীর দীর্ঘতম পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের রাত। বাণীনগর শিল্পনগরীর অদূরে রহস্যময় কালিদহের পাড়ে এক সন্ধে নিখোঁজ থাকার পর চারজন বালক-বালিকাকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল পরদিন ভোরবেলায়, এবং সেই সন্ধেতেই এই চারজনের ঘনিষ্ঠ একজন তরুণ, অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট রণজয় কর্মকার নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। তার আগের সপ্তাহ জুড়ে গুজব ছড়াচ্ছিল যে রণজয় যে যন্ত্রটি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করছিল, সেটি হয়তো গুপ্তচরবৃত্তির উদ্দেশে নির্মিত। রহস্য ঘনীভূত হয়, কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর সেই বালক-বালিকারা সেই সন্ধেয় কী হয়েছিল, বলতে চায়নি। কৈশোরের দ্বারপ্রান্তে সেই বালক-বালিকারা এতটা বুঝে তখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠছে যে বাকিটা জীবন তাদের প্রিয় রণদার সঙ্গে বাল্যকালের জন্য শোকযাপন করেই কাটবে। ৩৯ বছর পর, তাদের তিনজন এখন মধ্যবয়স্ক। তাঁরা শোনেন যে রণজয় ফিরে এসেছিলেন ১৯৯২ সালে, বাকিটা জীবন অন্তরালে কাটিয়ে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার সময় এই তিনজনের কাছে রেখে গেছেন আরেকটি রহস্যজনক যন্ত্রের ব্লুপ্রিন্ট, যেটি হয়তো একটি টাইম মেশিনের। সেই মেশিনের দ্বারা কি সম্ভব হবে ’৮২-র সেই সন্ধেবেলাটা পালটে ফেলা? যে সন্ধের রহস্যের সমাধান এই বিশ্ব করতে পারুক, তাঁরা কোনোদিনও চাননি?
Anindya Sengupta teaches at the Department of Film Studies, Jadavpur University, Kolkata, India. His debut novel in Bengali, a science fiction, was followed by a sci-fi anthology. His latest sci-fi novel is titled 1982.
একটি অডিও চ্যানেলের 'বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না' গোছের অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে দুই মধ্যবয়স্ক নরনারীর সঙ্গে কথা বলতে থাকে দুই যুবক-যুবতী। কথায়-কথায় বোঝা যায়, এ শুধুই রোমহর্ষক অডিও স্টোরির সন্ধান নয়। চল্লিশ বছর আগে এক শিল্পশহরের লাগোয়া জলাশয়ের কাছে চারটি ছেলেমেয়েকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেছিল। সেই ছেলেমেয়েগুলোর অসমবয়সী বন্ধু তথা মেন্টর মানুষটি সেই সময়েই নিখোঁজ হয়ে যায়। যেহেতু সেই মানুষটিকে নিয়ে অনেকের অনেক ধারণা ছিল, তাই "কী হয়েছিল" তা জানার জন্য ওই চারটি ছেলেমেয়েকে নানাভাবে জেরা করা চলে। কিন্তু ঠিক কী হয়েছিল ওই সন্ধায় ওই বিশেষ জায়গাটিতে, তা জানা যায়নি। নিখোঁজ মানুষটি ফিরে আসে দশ বছর পর। তারও প্রায় চল্লিশ বছর পর তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। এরপরেই শুরু হয় সেই ঘটনার 'সারভাইভর' ছেলেমেয়েদের আবার একটা বিন্দুতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা— যার অন্তিম পর্যায় এই চারজনের এক জায়গায় আসা। কিন্তু কেন? কে কী উদ্দেশ্যে চল্লিশ বছর ধরে ভ্রান্ত ধারণা ও অজ্ঞতার অন্তরালে থাকা গল্পটা আজ বলাতে চাইছে? ঠিক কী হয়েছিল চল্লিশ বছর আগে, কালীদহ নামের সেই জলাশয়ের পাশে?
এই প্লট নিয়ে একটা রোমহর্ষক থ্রিলার লেখাই যেত, যায়, যাবে। কিন্তু ১৯৮২? সে যে থ্রিলারের সীমা ছাড়িয়ে চলে গেছে বহুদূরে— অন্য কোথা, অন্য কোন্খানে... বা অন্য কোনো ক্ষণে! কেন এ-কথা বলছি? কারণ ত্রিবিধ। প্রথমত, সম্পূর্ণ উপন্যাসটি লেখা হয়েছে চিত্রনাট্য়ের আকারে। বাংলায় এমন চেষ্টা এর আগে হয়েছে বলে মনে হয় না। অন্তত বাংলা কল্পবিজ্ঞান তথা স্পেকুলেটিভ ফিকশনে এ-চেষ্টা অভূতপূর্ব। দ্বিতীয়ত, লিনিয়ার বা নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভের বিভাজন ও সংজ্ঞা তছনছ করে দিয়েছে এই উপন্যাস। এতে কয়েকটি বিশেষ বিন্দুতে স্থান-কালের দ্বিখণ্ডিত হওয়ার সম্ভাবনা এবং তার ফলে সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিণাম তুলে ধরার মাধ্যমে কার্যত পাঠকের নিজের যাবতীয় অনুভূতি ও পূর্বানুমানকেই আনরিলায়েবল ন্যারেটরের চেহারা দেওয়া হয়েছে। ফলে এটি এমন এক রহস্যকাহিনি হয়ে উঠেছে, যার সমাধান হয় না, হতে পারে না। এর শেষে হাতে থাকে শুধুই পেনসিল, বা স্ক্রাইবার নামক সেই কল্পিত যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তাটি— যে বিভিন্ন ইনপুটের সাহায্যে এই আখ্যানটি নির্মাণ করছে। তার মাধ্যমে যে গল্পটা বলা হল, সেটা অনিঃশেষ এক স্রোতের মতোই চলতে থাকে কোনো এক অতীত থেকে কোনো এক ভবিষ্যতের দিকে। তৃতীয়ত, এই কাহিনির নানা পর্যায়ে বিভিন্ন রিপোর্টের সাহায্যে দেখানো হয়েছে, ঘটনাস্থল কালীদহ বহু-বহুদিন ধরেই নানা অদ্ভুত ও ব্যাখ্যাতীত ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তার বিবরণের মাধ্যমে এই বইয়ের সবটাকেই নিপুণভাবে অলৌকিক কাহিনির আকার দেওয়া যেত। কিন্তু লেখক তা করেননি। বরং সময় নামক অতীব রহস্যময় ভাবনাটির মূল তত্ত্ব বুঝতে চাওয়া এবং তার নাগাল পাওয়ার মধ্য দিয়ে একটা 'অন্যরকম' ভবিষ্যৎ গড়ার চিরন্তন স্বপ্ন— এই অতি-পরিচিত ট্রোপটিকে আগাগোড়া ভেঙে নতুন করে গড়েছেন তিনি। এর মধ্যে যে কত সম্ভাবনার বীজ গল্প ও উপগল্প হিসেবে রয়ে গেছে, ভাবলে চমকে উঠতে হয়। কিন্তু লেখক তা করেছেন ভীষণরকম চেনা ও বাস্তবানুগ চরিত্রদের কেন্দ্রে রেখে। তারই সঙ্গে এই রচনা হয়েছে পুরোদস্তুর মৌলিক, যাতে আমি আমদানিকৃত ভাবনার প্রয়োগ খুঁজে পাইনি। এ এক অসামান্য কৃতিত্ব!
কল্পবিজ্ঞান তথা স্পেকুলেটিভ ফিকশনকে অরাজনৈতিক একটা আকার দেওয়ার দাবি তোলেন অনেকেই। কিন্তু এই বিশেষ আখ্যানটি ঘোরতর রাজনৈতিক। এটির মাধ্যমে বহু প্রতিষ্ঠিত ভাবনাকেই চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এ-ও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে কল্পকাহিনির মাধ্যমেও অন্ধকার মনে মশাল জ্বেলে দেওয়া সম্ভব— যা একদিন ইতিহাস বদলে দিতে পারে। তারই সঙ্গে এই উপন্যাস এক স্বপ্নের উড়ানও বটে। যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা একদিন আরোপিত সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে গেলে কী হতে পারে, তাই নিয়ে বিস্তর ডিস্টোপিয়া পড়েছি ও দেখেছি আমরা। এই বই কিন্তু বলে, যেখানে আমরা নিজেদের চতুর্মাত্রিক অস্তিত্ব নিয়ে গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে পারি, সেখানে এই বুদ্ধিমত্তা খুঁজে নিতে পারে এক অন্য পথ— যা হয়তো মানুষকে কাটাছেঁড়া করে বোঝার বদলে তাকে চিকিৎসার একটা সুযোগ দিতে চায়। সহজ ও বুদ্ধিদীপ্ত গদ্যে রচিত হলেও এই উপন্যাস যথেষ্ট জটিল এবং পাঠকের নিবিড় মনোযোগের দাবিদার। তাতেও হয়তো বইয়ের সবটা বোঝা যায় না। তাতেও হয়তো অনেক কিছুই আমাদের কাছে থেকে যায় রহস্যময় হয়েই। কিন্তু সে-সবের মধ্য দিয়েই লেখক বুঝিয়ে দেন, জীবন আসলে অপার সম্ভাবনার সমষ্টিমাত্র— যার ধুলোমুঠির থেকে সোনামুঠি আলাদা করার ক্ষমতা রয়েছে আমাদেরই হাতে, মনে, স্বপ্নে। এমন একটি দুঃসাহসিক আকার ও প্রকারের বই প্রকাশ করতে যে সাধ ও সাধ্য লাগে, এই মুহূর্তে এপার বাংলায় তা আছে শুধু কল্পবিশ্ব-র। লেখকের সঙ্গে তাঁদেরও ভূয়সী প্রশংসা করতেই হচ্ছে। তবে দুঃখের বিষয়, বইটিতে বেশ কিছু মুদ্রণ-প্রমাদ আছে। গল্পের গতির জন্য সেগুলো তেমন অন্তরায় না হলেও এমন বৈপ্লবিক কাঠামোতে লেখা উপন্যাস মুদ্রণের ক্ষেত্রে আরও একটু যত্ন দাবি করে। আশা করি পরবর্তী সংস্করনে এগুলো শুধরে নেওয়া হবে। বইটা শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলাম। বুঝতে চাইছিলাম, লেখক ঠিক কী বলতে চেয়ে এই উপন্যাসটি লিখেছেন? অবশেষে মনে হল, তিনি হয়তো বলতে চাইছেন যে একদিন কালীদহের সাহায্য না নিয়েই আমরা স্থান-কালের স্রোতে 'দ্য রোড নট টেকন্' ধরতে পারব; পৃথিবীকেও আবার বাসযোগ্য করে তোলা যাবে সেই পথে চলে। নবজাতকের কাছে হয়তো এটুকুই তাঁর অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার আমাদেরও হোক। আলো আসুক। আশা রাখি যে লেখক আগামী দিনেও এমন অসাধারণ প্রয়াসের মাধ্যমে আমাদের কল্পভুবনটিকে আরও প্রসারিত, আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ করে তুলবেন। ভরসা থাকুক।
my brain is hacked literally! বিদেশি বেশ কিছু টপ নচ সায়েন্স ফিকশন আমার পড়া আছে। ভাবতে অবাক লাগছে সেই রকম লেভেলের একটি টপ নচ সাইফাই বাংলাতে বাঙালি লেখক এর লেখাতে পড়লাম। কি ব্রিলিয়ান্ট লেভেলের ক্রিয়েটিভ থিঙ্কিং লেখক এর!!! বইটিকে শুধু সাইন্স ফিকশনের সীমাবদ্ধ করে রাখার জো নেই। হিউম্যান ইমোশন, বন্ধুত্ব, বিচ্ছেদ, পলিটিক্যাল বক্তব্য, ফিলোসফি, অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যাখ্যাহীন দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হওয়ার পর সমাজের চাপ, সমাজের গোঁড়ামি ইত্যাদি সবকিছু আছে। তার সাথে সাথে কত প্রকার ব্যাখ্যা যে হতে পারে গল্পটার তার ইয়ত্তা নেই। লেখককে কুর্নিশ কুর্নিশ!!
বইটি যে শুধুমাত্র এক অসাধারণ পাঠ অনুভূতি দেবে তা নয়, তার সাথে আপনাকে রীতিমতন ভাবাবে তার বিষয়বস্তু নিয়ে। আর যখন সেই মোডে একজন মানুষ চলে যায়, তখন মনে হয় খানিকক্ষণের জন্য মানুষ একটি বাকরুদ্ধ হয়ে যায়, যেটা আমার সাথেও হয়েছিল। কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে এই বই তো এক খনি বললেও কম বলা হবে, তবে যারা রহস্য এবং থ্রিলার কাহিনী পড়তে পছন্দ করেন, তাদেরকেও আমি এই বই পড়ার জন্য রেকমেন্ড করব। তবে হ্যাঁ একটা বিষয় আমি এখানে বলে দিতে চাই, সেটা হল - এই কাহিনী পড়ার সময় কিন্তু অশান্ত মস্তিস্ক হলে, কাহিনীর বিষয় মাথার এক আলোকবর্ষ দূর দিয়েও চলে যেতে পারে। তাই আমি এটাই সাজেস্ট করব যে খুব ধীর স্থির শান্ত মস্তিস্ক নিয়ে এই কাহিনী পড়বেন, তাহলে এই কাহিনীর বিস্তৃতি পার করে বিশাল হওয়ার অপার সম্ভাবনা আপনার কাছে খুলে যাবে।
সাহিত্যে আধুনিক জঁর ফিকশনের শ্রেষ্ঠ কাজের সাফল্য শুধুমাত্র আখ্যানের গুণমানের বিচারে সীমাবদ্ধ নয়। গল্পের গতিবিধি, চরিত্রের জটিলতা, বা উপসংহারের চমক যেমন অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে, সামগ্রিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তেমনই জরুরি একটি গল্প বা উপন্যাস কীভাবে তার সমকালীন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হচ্ছে। যেমন উর্সুলা লে গুইনের কল্পবিজ্ঞানকাহিনী, রেমন্ড শ্যান্ডলারের রহস্য উপন্যাস, বা স্টিফেন কিং-এর অলৌকিক গল্পের সাফল্য এই দুই বিভাগে সমানভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্যে। অনিন্দ্য সেনগুপ্তের ১৯৮২ উপন্যাস হিসাবে সমৃদ্ধ এবং সফল এরকম বহুবিধ কারণে। এই উপন্যাসের আলোচনা, সমালোচনা, বা মূল্যায়ন দীর্ঘ সময় ও ব্যাপ্তির দাবি রাখে। ১৯৮২ -র আখ্যানের গঠনশৈলী, তার কাঠামো, বিভিন্ন চরিত্র ও পরিস্থিতির জটিলতা কীভাবে নিষ্পত্তির দিকে এগিয়েছে, ইত্যাদি নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে আলোচনা হতে পারে। তর্ক চলতে পারে উপন্যাসে কীভাবে মফস্বলের উচ্ছল ছোটবেলা ও মেট্রোপ্লিটানের ক্লান্ত মাঝবয়সের দন্দ্ব গঠিত হয়েছে, অথবা জঁরের অন্যান্য পূর্বসূরিদের কাজ - সত্যজিৎ রায় থেকে স্পিলবার্গ, বা সুনীল গাঙ্গুলি থেকে কার্ল সাগান কীভাবে জায়গা করে নিয়েছে, এইসব নিয়েও। আমার ছোট পাঠপ্রতিক্রিয়ায় আমি একটি অন্যদিক নিয়ে ভাবার ও লেখার চেষ্টা করছি। ১৯৮২ আমার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে যেসব কারণে, তার মধ্যে অন্যতম হল এই উপন্যাসজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিবিধ ভাবনা বা কনসেপ্ট। তার মধ্যে আমার কাছে সবথেকে অর্থপূর্ণ এই উপন্যাসে সময়/ইতিহাসের ধারণা ও তার প্রতিফলন। স্পয়লারের সম্ভাবনা থেকে বিরত থেকেই বলছি, সময়ের ধারণা যে এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য তা নিতান্তই সুস্পষ্ট। ১৯৮২ ইতিহাসের কিছু বিশেষ বিশেষ সময়ের গল্প বলে। গল্প বলে সেইসব বিশেষ মুহুর্তের মধ্যে নিহিত সম্ভাবনার ও সেই সম্ভাবনার অপমৃত্যুর। আখ্যানের পটভূমি মূলত বাংলা এবং এইসব মুহুর্তগুলো একরকম আধুনিকতার সম্ভাবনা, আলোকপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা, প্রগতিশীল হওয়ার সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করে। ভেবে দেখা যেতে পারে উপন্যাসের কেন্দ্রে থাকা কালিদহের কথা। সেই রহস্য, জনশ্রুতি, আর কিংবদন্তী দিয়ে ঘিরে থাকা জলরাশি যা থেকে আলেয়ার মতো ভৌতিক আলো কখনও কখনও কেউ কেউ প্রতক্ষ্য করেন। প্রাচীন বাংলার এ কোন আলো যা তার প্রতিশ্রুত গন্তব্যে পৌঁছোতে পারেনি? উপন্যাসের অনেকটা জুড়ে আছে ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের নেহরুভিয়ান আদর্শে তৈরি শিল্পশহর বাণীনগর; দুর্গাপুর, জামশেদপুরের আদলে ভাবলে হয়তো দেখা যাবে আমাদের সবথেকে চেনা আধুনিকতার মডেল। একদিকে যেমন আছে চোখের সামনেই প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের ইনফ্রাস্ট্রাকচার, সেইসাথে আছে প্রায় জ্যামিতিক নকশায় তৈরি টাউনশিপ যেখানে বসবাস করেন নানা জাতির নানা ভাষার মানুষ। সেখানে যেমন নিজেদের মধ্যে ভাবনা ও সংস্কৃতির আদান প্রদান সম্ভব, আবার প্রযুক্তির হাত ধরে গোটা পৃথিবীর সাথে যোগস্থাপনও সম্ভব। একইসাথে সম ও বিবিধ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক। ৮০/৯০এর দশক জুড়ে শিল্পাঞ্চলের ক্রমশ জরাগ্রস্থ হয়ে পড়লে, আধুনিকতার এই যানটিও গন্তব্যের আগেই যেন থেমে যায়। কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ সরলরেখায় চলেনা; যেসব টুকরো টুকরো সম্ভাবনা নির্দিষ্ট কোনও মুহুর্তে পূর্ণতা পায়না, তা হয়তো অন্য কোনও সময়, অন্য কোনও স্থানে, ভিন্ন আকারে এসে হাজির হয় - উজ্জ্বল ইউটোপিয়ার মতোও হতে পারে আবার ভয়াল ডিস্টোপিয়াও হতে পারে। প্রকৃত ইতিহাস, যা হল সময়ের আখ্যান, সে সবসময়ই খন্ডিত, এলোমেলো, নির্দিষ্ট গন্তব্যবিহীন। বলা ভালো যে সরলরেখা নয় বরং ইতিহাস হল এক জটিল নেটওয়ার্ক। এই খণ্ডিত সময়ের আখ্যান ও নেটওয়ার্কের ধারণাই হয়তো ১৯৮২-কে তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রূপটি দান করেছে। বাংলা, ভারতবর্ষ, ও একভাবে গোটা পৃথিবীর ইতিহাসের কিছু নির্দিষ্ট মুহুর্তের মধ্যে আনাগোনা করে এই উপন্যাস। এই যাতায়াত কোনও সোজা রাস্তা ধরে নয়, বরং বিভিন্ন মানুষ, বিভিন্ন সত্বা ও তাদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে দেখা ও শোনা ঘটনাবলীকে প্রত্নতত্ত্ববিদের মতো যত্ন ও ধৈর্য্য নিয়ে জুড়তে জুড়তে। এই উপন্যাসের ভাষাও তেমনই খন্ডিত ও বিবিধ। কোথাও বাংলা, কোথাও ইংরেজি, আবার পাঞ্জাবী অনূদিত হচ্ছে বাংলায়, নেপালি মানুষের মুখের হিন্দি ভাষা লেখা হচ্ছে বাংলা হরফে - স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের টাউনশিপের কসমোপলিটান অভিজ্ঞতা, ইংরেজি মাধ্যমের লেখাপড়া ও সংস্কৃতির সঙ্গে আদানপ্রদান কোথাও গিয়ে মাতৃভাষার প্রবাহে মিশে নির্মাণ করছে এই দৈনন্দিনতার ভাষা, এই উপন্যাসের ভাষা। এই নিগূঢ় ইতিহাসবোধ ও সচেতনতা ১৯৮২-কে একটি সার্বিকভাবে সফল কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস হিসাবে গড়ে তোলে। চরিত্রায়ণ বা ঘটনাবলীর বিবরণে তাই কখনোই মনে হয়না যে ঔপন্যাসিক জোর করে বর্তমান সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যোগস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। যেকোনও জঁর ফিকশনের শ্রেষ্ঠ কাজের মতোই ১৯৮২-র বাস্তববোধ যেন অবধারিতভাবেই আমাদের সময়ের আশেপাশের চেনা গতিপথ ধরেই এগোতে থাকে। অগোছালোভাবে কিছু কথা লেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু অনেক অনেক কথাই বলা হলনা। শুধু স্পয়লারের কথা চিন্তা করে নয়; এরকম উপন্যাস নিয়ে একটি লেখায় বিশেষ কিছুই বলা হয়ে ওঠেনা। আশা করবো আরও অনেকে পড়বেন, তাঁদের সুচিন্তিত মতামত দেবেন, আলোচনা এগোবে ও আরও সমৃদ্ধ হবে। আপাতত আমি এই ভেবে অত্যন্ত আনন্দিত যে বিগত কিছু বছর ধরে বাংলা ভাষায় রীতিমত সিরিয়াস জঁর ফিকশনের চর্চা হচ্ছে এবং যেকোনও কাজের মতোই তার মধ্যে বেশ কিছু সাধারণ মানের হলেও থেকে থেকেই কিছু আন্তর্জাতিক মানের কাজেরও সম্মুখীন হতে পারছি। জঁর ফিকশন যে শুধুমাত্র কিশোর-কিশোরীদের নয় বরং প্রাপ্তমনষ্ক পাঠকের কাছেও তা সমান আবেদন রাখতে পারে, এটা হয়তো ধীরে হলেও আমরা অবশেষে উপলব্ধি করতে চলেছি। এবং এই কাজে কল্পবিশ্ব যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে, তার জন্য শুধু ধন্যবাদ বলা হয়তো যথেষ্ট নয়। ১৯৮২-র মতো একটি জটিল, প্রায় নিরীক্ষামূলক উপন্যাস প্রকাশ করার জন্য তাঁদের আমি সাধুবাদ ও আন্তরিক নমষ্কার জানাই।
সাহিত্যে আধুনিক জঁর ফিকশনের শ্রেষ্ঠ কাজের সাফল্য শুধুমাত্র আখ্যানের গুণমানের বিচারে সীমাবদ্ধ নয়। গল্পের গতিবিধি, চরিত্রের জটিলতা, বা উপসংহারের চমক যেমন অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে, সামগ্রিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তেমনই জরুরি একটি গল্প বা উপন্যাস কীভাবে তার সমকালীন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হচ্ছে। যেমন উর্সুলা লে গুইনের কল্পবিজ্ঞানকাহিনী, রেমন্ড শ্যান্ডলারের রহস্য উপন্যাস, বা স্টিফেন কিং-এর অলৌকিক গল্পের সাফল্য এই দুই বিভাগে সমানভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্যে। অনিন্দ্য সেনগুপ্তের ১৯৮২ উপন্যাস হিসাবে সমৃদ্ধ এবং সফল এরকম বহুবিধ কারণে। এই উপন্যাসের আলোচনা, সমালোচনা, বা মূল্যায়ন দীর্ঘ সময় ও ব্যাপ্তির দাবি রাখে। ১৯৮২ -র আখ্যানের গঠনশৈলী, তার কাঠামো, বিভিন্ন চরিত্র ও পরিস্থিতির জটিলতা কীভাবে নিষ্পত্তির দিকে এগিয়েছে, ইত্যাদি নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে আলোচনা হতে পারে। তর্ক চলতে পারে উপন্যাসে কীভাবে মফস্বলের উচ্ছল ছোটবেলা ও মেট্রোপ্লিটানের ক্লান্ত মাঝবয়সের দন্দ্ব গঠিত হয়েছে, অথবা জঁরের অন্যান্য পূর্বসূরিদের কাজ - সত্যজিৎ রায় থেকে স্পিলবার্গ, বা সুনীল গাঙ্গুলি থেকে কার্ল সাগান কীভাবে জায়গা করে নিয়েছে, এইসব নিয়েও। আমার ছোট পাঠপ্রতিক্রিয়ায় আমি একটি অন্যদিক নিয়ে ভাবার ও লেখার চেষ্টা করছি। ১৯৮২ আমার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে যেসব কারণে, তার মধ্যে অন্যতম হল এই উপন্যাসজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিবিধ ভাবনা বা কনসেপ্ট। তার মধ্যে আমার কাছে সবথেকে অর্থপূর্ণ এই উপন্যাসে সময়/ইতিহাসের ধারণা ও তার প্রতিফলন। স্পয়লারের সম্ভাবনা থেকে বিরত থেকেই বলছি, সময়ের ধারণা যে এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য তা নিতান্তই সুস্পষ্ট। ১৯৮২ ইতিহাসের কিছু বিশেষ বিশেষ সময়ের গল্প বলে। গল্প বলে সেইসব বিশেষ মুহুর্তের মধ্যে নিহিত সম্ভাবনার ও সেই সম্ভাবনার অপমৃত্যুর। আখ্যানের পটভূমি মূলত বাংলা এবং এইসব মুহুর্তগুলো একরকম আধুনিকতার সম্ভাবনা, আলোকপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা, প্রগতিশীল হওয়ার সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করে। ভেবে দেখা যেতে পারে উপন্যাসের কেন্দ্রে থাকা কালিদহের কথা। সেই রহস্য, জনশ্রুতি, আর কিংবদন্তী দিয়ে ঘিরে থাকা জলরাশি যা থেকে আলেয়ার মতো ভৌতিক আলো কখনও কখনও কেউ কেউ প্রত্যক্ষ করেন। প্রাচীন বাংলার এ কোন আলো যা তার প্রতিশ্রুত গন্তব্যে পৌঁছোতে পারেনি? উপন্যাসের অনেকটা জুড়ে আছে ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের নেহরুভিয়ান আদর্শে তৈরি শিল্পশহর বাণীনগর; দুর্গাপুর, জামশেদপুরের আদলে ভাবলে হয়তো দেখা যাবে আমাদের সবথেকে চেনা আধুনিকতার মডেল। একদিকে যেমন আছে চোখের সামনেই প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের ইনফ্রাস্ট্রাকচার, সেইসাথে আছে প্রায় জ্যামিতিক নকশায় তৈরি টাউনশিপ যেখানে বসবাস করেন নানা জাতির নানা ভাষার মানুষ। সেখানে যেমন নিজেদের মধ্যে ভাবনা ও সংস্কৃতির আদান প্রদান সম্ভব, আবার প্রযুক্তির হাত ধরে গোটা পৃথিবীর সাথে যোগস্থাপনও সম্ভব। একইসাথে সম ও বিবিধ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক। ৮০/৯০এর দশক জুড়ে শিল্পাঞ্চলের ক্রমশ জরাগ্রস্থ হয়ে পড়লে, আধুনিকতার এই যানটিও গন্তব্যের আগেই যেন থেমে যায়। কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ সরলরেখায় চলেনা; যেসব টুকরো টুকরো সম্ভাবনা নির্দিষ্ট কোনও মুহুর্তে পূর্ণতা পায়না, তা হয়তো অন্য কোনও সময়, অন্য কোনও স্থানে, ভিন্ন আকারে এসে হাজির হয় - উজ্জ্বল ইউটোপিয়ার মতোও হতে পারে আবার ভয়াল ডিস্টোপিয়াও হতে পারে। প্রকৃত ইতিহাস, যা হল সময়ের আখ্যান, সে সবসময়ই খন্ডিত, এলোমেলো, নির্দিষ্ট গন্তব্যবিহীন। বলা ভালো যে সরলরেখা নয় বরং ইতিহাস হল এক জটিল নেটওয়ার্ক। এই খণ্ডিত সময়ের আখ্যান ও নেটওয়ার্কের ধারণাই হয়তো ১৯৮২-কে তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রূপটি দান করেছে। বাংলা, ভারতবর্ষ, ও একভাবে গোটা পৃথিবীর ইতিহাসের কিছু নির্দিষ্ট মুহুর্তের মধ্যে আনাগোনা করে এই উপন্যাস। এই যাতায়াত কোনও সোজা রাস্তা ধরে নয়, বরং বিভিন্ন মানুষ, বিভিন্ন সত্বা ও তাদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে দেখা ও শোনা ঘটনাবলীকে প্রত্নতত্ত্ববিদের মতো যত্ন ও ধৈর্য্য নিয়ে জুড়তে জুড়তে। এই উপন্যাসের ভাষাও তেমনই খন্ডিত ও বিবিধ। কোথাও বাংলা, কোথাও ইংরেজি, আবার পাঞ্জাবী অনূদিত হচ্ছে বাংলায়, নেপালি মানুষের মুখের হিন্দি ভাষা লেখা হচ্ছে বাংলা হরফে - স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের টাউনশিপের কসমোপলিটান অভিজ্ঞতা, ইংরেজি মাধ্যমের লেখাপড়া ও সংস্কৃতির সঙ্গে আদানপ্রদান কোথাও গিয়ে মাতৃভাষার প্রবাহে মিশে নির্মাণ করছে এই দৈনন্দিনতার ভাষা, এই উপন্যাসের ভাষা। এই নিগূঢ় ইতিহাসবোধ ও সচেতনতা ১৯৮২-কে একটি সার্বিকভাবে সফল কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস হিসাবে গড়ে তোলে। চরিত্রায়ণ বা ঘটনাবলীর বিবরণে তাই কখনোই মনে হয়না যে ঔপন্যাসিক জোর করে বর্তমান সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যোগস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। যেকোনও জঁর ফিকশনের শ্রেষ্ঠ কাজের মতোই ১৯৮২-র বাস্তববোধ যেন অবধারিতভাবেই আমাদের সময়ের আশেপাশের চেনা গতিপথ ধরেই এগোতে থাকে। অগোছালোভাবে কিছু কথা লেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু অনেক অনেক কথাই বলা হলনা। শুধু স্পয়লারের কথা চিন্তা করে নয়; এরকম উপন্যাস নিয়ে একটি লেখায় বিশেষ কিছুই বলা হয়ে ওঠেনা। আশা করবো আরও অনেকে পড়বেন, তাঁদের সুচিন্তিত মতামত দেবেন, আলোচনা এগোবে ও আরও সমৃদ্ধ হবে। আপাতত আমি এই ভেবে অত্যন্ত আনন্দিত যে বিগত কিছু বছর ধরে বাংলা ভাষায় রীতিমত সিরিয়াস জঁর ফিকশনের চর্চা হচ্ছে এবং যেকোনও কাজের মতোই তার মধ্যে বেশ কিছু সাধারণ মানের হলেও থেকে থেকেই কিছু আন্তর্জাতিক মানের কাজেরও সম্মুখীন হতে পারছি। জঁর ফিকশন যে শুধুমাত্র কিশোর-কিশোরীদের নয় বরং প্রাপ্তমনষ্ক পাঠকের কাছেও তা সমান আবেদন রাখতে পারে, এটা হয়তো ধীরে হলেও আমরা অবশেষে উপলব্ধি করতে চলেছি। এবং এই কাজে Kalpabiswa Publications কল্পবিশ্ব - Kalpabiswa যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে, তার জন্য শুধু ধন্যবাদ বলা হয়তো যথেষ্ট নয়। ১৯৮২-র মতো একটি জটিল, প্রায় নিরীক্ষামূলক উপন্যাস প্রকাশ করার জন্য তাঁদের আমি সাধুবাদ ও অভিনন্দন জানাই।
বাংলার কল্পবিজ্ঞান তথা স্পেকুলেটিভ ফিকশনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছে অনিন্দ্য সেনগুপ্তের "১৯৮২" উপন্যাসের মাধ্যমে। এটি একটি অবিস্মরণীয় গল্পের পটভূমিতে রচিত, যেখানে রহস্য ও সময়ের অদ্ভুত খেলায় পাঠককে গভীরভাবে জড়িয়ে রাখা হয়েছে। এই বইটি শুধুমাত্র একটি বিনোদনমূলক কাহিনী নয়, বরং এটি গভীর চিন্তা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বিভিন্ন আভাস প্রদান করে।
এই উপন্যাসে, সময়ের ধারণা এক নতুন রূপ গ্রহণ করেছে। চল্লিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ভয়াবহ ঘটনার সূক্ষ্ম চিত্র পরিস্ফুটিত হয়েছে। কালিদহের প্রাচীন জলাশয়ের রহস্য, নিখোঁজ এক মেন্টরের কাহিনী এবং চারজন 'সারভাইভার'-এর জীবনের সূত্রে ওঠা তথ্য—সবকিছুই যেন আমাদের মধ্যে এক ধারাবাহিক অজ্ঞতার উপস্থিতি নির্দেশ করছে।
"১৯৮২" উপন্যাসটি চিত্রনাট্যের আকারে লিখিত, যা বাংলা সাহিত্যে একটি দুর্লভ এবং অভিনব কৌশল। এই পদ্ধতি লিনিয়ার এবং নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভের পরিচিত তত্ত্বগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে। এর ফলে, পাঠক একটি অসাধারণ রহস্যময় জগতে প্রবেশ করে, যেখানে ইতিহাস কখনও সুন্দর দৃশ্য এবং কখনও ভয়ের অন্ধকারের মাধ্যমে একটি অতিক্রমণের পথ তৈরি করেছে। এটি একাধিক সম্ভাবনার সংকেত প্রদান করে, যা কল্পনাকে ভেঙে নতুনভাবে নির্মাণের আহ্বান জানায়।
এই উপন্যাসটি কেবল কল্পনা নয়; এটি সমাজের একটি প্রতিচ্ছবি। রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সাথে সমন্বিত হয়ে লেখক আমাদের সামনে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন, যেখানে আধুনিকতা, প্রগতিশীলতা এবং ঐতিহ্যের সংঘর্ষ এক মহাকাব্যের রূপ ধারণ করে। লেখক আমাদের বোঝাতে চান যে, সময়ের এই উৎকর্ষতার মধ্যে পুনঃআবিষ্কার সম্ভব এবং সহস্র বছরের ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন অসমাপ্ত ঘটনার নতুন তাৎপর্য তৈরি করা যেতে পারে।
ভাষার সৌন্দর্য এবং গঠনশৈলী এই উপন্যাসের অন্যতম ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য। বিভ���ন্ন ভাষা এবং সাংস্কৃতিক পরিধির সমন্বয়ে একটি বিশেষ বাস্তবতা নির্মিত হয়েছে, যা চলচ্চিত্রের আঙ্গিককে প্রতিফলিত করছে।
এই পরীক্ষামূলক এবং চ্যালেঞ্জিং উপন্যাসটি প্রকাশ করার জন্য কল্পবিশ্বকে বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানানো আবশ্যক। "১৯৮২" আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে কীভাবে আমরা নিজেদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের শিকড়ে ফিরে যেতে পারি। এটি প্রতিটি পাঠকের মনে আগ্রহ ও ভাবনাকে উদ্দীপিত করবে, যা আমাদের সৃজনশীলতাকে নিরন্তর প্রশ্রয় দেয়।
আশা করি, এই বইয়ের মাধ্যমে লেখক আমাদের সৃজনশীলতার নতুন দ্বার উন্মুক্ত করতে সক্ষম হবেন, যা আমাদের চিন্তাভাবনাকে আরো উদ্ভাসিত করবে। আগেই বলেছি, "১৯৮২" কেবল একটি উপন্যাস নয়, বরং এটি বাংলার কল্পবিজ্ঞান তথা স্পেকুলেটিভ ফিকশনের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
প্রথমেই বলে রাখা ভালো, আমি যাদবপুরের ফিল্ম স্টাডিসের ছাত্র ছিলাম, সেই সূত্রে অধ্যাপক সেনগুপ্তের ক্লাস করার সুযোগ হয়েছে। তবে ক্লাসরুমে সাক্ষাৎ হওয়ার আগেই সোশাল মিডিয়ায় হোককলরব আন্দোলন ও সিনেমা সংক্রান্ত লেখালিখি এবং ওঁর প্রথম উপন্যাসটির সূত্রে স্যারের সাথে পরোক্ষ পরিচয় হয়ে গেছিল।
১৯৮২র প্লট নিয়ে বিস্তারিত বলব না, বস্তুত এ গপ্পের প্লট সামারি করতে যাওয়া সংগত কারণেই বেশ কঠিন। তার চাইতে কল্পবিশ্বের ওয়েবসাইটে যে দুঃসাহসী সারসংক্ষেপ দেওয়া আছে, সেইটে রেফার করা অনেক নিরাপদ। আমি বরং কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা বলে তারপর উপন্যাসের কয়েকটি বিশেষ দিক কথা বলব।
উপন্যাসের নায়ক যাকে বলা যায়, সেই রণজয় অনেকগুলো স্মৃতি টেনে আনে। সে তো শুধু নাসার বিজ্ঞানী এবং এক্স নকশাল নয়, তার পাশাপাশি ছোটছোট চারজন কিশোরকিশোরীর স্বপ্নজগতের কারিগরও বটে। আমার মনে হয় আমরা যারা কল্পনার জগতে বু্ঁদ হয়ে থাকতে ভালোবাসি, ভালোবাসি কল্পবিজ্ঞান, অ্যাডভেঞ্চার, ডিটেকটিভ, রূপকথা আর ফ্যান্টাসির মায়াজগতে ফিরে ফিরে যেতে–তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই এই বাস্তবের অন্তরালবর্তী কুজ্ঝটিকাময় পৃথিবীতে অনুপ্রবেশ ঘটেছে কোনো দাদা-দিদি, পিসি, বা জেঠুর হাত ধরে। রণজয় যেমন রুপু দিপু দীপ রিখির ফ্রেন্ড ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড ছিল, তেমনি আমাদের জীবনেও, একটি মানুষ না হলেও, অনেক মানুষের টুকরো টুকরো চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি রণজয় গড়ে তোলা যায়।
আমার নিজের কথাই বলি, আমার এক ভদ্রেশ্বরের বড়োপিসেমশাই ছিলেন, যদ্দূর জানি তিনি কোনো চাকরি করতেন না, ভদ্রেশ্বরেই কোথাও একটা সাইকেলের দোকান ছিল তাঁর। বড়োপিসে ও তাঁর ছোটছেলে যখন কোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষে আমাদের হাওড়ার পুরোনো ছাতাপড়া বাড়িটায় এসে থাকতেন, বা আমি যেতুম ভদ্রেশ্বরে, তখন তাঁদের ডিউটি ছিল সময়ে অসময়ে আমার গপ্পের আবেদন মেটানো। গালিভার্স ট্র্যাভেলস থেকে ফ্যান্টম, শঙ্কু থেকে ইটি, সিন্ধবাদ থেকে ট্রেজার আইল্যান্ড–সব কিছু পড়া বা দেখার আগেই মুখে মুখে শোনা হয়ে গেছিল আমার। তখন কতই বা বয়েস, ক্লাস টু-থ্রিতে পড়ি হয়তো। সেই গপ্পো শোনার আবেশ এখনও রয়ে গেছে, রয়ে গেছে ভদ্রেশ্বরের বাড়ি গিয়ে পুরোনো কুলুঙ্গি খুলে প্রচ্ছদে কঙ্কাল আঁকা হলদে বই পাওয়ার স্মৃতি, তার সঙ্গে ঝুরঝুরে হয়ে যাওয়া পুরোনো আনন্দমেলা, টারজান সমগ্র, প্রোফেসর শঙ্কুর ডায়রি। ছাতে শুয়ে ভূতের গল্প শুনতে শুনতে কার্নিসে বসা দাঁড়কাক দেখে গা ছমছম করা; বাড়ির পাশে রেললাইনের ধারে স্কন্ধকাটা ঘুরে বেড়ায় শুনে ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকা। শুধু বড়োপিসে নয়, আমার বাবা, ছোটপিসি, ঠাকুমা, দিদিমা, এঁরা সকলেই শৈশব থেকে কৈশোরে ওঠার সময়টুকুতে আমার খাঁই মিটিয়ে গেছেন অজস্র আজগুবি গপ্পো শুনিয়ে। এখন বুঝি ঐ বয়েসে শোনা গপ্পোগুলো মনটাকে একটা বিশেষ ছাঁচে গড়ে দিয়েছে।
নিজের কথা এতক্ষণ বলে আসলে পাঁয়তারা কষলাম; যেটা বক্তব্য, তা হল–১৯৮২ আমার মতে গল্প বলার ও শোনার গল্প। অর্থাৎ গল্প বা ফিকশন, এবং তার কথন হল এর মূল প্রেরণা, উদ্দীপনা ও কাটাছেঁড়ার বিষয়। যেহেতু যে ফিকশন ১৯৮২র উপজীব্য তা কয়েকটি বিশেষ ঘরানার, তাই ১৯৮২ যে সব পাঠকের জন্য তাও নয়। একপ্রকারের জঁর ফিকশনের জগৎ সম্বন্ধে যাঁদের অল্পবিস্তর জানাশোনা আছে, তাঁরাই আমার মতে এই উপন্যাসের উদ্দিষ্ট পাঠক, কারণ গপ্পে যে রঙিন শৈশবের স্মৃতিকে উদ্রেক করা হয়েছে, যাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে গল্প শোনার স্মৃতি, তাতে থাকা এবং তার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা যাঁরা সয়েছেন, তাঁরা ব্যতিরেকে অন্য কেউ এ উপন্যাসের রসাস্বাদন নাও করতে পারেন।
কিন্তু সবজান্তা geek হওয়াটাই একমাত্র শর্ত নয়, উপন্যাসটি পাঠকের কাছে একরকমের মনোযোগ, ধৈর্য এবং সহানুভূতিও দাবি করে তার গড়ন, চলন এবং বিভিন্ন তাত্ত্বিক অভিনিবেশের প্রতি। এখানেই গল্প বলার গল্প বিষয়টি জরুরি হয়ে ওঠে, কারণ ১৯৮২-র আখ্যানবিশ্বে কোন অংশটি সত্যিই ঘটছে এবং কোনটি ঘটছে না–এটা একটা সময়ে বোঝা দুষ্কর হয়ে ওঠে। আমাদের এপিক ট্র্যাডিশনে যেমন হত, অজস্র গপ্পের সমাহারে একটি আখ্যান গজিয়ে উঠত, অনেকটা ম্যাট্রোশকা পুতুলের মত, কিসসার মধ্যে কিসসা, গপ্পের মধ্যে গপ্প, একেকটি গপ্পের মধ্যে ধরে রাখা একেকটি কালপর্ব, ১৯৮২তেও খানিকটা তাই, তবে ব্যাপার আরো ঘোরতর।
রণজয় এবং তার শাগরেদদের কীর্তি যেভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে, তাতে স্মরণের প্রক্রিয়াটি খোদিত আছে! মানে সেগুলো যে ঘটমান বর্তমান নয়, বরং অতীত, তা শুরু থেকেই স্পষ্ট। যেহেতু স্মরণ, তাই তাতে বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার মিশেল ঘটবে। তবু ক্ষেত্রবিশেষে, উপন্যাসের ঘটনা যেভাবে এগোয়, তাতে একেক জায়গায় মনে হয় সময় যেন অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে না, বরং উল্টোটা, ভবিষ্যত থেকে ঘটনাগুলো উড়ে আসছে অতীতে, অতীত নির্ধারিত হচ্ছে ভবিষ্যতের দ্বারা।
আমাদের চিরাচরিত সময়ের ধারণা এখানে ঘা খায়। সচরাচর আমরা ধরেই নিই অতীত মানে যা বাস্তব ছিল, এখন নেই, কিন্তু তার ক্ষয়িষ্ণু অবশেষ লেপটে রয়েছে বর্তমানের গায়। তাকে আমরা রুইনস্ বলি, ভূত বলি, ফ্যান্টম বলি। তারপর ধরে নিই ঘটনাস্রোত ভবিষ্যতের দিকে এগোবে, তার কিছু সম্ভাবনা পূর্ণতা পাবে, কিছু পাবে না। ১৯৮২তে কিন্তু উল্টো জিনিসটাও সত্যি। অর্থাৎ ভবিষ্যত সবসময় অতীতের সম্ভাবনার বাস্তবায়ন নয়, সে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাস্তব হয়ে অতীতকে প্রভাবিত করতে, নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্যত। অতীত আর ভবিষ্যতের মধ্যে যে উভমুখী মোলাকাত, তাদের মধ্যে সবসময় সংশ্লেষ হয় না, সূত্র আলগা হয়ে পড়ে থাকে, তৈরি হয় অনেক অনেক গল্পবিশ্ব, একই ঘটনাসূত্রের হাজার খতিয়ান, হাজার হাজার কিসসা। কারণ অতীত ও ভবিষ্যতে মন্দ ভালো এবং ধূসর–সবরকম শক্তিই সক্রিয়।
সময়ের এই বিচিত্র গতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলে আসে বিভিন্ন টাইপের চরিত্র, আমাদের বাংলাবাজারে তথাকথিত জঁর ফিকশন এবং সিরিয়াস ‘সামাজিক’, ‘বাস্তববাদী’ কথাসাহিত্যের মধ্যে যে গণ্ডী রয়েছে, তার দুপার থেকে ছিটকে আসা ‘টিপিকাল’ চরিত্র ও ঘটনাস্থল এসে ভিড় করে ১৯৮২তে। যেমন বিরানব্বইয়ের মসজিদভাঙার গল্পে চলে আসে পোর্টাল এবং সুপারপাওয়ারের গল্প। তা না হলে মানুষ দমবন্ধকরা সময়ের পাকদণ্ডী থেকে মুক্তি পাবে কী করে?
১৯৮২ সে দিক থেকে বললে, সময়ের রৈখিক ধারণা থেকে মুক্ত হওয়ার গল্প, কার্যকারণ পরম্পরা যে ইতিহাসচেতনার ভিত্তি, তার থেকে বেরিয়ে আসার বেপরোয়া চেষ্টা। সে ইতিহাসকে প্রত্যাখ্যান করে না, কিন্ত�� তাকে ছিন্নমালার অজস্র পু্ঁতির মত একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গল্পের জগৎ হিসেবে চিহ্নিত করে। সে বলে যে একই ঘটনার অনেক অবয়ব থাকতে পারে, কুরোসাওয়ার রাশোমনের মত, কোনো একটি সত্য দিয়ে তার মীমাংসা হয় না। সত্য ও বাস্তবের যেহেতু কোনো মাপকাঠি নেই, সবই যেহেতু দিনের শেষে গল্প হয়ে যেতে পারে, তাই কোনো অবিশ্বাস্য ঘটনাকে রূপক বা ট্রমাজনিত আখ্যান বলে দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। হয়তো সেটা কাম্যও নয়, তা হলে শেষমেশ উপন্যাসটি কয়েকটি ট্রমা-তাড়িত চরিত্রের ফ্যান্টাসি ও ডিলিউশনের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ হয়ে দাঁড়াত। বাস্তববাদের যুক্তিতে যা রূপক, অর্থাৎ বাস্তবের গূঢ় অভিব্যক্তি, তা এখানে মেটিরিয়াল, রক্তমাংসের বাস্তব। গল্পের অলৌকিক, অবিশ্বাস্য ঘটনা ও চরিত্র যে সব বাস্তব ঘটনার রূপক হতে পারত, তাদের ইতিমধ্যেই খোলসা করে দেওয়া হয়েছে। কাজেই রূপক টেনে আনার কোনো প্রয়োজনই নেই। ফলে যুক্তিসম্মত ‘বাস্তব’ আর মায়াজগৎ জড়িয়ে পেঁচিয়ে উঠেছে একে অপরের গা বেয়ে।
রাশোমনের মত অ্যান্টি-ডিটেকটিভ ফিল্মেও শেষমেশ সত্যের অন্বেষণ জারি ছিল। বর্তমানের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে, নৈতিকতার অধঃপতন, সত্য নিশ্চিহ্ন, নৈরাজ্যই সর্বাত্মক–এ কথা মেনে নিয়েও গল্পের চরিত্ররা এক বেওয়ারিশ নবজাতককে বড় করে তোলার মধ্যে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার সূত্র পেয়েছিলেন, বেঁচে থাকার উদ্দীপনা খুঁজে পেয়েছিলেন। এই টিমটিম করে জ্বলা দীপশিখাটিই ইউটোপিয়া-কে জাগিয়ে রাখে। একইভাবে, ১৯৮২-ও কোনো সমাধানসূত্রে পৌঁছয় না। কালীদহের পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, তার কোনো সঠিক হদিশ মেলে না, সে-সম্বন্ধে গল্পের বড়দের মত পাঠকদেরও অন্ধকারে ফেলে রাখা হয়। উপন্যাসটি বড়দের জন্য লেখা বলেই কি পাঠকদের বিশ্বাস করা গেল না? গল্পটি যেখানে শেষ হয় সেখান থেকে বরং আরো অনেকক’টি গল্পের শেকড়বাকড় বেরিয়ে আসে–রণজয় ও বিদিশার গল্প, রণজয়, দিপু ও রুপুর কালত্রিশঙ্কু থেকে পালানোর গল্প, রিখি ও পাখির হারিয়ে যাওয়ার রহস্য, সৌজন্যর বড় হয়ে ওঠার গল্প, দিবাকর ও স্ক্রাইবারের গল্প। এবং এই সবকটি গল্প একজায়গায় আসার সম্ভাবনা।
লেখকের অপার্থিব উপন্যাসটি পড়ার পর , ওনার লেখা আরও পড়ার উৎসাহ জন্মায়। সেটি থেকেই এই বইটি পড়া শুরু করেছিলাম, একেবারেই হতাশ হইনি।
বইটিতে সময় পরিভ্রমণের অসীম সম্ভাবনা নিয়ে উপভোগ্য সামাজিক আলেখ্য ও কল্পবিজ্ঞানের আলোচনা আছে। তার সাথে ভারতের তথা বাংলার গত পঞ্চাশ বছরের বিভিন্ন সামাজিক অভিমুখের আলোচনাও ছড়িয়ে আছে গল্পের পরতে পরতে। পুরো উপন্যাসটি কথপোকথন ভিত্তিক হওয়ায়, বেশ দ্রুত পড়ে ফেলতে পেরেছি। এখানে বিজ্ঞানের জটিল বিষয় সহজ ভাবে আলোচনা করায় আরও সুবিধা হয়েছে।