1990 র দশকে পড়া আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখক শ্রদ্ধেয় বিমল করের উপন্যাস "অসময়" পড়বার ইচ্ছে হলো আবার।
এক বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় শুরু করলাম এই পাঠ।
তারপর একটু একটু করে এই কাহিনী মূল চরিত্র মোহিনী ও তার পাশাপাশি আয়না , জ্যাঠামশাই, সুহাস আর শচিপতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া। আজ থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার পাঠের স্মৃতি আর এখনকার এই পাঠ মিলেমেশে যাচ্ছিল। এই উপন্যাসের পটভূমি অধুনা ঝাড়খন্ডের কোন এক আধা শহর যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছয়নি।সময়টা হয়তো ষাটের দশক। কিন্তু একটি বনেদি পরিবারের রুচি ও সম্মানের ধারক বৃদ্ধ জ্যাঠামশাই ও তাঁর ভাইপো, ভাইজি যারা তাঁর নিজের সন্তান সম, ছোট ভাই ও তার স্ত্রীর এমনকি নিজের স্ত্রীর অকাল মৃত্যু র পরে এমন একটি পরিবারের ঘটনা ই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। এই উপন্যাসে মৃত্যু র অনুষঙ্গ বারবার আসে। সেই পটভূমিতে রাঁচি র কাছাকাছি কোনো আধা শহরের ছড়ানো ছেটানো মাঠঘাট , জমি ও গৃহস্থ বাড়ি ও তার লাগোয়া বাগান, অনতিদূরে রেল স্টেশন, রাতের অন্ধকারে ট্রেনের হুইসিলের শব্দ, অথবা গুমগুম শব্দে ট্রেনের চলে যাওয়া , আর বৃষ্টির জলে ভিজে ওঠা বাগানের গাছপালা, ভেজা মাটি, ঘাস,লতা পাতার গন্ধ, রাতের অন্ধকারে সেজবাতির আলোয় আধো অন্ধকারে বিভিন্ন চরিত্রে র মনের আলো- আঁধারি জগতের মধ্যে আমরা একটু একটু করে অমোঘ মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যাই। প্রত্যেকটা চরিত্র ই যেন আমাদের কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। এমন করে জীবনের ঘটে যাওয়া যেন অদৃষ্ট চালিত ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যেতে যেতে প্রকৃতি আর মানুষের অনবদ্য সহাবস্থান আমাদের স্নায়ু কে এক বিষণ্ণ অথচ কি গভীর এক টানে বেঁধে ফেলে। আমরা ঐ আধা শহরের দিবারাত্রি র ভোর থেকে রাতের প্রবাহের মধ্যে প্রত্যেক চরিত্রে র সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে থাকি , তা যেন আমাদের বাস্তব জীবনের আত্মীয়তার মতো মনে হতে থাকে। অথচ এই সব চরিত্রের প্রত্যেকের অনুভূতি র মধ্যে এমন এক মন্থর , অনুচ্চ শান্ত, স্নিগ্ধতা যেখানে আছে মৃত্যু অথবা ভাগ্যের পরিহাস, নানা ভাগ্য বিপর্যয় সত্ত্বেও ভালোবাসা র নিগুঢ় পারিবারিক বন্ধন, জীবনকে মেনে নেওয়ার এক অদৃষ্টবাদিতা - এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য আর বিষণ্ণতা র মধ্যেও শালীনতা ও শোভনতার আশ্চর্য মিশেলে গড়ে ওঠা মধ্য তিরিশের বিবাহ বিচ্ছিন্না মোহিনী, তার যৌবনের শেষ প্রান্ত ছোঁয়া বোন আয়না, পরিবারের মৃত্যুর আবহে ভাগ্যের নানা বিপর্যয় সত্ত্বেও ভাই সুহাসের ,সকলের জন্য মমতা বুকে নিয়ে এই শূন্যতা থেকে নিজেকে ভুলিয়ে কলকাতা শহরের হইচইয়ের মধ্যে চাকরিতে ব্যস্ত থাকা- এ সব নিয়ে এই সব চরিত্র ই একে একে নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার মতো করে তাদের জীবনের আপাত সাধারণ দিন ও ঘটনা ব্যক্ত করে গেছে। কখনো মোহিনী, কখনও আয়না, কখনও জ���যাঠামশাই আবার কখনও সুহাস অথবা তাদের আত্মীয় সম প্রতিবেশী শচিপতি যার অভিশপ্ত পরিবারে হানা দিয়েছে মৃত্যু, বারেবারে আকস্মিকভাবে , এরা ঘুরে ঘুরে এসেছে। কখনও ভোরের ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা গায়ে মাখতে মাখতে, কখনও দুপুরের গরম হয়ে ওঠা দিনের প্রান্তে, কখনও আকাশের কোনে জমে ওঠা কালো মেঘ, তুমুল বৃষ্টি , ভিজে মাটি , গাছপালার গন্ধ মাখা রাতের অন্ধকারে এই সব চরিত্র রা নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলেছে। মনের কথা। আর তাই আমরা শুনেছি। আর এভাবেই এ গল্পের আর এক মূল চরিত্র অবিন এসে দেখা দিয়েছে সুহাসের বন্ধু হিসেবে, পৌঁছে গেছে এই পরিবারের অন্দরমহলে। সেই অবিন যে যুক্তি বাদী, যে অদৃষ্টের কাছে আত্মসমর্পণে বিশ্বাসী নয়, যে বাঁচতে ভালোবাসে, কোনো নিয়ম, শৃঙ্খলা র বাঁধনে বাঁধা থেকে নিজেকে বঞ্চিত হতে দিতে চায় না বা অন্যকেও জীবনের অদৃষ্টবাদী আত্মসমর্পণ থেকে ফিরিয়ে আনতে চায়। খোলা হাওয়ার মতো তার চিন্তা, ভাবনা সাহসী , ব্যাতিক্রমী, সমাজ সংসারের ঠুনকো নিয়মকে যে অস্বীকার করতে পিছপা হয় না। আবার যার হৃদয়ে থাকে এক অপূর্ব সহমর্মিতা- এমনই এক বাঁধন হারা যুবক এই সমাজ, রীতিনীতি আর নিজেদের কে গুটিয়ে রাখা জীবনে অভ্যস্ত এই সব মানুষদের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়।
এমন ই সব চরিত্র আর ঘটনার অনুচ্চ প্রবাহে সুক্ষ অনুভূতি তে ধরা পড়া প্রকৃতির উপাদানে ভরপুর আমাদের এই জীবনকে যেন কী এক মায়ায় ভালোবাসতে শেখায়। যেখানে স্বাভাবিক, সাধারণ জীবন যাপনের আটপৌরে অভ্যস্ততা য় ভালোবাসা ও টান , মানবিকতা ও প্রগাঢ় জীবনবোধ জড়িয়ে থাকে।
অসময় উপন্যাস পাঠ যেন এক ঘোর লেগে যাওয়া অভিজ্ঞতা যেখান থেকে বেরিয়ে আসতে কষ্ট হয়। 2025 এর এই আধুনিকতা আর প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব আবহে অসময় আমাদের নিয়ে যায় এমন এক সময়ে যেখানে জীবন মন্থর, সামাজিক বিধিনিষেধের ঘেরাটোপে আটকে থাকা , কিন্তু যেখানে মানুষের মন আর হৃদয় কাঁপে তিরতিরে ভালোবাসার অনুভূতি তে, যান্ত্রিকতায় শক্ত হয়ে যাওয়া আজকের মন যার জন্য কাঁদে। সেই সময়, সেই মানুষ, সেই জীবন যেখানে ব্যথা, যন্ত্রণা, অসহায়তা, থাকা সত্ত্বেও কী এক মায়াময় সহমর্মিতা আর হৃদয় মথিত করা অনুভূতি কে ছুঁতে আমরা হাথ বাড়িয়ে দিই এইসব চরিত্র দের দিকে। ফেলে আসা সেই সময় আমাদের পিছু ডাকে। পাশাপাশি রাখা বিহারের ( অধুনা ঝাড়খন্ড) বাঙালি পরিবারগুলোর সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা আর প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে যেতে হবে "অসময়" র কাছে। সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার পাওয়া এই অতুলনীয় সাহিত্যের রচয়িতা কে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম। আজ যখন এই অশান্ত পৃথিবী আমাদের ভয়ে আড়ষ্ট করে তুলছে, কী এক যান্ত্রিক, মেকি জীবনের অস্বস্তিতে আমাদের সম্পর্কগুলো আলগা হতে থাকছে তখন অবিনের মতো চরিত্র আর অসময়ের মতো উপন্যাস আমাদের, জীবনকে ভালোবাসতে শেখায়। এখানেই সাহিত্যের সার্থকতা।