What do you think?


কারুবাসনা
‘বনলতা সেন' কবিতাটির আগেই বনলতা এই উপন্যাসে জীবনানন্দের স্মৃতিনির্মিত নায়িকা।
“সেই বনলতা, আমাদের পাশের বাড়িতে থাকত সে। কুড়ি-বাইশ বছরের আগের সে এক পৃথিবীতে, বছর আষ্টেক আগে বনলতা একবার এসেছিল। দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চালের বাতায় হাত দিয়ে মা ও পিসিমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলল সে। তার পর আঁচলে ঠোঁট ঢেকে আমার ঘরের দিকে আসছিল। কিন্তু কেন যেন অন্যমনস্ক নত মুখে মাঝপথে গেল থেমে, তার পর খিড়কি পুকুরের কিনারা দিয়ে, শামুক গুগলি পায়ে মাড়িয়ে, বাঁশের জঙ্গলের ছায়ার ভিতর দিয়ে চলে গেল সে। নিবিড় আমরুল গাছটার নীচে একবার দাঁড়াল, তার পর পৌষের অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।”
দেবেশ রায় সম্পাদিত, মূল পান্ডুলিপি থেকে মুদ্রিত। মূল খাতায় জীবনানন্দ দাশ যে অংশগুলি কাটাকুটি করে বাদ দিয়েছিলেন, তা'ও এখানে সংযোজিত হয়েছে।
“সেই বনলতা, আমাদের পাশের বাড়িতে থাকত সে। কুড়ি-বাইশ বছরের আগের সে এক পৃথিবীতে, বছর আষ্টেক আগে বনলতা একবার এসেছিল। দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চালের বাতায় হাত দিয়ে মা ও পিসিমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলল সে। তার পর আঁচলে ঠোঁট ঢেকে আমার ঘরের দিকে আসছিল। কিন্তু কেন যেন অন্যমনস্ক নত মুখে মাঝপথে গেল থেমে, তার পর খিড়কি পুকুরের কিনারা দিয়ে, শামুক গুগলি পায়ে মাড়িয়ে, বাঁশের জঙ্গলের ছায়ার ভিতর দিয়ে চলে গেল সে। নিবিড় আমরুল গাছটার নীচে একবার দাঁড়াল, তার পর পৌষের অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।”
দেবেশ রায় সম্পাদিত, মূল পান্ডুলিপি থেকে মুদ্রিত। মূল খাতায় জীবনানন্দ দাশ যে অংশগুলি কাটাকুটি করে বাদ দিয়েছিলেন, তা'ও এখানে সংযোজিত হয়েছে।
- GenresFiction
128 pages, Hardcover
Published February 1, 2022
About the author
Jibanananda Das
87 books435 followersJibanananda Das (bn: জীবনানন্দ দাশ) is probably the most popular Bengali poet. He is considered one of the precursors who introduced modernist poetry to Bengali Literature, at a period when it was influenced by Rabindranath Tagore's Romantic poetry. During the later half of the twentieth century, Jibanananda Das emerged as the most popular poet of modern Bengali literature. Popularity apart, Jibanananda Das had distinguished himself as an extraordinary poet presenting a paradigm hitherto unknown. It is a fact that his unfamiliar poetic diction, choice of words and thematic preferences took time to reach the heart of the readers. Towards the later half of the twentieth century the poetry of Jibanananda has become the defining essence of modernism in twentieth century Bengali poetry.
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 5 of 5 reviews
Read
June 28, 2026"রাত দুপুরে বড়ো বাপ-মা তুলে গাল! অমানুষ! তোমাদের ওই ঘরে মানুষ কটা শুনি?ফের গাল দিয়েছ তো তোমার মেয়ের গলা টিপে আমি জলে ফেলে দিয়ে আসব।"
জীবনানন্দ ১৯৩৩ সালে লিখেছিলেন এই উপন্যাস। উৎসাহী পাঠকমাত্রই জানেন, "কারুবাসনা" তার ছদ্ম আত্মজীবনী। নায়ক হেম ও জীবনানন্দের দুজনেরই বয়স, বৈবাহিক অবস্থা, আর্থিক অবস্থা থেকে শুরু করে সব বিষয়েই মিল আছে। একযুগ আগে পড়ার সময় যা সচেতনভাবে খেয়াল করিনি তা হচ্ছে, পুরো উপন্যাসে স্বগতকথন বলতে গেলে নেই, কার মনে কী চলছে তা জানার প্রধান উপায় হচ্ছে সংলাপ। বইয়ের সবচেয়ে স্মরণীয় স্বগতকথন "কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে। সব সময়ই শিল্প সৃষ্টি করবার আগ্রহ, তৃষ্ণা, পৃথিবীর সমস্ত সুখ-দুঃখ, লালসা, কলরব, আড়ম্বরের ভিতর কল্পনা ও স্বপ্ন চিন্তার দুর্ভেদ্য অঙ্কুরের বোঝা বুকে বহন করে বেড়াবার জন্মগত পাপ। কারুকর্মীর এই জন্মগত অভিশাপ আমার সমস্ত সামাজিক সফলতা নষ্ট করে নিয়েছে। আমার সংসারকে ভরে দিয়েছে ছাই-কালি-ধূলির শূন্যতায়..." তো খুবই বিখ্যাত।
চাকরি নেই বলে প্রতিনিয়ত স্ত্রীর সাথে মনোমালিন্য, বাসায় ধনী চাচার আগমনে অহেতুক উৎপাত, নিরীহ বিবেচক বাবার সাথে চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দার্শনিক আলাপ, সর্বংসহা মা - এ সব নিয়েই আখ্যানভাগ। সত্যিকার অর্থে গল্পে কোনো উত্থানপতন নেই, ঘটনার ঘনঘটা নেই, নেই কোনো প্রারম্ভ বা পরিসমাপ্তি। জীবনের মতো "কারুবাসনা " নিরন্তর প্রবাহিত হয়ে চলেছে দিকচিহ্নহীন।আরেকটি লক্ষণীয় ব্যাপার, হেম ও তার সহগৃহীরা ঘর ছেড়ে বের হন তা চকিত কোনো উক্তিতে জানা গেলেও সারাক্ষণ ঘরেই আবদ্ধ থাকে লেখকের দৃষ্টি, নাটকের মঞ্চের মতো এখানে ঘরটিই শুধু উপন্যাসের সংঘটনস্থল।
জীবনানন্দের কারুবাসনা কীভাবে তার জীবন নষ্ট করছে তা নিয়ে কিন্তু কোনো আলোকপাত করা হয়নি। যেন সযত্নে সব আড়াল করে শুধু বাইরের দিকটাই প্রকাশ করা হয়েছে।
(জীবনানন্দের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগ্রহী না হলে "কারুবাসনা " স্বচ্ছন্দে এড়িয়ে যাওয়া যেতে পারে।)
জীবনানন্দ ১৯৩৩ সালে লিখেছিলেন এই উপন্যাস। উৎসাহী পাঠকমাত্রই জানেন, "কারুবাসনা" তার ছদ্ম আত্মজীবনী। নায়ক হেম ও জীবনানন্দের দুজনেরই বয়স, বৈবাহিক অবস্থা, আর্থিক অবস্থা থেকে শুরু করে সব বিষয়েই মিল আছে। একযুগ আগে পড়ার সময় যা সচেতনভাবে খেয়াল করিনি তা হচ্ছে, পুরো উপন্যাসে স্বগতকথন বলতে গেলে নেই, কার মনে কী চলছে তা জানার প্রধান উপায় হচ্ছে সংলাপ। বইয়ের সবচেয়ে স্মরণীয় স্বগতকথন "কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে। সব সময়ই শিল্প সৃষ্টি করবার আগ্রহ, তৃষ্ণা, পৃথিবীর সমস্ত সুখ-দুঃখ, লালসা, কলরব, আড়ম্বরের ভিতর কল্পনা ও স্বপ্ন চিন্তার দুর্ভেদ্য অঙ্কুরের বোঝা বুকে বহন করে বেড়াবার জন্মগত পাপ। কারুকর্মীর এই জন্মগত অভিশাপ আমার সমস্ত সামাজিক সফলতা নষ্ট করে নিয়েছে। আমার সংসারকে ভরে দিয়েছে ছাই-কালি-ধূলির শূন্যতায়..." তো খুবই বিখ্যাত।
চাকরি নেই বলে প্রতিনিয়ত স্ত্রীর সাথে মনোমালিন্য, বাসায় ধনী চাচার আগমনে অহেতুক উৎপাত, নিরীহ বিবেচক বাবার সাথে চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দার্শনিক আলাপ, সর্বংসহা মা - এ সব নিয়েই আখ্যানভাগ। সত্যিকার অর্থে গল্পে কোনো উত্থানপতন নেই, ঘটনার ঘনঘটা নেই, নেই কোনো প্রারম্ভ বা পরিসমাপ্তি। জীবনের মতো "কারুবাসনা " নিরন্তর প্রবাহিত হয়ে চলেছে দিকচিহ্নহীন।আরেকটি লক্ষণীয় ব্যাপার, হেম ও তার সহগৃহীরা ঘর ছেড়ে বের হন তা চকিত কোনো উক্তিতে জানা গেলেও সারাক্ষণ ঘরেই আবদ্ধ থাকে লেখকের দৃষ্টি, নাটকের মঞ্চের মতো এখানে ঘরটিই শুধু উপন্যাসের সংঘটনস্থল।
জীবনানন্দের কারুবাসনা কীভাবে তার জীবন নষ্ট করছে তা নিয়ে কিন্তু কোনো আলোকপাত করা হয়নি। যেন সযত্নে সব আড়াল করে শুধু বাইরের দিকটাই প্রকাশ করা হয়েছে।
(জীবনানন্দের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগ্রহী না হলে "কারুবাসনা " স্বচ্ছন্দে এড়িয়ে যাওয়া যেতে পারে।)
December 15, 2025
-'আমার কি ইচ্ছে করে জানো?'
বাবা তাকালেন আমার দিকে।
বললাম-'মস্ত বড় একটা মাঠের মধ্যে কুঁড়ে ঘর বানিয়ে থাকি; পাশে মেঘনা কিংবা কর্ণফুলী, অথবা ইছামতী। পেটের জন্য কোনো চিন্তা থাকে না, দিন রাত লিখি আর পড়ি। দিগন্তবিস্তৃত সোনালি খড়ের মাঠের কিনারে বেড়াই, লাল আকাশ ভেঙে সন্ধ্যার দাঁড়কাকগুলোকে ঘরে ফিরে চলে যেতে দেখি।'
জীবনানন্দ জীবদ্দশায় এই ইচ্ছা পূরণ করতে পারেননি। কোনোদিন নির্বিঘ্নে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখতে পারেন নি। তাই বারবার তাঁর লেখায় এসেছে নিজের কথা। আর তিনি সারাজীবন ধরে নিজেকেই লিখেছেন।
মাত্র 62 পেজের বইটা পড়তে গিয়ে দমবন্ধ হয়ে আসে। এত দারিদ্র্য, এত অসহায়তা - বেশ কিছু তার নিজেরও সৃষ্টি। আর তারপর অনন্ত অপেক্ষা। হেমের ভিতরে জীবনানন্দ নিজেকেই লিখেছেন। লেখক কোথাও গিয়ে চরিত্রকে আপন শক্তিতে বলীয়ান করেন নি। বরং ঠেলে দিয়েছেন ভাগ্যের হাতেই।
পরিস্থিতিতে রুখে দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা দেননি। দিয়েছেন নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা। কিছু করতে না পারার মতো অসহায়তা। কল্যাণীর কঠোরতার জন্য হেম নিজেকেই দায়ী করে, মেয়ের জন্যেও সেই নিজেকে কষ্ট দেয়। এই জীবনে শুধু শিল্পকেই পাথেয় করতে চেয়েছিল সে। সেও সোনার পথরবাটির মতো দূর থেকে দূরে সরে যায়। আর হেমরূপী জীবনানন্দ জীবনের লড়াইতে হেরে যায় বারংবার।
দুঃখ হয় খুব। পাঠকও এখানে চূড়ান্ত অসহায়। কারণ, শতাব্দী পেরিয়ে প্রিয় কবির দুঃখ মোছানোর ক্ষমতা তার নেই।
October 3, 2026
কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে। এমন একটা পর্যায়ে বইটা পড়লাম। ঠাশ করে মস্তিষ্ক আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার মতো। জীবননান্দ নিয়ে আরো অনেক অনেক জানতে চাই।
April 16, 2025
কারুবাসনা উপন্যাসটি ১৯৩৩ সালের আগস্ট মাসে রচিত। পাণ্ডুলিপিতে বরিশালের উল্লেখ জীবনানন্দের নিজ হাতে লেখা। জীবনানন্দ যেন নিজের বাস্তব জীবনের যাবতীয় রিক্ততাকেই তুলে ধরেছেন 'কারুবাসনা উপন্যাসে। হেম এবং তার স্ত্রী কল্যাণীর আদলে যেন নিজের দাম্পত্যজীবনের অন্তর্গত দ্বন্দ্বই উঠে এসেছে। জীবনানন্দের লেখা উপন্যাসগুলোর ধারাক্রম বিবেচনা করলে সেই সময়ে তাঁর নিজ জীবনের নানা ঘটনাপঞ্জির প্রতিফলনই যেন উপন্যাসে দেখতে পাই।
'কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে। সব সময়ই শিল্প সৃষ্টি করবার আগ্রহ, তৃষ্ণা, পৃথিবীর সমস্ত সুখ-দুঃখ, লালসা, কলরব, আড়ম্বরের ভিতর কল্পনা ও স্বপ্ন চিন্তার দুর্ভেদ্য অঙ্কুরের বোঝা বুকে বহন করে বেড়াবার জন্মগত পাপ। কারুকর্মীর এই জন্মগত অভিশাপ আমার সমস্ত সামাজিক সফলতা নষ্ট করে নিয়েছে। আমার সংসারকে ভরে দিয়েছে ছাই-কালি-ধূলির শূন্যতায়... আকাঙ্ক্ষা ও উদ্যমের অকুতোভয় স্বাভাবিকতা ও অমিততেজা সাংসারিকতা যদি থাকত তাহলে গত ছ-সাত বছরের মধ্যে কোনো না কোনো কাজ আমি নিশ্চয়ই খুঁজে পেতাম; হয়ত কোনো ইস্কুলে পঁচিশ টাকার মাস্টারি নিতাম, কোনো মেসের সরকার হয়ে যেতাম হয়ত, লাইফ ইনসিওরেন্সের এজেন্সি নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে একদিনে হয়ত প্রদীপ জ্বালিয়ে ফেলতে পারতাম, দর্জির কাজ শিখে ফেলতাম কিংবা স্টেনোগ্রাফার হয়ে যেতাম, নিরবচ্ছিন্ন একাগ্রতায় ক্যানভাস করতাম হয়ত, কিংবা প্রাণপণে শেয়ার বিক্রি করতাম, হয়ত মুদির দোকানের মালিক হয়ে বসতাম, কিংবা-দুতিন গ্রুপে এমএ নিয়ে ফেলতাম, হয়তো নিদারুণ একনিষ্ঠতার সঙ্গে জেলে পচতাম, কিংবা ভ্রুক্ষেপহীন অক্লান্তিতে পথে পথে জুতো সেলাই করে চলতাম... আলুর আড়ৎ না-খুলে সাহিত্য সৃষ্টি করতে চাচ্ছি বলে মনের ভিতর কোনো বেদনা থাকত না। যদি আমি বিবাহ না করতাম, সন্তান না হত আমার, যদি একা থাকতাম আমি— তা হলেও শিল্পসৃষ্টি ভালবেসে, সংসারে বিফল হয়ে, মনের ভিতর কোনো নিরবচ্ছিন্ন বেদনা থাকত না। হয়ত খুব লঘুভাবে থাকত। কিন্তু কল্যাণী ও খুকির ভার এমন একজনের উপর পড়েছে, যে, না পারে ঐকান্তিকভাবে শেয়ার ক্যানভাস করে বেড়াতে, না পারে ঘোলের শরবতের দোকান খুলে লক্ষ্মীকে অধিকার করবার বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাতে... একখানা গল্পের বইয়ের সাংসারিক দাম যে তেমন কিছু নয়, একখানা কবিতার বইয়ের দাম যে আরো ঢের কম তা তাকে বারবার চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে সংসার; কিন্তু তবুও সমস্ত কবিতা ও শিল্পসৃষ্টির প্রেরণা বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে সংসারের ছককাটা উন্নতির পথে পরিপূর্ণ অন্তর্ধান করবার মত স্বাভাবিকতা কোনোদিনই সে অর্জন করতে পারে না। এমনই অস্বাভাবিক অবৈধ মানুষ সে, এই আর্টিস্ট...'
কারুবাসনা'র শুরুতে সংকেতিত হয়েছিল জৈবজগতের নিশ্চেতনা ও ক্ষয় প্রসঙ্গ; গ্রন্থ, চিঠি-যা কিছু চৈতন্যের সম্পদ ও মনোলোকের বৈভব সব কীটপতঙ্গের আহার্যে পরিণত অর্থাৎ কলোনিয়াল যুবকের জ্ঞানক্ষমতার আয়ুধ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তবু, সেখানে হৈমর স্মৃতি-বাক্সে সংরক্ষিত ছিল এসবের নিরবয়ব অস্তিত্ব। উপন্যাসের শেষাংশে যদুবাবু প্রতীকী চরিত্রটি যে বস্তুপুঞ্জের, সফলতার কথালিপি উপস্থাপন করে, তার মধ্যে ব্যক্তি দেখে চেতনাবৃত্তির পরাভব, অন্য অর্থে তার কারুবাসনার অবসান। সমাপ্তিতে তার জীবনে সৃষ্টিক্ষমপ্রজ্ঞার ব্যর্থতাই প্রকটিত হয়, হৈমর জন্য উচ্চারিত হয়, নির্বাসনের দণ্ডাদেশ-তার ক্রুসিফিকেশন:
''দূর থেকে দূরে সরে যায়-
অন্তর্গত পৃথিবীর সুনিশ্চয় ঘন পরিচয়; প্রত্যাবর্তনের পথ নিঃশেষ মুছে-
কীর্তি সফলতা আর উদ্যামের বিপুলতা দিয়ে।
নির্বাসনের এক নিরুন্ধ্র বলয় কাছে আসে।
কারুবাসনার লয়, নিরন্ধ্র বলয়। ''
জীবননান্দ সাধারণভাবে তাঁর উপন্যাসে, চিন্তা ও বর্ণনার অংশ ও সংলাপের অংশের মধ্যে, গভীর কোনো মিশ্রণ ঘটান না এবং উপন্যাসের প্রগতি প্রায়ই তিনি ঘটাতে পারেন এই দুই অংশের সমানুপাতিক অনায়াস বিন্যাসে। কিন্তু পুরো উপন্যাসটি প্রধান চরিত্রের সঙ্গে তার বাবা, মা, মেয়ে, স্ত্রী, কাকা, বন্ধু ও গ্রামবাসীর এমন সংলাপে-সংলাপে গড়ে ওঠার এই গঠন জীবনানন্দেও খুব সুলভ নয়।
বেশিরভাগ চরিত্রের সঙ্গে সংলাপ ঘটেছে একাধিক, এবং দুই সংলাপের মধ্যে তেমন কোনো গুরুতর ঘটনাও ঘটে না, কিন্তু উপন্যাস তার নিজস্ব গতি পায় এই একাধিক সংলাপেরই বিরোধাভাসে। প্রধান চরিত্র উত্তমপুরুষে কথা বলেছে। কবিতা-লেখায় জীবব্রতী এক প্রধান চরিত্র।এই প্রবণতা তাঁর উপন্যাসগুলির মধ্যে সর্বাধিক প্রকাশ পেয়েছে 'কারুবাসনা'-য়। বস্তুত জীবনানন্দের এটিই একমাত্র উপন্যাস, যার নায়কের (হেম) মনে নিহিত আছে কবিতা লেখার গূঢ় প্রেরণা, তার ভাষায়, 'কারুবাসনা'।
‘বনলতা সেন' কবিতাটির আগেই বনলতা এই উপন্যাসে জীবনানন্দের স্মৃতিনির্মিত নায়িকা।
“সেই বনলতা, আমাদের পাশের বাড়িতে থাকত সে। কুড়ি-বাইশ বছরের আগের সে এক পৃথিবীতে, বছর আষ্টেক আগে বনলতা একবার এসেছিল। দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চালের বাতায় হাত দিয়ে মা ও পিসিমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলল সে। তার পর আঁচলে ঠোঁট ঢেকে আমার ঘরের দিকে আসছিল। কিন্তু কেন যেন অন্যমনস্ক নত মুখে মাঝপথে গেল থেমে, তার পর খিড়কি পুকুরের কিনারা দিয়ে, শামুক গুগলি পায়ে মাড়িয়ে, বাঁশের জঙ্গলের ছায়ার ভিতর দিয়ে চলে গেল সে। নিবিড় আমরুল গাছটার নীচে একবার দাঁড়াল, তার পর পৌষের অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।”
উত্তমপুরুষে কথা বলে যায় বলেই এই উপন্যাসে অনেক সময়ই ডায়েরি-জার্নালের প্রকৃতি যেন বেশি ধরা পড়ে। জীবনানন্দ নিজেই এ-রচনাকে 'novel' বলে চিহ্নিত করে না-গেলে মনে হতে পারত যে তিনি সব আড়াল ভেঙেই নিজের জীবনের কোনো-এক সময়ের ডায়েরি রেখে গেছেন। জীবনানন্দের উপন্যাসে তাঁর আত্মজীবনীর প্রয়োগ সম্পর্কে কোনো ধারণা বা আন্দাজ থেকেই মাত্র, এই উপন্যাসটির এমন জার্নালধর্ম ঠিক বুঝে ওঠা যায় না, যদিও তাঁর জীবন সম্পর্কে তথ্যসংগ্রহের ভিত্তি ছাড়া তেমন আন্দাজও অর্থহীন।
কিন্তু, এই উপন্যাসটিতে উপন্যাস ও আত্মজীবনের মধ্যে তেমন কোনো আড়াল যে নেই তারই যেন আরো আভাস মেলে,উপন্যাসটি জীবনঘটনার তীব্র সংঘাতশীল অভিজ্ঞতা পটে বিন্যস্ত হয়নি, নতুন জীবনপ্রভাত রচনারও অবভাস এতে নেই। 'কারুবাসনা' ভাবনা প্রতিভার আত্মোন্মোচন।
'কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে। সব সময়ই শিল্প সৃষ্টি করবার আগ্রহ, তৃষ্ণা, পৃথিবীর সমস্ত সুখ-দুঃখ, লালসা, কলরব, আড়ম্বরের ভিতর কল্পনা ও স্বপ্ন চিন্তার দুর্ভেদ্য অঙ্কুরের বোঝা বুকে বহন করে বেড়াবার জন্মগত পাপ। কারুকর্মীর এই জন্মগত অভিশাপ আমার সমস্ত সামাজিক সফলতা নষ্ট করে নিয়েছে। আমার সংসারকে ভরে দিয়েছে ছাই-কালি-ধূলির শূন্যতায়... আকাঙ্ক্ষা ও উদ্যমের অকুতোভয় স্বাভাবিকতা ও অমিততেজা সাংসারিকতা যদি থাকত তাহলে গত ছ-সাত বছরের মধ্যে কোনো না কোনো কাজ আমি নিশ্চয়ই খুঁজে পেতাম; হয়ত কোনো ইস্কুলে পঁচিশ টাকার মাস্টারি নিতাম, কোনো মেসের সরকার হয়ে যেতাম হয়ত, লাইফ ইনসিওরেন্সের এজেন্সি নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে একদিনে হয়ত প্রদীপ জ্বালিয়ে ফেলতে পারতাম, দর্জির কাজ শিখে ফেলতাম কিংবা স্টেনোগ্রাফার হয়ে যেতাম, নিরবচ্ছিন্ন একাগ্রতায় ক্যানভাস করতাম হয়ত, কিংবা প্রাণপণে শেয়ার বিক্রি করতাম, হয়ত মুদির দোকানের মালিক হয়ে বসতাম, কিংবা-দুতিন গ্রুপে এমএ নিয়ে ফেলতাম, হয়তো নিদারুণ একনিষ্ঠতার সঙ্গে জেলে পচতাম, কিংবা ভ্রুক্ষেপহীন অক্লান্তিতে পথে পথে জুতো সেলাই করে চলতাম... আলুর আড়ৎ না-খুলে সাহিত্য সৃষ্টি করতে চাচ্ছি বলে মনের ভিতর কোনো বেদনা থাকত না। যদি আমি বিবাহ না করতাম, সন্তান না হত আমার, যদি একা থাকতাম আমি— তা হলেও শিল্পসৃষ্টি ভালবেসে, সংসারে বিফল হয়ে, মনের ভিতর কোনো নিরবচ্ছিন্ন বেদনা থাকত না। হয়ত খুব লঘুভাবে থাকত। কিন্তু কল্যাণী ও খুকির ভার এমন একজনের উপর পড়েছে, যে, না পারে ঐকান্তিকভাবে শেয়ার ক্যানভাস করে বেড়াতে, না পারে ঘোলের শরবতের দোকান খুলে লক্ষ্মীকে অধিকার করবার বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাতে... একখানা গল্পের বইয়ের সাংসারিক দাম যে তেমন কিছু নয়, একখানা কবিতার বইয়ের দাম যে আরো ঢের কম তা তাকে বারবার চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে সংসার; কিন্তু তবুও সমস্ত কবিতা ও শিল্পসৃষ্টির প্রেরণা বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে সংসারের ছককাটা উন্নতির পথে পরিপূর্ণ অন্তর্ধান করবার মত স্বাভাবিকতা কোনোদিনই সে অর্জন করতে পারে না। এমনই অস্বাভাবিক অবৈধ মানুষ সে, এই আর্টিস্ট...'
কারুবাসনা'র শুরুতে সংকেতিত হয়েছিল জৈবজগতের নিশ্চেতনা ও ক্ষয় প্রসঙ্গ; গ্রন্থ, চিঠি-যা কিছু চৈতন্যের সম্পদ ও মনোলোকের বৈভব সব কীটপতঙ্গের আহার্যে পরিণত অর্থাৎ কলোনিয়াল যুবকের জ্ঞানক্ষমতার আয়ুধ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তবু, সেখানে হৈমর স্মৃতি-বাক্সে সংরক্ষিত ছিল এসবের নিরবয়ব অস্তিত্ব। উপন্যাসের শেষাংশে যদুবাবু প্রতীকী চরিত্রটি যে বস্তুপুঞ্জের, সফলতার কথালিপি উপস্থাপন করে, তার মধ্যে ব্যক্তি দেখে চেতনাবৃত্তির পরাভব, অন্য অর্থে তার কারুবাসনার অবসান। সমাপ্তিতে তার জীবনে সৃষ্টিক্ষমপ্রজ্ঞার ব্যর্থতাই প্রকটিত হয়, হৈমর জন্য উচ্চারিত হয়, নির্বাসনের দণ্ডাদেশ-তার ক্রুসিফিকেশন:
''দূর থেকে দূরে সরে যায়-
অন্তর্গত পৃথিবীর সুনিশ্চয় ঘন পরিচয়; প্রত্যাবর্তনের পথ নিঃশেষ মুছে-
কীর্তি সফলতা আর উদ্যামের বিপুলতা দিয়ে।
নির্বাসনের এক নিরুন্ধ্র বলয় কাছে আসে।
কারুবাসনার লয়, নিরন্ধ্র বলয়। ''
জীবননান্দ সাধারণভাবে তাঁর উপন্যাসে, চিন্তা ও বর্ণনার অংশ ও সংলাপের অংশের মধ্যে, গভীর কোনো মিশ্রণ ঘটান না এবং উপন্যাসের প্রগতি প্রায়ই তিনি ঘটাতে পারেন এই দুই অংশের সমানুপাতিক অনায়াস বিন্যাসে। কিন্তু পুরো উপন্যাসটি প্রধান চরিত্রের সঙ্গে তার বাবা, মা, মেয়ে, স্ত্রী, কাকা, বন্ধু ও গ্রামবাসীর এমন সংলাপে-সংলাপে গড়ে ওঠার এই গঠন জীবনানন্দেও খুব সুলভ নয়।
বেশিরভাগ চরিত্রের সঙ্গে সংলাপ ঘটেছে একাধিক, এবং দুই সংলাপের মধ্যে তেমন কোনো গুরুতর ঘটনাও ঘটে না, কিন্তু উপন্যাস তার নিজস্ব গতি পায় এই একাধিক সংলাপেরই বিরোধাভাসে। প্রধান চরিত্র উত্তমপুরুষে কথা বলেছে। কবিতা-লেখায় জীবব্রতী এক প্রধান চরিত্র।এই প্রবণতা তাঁর উপন্যাসগুলির মধ্যে সর্বাধিক প্রকাশ পেয়েছে 'কারুবাসনা'-য়। বস্তুত জীবনানন্দের এটিই একমাত্র উপন্যাস, যার নায়কের (হেম) মনে নিহিত আছে কবিতা লেখার গূঢ় প্রেরণা, তার ভাষায়, 'কারুবাসনা'।
‘বনলতা সেন' কবিতাটির আগেই বনলতা এই উপন্যাসে জীবনানন্দের স্মৃতিনির্মিত নায়িকা।
“সেই বনলতা, আমাদের পাশের বাড়িতে থাকত সে। কুড়ি-বাইশ বছরের আগের সে এক পৃথিবীতে, বছর আষ্টেক আগে বনলতা একবার এসেছিল। দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চালের বাতায় হাত দিয়ে মা ও পিসিমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলল সে। তার পর আঁচলে ঠোঁট ঢেকে আমার ঘরের দিকে আসছিল। কিন্তু কেন যেন অন্যমনস্ক নত মুখে মাঝপথে গেল থেমে, তার পর খিড়কি পুকুরের কিনারা দিয়ে, শামুক গুগলি পায়ে মাড়িয়ে, বাঁশের জঙ্গলের ছায়ার ভিতর দিয়ে চলে গেল সে। নিবিড় আমরুল গাছটার নীচে একবার দাঁড়াল, তার পর পৌষের অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।”
উত্তমপুরুষে কথা বলে যায় বলেই এই উপন্যাসে অনেক সময়ই ডায়েরি-জার্নালের প্রকৃতি যেন বেশি ধরা পড়ে। জীবনানন্দ নিজেই এ-রচনাকে 'novel' বলে চিহ্নিত করে না-গেলে মনে হতে পারত যে তিনি সব আড়াল ভেঙেই নিজের জীবনের কোনো-এক সময়ের ডায়েরি রেখে গেছেন। জীবনানন্দের উপন্যাসে তাঁর আত্মজীবনীর প্রয়োগ সম্পর্কে কোনো ধারণা বা আন্দাজ থেকেই মাত্র, এই উপন্যাসটির এমন জার্নালধর্ম ঠিক বুঝে ওঠা যায় না, যদিও তাঁর জীবন সম্পর্কে তথ্যসংগ্রহের ভিত্তি ছাড়া তেমন আন্দাজও অর্থহীন।
কিন্তু, এই উপন্যাসটিতে উপন্যাস ও আত্মজীবনের মধ্যে তেমন কোনো আড়াল যে নেই তারই যেন আরো আভাস মেলে,উপন্যাসটি জীবনঘটনার তীব্র সংঘাতশীল অভিজ্ঞতা পটে বিন্যস্ত হয়নি, নতুন জীবনপ্রভাত রচনারও অবভাস এতে নেই। 'কারুবাসনা' ভাবনা প্রতিভার আত্মোন্মোচন।
September 3, 2024
কারুবাসনা থাকার সত্ত্বেও ভাগ্যের পরিহাস এমনিই যে, সাংসারিক অভাব - অনটন , জীবন যুদ্ধে হেরে যাওয়া এবং পারিবারিক সম্পর্ক গুলোর টানাপোড়েন কেই নিজের সাহিত্য রচনার রসদ করেছে হেম...এটাই হয়তো জীবনানন্দের জীবন দর্শনের বৈশিষ্ট্য। ভোরের আলো, নদীর জলের বহমানতা, মাঠের সবুজ ঘাস, মাঝ রাতের তৃপ্তি দ্বাই বৃষ্টি ও তার সাথে স্নিগ্ধ বাতাস জীবনানন্দের রচনাকে অভাব বিলাসী ও দার্শনিক ভাবে অতীব সচ্ছল করে তোলে। জানিনা কেন ..কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে খুব মেনে নিতে ইচ্ছে করছিল যে এটাই আমাদের জীবনানন্দের জীবন কাহিনী এর একটা অংশ.. ঘুরে দাঁড়ানোর ইচ্ছে আছে, ইচ্ছে আছে সৃষ্টি করার, ইচ্ছে আছে প্রতিটা সম্পর্ক কী জিইয়ে রাখার..সে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েই হোক না কেনো !!
অতীতের জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা, একান্তই অনুতাপ হিন একজন আপন ভোলা চরিত্র...সকল করুবাসনা চিরকাল বাঁচিয়ে রাখুক সকল হেম রুপি জীবনানন্দ দের ।
অতীতের জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা, একান্তই অনুতাপ হিন একজন আপন ভোলা চরিত্র...সকল করুবাসনা চিরকাল বাঁচিয়ে রাখুক সকল হেম রুপি জীবনানন্দ দের ।
Displaying 1 - 5 of 5 reviews





