১৯৬৪ হজরতবালে চুরি হয়ে গেল বিশ্বনবীর পবিত্র চুল। পরে ফেরত এলেও ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। পূর্ব পাকিস্তানে ফের জ্বলে উঠেছে ভয়াবহ দাঙ্গার আগুন। পশ্চিমের সেনা-পুলিশ, রাজাকারদের চোখে লালসার দৃষ্টি....মওলানগুলোরে মেরে তাড়াও, ওদের মেয়েদের ইজ্জত লোটো! আর থাকা গেল না, যুগীগঞ্জের সুধাময়ীর পরিবার বেরিয়ে পড়তে বাধ্য হল সব ছেড়ে। তারপর?
বই - সন্ধিক্ষণ লেখক - সমৃদ্ধ দত্ত প্রকাশনী - পত্রভারতী মুদ্রিত মূল্য - ৩৫০/-
ভারতের ইতিহাসে চিরকালের এক কলঙ্কময় দাগ হল বাংলা ভাগ। ভাগ জিনিসটা এতটাই অভিশপ্ত যে তার ফলে সাময়িক শান্তি কিছু মানুষ খুঁজে পেলেও দীর্ঘায়িত শান্তি কোনোদিন কেউ পায়নি। তাই এখানেও কেউ পাবে এমন আশা করাটা ভুল।
১৯৬৪ সাল। হজরতবালে চুরি হয়ে গেল বিশ্বনবীর পবিত্র চুল। পরে ফেরত এলেও ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে! পূর্ব পাকিস্তানে ফের জ্বলে উঠেছে ভয়াবহ দাঙ্গার আগুন। ঘটনা ঘটল কাশ্মীরে আগুন লাগলো পূর্ব পাকিস্তানে। কারণ আগুন লাগানোর জন্য কারুর কোনো কারণের প্রয়োজন হয় না, শুধু একটা ছুতোর দরকার হয়। পশ্চিমের সেনা পুলিশ, রাজাকারদের চোখে লালসার দৃষ্টি.... মওলানগুলোরে মেরে তাড়াও... ওদের মেয়েদের ইজ্জত লোটো। হয় মরো আর নয়তো পালাও, আর থাকা গেল না...যুগীগঞ্জের সুধাময়ীর পরিবার বেরিয়ে পড়তে বাধ্য হল সব ছেড়ে আরো অনেক পরিবারের সাথে।
উপন্যাসের মূল কেন্দ্রবিন্দু একটি পরিবার, সুধাময়ীর পরিবার। যারা পূর্ব পাকিস্তানে সম্পন্ন একটি পরিবার ছিল। সুধাময়ী হলেন বিধবা বৃদ্ধা, তাঁর দুই পুত্র, একজন ইন্ডিয়া যাওয়ার পর থেকে যোগাযোগ রাখে না। আরেকজন হল প্রভাস যে মায়ের সাথে থাকে, শাড়ির ব্যবসা করে, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। এই পরিবারকে কোনোদিন কল্পনাতেও ভাবতে হয়নি তাদের দেশ ছাড়া হতে হবে কিন্তু মানুষ আর সময় বড় অদ্ভূত, তারা যা খুশি করিয়ে নিতে পারে। প্রবল দাঙ্গার সম্মুখীন হয়ে নিজেদের দেশ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন তাঁরা। আর এখানেই শুরু হয় লেখকের আসল 'সন্ধিক্ষণ'। সুধাময়ী নিজের বাড়িতে চুপচাপ থাকতেন, কিংবা পূজা আচ্ছা নিয়ে থাকতেন কিন্তু ইন্ডিয়ায় রিফিউজিদের জন্য বানানো 'কুপার্স ক্যাম্পে' এসে তিনি হয়ে উঠলেন সবার মনোবল। সবাইকে রোজগারের পথ বাতলে দিলেন, সবাইকে শিক্ষা দিলেন। প্রভাস দেখলো সবকিছু কিন্তু কিছুতেই মেলাতে পারলো না যে এ তারই মা। ক্রমে দীর্ঘ কষ্ট, অনটন, অন্যায়, অবিচার সহ্য করেও লড়াই করে গেল এই পরিবারটা। কুপার্স ক্যাম্প থেকে দন্ডকারণ্যর ঘন জঙ্গল কোথাও থেমে থাকেনি সময় ও তাদের জীবন। শেষ অবধি প্রভাসের আরেকটি মেয়ে হয় পাঞ্চালি যে জারি রাখে সুধাময়ীর বিপ্লবী সত্ত্বাকে।
বইটি আবর্তিত হয় দাঙ্গা, দাঙ্গা পরবর্তী রিফিউজি অস্তিত্ব, রাজনীতি ও লড়াই নিয়ে। একটি পরিবারকে মূল কেন্দ্রবিন্দু বানালেও আমরা আরো অজস্র পরিবার ও চরিত্রকে খুঁজে পাই এই "সন্ধিক্ষণ"এ। তাদের প্রত্যেকের অনুভূতি, চাওয়া পাওয়া, প্রত্যাশা, ভালোলাগা, ভালোবাসা, কষ্ট, দুঃখ সবই পরিষ্কার করে ফুটে উঠেছে। আর শুধু রিফিউজি কেন, আমরা দেখতে পাই আদিবাসীদের আঙ্গার মাধ্যমে। কতটা কঠিন জীবন ওদের, তারপরেও বিধাতা যে ওদের শান্তি দেয় না তারও প্রমাণ রয়েছে ছত্রে ছত্রে। আমরা দেখতে পাই, মাওবাদীদের ক্যাপ্টেনের মাধ্যমে, যে ভালো খারাপের পার্থক্য বোঝে, যে জানে কোনটা উচিৎ কোনটা নয়, যে জানে তারা যেটা করছে সেটা বেশ খানিকটা হলেও ভুল, তবু সে নিজেকে নয় পাঞ্চালিকে জিততে দেখতে চায়। এছাড়া নারীর উপর অত্যাচার সে তো প্রত্যেক আগুনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে বড় বিসর্জন।
লেখার ভাষা ঝড়ঝড়ে ও দুই ধরণের বাংলার সমান ব্যবহার বেশ ভালো লেগেছে। শেষেরদিকে লেখক আরো কিছু চরিত্র এনেছেন যাদের কোনো নির্দিষ্ট পরিণতি হয় না, যা থেকে মনে অনেক প্রশ্ন থেকে যায়, যেমন, অরণ্যর কি হল? সে কি আত্মসমর্পণ করল? আবার তথাগত হঠাৎ প্রকৃতির প্রেমে এমন মোহাচ্ছন্ন পাগল হয়ে উঠল কেন? বৈশাখের পাগলামিকেও কি একটু হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারল স্তুতি? পাঞ্চালিও কি তার প্রজেক্টটা সম্পূর্ণ করতে পেরেছিল? গিল্টি ফিলিং থেকে লেখককে বলতে ইচ্ছা হয় দ্বিতীয় পর্ব কবে আসছে এটার? আবার অন্যদিকে এটাও বুঝতে পারি যে কিছু কিছু জিনিস অসম্পূর্ণ থাকাটাই তার এক ধরণের সম্পূর্ণতা। এক একটা চরিত্রের বিশ্লেষণ ও তাদের মধ্যে পরিণত কথোপকথন এত সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন লেখক যে পড়তে পড়তে মুগ্ধ হয়েছি। উল্লেখযোগ্য যেমন, প্রভাস ও সন্ধ্যার ঘুরতে বেরিয়ে কথোপকথন আবার প্রভাস ও কুসুমের কথোপকথন। এর থেকে প্রমাণিত হয় আমি এক শক্ত পোক্ত লেখনীযুক্ত মানুষের লেখাই পড়ছি। সবশেষে, প্রচ্ছদ ভীষণ সুন্দর লেগেছে।
আমার পড়া এটাই ওনার প্রথম বই, বেশ ভালো লাগলো। আরো ওনার লেখা বই পড়ার আশায় রইলাম।