নীলক্ষেতের কোনো এক পুরাতন বই ঘরের একদম সাদা চুল-দাঁড়িওয়ালা মামার কথায় হুট করেই বইটা কিনে নেওয়া। আক্ষেপ নেই কোনো, বইটা নিয়ে সময় ভালোই কেটে গেছে।
মূল চরিত্র হিসেবে বলতে গেলে গুজরাত থেকে কলকাতায় আসা ব্যবস্যায়ী-সমাজসেবী-নির্ভয় কস্তুরী মেহতা বা কস্তুরী বেনের কথা মাথায় আসে সবার প্রথমে। "ছুটোবেলাই সব বেলা"_আধো বাংলায় এই একটা কথা কস্তুরীবেনের মুখে এসেছে অনেকবার। বলতে গেলে পুরো উপন্যাসটার উপজীব্য এই ছোট্ট একটা লাইন। সেই ছোটোবেলায় কোনো এক অজানা কারণে কস্তুরী বেনকে নিয়ে তার বাবা কোলকাতা থেকে পারি জমিয়েছিলেন আহমেদাবাদ, গুজরাতে_তার দাদুবাড়িতে। তাদের কাছেই বেড়ে ওঠা কস্তুরীবেনের। সেই সাথে বাবার সাথের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থেকে ব্যবসার টুকটাক শিখতে শিখতে হয়ে ওঠেন একজন সফল ব্যবসায়ী। তার পুরো জীবনদর্শন ঘিরে রয়েছে ছোটোবেলার কলকাতার সেই বাড়িতে জমে ওঠা কিছু স্বাধীনচেতা মানুষের সৃজনশীল-মুক্ত আলোচনার আসর। যে আলোচনায় উঠে এসেছে যুদ্ধ পরবর্তী নবীন ভারতবর্ষকে ঢেলে সাজানোর প্রতিজ্ঞা। নেতাজি সুভাষচন্দ্রের স্বপ্নে আলোকপাত করতে নিয়ে বইটিতে চলে এসেছে তাঁর কিছু মূল্যবান উক্তি, জীবনাদর্শ, বাস্তবমুখী চিন্তাধারা। কস্তুরীবেন এমন কিছু মানুষের মাঝে বেড়ে উঠেছিলেন বলেই হয়তো স্বামী মারা যাবার পর জীবনকে ঢেলে সাজিয়েছিলেন এই স্বপ্নকে ঘিরে। সেই সাথে ভীত হিসেবে ছোটোবেলায় মায়ের কাছে থেকে পাকাপোক্তভাবে জেনেছিলেন আত্মপরতার বাইরের এক জগতকে। যে জগৎ তার জন্য একটা সময় শুধু স্মৃতি হয়ে যায়, যে স্মৃতিকে খুঁজে পেতে, আঁকড়ে ধরতে, কিছু অজানা সত্যের সম্মুখীন হতে শেষ বয়সে তিনি আবার ছুটে আসেন তার সেই পুরোনো জগতে, তার মা-ল্যান্ড, কলকাতায়।
কস্তুরীবেনের যাত্রাকে ঘিরে গল্পের প্রবাহ চলতে থাকলেও অন্য তিনটি চরিত্র, কাজল মুণ্ডা, মৈত্রী ব্যানার্জি, এবং শিখরিণী, ধরে রেখেছিল তাদের স্বকীয়তা। কস্তুরীবেনের জীবনদর্শন থেকে যেভাবে সুভাষচন্দ্রের স্বপ্নের ভারত গড়ার পেছনের তাগাদা পাওয়া যায়, তেমনি কাজল মুণ্ডার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসে আদি জনগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের জীবনগাথা। লেখিকা থরে থরে সাজিয়েছেন সৃষ্টির পর থেকে হয়ে আসা আর্য-অনার্য গোষ্ঠী নিয়ে প্রচলিত লোককথা। ধর্মগ্রন্থ আর লোকমুখে জীবন্ত সৃষ্টির আদিকালের ইতিহাস সম্পর্কে মেলবন্ধন ছিল পুরো উপন্যাসে। কাজল চরিত্রটি যেভাবে নিজ সত্ত্বা নিয়ে সন্তুষ্ট, পদবির পরিবর্তনের অনীহা নিয়ে নাছোড়বান্দা, ঠিক সেভাবেই নিজের মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়ে ছিল দোদুল্যমান। এদিকে নারী চরিত্র হিসেবে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী চরিত্র ছিল মৈত্রী বা মিঠু এবং শিখরিণী। নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে বৈপরীত্যের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল পুরোটা সময়।
দুটো ভিন্ন প্রজন্মের মানুষের চিন্তাধারার পার্থক্য উপন্যাসে বারবার চলে এসেছে। সবকিছু নিয়ে একমত কিনা তা বলতে পারবো না, তবে সত্যতা ছিল। নতুন প্রজন্ম তাদের ইতিহাস সম্পর্কে অনেকটাই উদাসীন। তারা জানে কী হয়েছিল, কিন্তু তার পেছনের মানুষদের সংগ্রাম সম্পর্কে তাদের ধারণা খুবই নগণ্য। কস্তুরীবেনের উত্তেজিত হয়ে বলা কিছু মনোলগে তার কথার পেছনের যুক্তিকে পাকাপোক্ত করে তুলে ধরেছেন ভালোভাবে। সেই সাথে চলে এসেছে বাঙালিদের মানসিকতার নিদারুণ তিক্ত কিছু বাস্তবতা। তার মধ্যে কিছু লাইন খুব মনে ধরেছে আমার।
"...মানুষ কিন্তু আদতে স্বার্থপর, তার চেয়েও বেশি আত্মপর। পাবলিক ক্যালামিটি ইজ এ মাইটি লেভেলার।"
"ব্যক্তিগত সমস্যা সব দেশেই আছে রমেশ। কিন্তু নিজের দেশের শিশুদের ফুডে, রোগীদের ওষুধে ভেজাল মিশিয়ে দিচ্ছে, সদ্য সদ্য স্বাধীন হয়ে_ এ আর কোথাও পাবে না...সততা দেখাতে গেলে অবধারিত মৃত্যু, স্বাধীন চিন্তা প্রকাশ করলে কণ্ঠ চেপে ধরবে, এ জিনিসও অচিন্তনীয়।"
"স্বাধীনচেতা মানুষেরা নিজেদের স্বাধীনতা, সাবলম্বিতা সম্পর্কে অতিমাত্রায় স্পর্শকাতর, হয়তো ভেতরে ভেতরে কোথাও বশ্যতা আছে বলেই।"
বইটি আদিবাসীদের ইতিহাস, তাদের ঘিরে লোককথা, তাদের সমাজব্যবস্থা সম্পর্কিত তথ্যসমৃদ্ধ। আদিবাসীদের ভাষা থেকে সংস্কৃতে আসা শব্দ নিয়ে কিছু বিস্তর ব্যাখ্যা আছে এখানে। পড়তে নিলে ফিকশনের আদলে কিছুটা নন-ফিকশনের স্বাদ পাওয়া যায়। ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ উপভোগ্য ছিল।
তবে বইটি পড়তে নিয়ে আমার কাছে যে বিষয়টি তাল কেটেছে তা হলো কিছু অধ্যায় পরপর গল্পকথকের আকস্মিক পরিবর্তন। এদিকটা আরেকটু গোছানো হলে গল্পের ফ্লোটা আরো মসৃণ হতো মনে হয়। সেই সাথে মৈত্রীর চরিত্র ঘিরে শুরুর দিকে এগিয়ে যাওয়াটাও কিছুটা এলোমেলো মনে হয়েছে। প্রথম কিছু অধ্যায় শুধুমাত্র কালক্ষেপণ বলে মনে হয়েছে, যদিও মৈত্রী এবং কাজলের চরিত্রের গঠনের ক্ষেত্রে সেগুলো হয়তো জরুরি ছিল।
চারজন মানুষ, দুটো প্রজন্ম, চারটে আলাদা সংস্কৃতির আদল। তবু কোথায় এসে যেন সবটা মিলেছে। সর্বোপরি, 'উজান যাত্রা'য় আছে এক শিকড়ের সন্ধান। আর সে যাত্রায় সময় ভালোই কেটেছে আমার। আশা করি অন্যদেরও লাগবে।
Happy reading!