প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাপে-নেউলে সম্পর্ক ঘিরে বাঙালীর আত্মনুসন্ধানের গল্প কম লেখা হয়নি। বাণী বসুর এই উপন্যাসটিও সেই ঘরানার ঘরণী। এবং বেশ পুরনো। সেই ইন্দিরার আমলের কাহিনী। তায় লেখিকার সর্বপ্রথম। যারা জানেন, তারা জানেন, প্রথম উপন্যাসের প্রতি আমার দুর্বার আকর্ষণ। এসব সাহিত্যে অনুভূত হয় প্রতিমা গড়নের প্রথম ছোঁয়া। অপরিণত রূপটানে, কুমোরটুলির ভোর। নিদ্রাহীন গল্পকথা। ব্যস্ত কিচিরমিচির।
উপন্যাসটির কোনো গতানুগতিক রিভিউ লিখছি না তাই। মন চাইছে না আর। সহজ ভাষায় সহজ কথা বলতে না পারার মাশুল গুনি আরকি। ঠিকঠাক পারি না কিছুই।
তবে, মাঝেমধ্যে ভুল করি খুব। যেমন এই বইটি নিয়ে লাইট রিডিং করতে বসেছিলাম। ভেবেছিলাম 'প্রথমান্বেষণ'ও হবে, আবার চটজলদি Goodreads আপডেটও। ভুল করেছিলাম। এসব বই, আর যাই হোক, রাস্তার ভাজাভুজি নয়। 'ধর তক্তা মার পেরেক' এইখানেতে চলে না। প্রথম উপন্যাস হলেও বাণী বসু ততদিনে সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ছোটগল্পের আঙিনায় হাত পাঁকিয়ে, যথেষ্ট স্বনামধন্যা। সেই নিরিখে ওনার উপন্যাসও যে ভারী গোছের হবে, তাতে আর আশ্চর্য কি?
লেখিকার কলমের অসম্ভব ভক্ত না হলেও, ওনার শক্তসমর্থ গল্পবলিয়ে স্বত্তাটিকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি। তাই কচ্ছপসম শুরুয়াতের পরেও, রীতিমত যোদ্ধা মনোভাবে, দাঁতে দাঁত চেপে বই আঁকড়ে পড়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। ফলস্বরুপ একটি দুমুখো নদীর খোঁজ পেলাম যেন। এমন একটি উপন্যাস যা একাধারে স্বতন্ত্র। সামাজিক ব্যাখ্যান ও মানবিক গাম্ভীর্যের সংযত বীক্ষণাগার। আবার অপরপ্রান্তে কাঁচা রঙের গন্ধ। ন্যারেটিভ জুড়ে যৎসামান্য অতি-উদগ্রীবতার প্রলেপ।
গল্পের প্রথমাংশ জুড়ে মার্কিন মোনোটনি। লেখিকা এই অংশটি ব্যবহার করেছেন একটি প্রবাসী বাঙালি পরিবারের দুই ভিন্ন প্রজন্মের মানসিক ব্যাসন যাচাই হেতু। যা হয়তো বা উপন্যাসের ক্ষেত্রে দরকারি তবুও পাঠক্রমে ক্লান্তিকর। এইখানেতে ধৈর্য ধরা বাঞ্ছনীয়। কারণ একগুচ্ছ সাদা-বাদামীর ককটেল ও বাংলিশের ঘূর্ণিঝড় পেরিয়েই পৌঁছে যাওয়া যায় চিরন্তনী কলকাতায়। এই দেশীয় অংশটি (উপন্যাসের সত্তর শতাংশ প্রায়) আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশেষ উপভোগ করেছি।
তবে বাঁধ সাধে ঐ তাড়াহুড়োর ধাঁচ। লেখিকা যেই গল্পটি বলতে চেয়েছিলেন, সেই গল্পটি আরও বৃহৎ কলেবরে বলাতেই মেরিট ছিল বুঝি। উপন্যাস রচনায় প্রাথমিক অপরিক্কতা বা স্রেফ শব্দসংখ্যার বাঁধন মুখে, প্রায়-নবাগতা বাণী বসু সেটা করে উঠতে পারেননি সে সময়।
যার ফলস্বরুপ লেখাটিতে মাঝেমধ্যেই এসে পড়েছে অতর্কিত সব টাইম জাম্প। উপন্যাসের শুরুতে আরাত্রিকা ছোট। তেরোতম জন্মদিনে পড়ছে সবে। উপন্যাসের শেষে গিয়ে মেয়েটি একেবারে ইউনিভার্সিটির দোরগোড়ায় দাঁড়ায়। এর পুরোটাই ভীষণ আকস্মিক। বয়সের সমানুপাতে আত্মঅন্বেষণের যেই বহুরঙা ছবিটি আঁকার সুযোগ ছিল, লেখিকা সেখানেই অসফল। এছাড়াও, গল্পে নিগূঢ়তা আনতে বেশ কিছু পর্যায়ে মেলোড্রামা নামক চকচকে আবরণে করুণ-রসের পরিবেশনা করেছেন তিনি। যা শেষমেশ একটু অতিরিক্ত বলেই মনে হয়।
তবুও, বইটি থেকে একেবারে খালি হাতে ফেরা হলো না আমার। যার মূল কারণ, বাবু। বইয়ের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র, স্বদেশ। অল্প ডোজে হলেও, বাবুর চোখে দেখা আমেরিকার ভ্রাম্যমাণ অস্থিরতা, বাউন্ডুলে ব্যক্তি-স্বাধীনতার সূক্ষ্ম মূল্য বা নোনাধরা কলকাতার বাঙালি অভিমান, সবটাই অভিভূত করে। কোথাও গিয়ে আমার আরেক প্রিয় চরিত্র, অমিতাভ ঘোষের ত্রিদিবের কথা মনে পড়ে যায়। ইচ্ছে করে, সব ভুলে স্রেফ উদার একটা মানুষ হয়ে যেতে। এমন একজন মানুষ যার ব্যাপ্তি গোটা বঙ্গোপসাগরের ন্যায় সুবিশাল। যার প্রসার পুরো অ্যান্ডিজ পর্বতমালা সম।
তবে শুধু চরিত্রায়ণ ভুলে দেখলেও বইটি থেকে খুঁজে পাই মানসিক টানাপোড়েনের এক চিরায়ত স্বরলিপি। যেটার শেষ লগ্নে পৌঁছে গলার কাছটায় জমাট বেঁধে ওঠা ভীষণ স্বাভাবিক। স্রেফ দেশাত্মবোধের আতশ-কাঁচে বাজিয়ে দেখলে, মন খারাপ হতে বাধ্য। আবেগঘন করুন পাঠক আমি। অবন ঠাকুরের পেইন্টিংয়ের নিচে মাথা নুইয়ে হার শিকার করি কেবল। তবে মন জানে, এই সঠিক। মানবজন্ম যদি কোনো তেলচিটে পুরনো বাঙালি রান্নাঘর হয়, তবে জন্মভূমি ও মাতৃভূমি সেই বহুলব্যবহৃত সেরামিকের কাপ দুটো। যাদের ভবিতব্য ঠোকাঠুকিতেই বিদ্যমান।
অস্তিত্বের যুদ্ধে ভাঙনেই পরিসমাপ্তি। আমি বা আপনি, সেখানে নিমিত্ত মাত্র। এইতো।
(৩/৫ || জুলাই, ২০২৪)