বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কর্তৃক প্রকাশিত এই সংকলনে সুবোধ ঘোষের যে গল্পগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে: -অলীক -কাঞ্চনসংসর্গাৎ -মানশুল্ক -বারবধূ -অযান্ত্রিক -তিন অধ্যায় -কালাগুরু -শিবালয় -চতুর্থ পানিপথের যুদ্ধ -মা হিংসীঃ -পরশুরামের কুঠার -ভাট তিলক রায় -বৈর নির্যাতন
Subodh Ghosh (Bengali: সুবোধ ঘোষ) was a noted Bengali author and journalist, with Kolkata-based daily newspaper Ananda Bazar Patrika. His best known work Bharat Premkatha, about the romances of epic Indian characters, has remained a sensation in bengali literature world. Many of his stories have been adapted for making of great Indian films, most notably Ritwik Ghatak’s Ajantrik (1958) and Bimal Roy’s Sujata (1959), and even today filmmakers search his works for suitable plots. He won the Filmfare Award for Best Story twice, for Bimal Roy's Sujata (1960) and for Gulzar’s Ijaazat in 1989.
সুবোধ ঘোষের শ্রেষ্ঠ গল্পের বইটা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বাৎসারিক ছাড়ের সময় কিনেছিলাম সেই কতকাল আগে। কিন্তু পড়া হল এই সেদিন। এই সংকলনের গল্পগুলোর মধ্যে আছে অলীক, কাঞ্চনসংসর্গাৎ, মানশুল্ক, বারবধূ, অযান্ত্রিক, তিন অধ্যায়, কালাগুরু, শিবালয়, চতুর্থ পানিপথের যুদ্ধ, মা হিংসীঃ, পরশুরামের কুঠার, ভাট তিলক রায়, বৈর নির্যাতন। অনেকে বলতে পারেন এই সংকলনে সুবোধ ঘোষের সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পগুলোই নেই যেমন – ফসিল, সুন্দরম্ ইত্যাদি। তবুও এই সংকলনটা আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে কারন এই গল্পগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
সুবোধ ঘোষের জীবন খুব বিচিত্র। ১৯০৯ সালে জন্ম গ্রহণ করেন বিহার প্রদেশের হাজারিবাগে। পড়াশোনায় ভালো ছিলেন, অথচ ডাবল প্রমোশন পাওয়া সত্ত্বেও অর্থাভাবে একসময় পড়ালেখা থেমে যায়। টিকা দেওয়ার কাজ, সার্কাসের লটবহর বহন, দোকানে রুটি-কেক সাপ্লাই দেয়ার মতো প্রান্তিক পেশায় তিনি নিয়োজিত ছিলেন। তবে এ কারনে জীবনে অভিজ্ঞতাও সঞ্চার করেছিলেন প্রচুর। দার্শনিক মহেশচন্দ্র ঘোষের লাইব্রেরি তাঁর জন্য খোলা ছিলো – পড়েছেন সাহিত্য-ইতিহাস-দর্শনের প্রচুর বই। তাই ১৯৪০ এর আগে তাঁর প্রথম লেখাটি না বের হলেও লেখালেখির প্রস্তুতি হয়ে গেছিল তার অনেক আগে থেকেই। এজন্যই সম্ভবত বলেছেন, “আমার গল্প লেখার কৃতিত্বটা বিশুদ্ধ আকস্মিকতার একটা ইন্দ্রজালের জাল নয়। ভাবনা, কল্পনা ও অনুভবের মধ্যে জীবন-বৈচিত্র্যের যে ছবি আগেই রূপান্বিত হয়েছিল, তারই প্রতিচ্ছবি একদিন গল্পরূপে বিমূর্ত হয়েছিল।” (প্রবন্ধঃ সেদিনের আলোছায়া, গ্রন্থঃ সুনির্বাচিত)
সুবোধ ঘোষের গল্প গুলোকে বলা যায় অনেকটা সিনেমাতে আমরা যাকে বলি “Drama” ঘরানার। গল্পগুলো বিষয়বস্তুর দিক থেকে বেশ অন্যরকম, সুবোধ ঘোষের ভাষাও সরল অথচ ব্যঞ্জনাময়। “অলীক” গল্পে অলীক হল সেই লোক যারা বিনা দাওয়াতে বিয়ে বা অন্যান্য উৎসব বাড়িতে খেয়ে যায়। এ গল্পে যে লোকটা অলীক সে আসলে পেশাদার চোর, কিন্তু তার মতে বিয়েবাড়ির লুচির মতো লুচি আর হয় না, তাতে আবার কনে বা বরের বাবা-চাচারা এমন খাতির করে খাওয়ায়! ঘটনাচক্রে কী করে এই অলীকের মন চিরায়ত পিতৃস্নেহের শিশিরে সিক্ত হয় সেটাই এই গল্পের প্রতিপাদ্য। গল্পটা একই সাথে যেমন হাসির তেমনই করুণ। “অযান্ত্রিক” সুবোধ ঘোষের লেখা প্রথম গল্প, প্রকাশিত হয়ছিল ১৯৪০ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার দোলসংখ্যায়। মানুষের সাথে মানুষ নয়, এমনকি মানুষের সাথে পশু-পাখি বা গাছপালারও নয় – এই গল্পটা একটা ছ্যাকড়া ফোর্ড গাড়ির প্রতি মানুষ বিমলের স্নেহের গল্প। গল্পটা বিষয়বস্তুর দিক থেকে একেবারেই আনকোরা – বাংলাসাহিত্যে এরকম বিষয়ে আর দ্বিতীয় কোন গল্পের কথা আমার জানা নেই। আবার “বারবধূ” গল্পটা শেষ লাইনে মোচড় মারা ধরনের গল্প আর এতে এসেছে মানুষের মনস্তত্ত্বের খুব অদ্ভুত একটা দিক। প্রসাদ আর লতা দূরে কোথাও ছুটি কাটাতে এসেছে আর ঘটনাচক্রে বারবধূ লতাকেই কিছুদিন গৃহবধূর অভিনয় করে যেতে হয়। মিথ্যা পরিচয়ে যে সামাজিক মর্যাদা সে পেল সেজন্যই লোভ হয়ে থাকবে হয়ত লতার, তবে চিরদিনের জন্য এই সম্মানের দরজা তো আর তার জন্য নয়, কারন সে দরজা আগলে আছে সমাজের কুলকন্যারা। তাই বারবধূর কাছ থেকে কুলকন্যা যে মিথ্যা আধুলিটা চুরি করেছে সেই অপবাদ দিয়ে যেতে লতা শেষমেষ ছাড়ে না – “ না, তুমি করবে কেন, আভা-ঠাকুরঝি আমার এ সর্বনাশটা করলে।”
পুরো সংকলনে “তিন অধ্যায়” আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প। এটা বরং ব্যক্তি মানসের চেয়ে সমাজের সর্বাঙ্গীন মানসিকতার গল্প। অহিভূষণ মুখার্জি ভদ্রঘরের ছেলে তবে পড়ালেখায় বিশেষ না এগোতে পারায় চাকরী করছে “সর্দার স্ক্যাভেঞ্জার” হিসেবে যার মানে হল সকাল সকাল মিউনিসিপ্যালিটির ঝাড়ুদারদের কাজ তদারক করা, শশ্মানে গিয়ে মড়া গোনা ইত্যাদি। ওদিকে পুলিন বাড়ু্য্যে জুতার দোকান দিয়েছে অভাবে পড়ে। মুচিদের সাথে একসময় তাঁর দোকানটা দুভাগে ভাগ করা ছিলো, যেদিন পর্দা পড়ে গেলো সেদিন থেকে তিনি হয়ে গেলেন “পুলিন চামার”। তাঁর মেয়ে বন্দনা হয়েছে হাসপাতালের জমাদারনি – বারীনের ভাষা, “ঠিক এই, এই ধরনের হাবভাব যেসব মেয়েদের দেখা যায় যারা ইচ্ছে করেও হাসতে পারে না, চোখ তুলে তাকাতে পারে না, তাদের মতিগতি একটু অ্যানালিসিস করলেই বুঝতে পারবে যে, তারা শুধু চায় …।” অহি বা পুলিন চামার কিংবা বন্দনা এরা যদিও উঁচু সমাজের সাথে একই কাতারে বসতে পায় না কিন্তু নিজেরা যখন সমাজ রচনা করে সে যাত্রায় সমাজের কর্তাব্যক্তিদের আর বাঁধা দেয়ার উপায় থাকে না। সামাজিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে আরেকটি গল্প “পরশুরামের কুঠার”। তখনও মায়ের দুধ খেতে পায় না এমন বাচ্চাদের জন্য বিদেশী বিকল্প খাবারগুলো বাজারে আসেনি। ধনিয়া এরকম বাচ্চাদের দুধ-মা। তখনও গ্রামে ধনিয়ার ভালই কদর। কিন্তু একদিন যখন শিশুদের জন্য বিদেশী খাবার এলো তখন তিলকের মা ধনিয়ার আর কোন প্রয়োজন নেই। আর ধনিয়ার দুধ খাওয়া শিশুরা বয়ঃপ্রাপ্ত হল তখন দেখা যায় যে তাদেরই চরিত্র খারাপ হয়ে যাওয়ার ভয়ে সমাজ ধনিয়াকে বাধ্য করে বাজারের খাতায় নাম লেখাতে।
“কালাগুরু”, “বৈর নির্যাতন” গল্পদুটো বরং ভারতের জাতীয় চেতনার। আপাত দৃষ্টিতে খুব দয়ালু দেখালেও ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের অফিসার টেনব্রুক আসলে সাম্রাজ্যবাদীদেরই একজন। আর প্রভাতফেরীর গান বন্ধ করতে ব্যর্থ হতেই তাঁকে আবার পুরনো সহিংসতার পথ ধরতে দেখা যায়। “চতুর্থ পানিপথের যুদ্ধ” গল্পটাও আমার খুব প্রিয় গল্প – ভারতীয় চেতনা আর ইংরেজী শিক্ষার টানাপোড়েনে কোনদিকে যাবে আদিবাসী ছেলে স্টিফেন হোরো? “ভাট তিলক রায়” গল্পের তিলক রায় প্রথমে নদীতে বাঁধ দেয়ার বিরোধিতা করেন, পরে ভুল বুঝতে পেরে অংশ নেন বাঁধ তৈরীতে। কিন্তু যখন নতুন এক্সক্যাভেটর আসার কারনে তার চাকরি চলে যায় তখন নিজেই সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে। তাই গল্পটাকে বলা যায় প্রকৃতি আর সভ্যতার চিরায়ত সংঘাতের গল্প।
এই সংকলনের প্রায় সবগুলো গল্পই উপভোগ করার মতো। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য লাগল জাকির তালুকদারের লেখা এই বইয়ের ভূমিকা পড়ে। তিনি মোটামুটি “অযান্ত্রিক” আর “ফসিল” ছাড়া আর কোন গল্প নিয়ে আলোচনা করেননি তাও আবার “ফসিল” গল্পটা এই সংকলনে নেই। আবার যে গল্প গুলোর নাম উল্লেখ করেছেন তার বেশিরভাগই এই সংকলে নেই যেমন – সুন্দরম্, গোত্রান্তর, উচলে চড়িনু, গরল অমিয় ভেল ইত্যাদি। ভূমিকা লেখার সময় এই বইতে কী কী গল্প আছে সে বিষয়ে লক্ষ রাখা একটু হলেও উচিত ছিলো।